মেইন ম্যেনু

একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি নিয়ে হযবরল অবস্থা

পদ্ধতির জাঁতাকলে শিক্ষার্থীরা

একাদশ শ্রেণীর ভর্তিতে অনলাইন পদ্ধতি শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের জীবনে মহাদুর্ভোগ বয়ে এনেছে। কারিগরি ত্রুটি আর দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে শুরু থেকেই এ নিয়ে ভোগান্তি ও হয়রানি পৌঁছেছে চরমে। অথচ নতুন এ পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতিই ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। আগে থেকে নেয়া হয়নি সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনাও। মাত্র ৩ সপ্তাহ আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে একপ্রকার হুট করেই নতুন এ পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়া হয় ৩৫ লাখ শিক্ষার্থী-অভিভাবকের ওপর।
এ পদ্ধতির প্রায়োগিক দিকগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে প্রচার-প্রচারণাও চালানো হয়নি। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক এটি বুঝে উঠতে পারেননি। এমনকি অনেক শিক্ষকের কাছেও বিষয়টি ছিল দুর্বোধ্য ও জটিলতাপূর্ণ। এ নিয়ে সময় সময় যে নির্দেশনা জারি করা হয়, তাও স্পষ্ট ছিল না। এক কথায় এবার একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির পুরো পদ্ধতিটিই হয়ে ওঠে বিভ্রান্তিকর। এ কারণে ভর্তি আবেদন থেকে শুরু করে ফল প্রকাশ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পদে পদে বিপাকে পড়তে হয়েছে। অপরিসীম হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হয়েছে তারা। বিশেষ করে পছন্দের কলেজে ভর্তির ফল জানার জন্য তাদের থাকতে হয় দীর্ঘ প্রতীক্ষায়। বারবার ফল প্রকাশের সময় পিছিয়ে দিয়ে তৈরি করা হয় আরেক দুঃসহ পরিস্থিতি। ফল প্রকাশের পরের জটিলতাও প্রকট। এসব নিয়ে লাখ লাখ মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এখন চরম পর্যায়ে। ফল প্রকাশের পর চান্স পাওয়া ও না পাওয়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
এদিকে টানা ভোগান্তির পর রোববার মধ্যরাতে ফল প্রকাশ করা হলে তৈরি হয় আরেক দুর্ভোগের অধ্যায়। কে কোথায় চান্স পেয়েছে, তা জানতে পারাটা হয়ে ওঠে রীতিমতো যুদ্ধের শামিল। ফল জানতে ওয়েবসাইটে (www.xiclassadmission.gov.bd) ঢোকাই যাচ্ছিল না। অনলাইনে ‘কমান্ড’ দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ফল মেলেনি। উপায়ন্তর না পেয়ে অনেকে বন্ধুদের ফোন করেছে। কেউ বা ফল জানতে ছুটে গেছে পছন্দের তালিকায় দেয়া এক কলেজ থেকে আরেক কলেজে। এখানেই শেষ নয়, ভালো ফল- বিশেষ করে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েও অনেকে কোথাও চান্স পায়নি। আবার কেউ সুযোগ পেলেও সেটা পছন্দের কলেজ হয়নি। কেউ আবার বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে সুযোগ পেয়েছে ব্যবসায় প্রশাসন বা মানবিক বিভাগে। কিংবা ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীকে এমন কলেজে দেয়া হয়েছে যেখানে এ বিভাগই নেই। অনেকের আবেদনই গৃহীত হয়নি। এভাবে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগের অন্ত নেই। এ নিয়ে সোমবার শত শত অভিভাবক অবস্থান করেন ঢাকা বোর্ডে। ভুক্তভোগী এসব শিক্ষার্থীর অনেকের অসন্তোষ এমনই চরম ছিল যে, বোর্ড কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে অপ্রীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সব কলেজে নতুন এ পদ্ধতি চালুর ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী ও সচিবের মধ্যে ব্যাপক মতানৈক্য ছিল। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ চেয়েছিলেন সর্বনিু ৩০০ শিক্ষার্থী পড়ায় এমন কলেজকে অনলাইনের অধীনে আনতে। কিন্তু শিক্ষা সচিব সব কলেজকেই (৮ হাজার ৮৮১টি) নতুন এ পদ্ধতির অধীনে আনেন। এ নিয়ে ভর্তি নীতিমালা দু’বার চূড়ান্তও করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রীর অসম্মতির পরও শিক্ষা সচিব এ কাজ করেছেন। সচিবের গোয়ার্তুমির কারণেই আজ লাখ লাখ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
