মেইন ম্যেনু

পারসেপোলিস : পারস্যের শৌর্যের প্রতীক

সমাধির প্রত্যেকটি ইট পাথর উপড়ে ফেল! দেখতে চাই কে ছিল সেই মহান বীর! যার অধীনে গোটা বিশ্বে ছড়ি ঘুড়িয়েছে পারস্য সাম্রাজ্য!’ পারস্যের মহান বীর ও একসময়কার বিশ্বের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য হাখামানশি (Acheamenid dynesty) রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সাইরাস দ্য গ্রেটের সমাধি পাসারগাদ (ইরানের সর্বপ্রাচীন সমাধি, যেটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৯০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত) দাঁড়িয়ে গ্রিক বীর অ্যালেকজান্ডার দ্য গ্রেটের এটাই ছিল প্রথম স্বগতোক্তি।

উল্লেখ্য সাইরাস দ্য গ্রেটের অধীনেই খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে গড়ে উঠেছিল তৎকালীন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ হানাহানি সাম্রাজ্য। হাখামানশি সম্রাটরা প্রতিটি ঋতুর জন্য ভিন্ন ভিন্ন রাজধানীর প্রবর্তন করেছিলেন। শীত ঋতুর জন্য বাবেল বা বর্তমান ইরাক ও খুজিস্তানের শুশ নগরী। গ্রীষ্মকালের জন্য আলাভান্দ পর্বতের শীতল ও আরামপ্রদ স্থান হেগমাতান বা হামেদান। এই তিনটি শহর বা রাজধানী ছিল মূলত সরকারি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। অপরদিকে তাখতে জামশিদ বা পারসে গ্রিক ভাষায় যা পারসেপোলিস নামে খ্যাত, বিখ্যাত এই মহলটি তৈরি হয়েছিল শুধুমাত্র নওরোজ (পারস্যের নববর্ষ উৎসব) ও মেহরগান উৎসবটি জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পালনের জন্য।

তাখতে জামশিদের মূল নাম ছিল পারসে, এটি আরগ বা দুর্গ ও শহরের সমন্বয় ছিল। হাখামানশি যুগে এই নামটি প্রচলিত ছিল এবং এখনো তাখতে জামশিদের গায়ে খাততে মিখি বা কীলকলিপিতে এই নামটি লিখিত রয়েছে। আলেকজান্দ্রার ও গ্রেটের আক্রমণের পর এই নামটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। সাসানি যুগে (২২৬ খ্রি.-৬৫২ খ্রি.) এটিকে সাদ সোতুন বা শত স্তম্ভ হিসেবে অভিহিত করা হত। তবে ইরানিদের মূল অংশটি যেহেতু বাদশাহ জামশিদকে আভিজাত্যের প্রতীক ও নবদিগন্তের সূচনাকারী হিসেবে জানতেন এবং তারা বলতেন যে, জামশিদের প্রতিনিধিরা সিংহাসনকে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে বহন করে নিয়ে যেতেন। জামশিদ এক হাজার বছর জীবিত ছিলেন ও তাঁর শাসনকাল ৭০০ বছর স্থায়ী ছিল। জামশিদের সময়কালে উৎসবমুখর নওরোজের কথা উল্লেখ করে এবং হাখামানশি রাজত্বকালেও উৎসবমুখর নওরোজের কথা স্মরণ করে অঞ্চলটিকে তাখতে জামশিদ নামে অভিহিত করেছেন, যার প্রচলন আনুমানিক এক হাজার বছর পূর্ব থেকে।
আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৫১৮ অব্দে দারিয়ুশ দ্য গ্রেট ফারস প্রদেশের শিরায নগরী থেকে ৭০ কিমি উত্তর-পূর্বে কুহে রহমত বা মেহর পর্বতের উত্তর-পশ্চিম অংশকে নির্বাচিত করে তাখতে জামশিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র রাজা খাশাইয়ার শাহ ও নাতি রাজা প্রথম আরদাশির ক্রমান্বয়ে এর বিভিন্ন মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এক লাখ ২৫ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই বিশাল স্থাপত্য নির্মাণে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বছর সময় লেগেছিল। এটি পাসারগাদ থেকে ৪৩ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। রাজা খাশাইয়ার শাহের ভাষায়: আমার পিতা (দারিয়ুশ) যে রূপভাবে এই স্থাপনা তৈরি করেছেন আমিও তদ্রুপভাবে অব্যাহত রাখব এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ করব। আমি ও আমার পিতা যা তৈরি করেছি সেটা মহান ঈশ্বর আওরমাযদার ইচ্ছাতেই করেছি। তাখতে জামশিদের প্রত্যেকটি স্থাপনাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন; পেল্লেকান বা প্রবেশ পথ, কাখে রেসমি/তাশরিফাতে অপাদানা, খাজানেয়ে শাহি বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার, কাখে সাদ সোতুন বা শত স্তম্ভ ও শহর প্রতিরক্ষা দুর্গ অন্যতম। কাখে রেসমি/তাশরিফাতে অপাদানা হচ্ছে তাখতে জামশিদের সবচাইতে অভিজাত ও চাকচিক্যময় মহল। এটি তৈরি করতে ৩০ বছর লেগেছিল। নওরোজের মূল উৎসব অপাদানাতেই অনুষ্ঠিত হতো। অপাদানাকে বলা হয় প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম সেরা নিদর্শন। এটি ৩৬০০ বর্গমিটার আয়তন বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম। ৭২টি স্তম্ভ অপাদানাকে ধারণ করে রেখেছিল, বর্তমানে মাত্র ১৪টি স্তম্ভ বিদ্যমান রয়েছে। স্তম্ভগুলো স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত দ্বারা মোড়ানো ছিল। প্রতিটি স্তম্ভের শীর্ষে দুই মাথাওয়ালা ষাঁড়ের ভাস্কর্য স্তম্ভগুলোকে চিত্তাকর্ষক রূপ দান করেছিল। ষাঁড়ের শিংগুলো ছাদকে ধারণ করে রেখেছিল। এ ছাড়া পূর্বদিকের স্তম্ভগুলোতে রয়েছে সিংহের ভাস্কর্য।

