মেইন ম্যেনু

নীলক্ষেতেই মিলছে থিসিস পেপার, মৌলিক গবেষণা পণ্ড!

নীলক্ষেতে টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস ও রিসার্চ মনোগ্রাফ। সম্মান শেষ বর্ষে এসে গবেষণা প্রবন্ধ হিসেবে এসব ব্যবহার করছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিষয় ভেদে গবেষণাপত্রের দামও নির্ধারণ করছেন বিক্রেতারা। ৪০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকায় মিলছে এসব।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এ ধরনের রেডিমেড থিসিস মনোগ্রাফ শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক সৃষ্টিশীলতাকে নিরুৎসাহিত করছে। এ ছাড়া এর ফলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মৌলিক কোনও গবেষণা প্রবন্ধও আসছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, আইন অনুষদ, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ও বিজ্ঞান অনুষদের বেশিরভাগ বিভাগের শিক্ষার্থীকেই থিসিস ও রিসার্চ মনোগ্রাফের কাজ করতে হয়। শিক্ষার্থীদের দিয়ে থিসিস মনোগ্রাফ করানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ মাহমুদ জানান, শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ের ওপর পড়াশোনা করছে সে বিষয়ে নতুন কোনও তথ্য বা জ্ঞান বের করে আনাই গবেষণা কাজ করানোর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য। এ জন্য শিক্ষার্থীরা যে বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছে সে বিষয় সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করবে এবং নিজে গবেষণার মাধ্যমে সেটার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবে।

রেডিমেড থিসিস-মনোগ্রাফের সন্ধান জানতে রবিবার সরেজমিনে নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেটে ঢুকতেই কয়েকটি দোকানে চোখে পড়ে- ‘এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস, মনোগ্রাফ তৈরি ও প্রিন্ট করা হয়’ লেখা সাইনবোর্ড। একাধিক দোকানের কর্মচারী ডাকতে শুরু করেন ‘আসেন ভাই কী লাগবে, সার্টিফিকেট, থিসিস, মনোগ্রাফ?’

পরিচয় গোপন রেখে কথা হয় ‘গেটওয়ে ডিজিটাল প্রিন্ট ও কম্পিউটার’ নামের একটি দোকানের এক কর্মচারীর সঙ্গে। ভালো রিসার্চ মনোগ্রাফ পাওয়া যাবে কিনা জানতে চাইলে উল্টো ‘ছয় হাজার কপি আছে’ বলে দাবি করেন ওই দোকানের আরেক কর্মচারী। একটি টপিকের নাম বলতেই কম্পিউটার ফাইলে খুঁজতে শুরু করেন তিনি। এরপরই কথা প্রসঙ্গে দামসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ওই কর্মচারী জানান, ‘একেকটা কপির একেক রকম দাম। একশ, দুইশ, আড়াই’শ আবার কোনওটা চার’শ টাকাতেও বিক্রি করি। সেটা টপিকের ওপর নির্ভর করে। প্রিন্ট করালে সবকিছু মিলে ৪০০ টাকার মতো পড়বে।’

কারা এসব থিসিস ও মনোগ্রাফ বেশি কিনতে আসে জানতে চাইলে তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরই এর প্রধান ক্রেতা। তবে এরমধ্যে মার্কেটিং রিলেটেড থিসিস পেপারের চাহিদা বেশি।

384a4bd310a4318b3ce2f58631fcba8e-Shadikur-thesis-monograph-1
নির্ধারিত টপিক না পাওয়ায় ওই কর্মচারীর পরামর্শেই খোঁজ লাগানো হয় নাজিম কম্পিউটার নামের আরেকটি দোকানে। সে দোকানের সন্ধান পাওয়ার আগেই সমাদর করে আরেক দোকানে প্রতিবেদককে বসতে বলেন নাসির কম্পিউটার অ্যান্ড প্রিন্টের এক কর্মচারী।
টপিকের নাম শোনার পর ওই কর্মচারী বলেন, ‘এই টপিক এখন নাই। বানিয়ে দিতে হইব।’ কয়দিন সময় লাগবে জানতে চাইলে বলেন, ‘প্রথমে আমরা টপিকটা নিয়ে স্টাডি করব। এরপর দুই দিনের মাথায় একটা প্রুফ কপি দিবো। বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষাতেই দেওয়া যাবে। প্রুফ কপির জন্য ১৫০০ টাকা লাগবে, আর প্রিন্টের জন্য আলাদা খরচ। ’