অবশ্য শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন এবং এ নিয়ে সৃষ্ট সব সমস্যার দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন। রোববার তিনি এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমার পরিকল্পনাতেই অনলাইনে ভর্তির প্রক্রিয়াটি হচ্ছে। ভুলভ্রান্তি যা আছে এর সব দায় আমার।’
এদিকে বারবার ফল প্রকাশের সময় পেছানোর কারণে ভর্তির সময়সূচি ও নির্দেশনাও একইভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। সর্বশেষ এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি হয় রোববার রাতে। কিন্তু এটি প্রকাশ করা হয় ওয়েবসাইটে। যেহেতু ওয়েবসাইটে ঢোকা যাচ্ছিল না, তাই অনেকেই এ সম্পর্কে জানতে পারেনি। এখানেই শেষ নয়, প্রকাশিত ভর্তি প্রক্রিয়ার বিবরণ ও নির্দেশিকাও পরিষ্কার নয় বলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানিয়েছেন। এ কারণে যারা চান্স পেয়েছে আর যারা চান্স পায়নি, তাদের উভয়পক্ষকেই ঢাকা বোর্ডে ছুটতে হয়েছে।
ফল প্রকাশের পর সোমবার সরেজমিন ঢাকা বোর্ডে গিয়ে দেখা যায়, জটিলতায় নিপতিত শত শত অভিভাবক সমস্যার সমাধান পেতে কখনও চেয়ারম্যানের দফতরে ছুটে যাচ্ছেন, কখনও সচিব বা কলেজ পরিদর্শকের দফতরেও ছুটে গেছেন। কিন্তু কোথাও সঠিক জবাব তারা পাননি। ফলে একপর্যায়ে ভুক্তভোগীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চান্স না পাওয়া ছাত্রছাত্রী ও তাদের বাবা-মায়েরা কলেজ পরিদর্শকের কক্ষের সামনে সমাবেশ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ে। বিক্ষুব্ধরা একপর্যায়ে কলেজ পরিদর্শক ড. আশফাকুস সালেহীনের কক্ষে প্রবেশ করে তাকে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। বিক্ষুব্ধদের কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন নতুন পদ্ধতি প্রবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়ে। অনেকে এ পদ্ধতির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন করেছেন। তাদের অভিযোগ, স্বচ্ছ পদ্ধতি প্রবর্তন করতে পারেনি সরকার। কিন্তু এ ব্যর্থতার দায় নিতে হচ্ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী-অভিভাবককে।
পিতৃহীন ছাত্রী লায়লা খায়রুন নাহার এবার মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে হলিক্রস, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা সিটি কলেজ, হারম্যান মেইনার এবং শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজকে পছন্দক্রমে দিয়েছে। কিন্তু একটিতেও চান্স পায়নি। সোমবার দুপুরে লায়লা তার মাকে নিয়ে বোর্ডের কলেজ পরিদর্শকের কক্ষে ঢুকেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। সঙ্গে তার মাও। লায়লা বলেন, আমি কেন চান্স পাব না। আমি তো খারাপ ফল করিনি। ভর্তি নিয়ে দুর্নীতি হওয়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে।
একই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শামিউল হক চৌধুরীরও কোথাও চান্স হয়নি। গতরাত থেকে রুম বন্ধ করে বসে আছেন তিনি। তার পক্ষে বাবা রফিকুল ইসলাম ছুটে এসেছেন বোর্ডে। তিনি কলেজ পরিদর্শককে বলেন, ‘স্যার, আমার ছেলেকে বাঁচান। ও’ ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। এই কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে রফিকুল উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, আমার ছেলে আত্মহত্যা করলে এর দায় কে নেবে?
