মেইন ম্যেনু

নিজামী : যেভাবে আলবদর থেকে মন্ত্রী

মতিউর রহমান নিজামী আলোচিত, সমালোচিত, নিন্দিত একটি নাম। ইতিহাসের পরিক্রমায় ৪৫ বছর পর একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার কারণে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ৫ম ব্যক্তি তিনি। নিজামীর জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠা, একাত্তরের ভূমিকাসহ তার জীবনের অজানা নানাদিক আওয়ার নিউজ বিডি’র পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

পারিবারিক জীবন : মতিউর রহমান নিজামী ১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে টাইটেল (কামিল) এবং ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেন তিনি। তার পিতার নাম লুৎফর রহমান খান। ব্যক্তিগত জীবনে নিজামী শামসুন্নাহারের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নিজামীর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামী গুলশানে অবস্থিত ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ। একইসঙ্গে জামায়াতের নারী শাখার নেত্রীও তিনি। ছয় সন্তানের জনক নিজামীর রয়েছে চার ছেলে এবং দুই মেয়ে।

যুদ্ধাপরাধী নিজামী নিজে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও সন্তানদেরকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তার বড় ছেলে ড. নাকিবুর রহমান পড়ালেখা করেছেন মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ কেরোলাইনা ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করছেন। দ্বিতীয় ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। রাবেয়া ভূঁইয়া একাডেমিতে আইন বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করে লন্ডনে গিয়ে বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ছেলেদের মধ্যে কেবল নাজিব মোমেনই দেশে অবস্থান করছেন। তিনি বর্তমানে হাইকোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত। ডা. নাইমুর রহমান খালেদ। তিনি নিজামীর তৃতীয় ছেলে। পড়াশোনা করেছেন পাকিস্তানের একটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।

ছোট ছেলে নাদিম তালহা মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ালেখা করছেন। ছোট মেয়ে খাদিজা অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে লন্ডনের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ছোট মেয়ের স্বামী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম। তিনি একসময় ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। নজরুল ইসলাম বর্তমানে লন্ডনে আইন পেশায় নিয়োজিত।

নিজামীর রাজনীতি : মতিউর রহমান নিজামী ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে যুক্ত হন। পরপর তিন বছর (১৯৬৬-৬৯) তিনি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি হন। এরপর দুইবার তিনি গোটা পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের হাতে বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার পর ১৯৭৭ সালে একটি অভ্যূত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর ক্ষমতায় আসার ১৯৭৮ নিজামী দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে পুনরায় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি শুরু করেন।

১৯৭৮-১৯৮২ সালে তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩-১৯৮৮ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে নিজামী সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে এবং ২০০১ সালে নিজামী জামায়াতের আমির নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর হয়ে সংসদীয় আসন পাবনা-১ (থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি তার প্রার্থীতা হারান। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয়বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি কৃষিমন্ত্রী ও ২০০৩-২০০৬ সাল পর্যন্ত শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

একাত্তরের ভূমিকা : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি আলবদর বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী বাহিনীর হত্যাকাণ্ডে আল-বদর সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে, এবং ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনেও তাদের প্রধান ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গঠিত হলে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তার নেতৃত্ব দেন ইসলামী ছাত্রসংঘের তখনকার সভাপতি ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী।

তদন্ত সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিজামীর নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী যুদ্ধের মধ্যে ঢাকা, পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা, অপহরণ, লুটপাটের মতো ব্যাপক মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালায়।

নিজামীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনীত অভিযোগ সমূহ: পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিনকে ১৯৭১ সালের ৪ জুন পাকিস্তানি সেনারা অপহরণ করে নূরপুর পাওয়ার হাউসের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নিজামীর উপস্থিতিতে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ১০ জুন তাকে ইছামতী নদীর পাড়ে আরো কয়েকজনের সঙ্গে হত্যা করা হয়।

১৯৭১ সালের ১০ মে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ি গ্রামের রূপসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের একটি সভায় নিজামী উপস্থিত ছিলেন। সভায় পরিকল্পনা করে ১৪ মে পাকিস্তানি সেনারা দুইটি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪৫০ জনকে হত্যা করে এবং রাজাকাররা প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ করে। ১৯৭১ সালের মে মাসের শুরু থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের ঘটনায় নিজামীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কারণ তিনি ঐ ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল নিজামীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা ঈশ্বরদী উপজেলার আড়পাড়া ও ভূতের বাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় ২১ জন নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করা হয়। নিজামী ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর ধুলাউড়া গ্রামে ৩০ জনকে হত্যায় নেতৃত্ব দেন ও তার সম্পৃক্ততা ছিল। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর সোহরাব আলী নামক এক ব্যক্তিকে নির্যাতন ও হত্যা করেন। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট নিজামী নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলে গিয়ে আটক রুমী, বদি, জালালদের হত্যার ঘটনায় পাকিস্তানি সেনাদের প্ররোচনা দেন। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর হিন্দু অধ্যুষিত বিশালিখা গ্রামে ৭০ জনকে গণহত্যা করেন। নিজামীর নির্দেশে রাজাকাররা পাবনার সোনাতলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র কুণ্ডুর বাড়িতে আগুন দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউটে ইসলামী ছাত্রসংঘ আয়োজিত সভায় নিজামী উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। ২২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক একাডেমি হলে আল মাদানীর স্মরণসভায় উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্য ১২ নম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ছাত্রসংঘের সভায় বক্তব্যের জন্য ১৩ নম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। সেপ্টেম্বর যশোরে রাজাকারদের প্রধান কার্যালয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্য ১৪ নম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। ১৯৭১ সালের মে মাস থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থিত রাজাকার ক্যাম্পে নিজামী ও রাজাকার সামাদ মিয়ার ষড়যন্ত্রে সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেন এবং আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিজামীর বিরোদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়।

নিজামীর গাড়িতে জাতীয় পতাকা : ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী প্রথমে কৃষি ও পরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। গাড়িতে উড়ান লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত লাল সবুজের পতাকা।

বিচারের মুখোমুখি : বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর প্রথমে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদকে বিচারের আওতায় আনা হয়। ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি মামলায় মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেপ্তার করার পর একই বছরের ২ অগাস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১২ সালের ২৮ মে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে জামায়াত আমিরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক খানসহ প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৬ জন এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। নিজামীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন তার ছেলে মো. নাজিবুর রহমানসহ মোট চারজন। বিচার শেষে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল যে রায় দেয় তাতে প্রসিকিউশনের আনা ১৬ অভিযোগের মধ্যে আটটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এই আট অভিযোগের মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর ঘটনায় নিজামীর ফাঁসির রায় হয়।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন নিজামী। নিজামীর করা আপিলে ১৬৮টি যুক্তি তুলে ধরে সাজার আদেশ বাতিল করে খালাস চাওয়া হয়। সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি রাষ্ট্রপক্ষ।

এই আপিলের ওপর ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর শুনানি শুরু হয় চলে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। দ্বাদশ দিনে শুনানি নিয়ে ৮ ডিসেম্বর আদালত রায়ের দিন ঠিক করে দেন। ২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগেও ফাঁসির রায় বহাল থাকে। ১৫ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করলে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে। পরদিন তা নিজামীকে পড়ে শোনানো হয়। ২৯ মার্চ নিজামী রিভিউ আবেদন করলে ৩ মে শুনানি হয়। ৫ মে নিজামীর করা রিভিউ আবেদন খারিজ করে ফাঁসি বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

জামায়াত আমির নিজামীর ফাঁসির কার্যকরের মাধ্যমে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।






মন্তব্য চালু নেই