মেইন ম্যেনু

হৃদয়বিদারক লাভ স্টোরি উপন্যাস

পাশে হলো না যাওয়া…

একটু আগে নিতু ফিরে এলো। আগেও কতবার সে নিজের বাসায় ফিরেছে, বাজার থেকে, বাচ্চাদের স্কুল থেকে- কিন্তু বলতে গেলে বাসার চার দেয়ালের মধ্যে সে ফেরেইনি। কেউ জানেনি, নিতু সেই কবে চলে গেছে, কতদিন হলো ওখানে নেই। ঘরের ওই আলমারি, এই ড্রেসিং টেবিল, সব নিজস্ব জায়গায় পড়ে আছে তো আছেই, তাদের তো আর মন নেই যে উড়াল দেবে। নিতু কি আর সেরকম নিশ্চল ছিল কখনও? তবে সে কোনো প্রতিবাদ করেনি, নিজের সচল অস্তিত্বের মরে যাওয়া দিনের পর দিন মেনে নিয়েছিল।

একসময় বাকিরা ভুলে গেছে নিতুর কথা; ভুলে গেছে মানে- কি বৃষ্টি কি খরা, কি দিন কি রাত, নিতু যে তার জায়গাতেই থাকবে, এমনটাই জানত সবাই। সে নিজেও একসময় নিজেকে ভুলে গেছে, ভুলভাবে চিনতে শুরু করেছে, তাই অন্য কাউকে দোষ দেয়নি। তারপর সবার অগোচরে নিজেকে মুক্ত করে ফেলেছিল, অন্য কোনো জীবন তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছিল, কেউ জানত না। যারা তার নির্দিষ্ট জায়গাটিতে বরাবর তাকে দেখেছে বলে দাবি করতে পারে, তারা কখনও তার মনের ঠিকানা রাখেনি, রাখলে জানত যে টানা গত কয়েকটা মাসে কোনোদিন সে বাড়ি ফেরেনি। আজ এতদিন পরে ফিরে এলো।

আজও বাসার কলিং বেলে তার ক্লান্ত আঙুল একইভাবে পড়েছে, টুংটাং শব্দে বেজে উঠেছে, ভেতরের করিডোরে ছিল একই দৃশ্য; ভরা সন্ধ্যার মুখে ঝকঝকে সাদা-কালো পাথরের মোজাইক মেঝেতে দীপ আর ইনানি খেলছিল, চলছিল একই খেলনা নিয়ে কাড়াকাড়ি। একটু পর হয়তো নিজেদের ঝামেলা নিজেরাই মিটিয়ে ফেলবে, নিতু জানত। দুজনকে একরকম খেলনা কিনে দিলেও তাদের এই ঝামেলার শেষ নেই, অন্যের হাতেরটা তাদের কাছে বেশি ভালো লাগে। বাচ্চাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মেঝের মোজাইকের দিকে তাকিয়ে ছিল সে, পানিতে চোখ ভরে যাওয়াতেই হয়তোবা, ঝাপসা লাগল। মোজাইকের কালো কালো পাথরগুলোকে মনে হলো অসংখ্য মাছি। অগুনতি মরা মাছি পড়ে মেঝেতে চ্যাপ্টা হয়ে আছে ভেবে গা গুলিয়ে উঠল। এই বাসা ভাড়া নেয়ার সময়ে বাদল বলেছিল, “মেঝে বানানোর সময় মনে হয় কালো পাথরের কুচি বেশি পড়ে গেছে, খুব ঠান্ডা হবে, তোমার তো আবার দুপুরের পরে মেঝে মুছে শোয়ার অভ্যাস। যত্তসব আলসেমি!” নিতুর মাথা ঘুরছিল, দুর্বল লাগছিল, মনের ভারে শরীরের সব শক্তি যেন খরচ হয়ে গেছে।

অনেকক্ষণ পরে মাকে দেখল বলে ইনানি ‘মা মা’ বলে দু’পা জড়িয়ে ধরল, হাটুতে মুখ ঘষতে থাকল। সে আর আগাতে পারল না, নিচু হয়ে ওকে কোলে নিতে নিতে ভাবল, এমন পরির মতো একটা বাচ্চা ফেলে কী করে চলে যেত? ভালো থাকত হয়তো, কিন্তু ইনানি আর দীপ? তারা কখনও বুঝত না মা কেন চলে গিয়েছিল। শাশুড়ি তার ঘর থেকে মাথা বাড়িয়ে বলল, “এত দেরি! কই গেছলা?” “এই তো একটু বাইরে-” যেখানেই যায়, যত দেরি বা তাড়াতাড়িই আসে না কেন, বাসায় ঢোকার মুখে নিতুকে এই কথাটি বলা হয়, ‘এত দেরি!’ মনে মনে সে বলল, দেরি কই, কোনো কিছু ভেস্তে যাবার আগেই তো ফিরে এলো। কিছু যদি এদিক থেকে ওদিক হয়েছে তো সে নিতু নিজে, একমাত্র সে-ই তার নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল কোনো একদিন, নাকি আজই হারিয়ে ফিরল, জানে না। কোথায় গিয়েছিল তা তো আর শাশুড়ির কাছে বলা যায় না, তাই ওরকম রহস্য করে উত্তর দিলো।

নিতুর রহস্য তার বিরক্তি বাড়াল, গম্ভীর গলায় বলল, “বাচ্চাগুলান বাসায় ফালাইয়া এতক্ষণ থাকো কই?” নিতু আর কোনো উত্তর দেয়নি। দীপ আর ইনানিকে নিয়ে ঘরে চলে এসেছে। তার নিজের ঘর, সবকিছু চেনা অথচ যেন নতুন লাগে। অনেকদিন যেন ভালো করে কিছু খেয়াল করা হয়নি, বিশেষ করে মাস দুয়েক, যে সময়ে সে কেবলই সপ্নে ভাসত। অসহনীয় সুখের সেই সময়টা শেষ, কেউ কিছু জানার আগেই সব চুকেবুকে গেছে। বাদল, যে নিতুর সাথে প্রতিদিন এই ঘরে ঘুমায়, ঘুমানোর আগে তার শরীরটা একবার ঘেঁটে নেয়, সে-ও তার মন ছিঁড়েখুড়ে কিছু বের করতে পারেনি।

আজও একটু পরে বাদল অফিস থেকে আসবে, দেখবে নিতু তার জায়গায়ই আছে। সে রক্ত-মাংসের নিতুকে পেলেই মনে করে পুরোটা পাওয়া হয়েছে। আজও তার কাছে অন্য দু’দশটা দিনের মতোই একটা দিন। নিতুর কাছে তা নয়। বাদল অবশ্য তাকে দেখে বুঝবে না, সে কি আর নিতুর দিকে সেভাবে তাকায়? চারপাশে বিভিন্ন কারণে ঘন্টাচারেক ঘুরঘুর করলেও নিতুর মুখের কোনো পরিবর্তন সে লক্ষ করবে না।

নিতুকে ঠিকমতো না দেখলেও, নিতুর কোনো ভুল তার নজর এড়ায় না। “নিতু, বাথরুমের বেসিনে এত চুল পড়ে আছে কেন?…. আশ্চর্য, আমার সাদা শার্টটা লন্ড্রি থেকে আনোনি!… দীপের কাশি হলো কী করে, কখন ঠান্ডা লাগায় দেখতে পার না?” দীপ আর ইনানি খাটে বসে খেলছে। নাটকের মতো তাদের বানানো খেলা। ছোট্ট পুতুলের জ্বর এসেছে।

দীপ বলছে, “ওর তো অনেক জ্বর, তুমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওনি কেন?” ইনানি বলছে, “আমি তো খেয়াল করিনি কখন জ্বর এলো! রান্না শেষ করে আমি কাপড় আয়রন করছিলাম। খাওয়াতে এসে দেখি ওর জ্বর। তুমি একটু নিয়ে যাও না ডাক্তারের কাছে।” দীপ রাগ করে বলছে, “আমি অফিসে কাজ করে টায়ার্ড, দেখ না? তুমি সারাদিন বাসায় কী কর যে বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় পাও না?” ওদের খেলা দেখে মনে মনে হাসে নিতু, বাবা-মায়ের দৈনন্দিন আলাপ তাদের কত চেনা হয়ে গেছে! আজ ওদের গোসল করানো হয়নি।

তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাবে বলে কোনোরকমে খাওয়ানো শেষ করেই চলে গিয়েছিল। ভেজা তোয়ালে দিয়ে গা মুছে ওদের কাপড় বদলে দেয়া দরকার। কেন যেন শরীরে সে শক্তিও নেই, কেউ মনে হয় ভেতর থেকে সব শুষে নিয়েছে। পিপাসায় গলা শুকিয়ে আছে কিন্তু উঠে গিয়ে পানি খেতে ইচ্ছে করছে না। দীপকে বললে হয় না পানির কথা? ভাবতেই হাসি পায়। বছর দুয়েক আগে একবার নিতুর খুব জ্বর হলো। দীপ তখন তিন বছরের বাচ্চা, পাশে বসে খেলছিল। জ্বরের ঘোরে ওর কাছে পানি চেয়েছিল নিতু, কাছে অন্য কেউ আছে নাকি খোঁজার ক্ষমতাই ছিল না। ভেবেছিল দীপ কাউকে গিয়ে বললে সে পানি দিয়ে যাবে। কিন্তু দীপ মুহূর্তের মধ্যেই একগ্লাস পানি নিয়ে হাজির।

পিপাসায় হাত বাড়াতে বাড়াতে নিতু জানতে চেয়েছিল, “এত তাড়াতাড়ি কোথা থেকে পানি আনলে, বাবা?” সে বলল, “বাথরুম থেকে।” মুখে গ্লাস ঠেকিয়ে তাকে বলল, “আমরা তো বাথরুমের পানি খাই না, রান্নাঘরের ফিল্টারের পানি খাই,” বলতে গিয়ে মনে হলো বেসিন তো তার তুলনায় অনেক উঁচু, সে কী করে বাথরুমের ট্যাপ থেকে পানি আনল! “বেসিন কেমন করে হাতে পেলে তুমি, দীপ?” বেসিন না মা- আঙুলের ইশারায় কমোড দেখিয়ে দিয়ে সে বলল, “ওটা থেকে এনেছি।” মায়ের অসুস্থতায় এর চেয়ে দ্রুত পানির ব্যবস্থা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। নিতু চোখ কুঁচকে ঠোঁট থেকে গ্লাস সরিয়ে নেয়াতে সে বারবার বলছিল, “খাও মা, খাও।”