মতিঝিল মডেল স্কুল ও কলেজ থেকে জিপিএ-৫সহ এসএসসি পাস করা ফাহিম আহমেদ কলেজ পরিদর্শকের কক্ষে বসে জানান, তার চান্স হয়েছে মালিবাগের ঢাকা বিজ্ঞান কলেজে। তারা এখন ৫০ হাজার টাকা চায়। ফাহিম জানান, সে এ কলেজে পড়বে না। কিন্তু অন্য কলেজ পেতে হলে নীতিমালা অনুযায়ী তাকে এখন ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হবে। এরপর তাকে পছন্দের তালিকায় থাকা উপরের কলেজে ভর্তির জন্য পুনরায় আবেদন করতে হবে।
মো. রানা নামে এক ছাত্র জানায়, সে আবেদন করেছে এক কলেজে, তাকে দেয়া হয়েছে আরেক কলেজ। আবদুল হান্নান অনিক, রাজু আহমেদ হৃদয়সহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তারা বিজনেস স্টাডিজে পড়তে চায়। কিন্তু তাদের সরকারি বিজ্ঞান কলেজে দেয়া হয়েছে, যেখানে এ বিভাগই নেই। মুনিরা আহমেদ নামে একজন জানায়, আমি ৪টি সরকারি আর একটি বেসরকারি কলেজ পছন্দে দিয়েছি। আমাকে বেছে বেসরকারি কলেজে চান্স দেয়া হয়েছে। এখানে দুর্নীতি হয়েছে বলে দাবি তার। বিলকিস রহমান নামে এক অভিভাবক জানান, তার ছেলে ওয়াসিমুর রহমান ঢাকা কলেজে বিজ্ঞানে আবেদন করে মানবিকে চান্স পেয়েছে।
রুমানা আক্তার, সাথী রানী সাহাসহ কয়েকজন জানায়, তারা সরকারি বদরুন্নেসা কলেজে এসএমএসে আবেদন করেছে। কিন্তু কোথাও সুযোগ পায়নি তারা। এভাবে বিভিন্নজন বিভিন্ন অভিযোগ করতে থাকেন কলেজ পরিদর্শকের কাছে। একপর্যায়ে সেখানে হট্টগোল বেধে যায়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। কলেজ পরিদর্শক ড. আশফাকুস সালেহীন বলেন, জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও চান্স না পাওয়ার এ সংকট সব কলেজের ক্ষেত্রে নয়। দেখা গেছে, বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী হাতেগোনা ১০টি কলেজকে পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রেখেছে। এছাড়া অনেকে ৫টি কলেজ পছন্দ তালিকায় না দিয়ে ২টি বা ৩টি দিয়েছে। এ কারণে জিপিএ-৫ পেয়েও তারা চান্স পায়নি। তিনি আরও বলেন, পছন্দের কলেজে চান্স না পাওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে মেধায় না কুলানো। কেননা ঢাকার ১০টি কলেজে ১২ হাজার করে আবেদন পড়েছে। এ রকম একটি ঢাকা কলেজ। এ কলেজে আসনসংখ্যা ৬০০। এ ক্ষেত্রে যত ভালো ফলই হোক না কেন, বাকি ১১ হাজার ৪০০ ছাত্রকে বাদ দিতে হয়েছে। এ বাদপড়াদের কেউ কেউ আজ এখানে এসেছে অভিযোগ নিয়ে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীকে কলেজ বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে তার জিপিএ, বিষয় র‌্যাংকিং, প্রাপ্ত নম্বর এবং বিষয়ভিত্তিক নম্বর মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। এ ক্ষেত্রে জিপিএ-৫ পেলেও যে বা যারা মোট নম্বর কম পেয়েছে, তারা বাদ পড়েছে।
ওয়েবসাইটে ফল না পাওয়ার ব্যাপারে কলেজ পরিদর্শক বলেন, ফল প্রকাশের পর লাখ লাখ মানুষ ওয়েবসাইট ভিজিট করছে। অতিরিক্ত ‘হিট’ হওয়ায় সাইট স্লো হয়ে গেছে। এটা বাড়তি চাপের কারণে হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একজন ছাত্রকে দু’বার ভর্তি হতে হবে। নীতিমালায় এটাই আছে। প্রথমবার হওয়ায় এমনটা হয়েছে। এটা মেনে নিতে হবে। তবে এমন দু’বার ভর্তি এর আগেও হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একবার কোনো কলেজে টাকা দিয়ে ভর্তি হলে তা ফেরত করানো যায় না। এদিকে ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম চিত্রও পাওয়া গেছে। কলেজ পরিদর্শক জানান, ১৭টি কলেজ আছে যেখানে মাত্র ৫ জন ছাত্রছাত্রী আবেদন করেছে। আর ২৫ জন আবেদন করেছে এমন কলেজ ৬৭টি। ১৮ হাজার ছাত্রছাত্রীর আবেদন বাতিল হয়েছে। এদের আবেদনের ফি জমা হয়নি। এসব শিক্ষার্থী পুনরায় আবেদনের সুযোগ পাবে। তিনি জানান, কোথাও সুযোগ পায়নি এমন শিক্ষার্থী আছে ৫৬ হাজার। আর ভর্তির জন্য আবেদন না করা শিক্ষার্থী রয়েছে ৬০ হাজার। এদের মধ্যে চান্স না পাওয়া শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় মেধা তালিকার জন্য আবেদন করতে হবে। যারা পছন্দের কলেজে চান্স পায়নি, তাদের পছন্দের ঊর্ধ্বক্রমে যেতে আবেদন করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের সংশ্লিষ্ট কলেজের আসন শূন্য আছে কিনা তা দেখে নিতে হবে। আর যারা আবেদন করেনি, তাদের নতুন করে আবেদন করার সুযোগ দেয়া হবে।
উল্লেখ্য, প্রথমবারের মতো চালু করা এ পদ্ধতিতে ভর্তির জন্য আবেদনকারী ছিল সাড়ে ১১ লাখের বেশি। এদের মধ্যে ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৩৭৪ জনের ভর্তির সুযোগ দিয়ে প্রথম তালিকাটি প্রকাশ করা হয়েছে। যুগান্তর






মন্তব্য চালু নেই