মেইন ম্যেনু

পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশ ‘বানোয়াট’ সংস্কৃতি

পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের কোনও সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের লেখক ও চিন্তকরা জানান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক দিয়ে বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে এই খাবার দু’টির কোনও যুক্ততা খুঁজে পাননি তারা। তাদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে ব্যবসায়ীরা শহুরে নাগরিকদের কাছে পান্তা-ইলিশকে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

লেখক-চিন্তক যতীন সরকার বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে পান্তা-ইলিশকে পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গ করে তোলা হয়। প্রকৃত অর্থে এটি বানোয়াট সংস্কৃতিচর্চা। এর সঙ্গে বাঙালির কোনও সম্পর্ক নেই। পান্তা হচ্ছে গরীবের খাবার আর উৎসবের সময় মানুষ যেখানে ভালো ভালো খাবার খায়, সেখানে পান্তাকে খাওয়ানো হচ্ছে ব্যবসার খাতিরে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বৈশাখের পান্তা-ইলিশের জন্য ‘শহরের কিছু শিক্ষিত নাগরিককে’ দায়ী করেছেন। তিনি জানান, পহেলা বৈশাখে ইলিশ ভোজনকে উৎসবের উপলক্ষ করা হলেও আদতে ইলিশের মৌসুম আরও পরে। এ কারণে আশঙ্কাজনকভাবে ধরা হচ্ছে জাটকা। পহেলা বৈশাখের সময় যতো ঘনাচ্ছে জাটকা ধরার প্রবণতা ততো বাড়ছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ইংরেজি জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর বা বাংলা আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্রের সময়টিই হচ্ছে ইলিশ মাছ খাওয়ার আসল সময়। এই সময়ের ইলিশই সুস্বাদু হয়। পাশাপাশি মার্চের দিকে ইলিশ ডিম ছাড়ে। এ কারণে মৎস্য অধিদফতর থেকে ২-৮ মার্চ জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন করছে।

বাঙালির লোক উৎসব হিসেবে বিবেচিত পহেলা বৈশাখে থাকে নানা ধরণের আয়োজন। রমনা বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী গানের আসর, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা ছাড়াও আবহমানকাল থেকে গ্রামে-গঞ্জে মেলা, নৌকা বাইচসহ নানা আয়োজনে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়ে আসছে। এই আয়োজনগুলোর মধ্যে স্বাধীনতার পর ঢুকে পড়ে ‘পান্তা-ইলিশ’। রমনা বটমূলসহ রাজধানীর নানা জায়গায় পান্তা-ইলিশের আয়োজন করা হয়। বিক্রিও করা হয় চড়া দামে। বৈশাখ এলেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বেড়ে যায় ইলিশের দাম।

বৈশাখে বাড়ছে জাটকা নিধন

মৎস্য অধিদফতরের জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং গবেষণা প্রকল্পের জাটকা নিধন প্রতিরোধ কার্যক্রম ২০১৫-১৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে ২৩ জেলা থেকে ১৮.৬৮১৫ মেট্রিক টন জাটকা উদ্ধার করা হয়। জরিমানা করা হয়েছে ৪.৭৫৫ লক্ষ টাকা। ফেব্রুয়ারি মাসে জাটকা আটক হয়েছে ৬৬.৩৫৩ মেট্রিক টন। জরিমানা নেওয়া হয়েছে ১১.৫৫ লাখ টাকা। সর্বশেষ মার্চ মাসে জাটকা উদ্ধার হয়েছে ৮৯.৪২৪ মেট্রিক টন এবং জরিমানা হয়েছে ১০.২৫৫ লাখ টাকা।

মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, পহেলা বৈশাখে ইলিশের চাহিদা থাকায় জেলেরা নির্বিচারে জাটকা ধরছে। নিষিদ্ধ জেনেও বেশি দামের প্রলোভনে অপরাধ করছে তারা।

মৎস্য অধিদফতরের জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং গবেষণা প্রকল্পের সহকারী পরিচালক মাসুদ আরা মমি বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় জাটকা ধরছে জেলেরা। বরিশালসহ কিছু জায়গায় ইতোমধ্যে ইলিশ সংরক্ষণ করা হচ্ছে বেশি দামে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে। তবে আমরা জাটকা ধরা বন্ধ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

মাসুদ আরা জানান, অধিদফতর নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। তবে পহেলা বৈখাশে যেহেতু মানুষ ইলিশ খাচ্ছে, সেটিকে তো অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। তবে ক্রেতাকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, সেটি যেন জাটকা না হয়।