হয়তো তার মনে হয়েছিল পানি খেলেই মা ভালো হয়ে যাবে। দীপের সেই সরল ভালোবাসার কথা ভেবে নিতু চোখে রাজ্যের মায়া নিয়ে তার দিকে তাকায়। কী হতো হঠাৎ যদি দীপ জানত যে মা আর নেই- মা চলে গেছে। এই যে ফিরে আসতে পারল এজন্য সে নিজেই নিজেকে বাহবা দেয়। শাশুড়ি হঠাৎ ঘরে আসেন। “ও মা চুপচাপ বইসা আছ যে- বাদলা তোমারে ফোন দেয় নাই? আইজ তার বন্ধুবান্ধবরা রাইতে খাইতে আসবে- কিছু করলা না?” “তাই নাকি? আমি তো জানি না, আম্মা- এখনই করছি।” “আশ্চর্য! কিছুই জানো না? গেছিলা কই তুমি?” “এই তো ফরিদার বাসায়- এখনই করে ফেলব সব, কোনো অসুবিধা নাই।” শাশুড়িকে আর অবাক হওয়ার সুযোগ না দিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে।

জানে, পেছনে তার চোখ দুটো বিষ্ফোরিত। সেই নিতুর বিয়ের পর থেকেই এরকম বিস্মিত চোখেই তিনি তাকে দেখছেন। একটা মানুষ তাদের থেকে কী করে এত আলাদা হয়! নিতুরও বিস্ময় লাগে তাদের দেখে। বাবা কী করে এই পরিবারটিতে তাকে গছিয়ে দিয়েছিলেন! বাবা একবারও ভাবেননি নিতু কী করে এখানে মানিয়ে নেবে? তাই নিতুও বিষ্ফোরিত চোখে তাদের দেখছে দিনের পর দিন। বাদল কিছু বলেছিল নাকি রাতে কারও খাওয়ার কথা? মনে করতে পারে না। অফিসে গিয়ে বাদল ঠিক করেছে বোধ হয়।

কিন্তু তাহলে তাকে জানায়নি কেন? সকালে তপু ফোন করবে বলে ফোনটা সাইলেন্ট মোডে রেখেছিল। তারপর তার সাথে দেখা হওয়ার সময়টা ঠিক করার পরে আর কারও সাথে কথা হয়নি। নিশ্চয়ই ফোন করেছিল বাদল কিন্তু ফোন বাজেনি। সর্বনাশ! ডিপ ফ্রিজ থেকে মুরগির মাংস বের করে পানিতে ভিজিয়ে দৌঁড়ে গিয়ে দেখে আটটা মিসড কল বাদলের, নানান সময়ে- এর কী জবাব দেবে নিতু জানে না। এক ঝটকায় তার মাথা ঠিক হয়ে যায়। মনে হয় এতক্ষণ মাথার ভেতর যে ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল তা একেবারে নেই। বরং দুশ্চিন্তায় মাথা ঝিমঝিম করছে।

তাড়াতাড়ি বাদলকে একটা ফোন না করলেই নয়। “স্যরি, তোমার ফোন ধরতে পারিনি।” “তোমার ব্যাপারটা কী নিতু? তুমি লাস্ট চার ঘন্টা কই ছিলা? ফোন ধরো না কেন?” “ভুলে ফোনটা সাইলেন্টে রাখা ছিল, স্যরি।” “ভুলে মানে? ছিলা কই তুমি?” “এই তো, ফরিদার বাসায়।” “এতক্ষণ সেখানে থাকার কী হলো?” “ট্রাফিক জ্যাম ছিল খুব, আমি রাস্তায় বহুক্ষণ-” “বাদ দাও, খামাখা কারও বাসায় গিয়ে পড়ে থাকা আমি একদম পছন্দ করি না, তুমি জানো। আজ আমার দুজন কলিগ খাবে রাতে। ক্যাশ কাউন্ট শেষ হতে দেরি হবে, তারপর রওনা দেব। তুমি রেডি করে ফেল যা পার।” আর কোনো কথা শোনার দরকার নেই বাদলের। ফোন তাই কেটে যায় কথার মাঝখানে।

নিতু ভেবেছিল কী রাঁধতে হবে জানতে চাইবে, তা আর হয় না। ব্যস্ততার সময়ে আবার ফোন করলে বাদল চরম রেগে যাবে। হয়তো ধমকে উঠতে পারে। তার চেয়ে যা খুশি কিছু একটা বানিয়ে ফেললেই হয়। অনেক রকম আইটেম না করে শুধু মোরগ পোলাও করে নিলে নিতুর জন্য সহজ হয়। আরেক চুলায় কয়েক টুকরো মাছ ভাজতে ভাজতে একইসাথে শঁশাঁ-টমেটো কেটে ফেললে সালাদ তাড়াতাড়ি হয়ে যেতে পারে। দু’তিন ঘন্টার আগে আসতে পারবে না ওরা, ততক্ষণে সব তৈরি হয়ে যাবে। ফ্রিজে দই আছে। মিষ্টি কিছু বানাতে হবে না।

বাদলের সবকিছু এমনই, হঠাৎ করে একটা ঝামেলা দেবে, আগে থেকে কিছু বলবে না। তবু আকস্মিক তাগাদায় যেন কোথা থেকে নিজের জগতে আছড়ে পড়ে নিতু। একটু আগে ট্যাক্সির জানালায় মাথাটা হেলিয়ে রেখেছিল, শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার ব্যস্ততা দেখছিল। সেই নিরাসক্ততা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে যায়। তখন নিঃশ্বাসে জানালার কাচে ছোপ ছোপ ঘোলা ছবি হচ্ছিল। ঝাপসা চোখে সেসব ছবি পাহাড়পর্বত হয়ে উঠছিল। নিতুর সামনে উঁচু পাহাড়, ওপারে তপু ভাই, সেসব টপকে নিতু কিছুতেই তার কাছে যেতে পারে না।

বারবার হাত দিয়ে চোখ মুছছিল। এখন দ্রুত হাতে কাজ সারতে গিয়ে সেই আবেগ কোথায় ধামাচাপা পড়ে যায়। কিন্তু বারবার অন্যমনষ্ক হয়ে পড়ে, রান্নায় লবণ দিয়েছে তো? অথবা ফ্রিজ খুলে দাঁড়িয়ে আছে, কী নেয়ার জন্য খুলেছে, মনে পড়ছে না। ফ্রিজের ঠান্ডা গায়ে লাগছে, নিতু ভাবছে অন্য কিছু। বাদল আসার আগেই টেবিলে খাবার থাকতে হবে। তা না হলে তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। সে অফিস থেকে ফিরে টাই খুলতে আর জামাকাপড় বদলে ফ্রেশ হতে কিছুটা সময় নেয় কিন্তু নিতুর সেই আশায় বসে থাকলে চলে না। দরজা ঠেলে ঢুকতে ঢুকতেই বাদল দেখে টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে কি না। লবণদানি আর বোনপ্লেট তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো না থাকলে সে চিৎকার শুরু করবে। তার প্লেটের পাশে একটা গ্লাসে পানি আর তার পাশে ভরা জগ থাকতে হবে।

যদিও সে এক গ্লাসের বেশি পানি কখনই খাবে না, তবু জগ থাকতে হবে। আর আজ যেহেতু কলিগদের নিয়ে আসছে, আজ তো সব তৈরি হতে হবে আগেভাগে। বুয়াকে সাথে নিয়ে তড়িঘড়ি নিতুর সব কাজ হয়ে যায়। বাদলের মা যখন দেখেন নিতুর খুব তাড়া তখন প্রায়ই খামাখা বুয়াকে ডেকে ঘরে এটাসেটা কাজে ব্যস্ত রাখেন। হয়ত রান্নাঘর থেকে ডেকে বলেন, “আমার খাটের নিচটা পরিষ্কার কর তো, ঘর মোছার সময়ে খাটের নিচের ময়লা চোখে পড়ে না? এখনই কর, ঝাড়– নিয়ে আসো।” সেরকম সময়ে বুয়ার সাহায্য পাওয়া যায় না।

আজ ভাগ্যিস তিনি তাকে ডাকেননি। টেবিলে খাবার দেয়ার পরে নিতুর আর কোনো দায়িত্ব নেই। হেলে হেলে কলিগদের পাতে খাবার উঠিয়ে দেয়া আর তাদের চারপাশে ঘুরঘুর করে গল্পগুজোব করা বাদল একেবারে পছন্দ করে না। একবার বাদলের ছেলেবেলার বন্ধু সুমন এসেছিল। ঢাকায় আসার কয়েক মাস পরের ঘটনা। চা-নাস্তা দেয়ার পরে ভদ্রতার খাতিরে তাদের সামনে নিতু বসেছিল কিছুক্ষণ। হেসে হেসে জানতে চেয়েছিল, “ভাবী কেমন আছেন, সুমন ভাই? একবার নিয়ে আসেন না আমাদের বাসায়।”

তারপর বাদল শোবার ঘরে গিয়ে মিষ্টি করে ডেকেছিল নিতুকে। সুমনের সামনে থেকে উঠে গিয়ে নিতু দেখে মেঘের আড়ালে সূর্যের মতো বাদলের গনগনে মুখ। ধমকে বলেছিল, “কী, সুমনকে তোমার ভালো লাগে? ওর সাথে একা একা বসে থাকতে চাও? এতই যদি ওর সাথে ঢলাঢলি করার শখ তো বলো, আমি বাসা থেকে চলে যাই-” নিতু ভয়ে কাঠ হয়ে বাদলের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিছুই বলেনি। বাদল হনহন করে বসার ঘরে ফিরে গিয়ে এমন করে সুমনের সাথে কথা বলছিল যেন বরাবর সে এমন মুডেই ছিল। নিতুই কেবল খাটের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের হাসি-ঠাট্টার শব্দ শুনে কুলকুল করে ঘামছিল।

