মেইন ম্যেনু

পহেলা বৈশাখ থেকেই টার্গেট হন জুলহাজ

সম্প্রতি বাংলা বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রার পর ‘রূপবান’ নামে একটি সংগঠন ‘রেইনবো র‌্যালি’র আয়োজন করেছিল। কিন্তু কিছু মানুষ তাদের প্রতিহত করতে চারুকলার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। পরে শাহবাগ থানা পুলিশ র‌্যালিতে অংশ নিতে আসা সমকামীদের সরিয়ে দেয়। চারজনকে থানায়ও নিয়ে যায়। পরে তাদের ছাড়াতে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জুলহাজ মান্নান।

জুলহাজ বাংলাদেশে সমকামীদের একমাত্র ম্যাগাজিন ‘রূপবান’ এর সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য ছিলেন। এই ম্যাগাজিনের ও সংগঠনটির বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই কথা উঠেছে। নিষিদ্ধ করারও দাবি উঠেছে। বিশেষ করে আলেমদের পক্ষ থেকে।

ফলে বর্ষবরণের ওই ঘটনার দিন থেকেই জুলহাজ বিশেষ একটি গোষ্ঠীর টার্গেটে পরিণত হন বলে জানিয়েছেন তার বন্ধুরা। বিষয়টি নিয়ে না কি তিনি তাদের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন।

সোমবার রাজধানীর উত্তর ধানমণ্ডির ৩৫/এ আছিয়া নিবাসে জুলহাজ ও তার বন্ধু মাহবুব রাব্বী তনয়কে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় দুর্বত্তরা। এসময় টহল পুলিশের একটি পিকআপ ওই তেঁতুলতলা গলি দিয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু তারা তাদের ধরতে পারেননি। উল্টো তাদের হামলায় গুরুতর জখম হয়ে গ্রীনলাইফ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন কলাবাগন থানা পুলিশের এএসআই মোমতাজ হোসেন।

হত্যাকাণ্ডের খবর মুহূর্তেই গণামধ্যমের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়ে। একে একে আছিয়া নিবাসে আসতে শুরু করেন জুলহাজের বন্ধু ও স্বজনরা। এসময় তাদের মধ্যে দু’জন নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বর্ষবরণের ঘটনার সঙ্গে এ সূত্রতার কথা বলেন।

তারা বলেন, জুলহাজ দেশে সমকামিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছিলেন। এজন্য সে পহেলা বৈশাখে র‌্যালি করার সীদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশি বাধায় র‌্যালি পণ্ড হয়ে যায়। শুনেছি ওই দিন কিছু ছেলে জুলহাজকে বাজে ইঙ্গিতও করেছিলেন। এরপর থেকেই জুলহাজকে ফলো করা হতো। সে (জুলহাস) বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার আমাদের সাথে আলোচনাও করেছে।

এদিকে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় বিকেলেই ওই বাসায় জুলহাজের বন্ধু বান্ধবীদের যাতায়াত ছিল। এদের মধ্যে বেশিরভাগই নাট্যকর্মী। তবে বাসার সামনে কিছু অচেনা মুখ গত কিছুদিন ধরে প্রায়ই দেখা যেতো বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এদিকে বন্ধু-বান্ধব ও স্থানীয়দের এই তথ্যের সাথে প্রাথমিকভাবে একমত পোষণ করেছেন র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ।

তিনি বলেন, ‘সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করার কারণে খুন হতে পারেন জুলহাস।’ তবে বিষয়টি তদন্তের আগে নির্দিষ্ট করে কিছুই বলা সম্ভব না বলেও জানান তিনি।

বর্ষবরণের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির সামনে চ্যানেল আই এর কাছে ‘রূপবান’ সাময়িকীর সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য ও সংগঠনের নেতারা সমকামিতার পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করেন। ওই সময় জুলহাজও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তনয় ছিলেন কি না সেটা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশের নজরে এলে তারা শাহবাগ থানা পুলিশকে জানায়। তখন পুলিশ এসে সেখান থেকে চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

পরে দীর্ঘ চেষ্টার পর আটক রংপুরের কাউনিয়া থানার তাপস রায় (২০), মুন্সিগঞ্জ জেলার টুরাগবাড়ী থানার রাফা রহমান (৩০), রাজধানীর ধানমন্ডি থানার রিফাত বিন জুনায়েদ (২১) ও কুডিগ্রাম জেলার উলিপুর থানার মেহেদী হাসান(১৯) নামের ওই চারজনকে অনেক রাতে ছাড়িয়ে নিয়ে যান জুলহাজ।

ওই দিন আটকদের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শাহবাগ থানায় যোগযোগ করা হলে ওসি আবু বকর সিদ্দিক জানিয়েছিলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হওয়ার সময় তারা অংশ নিতে গেলে পুলিশ তাদের হটিয়ে দেয়। এরপর মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষে এককভাবে র‌্যালি বের করে। অন্যদিকে তাদের প্রতিহত করতে কয়েকজন চারুকলার সামনে অবস্থান নেয়।’

তখন সংঘর্ষ এড়াতে শোভাযাত্রাটি পুলিশে আটকে দেয় জানিয়ে ওসি বলেন, ‘বাকবিতণ্ডা এবং ধাক্কাধাক্কি করলে বাধ্য হয়ে পুলিশ তাদের মধ্যে চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।’

এদিকে জুলহাজ ও তনয়ের মরাদেহ সোমবার দিবাগত রাত রাত ১১টা ২৫ মিনিটে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে কলাবাগান থানা।

এর আগে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা একটি টার্গেট কিলিং। খুনিরা খুব সুকৌশলে এসে জুলহাজ ও তার বন্ধুকে খুন করে চলে গেছেন।’

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলামও প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। মোটিভ শনাক্ত হওয়ার আগে এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই বলা সম্ভব না।’

ডিএমপি কমিশনার ও অতিরিক্ত কমিশনার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে চলে যাওয়ার ঘণ্টাক্ষাণেক পরই আসেন র‌্যাবের মহাপরিচারক বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তবে তদন্তের আগে কিছুই নিশ্চিত হয়ে বলা সম্ভব না। আবার এমনও হতে পারে যে একটি গোষ্ঠী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্যও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।’ এ বিষয়টিও মাথায় রেখে তদন্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘পুলিশের পাশাপাশি এ ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করেছে র‌্যাব।’

এছাড়াও পুলিশের অপরাধ তথ্য বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুারো অব ইনভিজটিগেশন (পিবিআই) ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে।






মন্তব্য চালু নেই