মেইন ম্যেনু

নির্যাতন আড়াল করতেই ‘রোহিঙ্গা মুসলমান’দের পায়ে অদৃশ্য শেকল !

মিয়ানমারে সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা যেন অবৈধ পথে অন্য দেশের উদ্দেশে না পালাতে পারে তা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। তাদের উপর অমানুষিক সাম্প্রদায়িক নির্যাতন আড়াল করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে সাগরে ভাসমান অভিবাসীদের আশ্রয় কিংবা স্বীকৃতি না দেয়ার ব্যাপারে এখনও আগের অবস্থানে অটল রয়েছে দেশটি। আর এর মধ্য দিয়ে অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা পরিস্থিতি এবং ভাসমান অভিবাসী সঙ্কট সুরাহার সম্ভাবনা।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এভাবে রোহিঙ্গাদের অবৈধ পথে পাড়ি দেয়া সাময়িক ঠেকানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এ সঙ্কটের সমাধান হবে না। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নানা সহিংসতার শিকার হতে হয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাগরপথে অন্য দেশে গমনে অনেক ঝুঁকি রয়েছে বলে জানার পরও এখনও সে দুর্গম পথ পাড়ি দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন অনেকে। এর কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

20150612-ROHINGYA-slide-VRN0-jumbo

সরকারি ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের কষ্টকর দিনযাপন

২০১২ সালে বৌদ্ধ এবং ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সংঘর্ষ হওয়ার পর বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের বাড়ি ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এরপর মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন শহর থেকে রোহিঙ্গাদের এনে সিত্তে শহরের কয়েক মাইল এলাকাজুড়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। কোন ধরনের বিদ্যুৎ সুবিধা ছাড়াই সেখানে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করে। এখানকার ড্রেনগুলোরও বেহাল দশা। বেশিরভাগ শিশুই ভুগছে অপুষ্টিতে, তাদের জন্য নেই কোন স্বাস্থ্য সুবিধা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কষ্টের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে দ্বীন মোহাম্মদ নামের ৩২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বলেন, সরকার যদি এই ক্যাম্পে থাকতে বাধ্য করে তবে প্রত্যেক রোহিঙ্গাই জাহাজে করে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করবে।

মিয়ানমার সরকারের স্থাপিত শরনার্থী ক্যাম্পে অবহেলিত নুর ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি এখানে থাকতে পারছি না, আমার সন্তান আছে এবং আমি তাদের খাওয়াতে পারছি না।’

তার ছয় সন্তানের দুই সন্তান এবছরই দেশত্যাগ করেছে এবং তাদের সম্পর্কে কিছুই জানেন না তিনি। নুর ইসলাম বলেন, ‘আমার হাতে যদি টাকা থাকতো তবে যত দ্রুত সম্ভব আমি মালয়েশিয়া চলে যেতাম।’

20150612-ROHINGYA-slide-SNAY-jumbo

নির্ভরতার জীবন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানকারীদের জীবন এখন অনেকটাই সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। বেশিরভাগ রোহিঙ্গারই জীবন চলে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য বিদেশি সহায়তায়। এরমধ্যে ১০ হাজার রোহিঙ্গা যারা জাতিসংঘের রেশনের আওতাভুক্ত হয়নি তারা আবার রেশন সহায়তা থেকে বঞ্চিত। দুই মাস আগে মিয়ানমার সরকারের নথিভুক্ত না থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে চাল বিতরণ শুরু করে কিন্তু কিছুদিন পর তা বন্ধ হয়ে যায়। ক্যাম্পের খুব কম লোকেরই চাকরি আছে এবং তাদেরকে জমানো টাকা এবং অন্যের সহায়তার উপর নির্ভরে করেই জীবন যাপন করতে হয়।

সাময়িক নজরদারি

আন্তর্জাতিক চাপের কারণে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও এ বিষয়টি বেশিদিন স্থায়ী হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমার সরকার মানবপাচারকারী জাহাজের উপর নজরদারি রাখলেও সত্যিকার অর্থে রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাক এমনটাই চায় মিয়ানমার সরকার। সুতরাং সরকারের এ নজরদারি বেশিদিন টিকবে না বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

safe_image

আবহাওয়া অনুকূলে এলে আবারও বাড়বে মানব পাচার

দক্ষিণ থাইল্যান্ডে অভিবাসীদের ক্যাম্প ধরা পড়ার পর পাচারকারীরা এখন অনেকটাই নিস্তেজ অবস্থান নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া খুব বিপদজনক ও ভয়ংকর হওয়ায় সাগরপথে পাড়ি দেয়া কিছুদিন বন্ধ থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী অক্টোবর নভেম্বরে আবহাওয়া অনুকূলে এলে চাহিদা অনুযায়ী আবার শুরু হবে মানবপাচার।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ১০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়েছে এবং এদের বেশিরভাগই সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়েছে কিংবা পাচারের শিকার হয়েছে। অভিবাসীদের বেশিরভাগই বাঙ্গালী উল্লেখ করে সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি ভবনের সহকারী পরিচালক ইউ জ হটে বলেন, বাঙ্গালীদের জন্য মিয়ানমার সরকারের সিদ্ধান্তে কোন পরিবর্তন নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাগরে ভাসমান অভিবাসীদের দায়িত্ব কোন দেশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর আন্তর্জাতিক চাপের কারণে গেল মাসে ব্যাংককে আলোচনায় বসেন আঞ্চলিক নেতারা, যেখানে তাদের সাময়িক অভিবাসী হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। তবে মিয়ানমার তখনো রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। সমুদ্রে ভাসমান মানুষদের দুর্দশার এত খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে নি মিয়ানমার।

আর মিয়ানমার সরকারের কঠোর নীতিতে যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে কেবল পালানো বন্ধ করে অভিবাসী সঙ্কটের সমাধান সম্ভব হবে না বলেই মনে করে নিউইয়র্ক টাইমস।






মন্তব্য চালু নেই