বাদলের বন্ধুরা এলে বাড়তি সৌজন্য করতে হয় না বলে নিতু আবার নিজের ভেতরে ডুব দিতে পারে। বাদলের সাথে তার বিয়ে না হয়ে তপু ভাইয়ের সাথে হলে কেমন হতো? আগে কিংবা আজই যদি সে চলে যেত? তাহলে তারা দুজনে একসাথে রান্না করত আর একসাথে খেতে বসত। তপু ভাই হয়তো খাবার তুলে তুলে দিত নিতুর প্লেটে। বলত, “বেশি করে খাও নিতু, এত কষ্ট করে রাঁধলে!” সামান্য হাসি পায় ভাবতে গিয়ে। কিন্তু সত্যি এমনই হতো। নিতু জানে। নিতু রাঁধলে তপু ভাই তাকে ভুলে কখনও একা খেতে পারত না।

আবার হাসি মিলিয়ে যেতে না-যেতেই চোখ ভরে যায়। ধ্যাত! হচ্ছেটা কী? বাদল দেখলে কৈফিয়ত চাইতে চাইতে পাগল করে ছাড়বে। বলবে, “আমি তোমাকে কী এমন কষ্টে রেখেছি বলো তো যে তোমার কথায় কথায় কান্না পায়?” এত দৌড়াদৌড়ির পরে গোসল করতে যাওয়াটা নিতুর তখন সবচেয়ে জরুরি মনে হয়। কাপড় হাতে বাথরুমের দরজা লাগাতে লাগাতে কী যেন হয়ে যায় তার। মনে হয় এখানে দেখার কেউ নেই, এখানে সে যা খুশি করতে পারে; কাঁদতে পারে, কারও কাছে ক্ষমা চাইতে পারে- কার কাছে ক্ষমা চাইবে? তপু ভাইয়ের কাছে? বাদলের কাছে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে না।

বিশেষ করে নিতু, যখন শুধু নিজের সামনে দন্ডায়মান, দীঘির পাড়ে একাকী তালগাছের মতো। এখানে নিজের অপারগতার জন্য লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। ভাবতে এক ফোঁটাও কষ্ট হয় না যে সে বাদলের কাছে ক্ষমা চায় না। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ে সে। শরীরে ঝরঝর করে পানি পড়ে, গড়িয়ে যাওয়া পানির দিকে তাকিয়ে সে পাগলের মতো কাঁদতে থাকে। আজ তপু তাকে সেভাবে স্পর্শ করেনি, এতক্ষণ তারা একসাথে ছিল কিন্তু সে শুধু নিতুর হাত ধরেছিল। অনেকবার। একবার হাতের এপিঠ আরেকবার ওপিঠ তপুর হাতের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল।

মাথা নিচু করে কাঁদতে কাঁদতে নিতু তপুর হাত আর নিজের হাতের উন্মুক্ত অংশটুকুর দিকে তাকিয়ে ছিল। এখন পানির অবিরাম ধারার নিচে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে; ফরসা, সরু আঙুলের চামড়া রান্নার সময়ে এতটা সময় ধরে পানি ঘাঁটাঘাঁটি করে কুঁকড়ে আছে- ভাঁজগুলোর উপরে আরও পানি পড়তে থাকে, ফ্যাকাশে আর রক্তশূন্য দেখায়। হঠাৎ কেন যেন নিতুর মনে হয় তপু ভাইয়ের শেষ স্পর্শটা পানিতে ধুয়ে চলে যাচ্ছে। আর সে লাফিয়ে শাওয়ার থেকে বেরিয়ে তোয়ালে দিয়ে চেপে চেপে হাত শুকাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।

এই ছোঁয়াটা যেন কখনও মুছে না যায়- আবার নিজের উপরে ভীষন রাগ হয়। কেন সে এমন করল? কেন জেনেশুনে তপুকে এতটা কষ্ট দিলো? ঘরে বাদলের চলাফেরার শব্দ পাওয়া যায়। দীপ আর ইনানিকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে পাশ ফিরে দেখে নেয় নিতু। কলিগরা নিশ্চয়ই চলে গেছে। বাদল লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে। ইনানি বিছানায় পড়ার সাথে সাথে ঘুম। দীপের চোখ বন্ধ থাকলেও অনেকক্ষণ এপাশওপাশ করে, হাত নাড়ে, পা নাড়ে, মাথাকে কিছুতেই আরামদায়ক একটা অবস্থান দিতে পারে না, বোঝা যায় সে এখনও ঘুমায়নি।

তারপর যখন কিছু সময় ধরে দীপের হাত-পা আর নড়ে না তখন বাদল নিতুর উপরে উঠে আসে। অন্যান্য দিনের মতো নিতু অন্ধকার ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আজ একবার চোখ চেপে বন্ধ করে ফেলে, কপাল আর গালের মাঝখান দিয়ে দুপাশে পানি গড়িয়ে যায়। অন্ধকারে বাদল কিছুই দেখতে পায় না অথবা দেখতে চায় না। শুধু নিতুর গভীর আর ভারী নিঃশ্বাস দিশাহারা হয়ে অন্ধকারে থমথমে হয়ে থাকা ছাদের এদিক ওদিক ধাক্কা খেতে থাকে, ঘুরে ঘুরে কেনো সুদূর অতীতে পালাবার পথ খোঁজে ।

২ ছাদের সমান্তরালে পেয়ারার ডাল চলে গিয়েছিল। ঝরা শুকনো পাতার উপরে বৃষ্টির পানি পড়ে পড়ে ছাদে কালচে বাদামি ছ্যাতলা। ওপরের আমলকি গাছ প্রায় পুরো ছাদটাকে রাখত ছায়া করে। নিতু সারাদিন একটা ডালে হেলান দিয়ে পেয়ারা আর আমলকি পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। পেয়ারার সবুজটা সে খুব কচকচ করে খেত কিন্তু মাঝখানে বিচিভরা অংশটা তার ভালো লাগত না। পেয়ারা খেতে খেতে এক ধরণের দুষ্টামিতে পেয়ে বসত তাকে।

গাছে ঝুলে থাকা পেয়ারা চারদিক কামড়ে খেয়ে রেখে দিত, সব ডালের বোটায় বিচির অংশটা শুকিয়ে ঝুলতে থাকত। আস্তে আস্তে সেগুলো কালচে বাদামি হয়ে গিয়ে দেখতে হয়ে যেত বিশ্রি। ঝাঁ ঝাঁ রোদের নিস্তব্ধ দুপুরে বড়বোন ঋতু মাঝে মাঝে ছাদে এসে বলত, “নিতু, এসবের মাঝখানে বসে তোকে পেতনির মতো লাগে; এভাবে খাস কেন?” “তোমার পেয়ারা খাওয়া দেখলেও আমার অসহ্য লাগে আপা, তুমি সবুজটা ফেলে দিয়ে খালি বিচিটা খাও, এটা কি একটা খোসা ছিলে খাওয়ার জিনিস?” “তো ওপরটা খেয়ে তুই আমাকে বাকিটা দিয়ে দিলেই পারিস?” “হ্যাঁ হ্যাঁ, খাও আপা, এই যে চারদিকে কত ঝুলছে-” ঋতু তাকে মারতে গেল, “পাজি কোথাকার, এই শুকনো পেয়ারার বিচি চিবিয়ে খাব? আমি কি তোর মতো পেতনি?” হঠাৎ সাইকেলের বেল শোনা গেল।

নিতু মারের ভয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যেতে গিয়ে বেল শুনে দাঁড়াল, “আপা, ঐ যে চলে এসেছে তোমার নায়ক, যাও যাও-আর আমার পেছনে লেগো না-” ঋতুর ওঠানো হাতটা নেমে গেল। লজ্জায় লাল অথচ খুশিতে আটখানা হওয়া মুখটা লুকিয়ে পিঠের উপরে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো গোছাতে গোছাতে বলল, “লক্ষ্মী নিতু, যা না একটু দেখে আয় মা ঘুমিয়েছে কি না। যদি ঘুমাতে দেখিস, তাহলে তপু ভাইকে এখানে পাঠিয়ে দে আর না হলে আমাকে বলিস, আমি নিচে যাব।” হাতের আধ-খাওয়া পেয়ারাটা থেকে যতটা সম্ভব বড় করে কামড়ে নিয়ে ঋতুর হাতে চালান করে দিলো সে। তারপর মাথা একদিকে হেলিয়ে নিচে চলে গেল। প্রথম গন্তব্য মায়ের ঘর।

আস্তে আস্তে দরজা ঠেলে সামান্য ফাঁক করলে মাকে দেখা গেল, বিছানায় নিশ্চল শুয়ে আছেন, ভেজা চুলগুলো বালিশের ওপর দিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, চুলের ডগা খেকে গড়ানো ফোটায় ফোটায় পানি মসৃন লাল মেঝেতে পড়ে মেঝের রঙ গাঢ় করেছে। ফ্যানের বাতাসে ছোট চুলগুলো এলোমেলো ওড়া ছাড়া মায়ের আর কোনো নড়াচড়া নেই, নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে আছেন। দুপুরের খাওয়ার পরে ঘন্টা দুয়েকের এই আরামের ঘুমের মধ্যে মাকে কেউ জাগালে মা তাকে একটা চড়ও মারতে পারেন। নিতু যেভাবে খুলেছিল সেভাবেই ধীরে ধীরে দরজা টেনে দিলো।

লোহার গোল কড়াটা আস্তে আস্তে দরজার উপরে রাখল, লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙল। সিঁড়ির ধারে পুরোনো আমলের পাতলা পাতলা ইটের গাঁথুনি থেকে কোথায় একটা ইট খসে গেছে, কোন জায়গাটা ছাদ থেকে স্রোতের মতো বৃষ্টির পানি পড়ে পড়ে শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে আছে, সব নিতুর মুখস্ত। সেই হিসেবে কোথাও দুই সিঁড়ি লাফিয়ে কোথাও নড়বড়ে রেলিং ধরে ভীষণ দ্রুত নিচ তালায় নেমে এলো সে। উঠোন পার হওয়ার সময় মাথা ঘুরিয়ে দেখে নিলো ওদিকের বারান্দায় চাচিদের কাউকে দেখা যায় কি না।

