মেইন ম্যেনু

নির্বাচন কমিশনের ওপর নাখোশ সব দল

দেশে প্রথমবারের মত রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের ভিত্তিতে হতে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম ধাপে ৭৩২টির নির্বাচনের বাকি আর এক সপ্তাহ। নির্বাচনের দিনক্ষণ যত কাছাকাছি আসছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ততোই বাড়ছে। নির্বাচনী অনিয়ম ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের শত শত অভিযোগ উঠলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) অনেকটাই নির্লিপ্ত। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক দলই ইসির ভূমিকায় নাখোশ। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো, ভোটার ও সাধারণ মানুষ যেন ধরেই নিয়েছে-ইউপি নির্বাচনও শেষ পর্যন্ত প্রহসনেই পরিণত হতে যাচ্ছে। কারও কারও শঙ্কা, ২২ মার্চ অনুষ্ঠেয় প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনের দিন বেলা ১১টার মধ্যেই হয়তো ভোটের কারবার শেষ হয়ে যেতে পারে।

অনেকের এমন আশঙ্কার সঙ্গে প্রায় একমত পোষণ করলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সভাপতি এম. হাজিফ উদ্দিন আহমদও। তিনি গতকাল শনিবার বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে এবং বিভিন্ন ফোরাম থেকে আমরা বারবারই বলছি-নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি ও ভোট সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে ইসি তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করছে না। এর আগে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সময়ও প্রকাশ্যেই সিল মারার ঘটনা ঘটলেও কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কাজেই এই কমিশন যে অকার্যকর ও ব্যর্থ তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’ জনমনের শঙ্কা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিযোগ সম্পর্কে হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘ইউপি নির্বাচনও প্রহসন-ই হতে যাচ্ছে, এখানেও সিল মারার কারবারই ঘটবে।’

ইসি’র ভূমিকায় খোদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও যে অসন্তুষ্ট সেটি প্রকাশ্যেই বলেছেন দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। বৃহস্পতিবার হানিফের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীনের সক্ষে সাক্ষাত্ করে তাদের অসন্তোষের কথা জানায়। সিইসি’র সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে হানিফ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘নিরপেক্ষতার নামে কমিশন আওয়ামী লীগের ওপর খড়গহস্ত।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হানিফ বলেন, ‘আমরা চাই ইসি আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করুক। আইন লঙ্ঘনকারী সংসদ সদস্য, তিনি সরকারি বা বিরোধী যে দলেরই হোন না কেন, তাকে যেন ছাড় দেয়া না হয়।’ গতকাল শনিবার টেলিফোনে হানিফ বলেন, ‘নিরপেক্ষতার নামে ইসি অনেক স্থানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রতি বিরূপ ও অন্যায় আচরণ করছে।’

ইসি’র ভূমিকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও ক্ষোভের বিষয়ে সুজন সভাপতি হাফিজ উদ্দিন হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমার যেটা মনে হচ্ছে, কিছু স্থানে অনিয়মের অভিযোগে ইসি আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নিয়েছে তারা সেটা পছন্দ করছে না। এ কারণেই তারাও ক্ষুব্ধ।’

রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এবং ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীরা প্রায় প্রতিদিনই নানা অনিয়মের অভিযোগ করলেও নির্বাচনের প্রথম ধাপে ইসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আসা ‘অভিযোগ সুস্পষ্ট নয়’-এমন দাবি করে দায় এড়াচ্ছে কমিশন। অথচ এসব অভিযোগের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই কমিশন তদন্ত করার ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি। অবশ্য দ্বিতীয় ধাপের কয়েকটি অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন।

নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ এখনো হয়নি। তাই সময় থাকা সত্ত্বেও কমিশন এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে কেন তদন্ত করবে না? কমিশন বলছে, বিএনপিসহ অন্যান্য দলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগ সুস্পষ্ট বা আমলযোগ্য নয়। কিন্তু তদন্ত না করেই কমিশনের এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অনেকাংশেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া। তদন্ত করলে প্রথম ধাপের ৬২টি ইউপিতে মাত্র একজন করে প্রার্থী থাকার ক্ষেত্রে হয়তো কোনো অনিয়মের বিষয় বেরিয়ে আসত।

নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা এ-ও বলছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৪ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় বিষয়টি দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হয়। এ ব্যাপারে ক্ষতমাসীনদের পক্ষ থেকে সবসময়ই বলা হয়েছে, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে এ ঘটনা ঘটতো না। কিন্তু এখন দলীয় মনোনয়নে হতে যাওয়া ইউপি নির্বাচনে তো বিএনপিসহ উল্লেখযোগ্য প্রায় সব দলই অংশ নিয়েছে। তাহলে এখনও কেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। তাদের মতে, ভোট নিরপেক্ষ বা গ্রহণযোগ্য করা তো পরের কথা, ইসি প্রার্থীদের নির্বিঘ্নে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার বিষয়টিই নিশ্চিত করতে পারেনি।

অবশ্য প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৬২ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ গত ৭ মার্চ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার বিষয়ে কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে কমিশন তা খতিয়ে দেখবে।’ সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ওই ৬২টি ইউপি’র বিষয়ে তদন্ত করা উচিত। কারণ, এতগুলো ইউপিতে একজন করে প্রার্থী থাকাটা অস্বাভাবিক। তদন্ত করলে অনেক অনিয়ম বেরিয়ে আসবে।

প্রথম ধাপের ক্ষেত্রে বিএনপি থেকে একাধিকবার অভিযোগ করা হয়, ৮৩টির বেশি ইউপিতে সরকারদলীয় ব্যক্তিদের বাধার কারণে তাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। অনেকের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বাতিল করা হয়েছে। এ কারণে প্রথম ধাপে ১১৯টিতে বিএনপির প্রার্থী নেই। বিএনপির অভিযোগ, ৮৩ জন প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেয়ার অভিযোগ স্থানীয়ভাবে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দেয়া হয়। প্রতিকার না পেয়ে তাদের বিষয়টি ঢাকায় নির্বাচন কমিশনেও অভিযোগ আকারে দেয়া হয়। কিন্তু কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনে অক্ষম। নির্বাচনের ফল কী হবে, তাও সবার জানা।’ আর দলটির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর অভিযোগ, নির্বাচন নিয়ে অনাচার-অনিয়মের ঘটনা সম্পর্কে ইসি নির্বিকার ও ভ্রুক্ষেপহীন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী আইন-বিধি মোতাবেক নির্বাচন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসন এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। তারপরও প্রশাসনের ওপর কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ দেখা হচ্ছে না। বরং কমিশন নিজেই যেন গা-ছাড়া ভাবে রয়েছে। তা না হলে প্রথম ধাপের ১১৯টি ইউপিতে বিএনপির প্রার্থী না থাকা এবং ৬২টিতে কেবল আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকা অস্বাভাবিক। এ বিবেচনাতেই কমিশন এসব ইউপির নির্বাচন স্থগিত করতে পারত। যা তারা দ্বিতীয় ধাপে এসে ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে করেছে। কমিশন পরশুরামের তিনটি ইউপি’র নির্বাচন স্থগিত এবং ফুলগাজীর ছয়টির নির্বাচন বাতিল করেছে। এছাড়া আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে পাবনা-২ আসনের সরকারদলীয় এমপি আজিজুল হককে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে। আর বরগুনা-২ আসনের সরকারদলীয় এমপি শওকত হাচানুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে কমিশনের সুপারিশে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আলিমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

ইউপি নির্বাচনে অভিযোগের তুলনায় ইসির নগণ্য ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননও। তিনি বলেছেন ‘প্রথমবারের মত দলীয় মনোনয়নে ইউপি নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে আমরা যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলেছিলাম। কিন্তু ইসি তাদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। যার কারণে নির্বাচনের পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।’ সূত্র: ইত্তেফাক






মন্তব্য চালু নেই