ফাইনাল কপি কবে পাওয়া যাবে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর পাওয়া যায়, ‘প্রুফ কপি পাওয়ার পর সেটা আপনার সুপারভাইজারকে দেখালে উনি বলে দেবেন মনোগ্রাফে আর কী কী লাগবে। তারপর আমাদের কাছে আসলে ফাইনাল কপিটা করে দেব।’

জানা যায়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাদের থিসিস, মনোগ্রাফ নীলক্ষেতের এই দোকানগুলোতে প্রিন্ট ও বাঁধাই করাতে আসলে কৌশলে একটি কপি কম্পিউটারে রেখে দেন দোকানের অপারেটররা। পরে সেটাই অন্য কোনও শিক্ষার্থীর কাছে বিক্রি করেন।
বাকুশাহ মার্কেটে নাজিম কম্পিউটার এন্ড প্রিন্ট-এর দোকানে মনোগ্রাফ কিনতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, ‘ফোর্থ ইয়ারে এসে এমনিতেই পড়াশোনার বিভিন্ন চাপ থাকে। তারমধ্যে মনোগ্রাফ নিয়ে আবার কাজ করতে হয় ফাইনাল পরীক্ষার আগ মুহূর্তে। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে মনোগ্রাফ করার সময় পাওয়া যায় না। তাছাড়া মনোগ্রাফের জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মেথোডলজি সম্পর্কেও ক্লাসে খুব বেশি বুঝিয়ে পড়ানো হয় না। শিক্ষকরা যেমন আমাদের সঙ্গে ফাঁকিবাজি করেন, তখন আমরা একটু করলে দোষ কী! ’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘এ ধরনের অপকৌশল বন্ধ করতে সার্বক্ষণিক মনিটর প্রয়োজন। এর আগেও নীলক্ষেতে অভিযান চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ জালিয়াতি চক্রকে ধরা হয়েছে। যেহেতু এবার থিসিস মনোগ্রাফ জালিয়াতির চক্র নতুন করে তৈরি হয়েছে সেহেতু এজন্যও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলাদা মনিটরিং-এর ব্যবস্থা করা হবে।’
শিক্ষকদের গাফিলতির অভিযোগ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক। তবে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এদিকে নীলক্ষেতের রেডিমেড এসব থিসিস মনোগ্রাফের মান সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক রাশেদ মাহমুদ বলেন, ‘অধিকাংশ মনোগ্রাফের কাজ মোটেও ভালো হয় না। কারণ টাকার বিনিময়ে যে থিসিস মনোগ্রাফ পাওয়া যায় সেগুলোতে বিষয়ের গভীরতা থাকে না। কাজগুলো অনেকটা দায়সারা গোছের হয়। প্রত্যেকটা বিষয়ের একটা নির্দিষ্ট দর্শন থাকে। এধরনের কাজগুলোতে সেটার ধারে কাছেও যাওয়া হয় না। কারণ কাজটা হয় কপি-পেস্টের মাধ্যমে।’

এদিকে টাকার বিনিময়ে থিসিস মনোগ্রাফ কিনতে পাওয়াকে শিক্ষার বাণিজিকীরণের ফল বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘বতর্মান সময়টাই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের সময়। যার কারণে আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, থিসিস মনোগ্রাফ কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। এটা শুধু একজন শিক্ষার্থীর সৃষ্টিশীলতাকে সংকীর্ণই করছে না বরং এর পাশাপাশি তার শিক্ষার প্রায়োগিক জীবনেও প্রভাব ফেলছে। ’

রেডিমেড থিসিস মনোগ্রাফ প্রতিরোধে প্রধান দায়িত্ব শিক্ষকদেরই পালন করতে হবে বলে জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘একটি থিসিস আসল না নকল সেটা একজন শিক্ষকই ভালো ধরতে পারবেন। তাই এটা প্রতিরোধের জন্য তাদেরই সচেতন হতে হবে।’ শিক্ষার্থীদের মতো শিক্ষকরাও যদি এক্ষেত্রে দায়সারা ভূমিকা পালন করেন তাহলে এসব কিছুতেই বন্ধ হবে না।’বাংলাট্রিবিউন






মন্তব্য চালু নেই