তারপর সদর দরজায় হাত, ওপাশে তপু ভাই সাইকেলের পাশে লজ্জিত মুখে দাঁড়িয়ে। দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে মনে হলো এই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে গুরুতর কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। নিতু বোঝেনি, এতই যদি লজ্জায় মরে, তাহলে না এলেই তো হয়! নিতুকে দেখে যেন আরও লজ্জা এসে ভর করল তার মুখে, লালচে হয়ে গেল। কোনোরকমে তপু বলল, “রিংকু আছে?” “না, ভাইয়া নেই।”

নিতু জানত তপু ভাই ভাইয়ার কাছে আসেনি, ভাইয়া কখন বাসায় থাকবে না- সেটা জেনেই সে এসেছে। তবু এলেই তপু ভাই এই কথাটা প্রথমে জানতে চাইবে, নিতুও স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেবে। আরও একটা নিয়ম আছে তপু ভাইয়ের, সেটা ভাবলে নিতুর খুব হাসি পেত। সে জানত, তখনই নিয়মমাফিক পরের কথাটা বলবে তপু ভাই। “বাহ্, তুমি তো অনেক বড় হয়ে গেছ নিতু!” এমন করে বলত যেন আজ অনেকদিন বাদে সে নিতুকে দেখল।

সপ্তাহে অন্তত একদিন যার সাথে দেখা হয় তার এরকম বোকাবোকা কথার পিঠে কী বলবে নিতু ভেবে পেত না। তাই উত্তরে কিছু বলত না। একেবারে প্রথমবার যখন তপু ভাই একথা বলেছিল তখন নিতু পাল্টা বলেছিল, “যাহ্ আমি ছোট ছিলাম নাকি?” তপু ভাই খুব হাসি হাসি মুখে বলেছিল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো!” তারপর থেকে বললে নিতু কেবল একটু হাসত, ঝুঁকে দরজা লাগাত তপু ভাই ভেতরে ঢুকে গেলে ঘুরে বলত, “ছাদে আছে, চলে যান।” তপু ভাইয়ের ফরসা মুখ এক ঝলকে রক্তশূন্য হয়ে যেত তখন।

সাইকেলটা বারান্দার ক্ষয়ে যাওয়া একটা পিলারের সাথে ঠেস দিয়ে রেখে তপু ভাই আর পেছনে তাকাত না। প্রথম কয়েকটা সিঁড়ি একেবারে স্বাভাবিক গতিতে উঠবে নিতু জানত, তারপর আড়াল হয়ে গেলে তিনটা-চারটা করে লাফিয়ে একবারে উড়ে আপার কাছে চলে যাবে। নিতু অনেকদিন ধরে এসব লক্ষ করছিল কিন্তু এমন কেন করত সে বুঝতে পারত না। কেন আপা তপু ভাইকে দেখলে আর তপু ভাই আপাকে দেখলেই তাদের ভাবভঙ্গি একইরকমের হয়ে যেত? মনে হতো যেন দুজনে মিলে কোথাও কিছু চুরি করছে বা করবার ফন্দি আঁটছে?

তপু নিতুর বড় ভাই রিংকুর বন্ধু। পাশের পাড়ায় বাসা, রিংকুর সাথে একই কলেজে পড়ত। ওই পাড়ায় তপুকে সবাই চিনত, বাবা উকিল শহিদ হোসেন বেশ পরিচিত এলাকায়, ভালো নামডাক ছিল। নিতুদের বাসায় তপু যখনতখন আসতে-যেতে পারত। নিতু দেখেছে চাচি একবার বারান্দায় তপু ভাইকে দেখে বলেছিল, “তুমি শহিদ উকিলের ছেলে না?” “জি” “তাই তো চেনা চেনা লাগছে, তোমাকে অনেক ছোট দেখেছি, তোমার বাবা তো আমার মামাকে যা একটা ভয়ঙ্কর মামলা থেকে উদ্ধার করেছিলেন। আমরা তাঁর কাছে চিরঋণী। তা, ভালো আছ তুমি?” “জি ভালো, দোওয়া করবেন।”

পরে চাচির কাছে তপু ভাইয়ের বাবা-মা আর বড়বোনের কথা শুনেছিল নিতু। বোন অ্যামেরিকায় থাকত, মা মাঝে মাঝে তার কাছে গিয়ে থাকত। আগে একবার স্কুল থেকে ফেরার পথে নিতু একদিন তাদের বাসা দেখেছিল। সাজানো বাগানের ঝকঝকে উঁচু বারান্দাওলা বাসার গেটের সামনে নেমপ্লেট, এডভোকেট শহিদ হোসেন, এল এল বি। তার পাশে আর একটা কালো সাইনবোর্ডে সাদা রঙে লেখা,’কুকুর হইতে সাবধান’।

বাসায় ফিরে বারান্দায় ভাইয়ার সাথে তপু ভাইকে গল্প করতে দেখে নিতু জানতে চেয়েছিল, “আচ্ছা, তপু ভাই তোমার আব্বা শহিদ হয়ে গেছে না কি? একাত্তরে?” তপু ভাই কেন যেন হা করে তাকিয়ে ছিল আর রিংকু বিব্রত বোধ করছিল। ভাইয়া একটু পরে ধমক দিয়ে বলেছিল, “বেশি কথা বলিস তুই, যা এখান থেকে।” “আচ্ছা, বাদ দাও, তপু ভাই, কুকুরটা কি অনেক বড়? কামড়ে খেয়ে ফেলে?” “তাই বলো, কুকুরটা খুব ছোট, কিছুই করে না। অনেকটা বিড়ালের মতো,পায়ে পায়ে ঘোরে।” “তাহলে ওভাবে লিখে রেখেছ কেন?” “বাবা লাগিয়েছে সাইনবোর্ডটা, মনে হয় বাইরের লোকদের ভয় দেখাবে বলে, এই আর কী।” নিতু তবু আস্বস্ত হয়নি।

সে কোনোদিন তপু ভাইদের বাসায় যাবে না, আপা বললেও না। অবশ্য তপু ভাইয়ের নরম স্বভাব দেখলে কেউ বলবে না যে তলেতলে বাসার ভেতরে হিংস্র কোনো প্রাণী লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু তবু নিতু কিছুতেই স্কুল থেকে ফেরার পথে আর ওই গলিতে ঢুকবে না, পাশের গলিটা নেবে। এসব কুকুরটুকুরদের কোনো বিশ্বাস নেই। দেখা গেল পাঁচিল টপকে ধপ করে সোজা নিতুর সামনে!

দুপুরের খাঁ খাঁ রোদে তার দাঁতগুলো মুক্তোর মতো ঝিলিক দিয়ে উঠবে, একতিল নড়লেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। আচ্ছা, কুকুররা কি দাঁত ব্রাশ করে? তাদের দাঁত এত সাদা হয় কি করে? পোষা কুকুর দাঁত ব্রাশ করলেও করতে পারে, কিন্তু স্কুলের সামনের বটগাছের তলায় যে কতকগুলো বেওয়ারিশ কুকুর ঘুরঘুর করে, তাদের দাঁতও নিতু কখনও ময়লা দেখেনি। তপু ভাই বিশাল, হিংস্র আর কালো কুচকুচে এক কুকুরের দাঁত ব্রাশ করছে আর কুকুরটা গড়গড় করে গার্গল করে কুলি করছে, দৃশ্যটা ভাবতে গিয়ে নিতুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত।

নিতু এমনি এমনি তো আর কুকুরকে যমের মতো ভয় পায় না! সে বছর বর্ষায়, ঘাসের মধ্যে পানি লুকিয়ে থাকা মাঠে পাড়ার সবাই মিলে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছিল। পা দিলেই পানি ফোয়ারার মতো লাফিয়ে ওঠে অথচ এমনিতে দেখলে মনে হয় শুকনো মাঠ। রুনার হাতের ছোঁয়া বাঁচাতে যেই নিতু দৌড়াতে যাবে, পিছলে পড়ে রুনারই গায়ের উপরে, ডিগবাজি খেয়ে দূরে ছিটকে গেল।

দুজনের হাত-পা এমনভাবে পেঁচিয়ে গেল যে ছাড়াতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছিল। তাছাড়া ব্যথায় অথবা হাসিতে দুজনেই বারবার দুদিকে গড়িয়ে পড়ছিল। রুনার পোষা কুকুর ভেবেছিল, তার মনিবের বিপদ আসন্ন, নিতু তাকে আক্রমন করেছে। মাঠের আরেক দিক থেকে ছুটে এসে নিতুর উরুতে দাঁত বসিয়ে দিয়েছিল মনিবের খাবারদাবারের প্রতিদান হিসেবে।

নিজেকে কোনোরকমে ছাড়ানোর পরে কুকুরটাকে নিতুর পা থেকে ছাড়াতেও রুনাকে কম চেষ্টা করতে হয়নি। ব্যথায় নিতুর চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল আর চোখ মেলেই দেখে রক্তে ভেসে যাচ্ছে হাটুর একটু ওপর থেকে নিচের দিকে। রুনা নিজেই তাদের বাসায় নিয়ে রক্ত ধুয়ে-মুছে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিয়েছে। মাঠে সবাই বলেছে, এবারে চৌদ্দটা ইনজেকশন, কোনো ছাড়াছাড়ি নেই। মাকে বললে তা-ই হবে, নিতু জানে। তাই ভয়ে বলেনি। পাড়ার শেষ মাথায় থুত্থড়ে এক বুড়ির কাছে পরপর সাতদিন ওষুধ খেয়েছে। কলার মধ্যে পোরা অদৃশ্য ওষুধ।

রুনাই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সাদা মাটিতে লেপা ঝকঝকে উঠোনের একধারে তুলসীতলা সে বাড়িতে। ওই বাসায় নিতু আগে কখনও যায়নি কারণ সমবয়সী কেউ ছিল না সেখানে। সকালবেলা খালিপেটে কলা আনতে গেলে বাড়ির বারান্দায় রাখা থালা দেখতে পেত নিতু। ছবিতে দেখা আমাজান লিলির পাতার আকৃতির, আয়নার মতো ঝকঝকে স্টিলের থালায় তখনই তুলে আনা জবা ফুল প্রতিদিন নিতুর চোখে পড়ত।

