মেইন ম্যেনু

পদ্মায় বিলীন ৫ সীমান্ত পিলার, বিপর্যয়ের আশঙ্কা

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নদী ভাঙন এক ভয়াবহ সমস্যায় রূপ নিয়েছে। সীমান্ত নদীগুলোর ভাঙনে বদলে যেতে বসেছে বাংলাদেশের মানচিত্র। নদী তীর সংরক্ষণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন। পাথরের সিসি ব্লক, জিওব্যাগসহ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে তীর সংরক্ষণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

তবে পদ্মার ভাঙনে পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের শত শত হেক্টর জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। বিলীন হয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা পিলারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে প্রতিবছরই সীমান্ত নদীগুলোর ভাঙনে মূল্যবান জমি হারাচ্ছে বাংলাদেশ।

পাউবো কর্মকর্তা ও সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, দেশের অন্য অঞ্চলে নদীর এক তীর ভেঙে অন্য তীরে চর জাগে, দেশের জমি দেশেই থেকে যায়। কিন্তু সীমান্ত নদীর ভাঙনে জমি চলে গেলে সেটা আর ফিরে পাওয়া যায় না।

ক্রমাগত ভাঙনে পবা উপজেলার বেশকয়েকটি মৌজার জমি পদ্মা নদীতে তলিয়ে গেছে। আর একটু অবহেলা ও দেরি হলেই দেশের ভূ-খণ্ড হারাবে। চোখ রাঙ্গাবে ভারত সরকার। নদী শাসনের অজুহাতে নির্যাতনের মুখে পড়বে চরবাসী।

অনেক দেরিতে হলেও স্থানীয় প্রশাসন পবার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডে বিগত কয়েক বছর থেকে পদ্মার গর্ভে বিলীন হওয়া ভূ-খণ্ডের সীমানা নির্ধারণে উদ্যোগ নিয়েছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা বাংলাদেশ-ভারত সীমানা এলাকা পরিদর্শন করেন।

হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের চর তারানগর, চরখিদিরপুর, দিয়াড় খিদিরপুর, চর তিতামারি, দিয়াড় শিবনগর, চরবৃন্দাবন, কেশবপুর, চর শ্রীরামপুর ও চর রামপুরের সিংহভাগ জমিই পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে। যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাও বিলীন হতে বসেছে। আর পদ্মার তীর ভেঙে ভারতের সীমান্ত অতিক্রম করলেই ভারতীয় শাসন ও গর্জন চলবে এদেশের শান্তিপ্রিয় জনসাধারণের ওপর। তারা নদীশাসন সুতোতেই ঢুকে পড়বে পদ্মার অর্ধেক জলাশয়ে।

পদ্মার ভাঙনে এরই মধ্যে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে চর তারানগরে ২শ ঘরবাড়ি, চারটি মসজিদ, একটি মাদরাসা, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দ্বিতল আশ্রয়কেন্দ্র, খানপুর বিজিবি ক্যাম্প এবং আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ১৬৪ ও ১৬৫ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আবার ৮নং ওয়ার্ডে চরখিদিরপুরে প্রায় ৪শ বাড়ি, একটি বিজিবি ক্যাম্প, একটি পাকা দ্বিতল প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাচটি মসজিদ, দু’টি মাদরাসা, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ১৫৯-এর এস-৩, ৪, ৫ নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে।

এই দুই ওয়ার্ডে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। ভোটার ছিল প্রায় ৩৩শ। বাড়িঘর জমি জমা পদ্মার গর্ভে বিলীন হওয়ায় সবমিলিয়ে এখন দুই হাজার লোক বসবাস করছে সেখানে। কোন স্থানে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় এবং মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করতে না পেরে এরা পড়ে আছে সেখানেই।

এদের পুনর্বাসন ও নদীগর্ভে বিলীন হওয়া জমি এবং সীমানা পিলারগুলো পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে একটি তদন্ত কমিটি পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম হোসেনের নেতৃত্বে চর ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনে ছিলেন উপজেলা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক এসএম আশরাফুল হক তোতা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম মনজুরে মাওলা, শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম, উপজেলা বিএমডিএ’র সহকারী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন, নির্বাচন কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান, উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার আসাদুল ইসলাম, তৃসিত কুমার সাহা ও হরিপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মফিদুল ইসলাম বাচ্চু।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা দু’টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, খানপুর বিজিবি ক্যাম্পের বর্তমান অবস্থান পরিদর্শন করেন। সরজমিনে সীমানা পিলার স্থাপনে স্থান নির্ধারনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এছাড়াও মধ্যচরে পানীয়জল, পয়ঃনিষ্কাশন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জায়গা নির্ধারণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়।

বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা ৪৪২৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে নদী দিয়ে নির্ধারিত সীমানা ২৪৩ কিলোমিটার। তবে ৮ কিলোমিটার এলাকায় সীমানা নির্ধারণ করা নেই। সেগুলো হলো-ফেনীর মুহরী নদীতে দুই কিলোমিটার, সিলেটের দইখাতা ও লাঠিটিলা এলাকায় সুরমা-কুশিয়ারার তীরে ৬ কিলোমিটার।

বাংলাদেশের যেসব এলাকায় সীমান্ত নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা। সীমান্ত এলাকায় প্রতিবছরই নদীগর্ভে ভিটেমাটি হারাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের জমির পরিমাণ এতো কম যে, দেশটি ভূমি-ক্ষুধার্ত (ল্যান্ড হাংরি) হিসেবে চিহ্নিত। এর ওপর প্রতিবছর ভাঙনে আমাদের হাজার একর জমি চলে যাচ্ছে ভারতের অপদখলে। এভাবে জমি চলে গেলে দেশে আরোও বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হবে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর থেকে সীমান্ত নদীর তীর ভাঙন রোধে নির্মিত বাঁধগুলো স্বাধীনতার পর যথাযথভাবে মেরামত ও সংস্কার করা হয়নি। অন্যদিকে, ভারত সীমান্ত নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে শুকনো মওসুমে পানি ধরে রেখে আর বর্ষায় পানি ছেড়ে নিজেদের ষোলআনা স্বার্থরক্ষা করলেও আমাদের জন্য তাতে বিপদ সৃষ্টি হয়।

অতীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড অভিন্ন নদীর বাংলাদেশ তীরে বাঁধ নির্মাণ করলেও গত কয়েক বছর ধরে তেমন নতুন বাঁধ নির্মাণ করা যায়নি। ফলে বাংলাদেশ ক্রমাগতই ভূমি হারাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ২০০৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের ৩৬তম বৈঠকে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এভাবে লাখ লাখ কৃষক ভিটেমাটি, জোতজমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

পদ্মার ভাঙন ও করণীয় বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশের স্বার্থে এবং ভূ-খণ্ড অক্ষত রাখতে যা দরকার তা করতে হবে। পাশাপাশি চরবাসির সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি এই চর এলাকায় প্রথম এসেছি। পরিদর্শন করেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সীমানা পিলার পুনঃনির্ধারণসহ চরবাসীদের পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।






মন্তব্য চালু নেই