মেইন ম্যেনু

নীরবে শক্তি সঞ্চয় করছে শিবির

এক সময় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতিতে একক রাজত্ব ছিল ’৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডসহ বিগত দিনে হরতাল- অবরোধে চট্টগ্রাম মহানগরী ও নগরীর বাইরে বিভিন্ন উপজেলায় হত্যা, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন নাশকতায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা।

বিগত দিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগে যেসব মামলা হয়েছে তার বেশির ভাগ আসামিই হলো ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী। এ সব মামলায় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে আছেন শিবিরের শীর্ষ থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। অনেকেই গ্রেফতার আতঙ্কে এলাকা ছেড়েছেন অনেক আগেই। অনেকে আবার দেশত্যাগও করেছেন। যেসব নেতা-কর্মী দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন সংগঠনের তরফ থেকে আইনগত সহায়তার পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি মাসে দেওয়া হচ্ছে আর্থিক সহযোগিতাও। মূলত জামায়াত-সমর্থিত চট্টগ্রামের কিছু ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও প্রবাসীরা শিবিরকে পুনরুজ্জীবিত করতে অর্থায়ন করছেন।

ইতিমধ্যে দীর্ঘদিন জেল খেটে শিবিরের অনেক নেতা-কর্মী জামিনে বেরিয়ে এসেছেন। খবর নিয়ে জানা গেছে, শিবিরের যে সব নেতা-কর্মী জামিনে বেরিয়ে আসছেন তারা আগের মতো সক্রিয় হচ্ছেন সাংগঠনিক কর্মকান্ডে। সংগঠনকে গতিশীল করতে এবং চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সংগঠনের পূর্বের অবস্থান ফিরিয়ে আনতে তৃণমূলে গিয়ে জোরেশোরে কাজ করছেন শিবিরের নেতা-কর্মীরা। নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে কলেজ, মাদ্রাসা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা ও উপজেলায়। নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে চলছে দাওয়াতি কার্যক্রম।

চলছে ঘরোয়া বৈঠক ও প্রশিক্ষণ

চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইউনিটের কর্মী সদস্যদের নিয়ে গোপনে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও ঘরোয়া বৈঠকের আয়োজন করছেন শিবিরের দায়িত্বশীলরা। এই কর্মসূচিগুলো মূলত করা হচ্ছে সুকৌশলে প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে। চট্টগ্রাম নগরী ও এর বাইরে বিভিন্ন মসজিদে ফজর ও এশার নামাজের পর ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে মিলিত হচ্ছেন শিবিরকর্মীরা। সেখানে সিনিয়ররা উপস্থিত হয়ে দিক নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

খবর নিয়ে আরো জানা গেছে, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে কোনো কোনো নেতা নিজের ব্যবসা বা পারিবারিক অনুষ্ঠানের আড়ালে বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের একত্রিত করে সাংগঠনিক কর্মসূচি সারিয়ে নিচ্ছেন।

সামাজিক সংগঠনের আড়ালে কর্মসূচি

প্রশাসনের নজরদারি ও সরকারি দলের বাধার কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের ব্যানারে কোনো কর্মসূচি পালন করতে না পারলেও কৌশল পরিবর্তন করে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের আড়ালে নিয়মিত সংগঠনের কার্যক্রম তারা চালিয়ে যাচ্ছেন সুকৌশলে। এই সামাজিক সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা। উপরে জনহিতকর বা ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কথা বলা হলেও ভেতরে মূলত শিবিরের আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্যই কাজ করছে এই সংগঠনগুলো। এ সব সংগঠনের ব্যানারে বিভিন্ন সময় এসএসসি, এইচএসসির কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার আয়োজন করা হলেও মূলত অনুষ্ঠানের অভ্যন্তরে অর্থায়ন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শিবিরের হাইকমান্ড। অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবেও রাখা হয় জামায়াতের আদর্শে বিশ্বাসী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পেশাজীবীদের।

এদিকে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এবং মেধাবীদের শীর্ষ কলেজ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ও সরকারি মহসিন কলেজে একক আধিপত্য ধরে রেখেছে ছাত্রশিবির। শুধু কলেজ ক্যাম্পাস নয়, দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব আবাসিক হল এবং আশপাশের কোচিং সেন্টার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন শিবিরের নেতা-কর্মীরা। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে কোনো ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনই শিবিরকে বিতাড়িত করতে পারেনি এ দুই কলেজ থেকে। মূলত এ দুই কলেজ থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় চট্টগ্রামের রাজনীতি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগ ও বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের দাবির মুখে দুই কলেজে প্রশাসন রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও থেমে নেই শিবিরের তৎপরতা।

সরেজমিনে দুই কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পোস্টার, ব্যানারে ছেয়ে আছে কলেজ ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলগুলোতে নিয়মিত চলে সাংগঠনিক কার্যক্রম। কলেজ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পূর্বের নিয়মে এখনো প্রতিনিধিত্ব করেন কলেজ ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীলরা। উল্লেখ্য, কলেজ দুটির আবাসিক হলগুলোতে পুলিশ বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র গোলাবারুদসহ বিভিন্ন নাশকতার সরঞ্জাম উদ্ধার করেছিল।

নিয়ন্ত্রণ করছে কোচিং সেন্টারগুলোও

চট্টগ্রামের বেশিরভাগ কোচিং সেন্টারের মূল নিয়ন্ত্রক ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা। অভিযোগ আছে এসব কোচিং সেন্টারের আড়ালে পরিচালিত হচ্ছে শিবিরের কার্যক্রম। কোচিং সেন্টারগুলোতে তাদের অনুগত ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বিনা ফিতে কোচিং করানোর পাশাপাশি সংগঠনে ভেড়াতে অনেক শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত ফির চেয়ে বড় অঙ্কের ছাড় দিয়ে ভর্তি করানো হচেছ। খবর নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন নাশকতা মামলার আসামিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিতে শিক্ষক সেজে এসব কোচিং সেন্টারে নিরাপদে অবস্থান করেন। নগরীতে শিবির পরিচালিত কোচিং সেন্টারগুলো হচ্ছে ইনডেক্স, ফোকাস, রেটিনা, প্রবাহ, কংক্রিট।

চট্টগ্রামে শিবিরের গোপন তৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার অপরাধ ও অভিযান দেবদাশ ভট্টাচার্য এই সময়কে বলেন, নাশকতার মামলায় শিবিরের অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোরও দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হবে। তাছাড়া নগরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শিবিরের অপতৎপরতা ঠেকাতে তৎপর রয়েছে।ঢাকা টাইমস






মন্তব্য চালু নেই