ফুলগুলোর পাপড়িতে রাতভর ঝরা বৃষ্টির পানি লেগে থাকত। সকালের হালকা বাতাসে পাপড়িগুলো থেকে থেকে মৃদু নড়ত। পানির বিন্দুরা যেন নিতুর মতোই ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠত। কলাটা দেবার সময়ে চোখ বন্ধ করে বুড়ি বিড়িবিড় করে মন্ত্র পড়ত। নিতু অবাক হয়ে বুড়ির ঠোঁট নাড়ানো দেখত। তার হাত, গলা আর গালের কুচকানো চামড়ার ভাঁজে নিতু মাঘের পাতা ঝরে যাওয়া বয়ষ্ক বৃক্ষের ডালপালা দেখতে পেত।

কোনো সন্ধ্যার মুখে গম্ভীর এই বুড়িকে রাস্তায় দেখলে সে নিশ্চিত আঁতকে উঠবে। বাসায় নিতু তখনও কাউকে বলেনি। অনেকে বলেছে, এসব করে কোনো লাভ নেই, জলাতংক হবে। ইনজেকশন দিতেই হবে। কেন যেন তখন চৌদ্দটা সুঁইয়ের খোঁচা খাওয়ার চেয়ে মৃতুকে সহজ মনে হয়েছিল। একটা একটা করে সুচগুলো শরীরে ঢোকানোর চেয়ে একেবারে মরে যাওয়া তখন অনেক বেশি কাম্য। আর দিন সাতেক গভীর মৃত্যুচিন্তায় ডুবে থাকার অনুভূতিটা ছিল একেবারে আনকোরা। সবাইকে মাফ করে দিতে ইচ্ছে হতো, ভাইয়াকে তার বই ছিঁড়ে ফেলাতে নিতুকে চড় মারার জন্য, আপা তাকে ফেলে বান্ধবীদের সাথে পিকনিক করতে যাওয়ার জন্য।

সবকিছুর জন্য সবাইকে মনে মনে মাফ করে দিতে চাইলে আবার তীব্র কান্নাও পেত। দোতলায় আপা হয়তো তখন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছে, চলে যায় বসন্তের দিন, মরি হায়। কানে এলে নিতুর কী যে হতো! বসন্তের দিন কেন চলে যায়, কী হবে চলে গেলে, সে বুঝত না, বুঝতে চাইতও না। শুধু চলে যাওয়ার প্রবল ব্যথায় কান্নায় ভেঙে পড়ত। নির্জন দুপুরে বৃষ্টি থামার পরে সে একা একা ছাদের পেয়ারা গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াত। চোখের পানি টপটপ করে ছ্যাতলা পড়া ছাদে গড়িয়ে ছাদটাকে আর একদফা ভিজিয়ে দিত।

পরে কে যেন বলেছিল, “কুকুরটার নিশ্চয়ই জলাতংক ছিল না, তা না হলে তোমার কিন্তু হতো; এ যাত্রা বেঁচে গেছ!” শুনে সেদিন থেকে মৃত্যুচিন্তার ঘোর কেটে গেল। তপু ভাই ছাদে যাওয়ার ঘন্টাখানেক পরে নিতু ভাবল আপা ব্যস্ত, মা ঘুমাচ্ছেন তাই তপু ভাইকে চা-নাস্তা দিয়ে আসার দায়িত্ব তার। মা সবসময় বলতেন পিরিচে একফোঁটা চা পড়ে থাকলে বা কাপের গা বেয়ে চা পড়তে দেখলে তার রুচি চলে যায়। তাই কাপ থেকে যেন চা ছলকে পিরিচে না পড়ে এরকম একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিতু ট্রে হাতে সিঁড়ি ভাঙতে লাগল। এত ধীরে, যেন একবারে শব্দহীন, বেড়ালের চলাফেরা।

সিঁড়িঘর পেরিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখল দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আপা আর ঠিক সামনে তপু ভাই, হ্যান্ডস আপ ভঙ্গি, হাতের তালুর ওপরে আরেকজনের তালু আর সবকটি আঙুল আরেকজনের সব আঙুলের মধ্যে ঢোকানো। দুজনেই এমন অপলক তাকিয়ে ছিল যেন ক্লান্ত হলেও মানুষ চোখের পলক ফেলে না। এত দেখার কি থাকতে পারে নিতু জানত না। সেদিনই তো আর প্রথম দেখছে না! আর এরকম দৃষ্টির অর্থই বা কী, নিতুর বোধগম্য হতো না। নিতুকে এত কাছে দেখে দুজনেই চমকে উঠল, হাত ছেড়ে সরে দাঁড়াল। থতমত ভাব কাটিয়ে তপু ভাই প্রথম কথা বলল, বলার আগে এমনভাবে গলা পরিষ্কার করে নিলো যেন অনেক পুরোনো কশির রোগী। “বাহ্ নিতু! চা রেডি? তাই তো বলি- তুমি বড় হয়ে গেছ। রিংকু কই, আসেনি এখনও?” “না, ভাইয়া তো প্রাইভেট পড়তে গেছে, সন্ধ্যার আগে আসবে না।” নিতু নিশ্চিত তপু ভাই জানত ভাইয়া তখন আসবে না।

তবু কেন আবার জানতে চাইল? নিতুর হাসি পেল, আরও বেশি হাসি পেল আপার অবস্থা দেখে, যেন চায়ের ফ্যাক্টরির টেস্টারদের মতো মনোযোগ দিয়ে চা খাওয়ার বিশেষ দায়িত্ব পেয়েছে, একবারও নিতুর দিকে তাকাল না। ছাদের একধারে বেঞ্চে বসে ওরা চা খাচ্ছিল। ওদিকটা চাচিদের বারান্দা থেকে দেখা যেত না। এমনিতে তপুর জন্য নিতুদের বাড়ি অবারিতদ্বার হলেও কেউ জানত না তপু দিনে-দুপুরে বাসার ছাদে ঋতুর সাথে যেখানে কিনা বাসায় রিংকু নেই। নিতু ওদের অস্বস্তি দেখে বুঝতে পারল যে সে এখানে অনাকাঙ্খিত। ফিরে আসতে গিয়ে বলল, “আপা, চা খাওয়া হলে ট্রে নিয়ে নিচে নেমো আর আমি বারান্দায়ই আছি।”

আপাকে ট্রে আনতে বলে বোঝাতে চাইল যে সে আর ওপরে আসবে না, তারা যা খুশি করতে পারে, আর বারান্দায় থাকার কথা বলে জানাতে চাইল যে অন্য কেউ ছাদের দিকে রওনা দিলে, সে সামলাবে। নিতু নিজের বুদ্ধিতে নিজেই মুগ্ধ… সে কি তাহলে সত্যিই বড় হয়ে গেল? আগামীবছর ক্লাস সেভেনে উঠলে সে আপার মতো সালোয়ার-কামিজ পরে স্কুলে যাবে। ইস্ বড় হয়ে যাওয়া কতই না মজার! টিফিন পিরিয়ডে নিতু দেখত আপা তাদের ক্লাস টেনের সামনের বারান্দায় বান্ধবীদের সাথে বসে চেঁচামেচি করে গল্প করে। বসার সময়ে তারা কামিজের পেছনের অংশটা হাত দিয়ে উঠিয়ে এমনভাবে বসে যেন কামিজের পেছনে বারান্দার ধুলোময়লা না লাগে, নিচে সালোয়ারে ধুলা লাগলে তো আর কেউ দেখছে না। নিতুদের ফ্রক ওভাবে উঠিয়ে বসা যেত না। পরের বছরে ওই সালোয়ার-কামিজটা যখন নিতুর স্কুলড্রেস হবে তখন সে-ও ওভাবে বসবে।

টিফিন পিরিয়ডে আপাদের আড্ডার কাছে ঘেঁষলে আপা ধমকে উঠত, “অ্যাই তুই এখানে কী চাস? যা নিজের ক্লাসের মেয়েদের সাথে গিয়ে গল্প কর, খালি বড়দের কথা শোনা!” নিতুর কান্না পেত, আপারা এমন কী আলাপ করে যে তার শোনা যাবে না? তাদের মুখগুলো কথা বলতে বলতে লাল টুকটুকে হয়ে গেল, আবার কখনও তারা কানে কানে কিছু বলে হেসে গড়িয়ে পড়ল… নিতুর বোধ হয় কখনই এসবের কারণ জানা হবে না। কেন যেন সেদিন বিকেল থাকতেই রিংকু এসে পড়ল, সাথে বড় চাচা। চাচা উঠোনের দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইল, “সাইকেল কার?” নিতু কিছু বলার আগেই রিংকু বলল, “তপু এসেছে, না রে?” তারপর তপুর সাথে রিংকুর আড্ডা চলছিল তার ঘরে।

মা ঘুম থেকে উঠে মুড়ি মাখল, নিতু আর ঋতু রান্নাঘরে বসে মায়ের সাথে গল্প করছিল। মা হঠাৎ ঋতুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কোথাও গিয়েছিলি নাকি তুই?” “না তো, কেন?” “না, এত সাজগোজ করলি যে?” ঋতু চমকে উঠে বলল, “এমনিতেই করলাম, মা।” মা হাসল, ইচ্ছে করে ঋতুর লজ্জা পাওয়া মুখটা এড়াতে হাত উঠিয়ে উঠোনের কাক তাড়াল। নিতু দেখল আপার চোখে সরু করে কাজল আঁকা, কানে দুল। আগে খেয়াল করেনি, কাজলের জন্যই আপার চোখগুলো এত ভাসাভাসা লাগছিল। অবশ্য আপাকে না সাজলেও সুন্দর দেখাত। মাকে সবাই বলত, “এমন রূপসী মেয়ে, কোথায় যে এর জন্য তেমন ছেলে পাবে!” নিতু তখনও তত বড় হয়নি বলে বোধ হয় তার ব্যাপারে কেউ কিছু বলত না। কিন্তু সে জানত আপাকে আর তাকে দেখতে একইরকম, স্কুলে কতবার কতজন তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, “ক্লাস টেনের ঋতু আপা তোমার বোন নাকি?” মুড়ি মাখা দিতে নিতু রিংকুর ঘরের দিকে যেতেই উত্তেজিত দুটো গলা শুনতে পেল। ভাইয়া আর তপু ভাই কথা বলছিল।