তাখতে জামশিদে ষাঁড়, সিংহ, নিলুফার বা লোটাস ফুল ও সারভ বৃক্ষের চিত্রায়ন ও ভাস্কর্যকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণ সম্পর্কে খামানশি সাম্রাজ্য বিশেষজ্ঞ ড. আলিরেযা শাপুর শাহবাযি বলেন, ওই সময়কার প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বসন্ত বা নওরোজ আগমনের দিন কয়েকটি তারকা মিলে আকাশে ষাঁড়ের আকৃতি ধারণ করত। সূর্য যখন ষাঁড়ের গায়ে পড়ত তখন থেকেই নওরোজের দিনক্ষণ গণনা শুরু হতো ও মূল উৎসব সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ত। আর সিংহ বা লিও হচ্ছে নভোমণ্ডলে একটি তারকা ও শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। প্রাচীন ইরানের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী সারভ হচ্ছে সৌভাগ্যশালী, বরকতময় ও বেহেশতের প্রতীক। লোটাস বা নিলুফার ফুল হচ্ছে নির্মলতা, প্রফুল্লতা ও সম্ভবত ১২ মাসের প্রতীক। কেননা লোটাস ফুল ১২ পাপড়ি বিশিষ্ট হয়ে থাকে।

খাশাইয়ার শাহ নির্মিত ১০০ স্তম্ভ বিশিষ্ট অভ্যর্থনা কক্ষটি হচ্ছে তাখতে জামশিদের সর্ববৃহৎ প্রাসাদ, যা ফারসিতে সাদ সোতুন নামে প্রসিদ্ধ। প্রত্যেকটি স্তম্ভের উচ্চতা ৭০ মিটার। পরবর্তীতে এটির প্রায় অধিকাংশ স্তম্ভ গ্রিক সম্রাট আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এখনও কিছু অংশ অবশিষ্ট রয়েছে যা সত্যিই নজরকাড়ার মতোই!

যেহেতু হাখামানশি সাম্রাজ্য তৎকালীন দুনিয়ার সর্ববৃহৎ রাজ্য ছিল, তাই নওরোজ উৎসবে শামিল হতে সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ওই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ উপঢৌকনসহ এই মহলে হাজির হতেন। যেমন; শুশ নগরীর প্রতিনিধিরা জীবন্ত সিংহ ও যুদ্ধাস্ত্র, আর্মেনিয়ার প্রতিনিধিরা স্বর্ণ, রৌপ্য ও ঘোড়া, বাবেল বা ইরাকের প্রতিনিধিরা স্বর্ণখচিত পোশাক ও মহিষ, বাইজেন্টাইন প্রতিনিধিরা বিভিন্ন মূল্যবান পাথর খচিত পাত্র ও ঘোড়া, সোগদি প্রতিনিধিরা ভেড়া ও এর চামড়া দ্বারা তৈরি পোশাক, কৃষ্ণসাগর ও আনাতোলির প্রতিনিধিরা স্বর্ণখচিত পোশাক ও ঘোড়া, ভারতের প্রতিনিধিরা যুদ্ধাস্ত্র ও খচ্চর বাদশাহকে উপহার দিতেন। দারিয়ুসের নিজস্ব প্রাসাদে প্রতিনিধিদের খাবার পরিবেশন করা হত। যা এখনো তাখতে জামশিদের গায়ে অংকিত রয়েছে! অপাদানা মহলের সর্বাধিক সৌন্দর্যমণ্ডিত ও অধিক দৃষ্টিনন্দন এবং সম্ভবত পুরো তাখতে জামশিদের গুরুত্বপূর্ণ চিত্তাকর্ষক অংশই হচ্ছে পূর্ব অংশের দেয়ালের গাত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের আগমনের সচিত্র এই বর্ণনা।

