মেইন ম্যেনু

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চলছে মা ইলিশ নিধন

নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে মা ইলিশ শিকারের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছেন বরিশালের মৎস্যজীবীরা। ঝুঁকি নিয়ে মাছ শিকার করলেও ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে জেল-জরিমানা ভোগ করতে হচ্ছে। হারাতে হচ্ছে নৌকা ও জাল। পক্ষান্তরে নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখিয়ে লাভবান হচ্ছেন মধ্যসত্ত্বভোগীরা।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ দিনের জন্য মা ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এ সময় মা ইলিশগুলো নদীতে এসে ডিম ছাড়ে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ওই ১৫ দিন সব ধরনের ইলিশ শিকার থেকে বিরত রাখতেই এ নিষেধজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

৩ অক্টোবর শনিবার সকাল পর্যন্ত বরিশালের কীর্ত্তনখোলা নদী ও এর আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার নজরদারির মধ্যেও ইলিশ শিকার করতে দেখা গেছে জেলেদের। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিপুল পরিমাণ মা ইলিশ ও জাল জব্দ এবং অনেক জেলেকে আটক করেছে।

গত শুক্রবার প্রতিবেদকগণ বরিশাল নদীবন্দর টার্মিনাল থেকে দপদপিয়া সেতু এবং চানমারি খাল, মরাগাঙ্গি খাল, রূপাতলি খালসহ এর আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে মা ইলিশ নিধনের এসব দৃশ্য দেখেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অভিযানও চোখে পড়ে তাদের। তাদের নজরদারি ফাঁকি দিয়ে জেলেরা মাছ শিকারে অভিনব পন্থা অবলম্বন করছে। এরা সাধারণত ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে কীর্ত্তনখোলা নদী ও খালের সংযোগ মুখে অবস্থান করে। প্যাট্রল ট্রলার দেখলেই তারা জাল পেতে রেখে দ্রুত নৌকা বেয়ে ভেতরে চলে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরে গেলেই জাল টেনে মাছ সংগ্রহ করে। এভাবে প্রতিটি নৌকা প্রতিবার জাল টেনে মা ইলিশ তোলে। প্রতিটি ইলিশের পেটই ডিমে ভরা থাকে।

চর কাউয়ার জেলে আসাদ মিয়া ও সামছুল আলম কোস্টগার্ডের ধাওয়া খেয়ে দপদপিয়া সেতুর উত্তর দিকে একটি খালের ভেতরে অবস্থান করছিলেন। এ সময় তাদের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, ‘মাছ ধরাই আমাদের একমাত্র পেশা। একদিন মাছ ধরতে না পারলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। পুলিশের ধাওয়া খেয়েও আমাদের মাছ ধরতে হয়। এ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। সরকার জাটকা না ধরার বদলে কিছু খাবার আমাদের দেয়। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তাই বাধ্য হয়ে মাছ ধরতে হয়। আমার তিনটি জাল ছিল। এর মধ্যে দুটি জাল পুলিশ নিয়ে গেছে। এতে আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে।’

নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মাছ বিক্রি করেন কীভাবে, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাইকারদের দালালরা বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মাছ সংগ্রহ করে। প্রতি কেজি মাছ ১৫০-২০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। অথচ ওই মাছই বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৭০০ টাকায়।

শুক্রবারও র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যৌথ অভিযান চালাতে দেখা গেছে। এর মধ্যেই মা ইলিশ শিকারের মহোৎসব চলছে।

জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার ১৫ দিনে সরকারিভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হওয়ায় সংসারের খরচ জোগাতে ঝুঁকি নিয়ে ইলিশ শিকারে নদীতে নামছেন তারা। ফলে মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের গৃহীত উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে।

নিষেধাজ্ঞার ৮ দিনে (শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) বরিশাল বিভাগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৭৪০ দফা অভিযান চালিয়ে ২৭৭ জন জেলেকে আটক করেছে।

দেশের ইলিশ উৎপাদনের অন্যতম স্থান বরিশাল বিভাগের ৯০টি নদ-নদীর ৩ লাখ ২০ হাজার ২৫৪ হেক্টর জল এলাকা। এখান থেকেই সিংহভাগ ইলিশ আহরণ করা হয়ে থাকে। এ বিভাগে নিবন্ধনকৃত জেলের সংখ্যা ২ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮৬ জন।

দেশের নদ-নদীতে জাটকা সংরক্ষণের জন্য মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৮ মাস জেলেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ওই সময় জেলেদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে সরকার। কিন্তু মা ইলিশ রক্ষায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে দেশের সব নদ-নদীতে ইলিশ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা। তবে এবার জেলেদের পুনর্বাসনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

Elish1

সরকারের পক্ষ থেকে জাটকা সংরক্ষণের সময় গত মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুন মাসে এ বিভাগের ১ লাখ ২৯ হাজার ৬৭৮ জনকে ১৬০ কেজি করে মোট ২৭৪৮ দশমিক ৪৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়। এছাড়া বৈধ জাল বিতরণ করা হয় ৪ হাজার ৬৭০ জনকে।

এদিকে প্রতি সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবর প্রথমে ১১ দিন মা ইলিশ রক্ষার জন্য সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও এ বছরই প্রথম ১৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

কিন্তু এই ১৫ দিনে সরকারের পক্ষ থেকে জেলেদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা না করায় সংসারের খরচ জোগাতে নদীতে নামতে হচ্ছে জেলেদের। এর ফলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দক্ষিণের নদ-নদীতে চলছে মা ইলিশ নিধন চলছে।

প্রায় সব নদীতেই চলছে ইলিশ শিকার। ফলে প্রতিদিনই র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড আর বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানের আটক হচ্ছে জেলেরা।

Elish

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ দিনে (শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) বরিশালের ৯০টি নদীতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে ২৭৭ জন জেলেকে আটক করেছে। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই ৮ দিনে মোট ৪৩৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে।

বরিশাল বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক আজিজুল হক জানান, মা ইলিশ রক্ষায় এ পর্যন্ত ৭৪০ দফা অভিযান চালানো হয়েছে। এতে ৩৮৯ মেক্ট্রিক টন ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫০ টাকা। উদ্ধার করা হয়েছে জেলেদের ব্যবহৃত ২৮টি নৌকা ও ট্রলার। পাশাপাশি ২৭ দশমিক ৩৭ মিটার জাল উদ্ধার করা হয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. ওহিদুজ্জামান জানিয়েছেন, ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত বরিশাল জেলায় ২৩৮ দফা অভিযানে ১০৪ জনকে আটক করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৪৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৭২৯ কেজি ইলিশ ও ৬ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ মিটার জাল উদ্ধার করা হয়েছে। রাইজিংবিডি






মন্তব্য চালু নেই