তাদের এরকম গলা আগে শোনা যায়নি। তাই দরজার পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকল সে। ভাইয়া বেশ রেগে কথা বলছিল তপু ভাইয়ের সাথে। “আমার ভালো লাগে, আমি খাই, তোর তাতে সমস্যা কোথায়?” “বাদ দিয়ে দে রিংকু, এসব খুব খারাপ, তুই ওদের সাথেও আর মিশিস না।” “তোর কথায়?” “আমি তো তোর ভালোর জন্যই বলছি।” “আমার ভালোমন্দ তোকে দেখতে হবে না।” “তোর বাবা-মা জানলে কী বলবে বল তো!” “কী করে জানবে? তুই বলবি? যা তুই এখান থেকে, আর আসবি না।” নিতু আর থাকতে না পেরে মুড়ি নিয়ে ঘরে ঢুকল। তাছাড়া মা-ও তো বলে দিয়েছিল তাড়াতাড়ি দিয়ে আসতে, না হলে মুড়ি নরম হয়ে যাবে।

তাকে ঢুকতে দেখে রিংকু মুখ ঘুরিয়ে নিলো, তবে নিতু তার আগেই ভাইয়ার সেই চোখ দেখে ফেলল যেটা ভাইয়া ভয়ানক রেগে গেলে দেখতে পায়। আর ওরকম সময়ে কিছু বলা মানে বকা অবধারিত। সারা সন্ধ্যা ভেবেও কোনো সুরাহা করতে না পেরে রাতে ঘুমাতে গিয়ে আপার কোমরের উপরে পা উঠিয়ে নিতু বলল, “আপা, জানিস আজ ভাইয়া আর তপু ভাই ঝগড়া করছিল?” “তাই? বন্ধুদের মধ্যে তো ওরকম একটু আধটু ঝগড়া হয়ই।” “ভাইয়া যেন কী খায় আর তপু ভাই মানা করছিল। ভাইয়া রেগে গিয়ে তপু ভাইকে বাসায় আসতে নিষেধ করল।” “খালি বড়দের কথা লুকিয়ে লুকিয়ে শোনা, ঘুমা এখন।” নিতু আপার শরীরের সাথে আরেকটু ঘেঁষে ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করল।

ঘুমিয়ে পড়ার আগে মনে হলো আপা চিন্তায় পড়ে গেছে আর তার মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্ধকারেও আপার মুখের আশঙ্কা স্পষ্ট টের পেল সে। ৩ শহরের বড় রাস্তাগুলো থেকে সাদা লম্বা টিউব লাইটগুলো হারিয়ে গেল। সেই জায়গায় উঁচু, মাথা থেকে বেঁকে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকা ইলেকট্রিক পোল থাকল নুয়ে। আর সেই পোলের মাথায় দেখা গেল হলদে বাল্বের সারি, ফকফকে সাদা রাস্তা আর নেই, হলদে আর ঘোলাটে হয়ে গেছে। নিতুদের স্কুলে কে যেন বলছিল, সোডিয়াম বাতি মিডিয়াম জ্বলে। শুধু রাস্তায় কেন, অনেক জায়গায় অনেক কিছু বদলে যাচ্ছিল। নিতুদের স্কুলে তখন কী সব নতুন নিয়ম হয়েছিল, তার একটুও ভালো লাগত না। জাতীয় সংগীত গাইবার পরে তখন আবার অন্য আরেকটি গানও গাইতে হতো।

তখন যেন তাদের দুটো জাতীয় সংগীত হয়ে গেল- ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ব মোরা নতুন করে আজ শপথ নিলাম’- খোদ দেশের প্রেসিডেন্টের লেখা গান। এটিও তাদের লাইনে দাঁড়িয়েই গাইতে হতো তবে পার্থক্য হলো এই যে গানটা গাওয়ার সময়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মতো গম্ভীর হয়ে থাকবার প্রয়োজন নেই। সবাই গানের তালে তালে হাত তালি দেবে আর গাইবে, এমনই নিয়ম। কয়েক মাস পরপর প্রেসিডেন্ট নিজেও আসতেন, ওটাই তার বাড়ির এলাকা কিনা, সারাবছর ধরে তার বন্দনা চলত। যখন তিনি আসতেন, সরকারি স্কুল থেকে সব মেয়েকে বড় মাঠে যেতে হতো কাকডাকা ভোরে। তারপর হেলিকপ্টার থেকে তিনি নামলে ওই গান হাততালি দিয়ে গাইতে হতো, তখন আর জাতীয় সংগীতের কোনো বালাই নেই।

এক এক সময়ে এক এক কল্পনার রঙের সাফারী স্যুট পরে প্রেসিডেন্ট সাহেব নিজেও ভীষণ তৃপ্ত আর হাসিমুখে দাঁড়িয়ে মেয়েদের সাথে গলা মিলিয়ে গাইতেন। তারপর শুরু হতো ভাষণ, অনেক রাজনৈতিক কথাবার্তা, উন্নতির জোয়ারে ভাসার কথা, নিতু বা তার বান্ধবীরা যার একবর্ণও বুঝত না কিন্তু তাদের আটকে রাখা হতো যতক্ষণ অনুষ্ঠান শেষ না হয়। সারাদিন মাঠে বসে থাকা আর রোদে পোড়া নিতুর একদম ভালো লাগত না। দুবার সিঙ্গাড়া, মিষ্টি আর পেপসি পাওয়া যেত, অনুষ্ঠানের ওই ব্যপারটাই কেবল ভালো লাগত তার।

আপা বলেছিল তারা ছোট থাকতে প্রেসিডেন্ট এলে অন্য একটা গান গাইত- ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’, সেটা ছিল আগের প্রেসিডেন্টের প্রিয় গান। নিতুর কাছে মনে হতো প্রেসিডেন্টরা গান শুনতে নিশ্চয়ই খুব ভালোবাসেন আর তাদের প্রিয় গান সকলকে গাইতে হবে, এটাই দেশের আইন। লম্বা-চওড়া পরিপাটি প্রেসিডেন্টকে দেখলে মনে হতো অমায়িক মানুষ। তবে তার ব্যাপারে যে অন্যরকম ধারণা সবাই দিত তা-ও নিতুর মনে পড়ত। ঢাকা থেকে রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলন পরিষদের দলটি যখন তাদের ছোট শহরে প্রশিক্ষণের জন্য আসত, ঋতুর সাথে সে-ও তখন গানের স্কুলে যেত। একটি ছেলে হেড়ে গলায় গায়ের শক্তি দিয়ে সা-রে-গা-মা উচ্চারণ করছিল দেখে প্রশিক্ষক ওয়াহেদুল হক হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “এমনভাবে সা-রে-গা-মা বলছ যেন জেনারেল এরশাদ!” মাঠের অনুষ্ঠানে একদল ছেলেপেলে থাকত, যারা, নিতু জানে না কেন, খুব ব্যস্ত। তারা সারাক্ষণ এদিকওদিক দৌঁড়ে যেত, একেওকে ধমকাত, আবার স্টেজের দিকে হেলে পড়া মানুষের ঢল সামলাত।

পেছনের মানুষের চাপে সামনের সারির মানুষেরা রঙিন দড়িগুলো ছিঁড়ে আছাড় খেয়ে পড়লে কখনও না পারতে গিয়ে তারা লাঠিও ব্যবহার করত। তাদের ভাবভঙ্গি দেখলে মনে হতো ওই মুহূর্তে তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর, এমন কিছুই নেই যা তারা করতে পারে না, তাদের ইশারায় সমগ্র বাংলাদেশে ভয়ানক ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অবাক কা-, দলের একটি ছেলেকে যেন নিতুর কাছে রিংকুর মতো লাগছিল! জায়গা থেকে ওঠার নিয়ম নেই বলে নিতু কাছে গিয়ে দেখতে পারছিল না। মুখ স্পষ্ট দেখতে না পেলেও হাঁটাচলা দেখেই নিতু বলে দিতে পারত যে ওটা রিংকু। কিন্তু ভাইয়া ওখানে কী করছিল? তার তো তখন কলেজে থাকার কথা। সেদিন সকালে তো কলেজের কথা বলেই বাসা থেকে বের হয়েছিল। কলেজের ছাত্রদেরও কি তাদের মতো ওখানে যেতে হতো? বোধ হয় না। আর সেভাবে গেলে নিশ্চয়ই এক জায়গায় চুপ করে বসে থাকতে হবে, ছুটাছুটি করে তদারকি করতে পারবে না। মাঝে মাঝে হঠাৎ করে ভাইয়াকে দেখা যাচ্ছিল, তারপর আবার যেন কোনদিকে হাওয়া। একবার কাকে যেন একটা কাগজ দিতে চৌকি দিয়ে বানানো অনেক উঁচু স্টেজটার উপরে উঠে গেল, তখন নিতু নিশ্চিত হলো, ওটা ভাইয়াই।

নিতু সেদিকে উৎসুক চোখে তাকিয়ে ছিল, ভেতরে ভেতরে নানারকম সন্দেহ আসতে লাগল। ভাইয়া কি তবে ওইরকম একটা দলে যোগ দিয়েছিল যেগুলোকে বাবা খুব খারাপ বলত? বাবা তো সবসময় ভাইয়াকে বলত, “শোন, রাজনীতি-টাজনীতি করলে কিন্তু এ বাসার ভাত উঠে যাবে তোর, মনে রাখিস।” কিন্তু নিতুর জানামতে, নেতারা এলে, এই ছুটোছুটি, এই সমস্ত কাজকর্ম রাজনৈতিক দলের ছেলেরাই করত। তাদের আর পড়াশোনা তেমন হতো না, ওরকমই নিতু অনেকদিন ধরে শুনছিল। ভাইয়া কি তাহলে কলেজের নাম করে ওসব করে বেড়াচ্ছিল? নিতুর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো, বাবা যা রাগী, জানতে পারলে কী হবে কে জানে! বাবাকে বলার সাহস অবশ্য নিতুর ছিল না। বাসায় ফিরে আপাকে বললে আপা অবাক হয়ে গেল, বারবার জানতে চাইল, “তুই ঠিক দেখেছিস তো?” তারপর খাওয়ার সময় আপা বলল, “ভাইয়া, আজ তোমার এত দেরি হলো- ভাইয়া সাথে সাথে বলল, প্রাকটিক্যাল ক্লাস ছিল তো, তাই।” ব্যাস, আর কোনো সন্দেহ ছিল না যে ভাইয়া ওসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে, নিশ্চয়ই বাবার ভয়ে বলছে না। সেদিন ভাইয়ার ঘরে রাগারাগি হওয়ার পর থেকে তপু ভাই আর আসেনি। তবু আপার খুব একটা মন খারাপ বলে মনে হয়নি।

রাস্তায় অবশ্য তপু ভাইয়ের সাথে তার মধ্যে একবার দেখা হয়েছে নিতুর। সাইকেল থামিয়ে তপু ভাই বলেছিল, “নিতু, ভালো আছ?” নিতু ভালো আছে বলাতে বিষণ্ন হয়ে জানতে চেয়েছিল, “ঋতু কেমন আছে?” মনে হচ্ছিল উত্তরটা জানাই আছে, কেবল আপার নামটা নিতে ইচ্ছে হলো বলে প্রশ্নটা করা। আপার ভালো থাকার কথা শুনে একইরকম দুঃখ দুঃখ ভাব নিয়ে আবার সাইকেলে প্যাডেল দিয়েছিল। নিতু ওসবের মানে বুঝত না, কী যে হলো ওদের মধ্যে! আপাকে জিজ্ঞাসা করলে আপা বলত, “ধ্যাত, তপু শুধু শুধু ভাইয়ার নামে যা-তা বলে। বলে ভাইয়া নাকি ফেনসিডিল খায়, বুঝলি? মিথ্যুক একটা।” “ফেনসিডিল কী আপা?” “ফেনসিডিল কাশির ওষুধ।” “কই, আমি তো ভাইয়াকে কাশতে দেখিনি!” “আরে ধ্যাত, মানুষ নেশা করার জন্য ওটা খায়। তপু খামাখা ভাইয়ার নামে আজেবাজে কথা বলে। আমি ওর কথা বিশ্বাস করি না। ভাইয়া বলেছে কলেজে তপু সবার কাছে ভাইয়াকে খারাপ দেখাতে চায়।” “তুমিও কি তপু ভাইকে বাসায় আসতে মানা করেছ?” “না, তবে আমি ওর সাথে ভীষণ রাগ করেছি।”

কয়েকদিন পরে একবার তপু ভাই দুপুরের পরে এলো। মুখে কোনো লজ্জা লজ্জা ভাব ছিল না। কেমন যেন অসহায় হয়ে সদর সরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। দেখে মনে হতো যেন না আসতে পারলেই বেঁচে যেত কিন্তু কোনো একটা কিছু যেন তাকে টেনে এনেছে। নিতু তাকে দাঁড়াতে বলে আপাকে খবর দিতে এলে আপা গম্ভীর হয়ে বলল, “গিয়ে বল আমি বাসায় নেই।” নিতুর এত খারাপ লাগছিল! শুনে তপু ভাই আর কোনো কথা না বলে পেছনে রাস্তা খালি আছে কি না দেখে রওনা দিয়েছিল। মুখটা এক ঝটকায় কালো হয়ে গিয়েছিল তার। মিথ্যে বলার জন্য শুধু নয়, তাকে মনমরা দেখেও নিতুর কষ্ট হচ্ছিল। নিতু নিজেও বুঝতে পারছিল তার মিথ্যে বলার কায়দাটা সুন্দর হচ্ছে না। কিন্তু তবু তপু ভাই হাসেনি বা বলেনি, “দুষ্টামি করলে ভালো হবে না, নিতু!” তপু ভাইয়ের জন্য নিতুর খারাপ লাগত, মাঝে মাঝে বুকের ভেতরে ব্যথা করত। কোনো কোনো রাতে তপু ভাইয়ের মুখ মনে করে খুব বিষণ্ন লাগত, ঘুম আসত না। আপার উপরে খুব রাগ হতো, তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে ইচ্ছে হতো না। আপা তার গায়ের ওপর হাতটা দিলেও ইচ্ছে করত সরিয়ে দেয়। দু’এক সপ্তাহ পর পর তপু ভাই আসত আর একইভাবে নিতুর কথা শুনে ঘুরে চলে যেত।

নিতুর কান্না পেত তাকে আসতে দেখলে। তবে আপাকে গিয়ে বলার দরকার ছিল না আর। আপা তো বলেই দিয়েছিল, “তপু আসলে বলবি আমি বাসায় নেই।” তখন কেন যেন নিতুর ইচ্ছে করত তপু ভাইয়ের হাতটা একটু ধরে, একেবারে বলেই দেয়, “কেন আস বারবার? তুমি কি কিছুই বোঝ না? আপা মিথ্যে বলে তোমাকে ফিরিয়ে দেয়, বুঝতে পার না?” কিন্তু বলত না। তপু ভাই মাঝে মাঝে আসত, বিষণ্ন চেহারায় কখনও নিতুর দিকে তাকিয়ে জোর করে একটু হাসত, না এলে তা-ও তো নিতু হারিয়ে ফেলবে, সেটা ছিল একটা ভয়। ওই সামান্য কয়েকটা মুহূর্ত তপু ভাইকে দেখার লোভ সামলাতে পারত না নিতু। কখনও ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সে নিচের রাস্তার দিকে ঘনঘন তাকাত, বারবার মনে হতো, এখনই সাইকেলের বেল শুনতে পাবে। তারপর উদাস চোখে হেমন্তের পরিষ্কার আকাশে চোখ রাখত- আকাশ কি আগেও এতটা নীল ছিল? বোধ হয় আগে কখনও সেভাবে খেয়াল করেনি। মেঘ এমন সাদা আর তুলোর মতো নরম হয় তাও কোনোদিন সেভাবে ভাবা হয়নি। পেয়ারা গাছের নিচে শুধু শুধু বসে থাকতে আর ভালো লাগত না। রেলিং-এর ধারে দাঁড়িয়ে একগুচ্ছ্ব মেঘের সাথে তার দৃষ্টি আকাশের এদিক থেকে ওদিকে চলে যেত। সন্ধ্যার আগে আগে দল বেঁধে পাখিরা তাড়াহুড়ো করে কোথায় যেন চলে যেত, পাশের বাঁশঝাড়টায় অসংখ্য চড়–ই পাখির মেলা বসত। দিনশেষে কে কোথায় সারাদিন কী করেছে, চেঁচামেচি করে সেসব একজন আর একজনকে বলত। পুরো আকাশে কে যেন নানান রঙ ছিটিয়ে দিত, মেঘগুলোর গায়ে লালচে রঙ লাগতে থাকে।

নিতুর হঠাৎ খুব কান্না পেত, চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকত, কিন্তু ঠিক কোন বেদনায়, সে বুঝত না। ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে একদিন যেন তক্ষুণই প্রথম খবরটা জানতে পারল- তপু ভাইয়ের মন খুব খারাপ। মনে হলো ভেতর থেকে কে যেন বলল, তপু ভাই কি আগের মতো হাসবে না? সেই মুহূর্তে তপু ভাইকে খুশি দেখার চেয়ে বড় কোনো চাওয়া নিতুর ছিল না। যখন তখন অচেনা কিছু ছেলে ভাইয়ার খোঁজে বাড়িতে আসত। নিতুর কাছে তাদের দেখতে গুন্ডপান্ডার মতো লাগত। তাদের মধ্যে কারো কারো মুখ আবার চেনাচেনা মনে হতো। গার্লস স্কুলের সামনে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকত তারা। স্কুল থেকে কাউকে নিতে আসত বলে মনে হতো না, কেবল বড় মেয়েরা স্কুল থেকে বের হলে তাদের দিকে ইশারা করে নিজেরা নানান রসিকতা করত, শিশ দিয়ে গান গাইত। ক্লাসে একদিন ম্যাডাম বলেছিলেন, “তোমরা স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোর সাথে কখনও কথা বলবে না।

ওরা নিজেদের স্কুল-কলেজে যায় না। গার্লস স্কুলের সামনে তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই তাদের জীবন কেটে যায়।” ছেলেগুলো ভাইয়ার কাছে এলেও অবশ্য বাসায় ঢুকত না, কেবল তাকে ডেকে নিয়ে চলে যেত। ভাইয়া আগে যে কোনো সময়ে বাসার বাইরে যেতে পারত না, বাবার কড়া নিষেধ ছিল। কলেজ পেরিয়ে যাচ্ছে বলে হয়তো বাবা আর তেমন কিছু বলতেন না। আর আশ্চর্যের ব্যাপার, ভাইয়া তখন মায়ের কাছে কলেজের জন্য বের হবার আগে টাকাও চাইতে আসত না। আগে বাড়তি টাকার জন্য মায়ের কাছে কত ঘ্যানঘ্যান করত! বাবাকে লুকিয়ে মাকে টাকা বের করে আনতে হতো ভাইয়ার জন্য। আজ বই বা খাতা, কাল কারও জন্য জন্মদিনের উপহার- লেগেই থাকত। আপা ভাইয়ার কাছে জানতে চেয়েছিল, “নিতু তোমাকে জনদলের ছেলেদের সাথে দেখেছে ভাইয়া, তুমি কি রাজনীতি কর?” “করি, বাবাকে বললে এক থাপ্পড় খাবি।” “কেন কর ভাইয়া? জানোই যখন বাবা পছন্দ করেন না-” “কেন রাজনীতি করলে কি মানুষ নষ্ট হয়ে যায়? বাবার এসব ভুল ধারণা। বাবাকে আমি বোঝাতে পারবনা তাই বলারও দরকার নেই।” “তোমার কী লাভ ভাইয়া এসব করে? তোমার পড়াশোনা-” “লাভ মানে? পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত তো একটা চাকরিই করব। এটাও একটা চাকরির মতো! দলের কাজ করলে আমি টাকা পাই, লাভ না? আর ক্ষমতা নামে একটা জিনিস আছে, তা জানিস? এখন আমাকে সবাই ভয় পায়।

মানুষ ভয় পেলে খুব মজা লাগে।” “তুমি আর এখন বাবাকে ভয় পাও না, না ভাইয়া?” ভাইয়া আপার এই প্রশ্নের উত্তরে কিছুই বলেনি। এমন চোখে অন্যদিকে তাকিয়েছে যেন কিছু খারিজ করে দিল। আপা মরিয়া হয়ে জানতে চাচ্ছিল, “তোমার এত টাকার কী দরকার পড়ল ভাইয়া? মা কি তোমাকে টাকা দেন না?” “টাকার দরকার কার নেই ঋতু? মা যে টাকা দেয় সে টাকায় আমার হয় না। বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে চলাফেরা করতে হলে অনেক টাকার দরকার, বুঝলি? সারাক্ষণ মায়ের এই ’নেই’ ’নেই’ শুনতে আমার ভালো লাগে না।” আপা আর কোনো কথা বাড়ায়নি। কেন যেন নিতুরও মনে হয়েছিল ভাইয়া অনেক দূরে চলে গেছে, তাকে আর ফেরানো যাবে না, ভাইয়া অন্য কেউ হয়ে গেছে।