বৈশাখের পান্তা-ইলিশ, ‘বানোয়াট ও ভণ্ডামি’ উদযাপন

অধ্যাপক যতীন সরকার মনে করেন, পান্তা-ইলিশকে বৈশাখের উপলক্ষ্য করা বানোয়াট ও ভণ্ডামির অংশ। এসব উদ্যোগ যারা নিয়েছে তারা সাংস্কৃতিক চোর। স্বাধীনতার পর থেকে চোরেরা এই সংস্কৃতি চালু করেছে।

চিন্তাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার এক লেখায় বলেন, গরিব মানুষের খাবার পান্তাভাত। রাতে খাওয়ার পর অবশিষ্ট ভাত রাখার কোনও উপায় ছিল না; তাই পানি দিয়ে রাখা হতো এবং সকালে আলুভর্তা, পোড়া শুকনো মরিচ ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া হতো। আমিও ছোটবেলায় খেয়েছি। কিন্তু এখন পান্তা-ইলিশ ধনী লোকের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে এবং এটা দুর্মূল্যও বটে যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান দেখানোর পরিবর্তে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে।

এ নিয়ে আলাপকালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, ইলিশ খাওয়ার সিজন হচ্ছে আষাঢ়-শ্রাবণ মাস। বৈশাখ তো ইলিশ খাওয়ার সময় না। ৯০ এর দিকে এইটা শুরু হয়েছে। আগে যখন পহেলা বৈশাখ উদযাপন হতো, তখন গ্রামের অবস্থাপন্ন এবং ধনী পরিবারে খাবারের আয়োজনের মধ্যে থাকত চিড়া, মুড়ি, সাধারণ খই, বিভিন্ন ধানের খই, দই, লুচি, খেজুরের গুড়, খিচুড়ি, বড় কই মাছ, বড় রুই মাছ ইত্যাদি। কিন্তু ইলিশ আর পান্তার কোনও ব্যাপার ছিল না।

শামসুজ্জামান খান বলেন, এখন তো শহুরে নাগরিকদের হাতে টাকা এসেছে, তাই এক লাখ-দেড় লাখ টাকা খরচ করে বৈশাখে ইলিশ খায়।

এছাড়াও বিভিন্ন লেখক-ইতিহাসবিদরা পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশের সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলে এসেছেন। বিরোধিতা করে এসেছেন এই বানোয়াট আয়োজনের। ইতিহাসবিদ এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম এক লেখায় বলেছেন, সম্প্রতি পহেলা বৈশাখের উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতি। এই পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রচলন আগে ছিল না।

বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক আমজাদ হোসেন লিখেছেন, পহেলা বৈশাখে ইলিশ-পান্তার কালচার একদমই নতুন প্রজন্মের।

প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক এবং ছড়াকার ফয়েজ আহমদ পহেলা বৈশাখের উৎসব সম্পর্কে একাধিক প্রবন্ধ, নিবন্ধ এবং সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা কোনও গরিব মানুষের খাবার নয়। গ্রামের মানুষ ইলিশ মাছ কিনে পান্তাভাত তৈরি করে খায়, এটা আমি গ্রামে কখনও দেখিনি, শুনিনি।

ছায়ানটও বিরোধীতা করে

রাজধানী ঢাকার পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে রমনা বটমূলে ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠান। ১৯৬০ এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। ছায়ানটের এই আয়োজনকে কেন্দ্র করেও পান্তা-ইলিশের বিক্রির ব্যবস্থা হয় অনুষ্ঠানের আশেপাশে। যদিও বরাবরই ছায়ানট বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে আসছে এসব পান্তা-ইলিশের সঙ্গে ছায়ানট এবং বৈশাখের কোনও সম্পর্ক নেই।

ছায়ানটের নির্বাহী কর্মকর্তা সিদ্দিক বেলাল বলেন, ছায়ানটের অনুষ্ঠানের আশেপাশে বিক্রি হওয়া পান্তা-ইলিশ বিক্রির সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। বরাবরই আমরা বিবৃতি দিয়ে এই কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে এসেছি।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ পান্তা-ইলিশ

এবার পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পান্তা-ইলিশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন উপাচার্য প্রফেসর ড. এস এম ইমামুল হাকিম। গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বর্ষবরণ আয়োজনের নানা দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে কোথাও পান্তা-ইলিশের মিল আছে বলে জানা নেই আমাদের।

উপাচার্য আরও বলেন, নববর্ষের এ সময়টি হচ্ছে রূপালী ইলিশের প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে রূপালি ইলিশ খাওয়া মানে হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা। কাজেই নববর্ষ উদযাপনে পান্তা-ইলিশ ছাড়া সব ধরণের আয়োজনই থাকবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাট্রিবিউন






মন্তব্য চালু নেই