মেইন ম্যেনু

পাবলিক টয়লেট : নারীরা যেখানে সবচেয়ে উপেক্ষিত!

দক্ষতা তথা পুরুষের সমতালে এগিয়ে চলার ক্ষমতা নিয়ে যে কোনো নেতিবাচক প্রশ্নই অবান্তর প্রমাণ করেছে নারী। সংসারের গণ্ডি পেরিয়ে নারী এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছেন নিরন্তর। সমৃদ্ধ জাতি গঠনে সবক্ষেত্রেই নারী রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান, দিচ্ছে যোগ্যতমার পরিচয়। তবে একটি ক্ষেত্রে আজও তারা উপেক্ষিত ও অবহেলিত এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন!

নগর জীবনকে গতিশীল ও ছন্দময় করতে হলে যেমন প্রয়োজন রাস্তাঘাট, বাজার, পরিবহন ব্যবস্থা, পানি, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, গ্যাস, টেলিফোন। তেমনি নগরবাসীর স্বাস্থ্য বিশেষ করে নারীর স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যসম্মত ‘পাবলিক টয়লেট’।

কিন্তু দেখা যায় খোদ রাজধানীতেই চাহিদার তুলনায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা খুবই কম। যেগুলো রয়েছে, সেগুলোর অবস্থাও তথবৈচ। ফলে বেশি সময় ধরে ‘প্রাকৃতিক ডাক’ আটকে রেখে কিডনিজনিত রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীবাসী।

বিশেষ করে নারীদের টয়লেট ব্যবহারে নিরাপত্তাসহ আলাদা ব্যবস্থা নেই। এ ক্ষেত্রে নারীদের সমতা ও মর্যাদার বিষয়টি একেবারেই উপেক্ষিত। বিষয়টি মাথায় রেখে ঢাকা শহরের অধিকাংশ নারী পানি কম পান করেন। ফলে তারা পানিস্বল্পতাজনিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে বা ধরে রাখলে মূত্রথলিতে ব্যথা ও কষ্ট অনুভব হতে পারে এবং ঘন ঘন প্রদাহ বা ইনফেকশন হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ পায়খানা ধরে রাখলে তাৎক্ষণিক কষ্ট ছাড়াও ‘এনাল ফিশার’ রোগ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মূত্রনালী বা থলিতে প্রদাহ ও এনাল ফিশারের প্রকোপ বেশি।

জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বে সাতশ’ কোটি মানুষের মধ্যে আড়াইশ’ কোটি মানুষের উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। একশ’ কোটি মানুষ খোলা জায়গায় মল-মূত্র ত্যাগ করেন। এ ছাড়া টয়লেট ব্যবহারে নারী ও মেয়েশিশুদের ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকি থাকায় তাদের টয়লেট ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না।

আমাদের দেশের গুটিকয়েক পাবলিক টয়লেট ছাড়া বেশিরভাগই অপরিচ্ছন্ন ও নিরাপত্তাহীন। আর নিরাপত্তাহীনতায় তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক বার টয়লেট ব্যবহারের কারণে নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন কর্মজীবী ও পেশাজীবী নারী।

এদিকে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী হলেও পাবলিক টয়লেটগুলোতে তাদের জন্য উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থাই নেই। দেশে সাধারণ মানুষই যখন টয়লেট সুবিধাবঞ্চিত তখন প্রতিবন্ধীদের কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাধারণ নারীর বঞ্চনার এ বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য (ঢাকা-১) অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শুধু সংসদ সদস্য নয়, দেশের একজন সাধারণ নারী হিসেবেই এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে সচেতন করা আমার দায়িত্ব বলে মনে করি। কারণ এ ক্ষেত্রে আমি নিজেও একজন ভুক্তভোগী। ঢাকার বাইরে গেলেই বিপদে পড়তে হয়। লজ্জার মাথা খেয়ে গাড়ি থামিয়ে যেতে হয় পেট্রলপাম্পের টয়লেটগুলোতে।’

অ্যাডভোকেট সালমা বলেন, ‘এ সরকার অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করছে। এ ক্ষেত্রেও নারীদের বিষয়টি মাথায় রেখে নিশ্চয়ই এগিয়ে আসবে। শুধু ঢাকা নয়, বিদেশের আদলে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও নারীদের জন্য নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন আলাদা টয়লেট নির্মাণের বিষয়ে আমি জাতীয় সংসদে দুই মিনিটের বক্তব্য রাখব। আর ঢাকা শহরেও প্রতিটি জনসমাগমপূর্ণ জায়গায় বিদেশের মডেলে নারীদের জন্য আলাদা টয়লেটব্যবস্থা স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব। কারণ এটি একটি মুসলিম দেশ।’

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় বর্তমানে ৬০টি গণশৌচাগার রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি দক্ষিণ এবং ২৩টি উত্তরে।

সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের এক গবেষণায় দেখা যায়, ৬০ শৌচাগারের মধ্যে ৪৭টি চালু আছে। এর মধ্যে ২টিতে নারীকর্মী রয়েছে। বাকিগুলোতে নারীকর্মী না থাকায় নারীরা সেগুলো ব্যবহার করতে যান না। কিন্তু যেগুলো চালু আছে সেগুলোর অবস্থাও করুণ।

বর্তমানে পাবলিক টয়লেটগুলো ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগের আওতায় ন্যস্ত। টয়লেটগুলো ইজারা পদ্ধতিতে দেয়া আছে। প্রতিষ্ঠানগুলো টোল বা অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে ২/১ জন কর্মী নিয়োগ করে। এখানে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা বা স্বাস্থ্যসম্মত অবস্থায় ব্যবহার করার পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকলেও তারা তা পালন করছে না বা করতে পারছে না।

ঢাকা শহরে পাবলিক টয়লেটব্যবস্থা পুরুষের জন্যই লজ্জার, আর নারীরা এক্ষেত্রে উপেক্ষিত বললেন নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (বাপা) এই যুগ্ম-সম্পাদক বলেন, ‘ঢাকা শহরে গণশৌচাগার বিষয়টি একটি লজ্জাজনক অবস্থায় রয়েছে। আর নারীরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপেক্ষিত হচ্ছে। আমি মনে করি স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রতি কিলোমিটারে একটি করে শৌচাগার থাকা প্রয়োজন এই শহরে। যাতে মানুষ আধাকিলোমিটার চলার পরই টয়লেট সুবিধা পায়। সেটা হতে পারে গণশৌচাগার বা ইউরিনাল শৌচাগার।’

তিনি বলেন, ‘নারীদের বিষয়টি মাথায় রেখে শহরের সব মার্কেট, শপিং মল, রেস্টুরেন্টগুলোতে অবশ্যই নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ স্বাস্হ্যসম্মত টয়লেট অবশ্যই থাকা উচিত। শুধু তাই নয় ওইসব প্রতিষ্ঠানের সামনে এমনভাবে তা উল্লেখ করতে হবে যাতে সহজেই যে কোনো নারীর চোখে পড়ে।’

এক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে এই নগরবিদ বলেন, ‘বিষয়টিকে আমরা বাপার পক্ষ থেকে গুরুত্বসহকারে মেয়রদের কাছে তুলে ধরেছি। এর প্রেক্ষিতে উত্তর সিটি করপোরেশন আরো ৫০টি গণশৌচাগার তৈরির আশ্বাস দিয়েছে এবং আইনগত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে আগামী বছরের জুনের মধ্যে এই কার্যক্রম হাতে নেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন মেয়র আনিসুল হক।’

তিনি বলেন, ‘উত্তর সিটিতে কাজ শুরু হলে দক্ষিণও তখন উদ্যোগ নিতে বাধ্য হবে বলে আমি মনে করি।’ আর এ ক্ষেত্রে এখন থেকে নারীর বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন এই পরিবেশবিদ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উত্তর ও দক্ষিণ সিটির বেশিরভাগ পাবলিক টয়লেটের কোনোটির দরজা নেই, ছিটকিনি নেই, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, অপরিষ্কার, ময়লা, দুর্গন্ধ, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে, ইঁদুর তেলাপোকার বসবাস, ময়লা পানি জমে আছে, নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন বিপন কুমার সাহা টয়লেটগুলোর করুণ অবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পুরনো টয়লেটগুলো নিয়ে আমরা আর মাথা ঘামাচ্ছি না। আমরা বেশ কিছু এনজিওর সাথে এ বিষয়ে কাজ করছি, যাতে ঢাকা শহরে বিদেশের আদলে সম্পূর্ণ নতুন করে গণশৌচাগার স্থাপন করা যায়।’

এদিকে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ, সংস্কার ও ফুটওভার ব্রিজের নিচে স্থায়ী অথবা স্থানান্তরযোগ্য পাবলিক টয়লেট স্থাপন অথবা ভ্রাম্যমাণ পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবক্ষেণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে র্কতৃপক্ষ।

এ লক্ষ্যে গত বছরের ২৬ আগস্ট দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও ওয়াটার এইডের মধ্যে একটি বহুপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তি স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী কাজ চলমান রয়েছে।

ডিসিসি সূত্র জানায়, পান্থকুঞ্জ পার্ক, রমনা কালি মন্দির ও মানিকনগরে নতুন করে তিনটি পাবলিক টয়লেট স্থাপনের কাজ চলমান রয়ছে। এ ছাড়া সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন দুটি (মহলিা ও পুরুষ) পাবলিক টয়লেট সংস্কার করা হচ্ছে। টিএসসি, মুক্তাঙ্গন পার্ক, বাহাদুর শাহ পার্ক ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা পার্কের ভেতরে নতুন করে চারটি টয়লেট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই