মেইন ম্যেনু

নায়িকার ভাড়া ৬৫ টাকা!

১৯৬৩ সালের কথা। বাবা উনার সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে হালদারপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘উদীয়মান সংঘ’। তিনি ছিলেন এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এই সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিবছর তখন স্বরচিত নাটক মঞ্চস্থ হতো। ১৯৬৫ সালে ‘ছোট মা’ নামক নাটক মঞ্চস্থ করার আগে সিদ্ধান্ত হলো, একটা বিপ্লব ঘটাতে হবে। বিপ্লবটা হলো ‘নায়িকা’ ভাড়া করে আনতে হবে। তৎকালীন নাটকের নায়িকা চরিত্রে ছেলেরাই মেয়ে সেজে অভিনয় করতো। সেদিক থেকে বিপ্লবই বটে।

যেই ভাবা সেই কাজ। তখন এই সংগঠনেরই সদস্য এক গানের শিক্ষক কিশোরগঞ্জ থেকে চম্পাদেবী নামে এক নায়িকা ভাড়া করে আনেন ৬৫ টাকার বিনিময়ে। শর্ত ছিল নাটক শেষ হওয়া পর নায়িকার টাকা দেয়া হবে। এরআগে সবাই চাঁদা তুলে টাকার যোগাড় করে নেবে। এদিকে বাস্তবচিত্র উল্টো হয়ে গেলো। নায়িকা আসার পর চাঁদা তুলার কাজ বাদ দিয়ে সবাই নায়িকা দেখায় ব্যস্ত। নায়িকার নাকের গড়ন, চোখের ধরন, নায়িকা হাটে কিভাবে, কি খায়, কেমন করে খায়, কেমন ছাপের শাড়ি পরে তা নিয়ে সবাই এত ব্যস্ত হলো, নাটক শেষে যে তাকে ৬৫ টাকার বিশাল ভার উঠিয়ে দিতে হবে সেদিকে কারো খেয়ালই রইলো না।

নির্দিষ্টদিন নাটক মঞ্চস্থ হলো। এবার নায়িকা বিদায়ের পালা। তখন সবার টনক নড়লো টাকা যোগাড় হয়নি। সবাই যার যার মতো সরে পরলো। দায়িত্বশীল পদে থাকায় বিপদে পড়লেন বাবা আর আব্দুর রহমান নামের একজন। এখানে ওখানে গিয়েও তারা কোনভাবে টাকা যোগাড় করতে পারেন না। আসলে তখন ৬৫ টাকা হঠাৎ করে দেয়ার মতো লোকেরও অভাব ছিল। যাই হোক, টাকাতো দিতেই হবে। অনেক ভেবে চিন্তে উপায়ন্তর হয়ে দুজন মিলে টিএ রোডে একজনের কাছে গেলেন যিনি টাকা ধার দেন। তবে ফেরত নেন ডাবল! সেখানে গিয়ে ঘটল আরেক বিপত্তি। বাবা যার রেফারেন্সে টাকা আনতে গিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন বাবারই চাচা!

তিনি আবার তৎকালীন মুসলিমলীগের প্রতাপশালী পার্লামেন্টিয়ান সদস্য। যিনি টাকা দিবেন তিনি বাবার সেই চাচার কথা শুনে টাকা দেবার পরিবর্তে বলেন, ‘দাঁড়াও; এক্ষুনি আমি সব কথা তোমার চাচাকে গিয়ে বলবো!’ তা শুনে দুজনের আবার পরি কি মরি দৌড়! দৌড়াতে দৌড়াতে মধ্যপাড়ায় পরিচিত এক বাড়ির ধানের গোলায় আবিষ্কার করেন নিজেদের। সেই রাত তারা ধানের গোলাতেই রাত্রিযাপন করেন।

পরদিন ঘুম ভাঙে সেই গানের টিচারের হাউমাউ কান্নায়। বেচারা টিচার পড়েছেন মহাবিপদে। নায়িকা টাকা না নিয়ে যাবেন না। এদিকে তিনি আয়োজকদের কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না। এই অবস্থায় তিনি কিভাবে ধানের গোলায় বাবা আর তার সঙ্গীর অস্তিত্ব টের পেলেন সেই গল্পটা অবশ্য জানি না। বাবা সেখান থেকে বের হয়ে এলেন। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে স্টেশনে নায়িকার কাছে পাঠালেন। তারপর সিনেমা হলের পাশে এক পরিচিত ব্যক্তির অতি সদয় মনোভাবে টাকা ধার নিয়ে ৬৫ টাকার ভারটা নায়িকা চম্পাদেবীর হাতে তুলে দিয়ে এলেন।

কাল মেয়েদের নিয়ে উদীয়মান সংঘের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। ওপাশ থেকে একটা রড বোঝাই ট্রাক্টর আসায় তার সামনে দাঁড়াই। মরচে ধরা টিনের চাল আর ধুলোমাখা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো বাবার কথা। আজকের প্রজন্মের যারা এর সাথে জড়িত তারা হয়ত ভাবতেও পারে না কত ভালোবাসা, কত মমতা আর কত ত্যাগ তিতীক্ষায় একদল স্বপ্নপ্রিয় তরুণের হাত ধরে গড়ে উঠেছে এই উদীয়মান সংঘ। সেদিনের তরণদের অনেকেই আজ চলে গেছে না ফেরার দেশে। অনেকে আজ বয়সের ভারে ন্যুজ। তবু যারা আছেন, তারা আজও কখনো কখনো স্মৃতি হাতড়ে ফিরে যান তাদের প্রিয় ‘উদীয়মান সংঘে’।






মন্তব্য চালু নেই