আর একটি আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে পুরো তাখতে জামশিদের গায়ে তৎকালীন দুনিয়ার তিনটি প্রসিদ্ধ ভাষার ব্যবহার। খাততে মিখি বা কীলকলিপিতে রয়েছে ফারসি বাস্তান, বাবেলি ও ইলামি ভাষার চমৎকার হস্তলিখন।

এখনও যদি কেউ খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দের সেই নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী উপভোগ করতে চান তবে ঘুরে আসুন তাখতে জামশিদের হারেমসারা বা অন্দরমহলে। এটি ইংরেজি অক্ষর এল আকৃতির যা এখন হাখামানশি জাদুঘর নামে পুনঃ মেরামত করা হয়েছে। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত জার্মান পুরাতত্ববিদ আরনেস্ট হারযফেল্ড, ফ্রেডরিখ ক্রেফটার ও এরিক স্মিথের প্রচেষ্টা আপনাকে একেবারে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে! পৃথিবীতে তাখতে জামশিদের ন্যায় নান্দনিক স্থাপত্য শৈলী, সৌন্দর্যতা ও দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ স্বল্প-সংখ্যকই চোখে পড়বে! আর এ কারণে তাখতে জামশিদে সকলের অবাধ প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল! গ্রিক ও রোমান ইতিহাসগুলোতেও এ বিশ্বাস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায় না। কেননা শুধুমাত্র ইরানি ও আর্য জাতি ও ইরান সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যতীত অন্য কেউ এই পবিত্র মহলে প্রবেশ করতে পারতেন না।

গ্রিক চিকিৎসক কিতযিয়াস হাখামানশি সম্রাট দ্বিতীয় আরদাশিরের (৪০৪ খ্রিষ্টপূর্ব-৩৫৮ খ্রিষ্টপূর্ব) রাজকীয় চিকিৎসক থাকাকালে তাখতে জামশিদ সম্পর্কে কোনোরূপ ধারণা ছিল না এবং পরবর্তীতে তাঁর সিয়াহাত নামেহ নামক বইতে ইরানের মাটি ও মানুষ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হলেও তাখতে জামশিদ সম্পর্কে কোনোরূপ আলোচনা করেননি!

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০ অব্দে গ্রিক বীর অ্যালেকজান্ডার দ্য গ্রেট তাখতে জামশিদ আক্রমণের প্রথম ধাপে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে কুহকি লু ইয়ে ভা বুয়ের আহমাদ প্রদেশে পৌঁছান (যার প্রাচীন নাম বেলাদশাপুর)। এখানে তিনি এক রাত অতিবাহিত করেন। অতঃপর সেখান থেকে তাখতে জামশিদের দিকে রওনা হতেই তাঙ্গে তেকাব নামক স্থানে পর্বত ঘেরাটোপে স্থানীয় বীর সেনাপতি আরয়ুবারযান ও তাঁর বাহিনী অ্যালেকজান্ডারের সৈন্যবাহিনীকে টানা ৪-৫ দিন নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন। কিন্তু অ্যালেকজান্ডার লিবানি নামক এক রাখালকে বন্দী করে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করেন। পরবর্তীতে ওই রাখালের দেখানো পথ ধরেই অ্যালেকজান্ডার বাহিনী পর্বতের চূড়ায় পৌঁছে আরয়ুবারযান ও তাঁর বাহিনীকে সমূলে হত্যা করেন। অতঃপর খ্রিষ্টপূর্ব ১২ আগস্ট, ৩৩০ অব্দে পারসেপোলিস পৌঁছান। অ্যালেকজান্ডার সেখানে দুই মাস অবস্থান করেন। ফেরার সময় পুরো তাখতে জামশিদে লুণ্ঠন করে আগুনে ভস্মীভূত করেন সমগ্র এলাকা। এভাবেই পারস্যের গর্ব ও এক সময়ের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায় রূপান্তরিত হয়।

পারসেপোলিসকে ১৯৭৯ সালে ইউনেসকো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর ২১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ১৫ দিনের নওরোজের ছুটিতে এখানে উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়। দর্শনার্থীদের জন্য সন্ধ্যার পর নুর ভা সেদা বা আলো ও শব্দ নামক দারুণ উপভোগ্য একটি ডকুমেন্টারি উপস্থাপন করা হয়। কেউ ইরান এসে যদি পারসেপোলিস না দেখেন, তবে বলব ইরানের মূল ইতিহাস-ঐতিহ্য ও কৃষ্টি-কালচারের অনেক কিছুই অজানা থাকবে আপনার।

(লেখক সহকারী অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে পিএইচডি গবেষক, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়, তেহরান, ইরান)






মন্তব্য চালু নেই