তবে কি ভাইয়া ফেনসিডিলও খেত? তপু ভাই হয়তো ঠিকই বলেছিল। আপা শুধু শুধু তপু ভাইয়ের সাথে রাগ করল। এইসব ভাবনার ঘোরে নিজের অজান্তে হাতে টান লেগে নিতুর হাতের পুঁতির চুড়ি ছিঁড়ে গেল, ঘরের মেঝেতে চারদিকে পুঁতি ছড়িয়ে পড়ল, খাট কি আলমারির নিচে চলে গেল। অন্যমনষ্কভাবে কখনও কখনও নিতু চুড়ির পুঁতিগুলো গুনত। তেইশটা পুঁতি ছিল চুড়িটাতে। বারবার ঝাড়– দিয়ে টেনেও বাইশটা খুঁজে পেল, আরেকটা কিছুতেই পেল না। পুঁতিগুলো গাঁথতে বসে নিতুর হারানো পুঁতিটার জন্য মন খচখচ করছিল, চুড়িটা একটু ছোট হয়ে যাবে, চোখের সামনে দিয়ে গেল কোথায় পুঁতিটা? তারপর হঠাৎ বুক ভেঙে কান্না আসে, ভাইয়া কি তাহলে ওরকমই একটা হারানো পুঁতি? নিতুর মনটা তখন খারাপই থাকত।

বছর ঘুরে নিতু সেই কবে সালোয়ার কামিজ পরে স্কুলে যেতে আরম্ভ করেছিল কিন্তু কোনো কিছুই আর আগের মতো মজা লাগত না। তার কাছে মনে হতো এই বড় হয়ে যাওয়াটাই কাল হলো, কিছুতেই আর আগের মতো চট করে আনন্দে লাফিয়ে ওঠা যায় না। এতদিন যা যা বুঝতে চাইত সেসব বুঝতে পেরে কখনও কষ্ট বাড়ছিল, কখনও আবার আনন্দও যাচ্ছিল কমে। অবশ্য নিতু তার মনোভাব কাউকে বুঝতে দিত না, সে তো আর তখন তত ছোট নেই যে মন খারাপ করে কাউকে দেখিয়ে দেখিয়ে ভেউভেউ করে কাঁদবে। ঋতু তেমন বদলায়নি, এসএসসি পরীক্ষা শেষ, তাই বিকেলের দিকে মা ঘুমিয়ে পড়লে সে সেজেগুজে এখানেওখানে বেড়াতে যেত।

নিতু জানত না কোথায় যায় তবে একদিন স্কুল থেকে আসার সময় রাস্তায় ঋতুকে একটা ছেলের সাথে কথা বলতে দেখল। সেই সময় তার মুখের ভঙ্গি আর হাসিতে ঢলে পড়ার মধ্যে এমন কিছু ছিল যে দেখে নিতুর গা জ্বলে উঠেছিল। আপার ওরকম মুখ সে দেখেছিল আগে অনেকবার, তপু ভাইয়ের সামনে। সহজেই আপার সাথে নতুন নতুন নানান ছেলেদের বন্ধুত্ব হয়ে যেত। সবার সাথে তার মেলামেশা দেখলে মনে হয় বহুদিনের চেনা আর আপন। এদিকে তপু ভাই দিনের পর দিন, মাস কি বছর, থেকে থেকে আপার খোঁজে আসত। নিতুও অরিরাম একই কাজ করত, একইভাবে হাসত, গেট খুলত, মিথ্যে বলত, গেট লাগাত- নিতুর কখনও ক্লান্ত লাগত না। কিন্তু তপু ভাইয়ের মুখটা যেদিন দেখত সেদিন সারাদিন রাগে আপার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করত না। নিতু যখন ক্লাস নাইনে, তখন একবার বিকেল বেলায় তপু ভাই এসেছিল বহুদিন বাদে। সাইকেলের বেল বাজেনি। ঘরে বসেই নিতুর হঠাৎ মনে হয়েছিল গেটের সামনে কেউ হর্ন বাজাচ্ছে আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মটর বাইকের গিয়ার বাড়াচ্ছে, কমাচ্ছে।

নিতু দৌঁড়ে গিয়ে দেখল তপু ভাই বাইকে বসে আছে। বহুদিন পরে তপু ভাইয়ের হাসিমুখ। সেই খুশি দেখে নিতু চমকে উঠে বলল, “হোনডা কিনেছ তপু ভাই?” “অ্যাই বোকা, হোনডা কোথায়? এটা তো ভেসপা।” “ওই হলো।” “ওই হলো মানে? সব মোটর বাইকই হোনডা নাকি? সব জ্বরের ওষুধের নাম প্যারাসিটামল না, আর সব ¯িœকার্স কেডস্ না, বুঝেছ?” “আচ্ছা বাদ দাও, নতুন?” “হ্যাঁ, বাবা কিনে দিলো, ঋতুকে ডাক না নিতু, বল আজ যেন আর রাগ করে না থাকে, আমার সাথে দূরে কোথাও যাবে নাকি জিজ্ঞাসা করে আস না একটু, বল আমি এখানে বসে আছি, তাড়াতাড়ি যাও তো-” মোটরবাইকের হ্যান্ডেল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে এমন করে বলছিল তপু ভাই, যেন ভীষণ আত্মবিশ্বাস, ঋতু শুনেই ছুটে আসবে। নিতুর মন খারাপ হয়ে গেল। ঋতু যথারীতি সেদিন বাসায় ছিল না। আপার ওপর এমন রাগ হলো! সামনে থাকা তপু ভাইয়ের উপর সেই রাগ দেখাতে ইচ্ছে করল।

ইচ্ছে করল বলে, “তুমি কি একটা গাধা? আপা তোমার জন্য এখনও বসে আছে মনে কর? আপা কি আর সেই ’আপা’ আছে? তুমি বোঝ না কেন তপু ভাই?” তারপর আবার ভাবল ততদিন পরে তাকে হাসতে দেখছে, কত আশা নিয়ে এসেছে আপাকে অবাক করে দেবে বলে- তাই কিছুতেই ওরকম করে বলতে পারল না, বরং তাড়াহুড়ো করে বলল, “তপু ভাই, তুমি একটু দাঁড়াও, আমি আসছি।” দৌঁড়ে ওপরে উঠল নিতু। মা ঘুমিয়ে ছিল, ডাকার সাহস হলো না। চুলটা আঁচড়ে নিলো তাড়াতাড়ি। তারপর আবার দৌঁড়ে নেমে জুতার খোঁজে বারান্দায় এলো। সামনে চাচিকে পেয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “চাচি আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। মা ঘুম থেকে উঠলে বলো।” “কোথায় যাও?” “এই তো একটু সামনে।” “ওই যে বাইরে তপু দাঁড়িয়ে আছে, ওর সাথে?” “হ্যাঁ হ্যাঁ চাচি, তপু ভাই নতুন হোনডা- না না ভেসপা মোটর বাইক কিনেছে তো, তাই।” “আচ্ছা যাও, ছেলেটা ভদ্র, ভালো বাবা-মায়ের ছেলে, বুঝলে? আমি তোমার মাকে বলে দেব, যাও।” এক পায়ে জুতা পরে আরেক পায়ে ঢোকাতে ঢোকাতে নিতু বেরিয়ে এলো। তপু ভাই মনে হয় মোটরবাইকের দিকে তাকিয়ে গুনগুনিয়ে কোনো গান গাইছিল, নিতু এসে দাঁড়ানোর শব্দে থেমে গেল। আপাকে না দেখতে পেয়ে মুখটা একটা প্রশ্নবোধক চিহ্নে বদলে যেতে থাকল। নিতু তাড়াতাড়ি বলল তপু ভাই, “আপা তো নেই, আমি আসি তোমার সাথে? আমাকে নিয়ে একটু ঘুরবে? আমার খুব বাইকে চড়ে ঘোরার শখ।” “তুমি যাবে!” তপু অবাক হলো, ঋতুকে এত নিশ্চিতভাবে আশা করছিল যে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতেই পারল না। একটু ভেবে বলল, “বাসায় বলে এসেছ?” “হ্যাঁ, চাচিকে বলে এলাম।” তপু একটু সামনে এগিয়ে বসে বলল, “ওঠো, ভালো করে ধর কিন্তু।

ওড়নাটা ঠিক করে পেঁচিয়ে নিও, দেখ ঝুলে থাকে না যেন।” নিতু প্রথমে তপু ভাইয়ের ঘাড়ের পেছনে একটা হাত রাখল তারপর সিটে বসল। বাইক স্টার্ট দেয়ার সাথে সাথে তার মনে হলো সে তার চেনা গ-িতে ঘুরপাক খাওয়া জীবন ছেড়ে কোথায় চলে যাচ্ছে! এইমাত্র যেন স্বাধীন হয়ে গেল। বাতাস গায়ে জোরে ধাক্কা দিলো, আনন্দে নিতু হা করে বাতাস ভেতরে গিলতে থাকল। একটু শীত শীত করছিল কিন্তু ভালো লাগছিল তবু। তপু ভাই চিৎকার করে বলল, “ঠিক করে ধরেছ তো, নিতু-উ- উ?” নিতু তার শার্ট খামচে ধরে, চিৎকার করে বলল, “ধরেছি, তপু ভাই” বাতাসের ঝাপটায় কথাগুলো ভেঙে গেল। পাশাপাশি বসেও কেউ করো কথা ঠিকমতো শুনতে পেল না তেমন।

মুখ থেকে বের হয়েই শব্দের তরঙ্গ যেন কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। নিজেদের পাড়াটা পার হয়ে দূরে যেতে থাকলে নিতু আরও জোরে চিৎকার করে বলল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি, তপু ভাই?” “কোথায় যেতে চাও?” “আমি তো কোথাও যাই না, জানি না বেড়াতে চাইলে কোথায় যায় মানুষ।” “হা হা হা… মানুষ কোথায় যায়?” “হাসির কী হলো?” “চল, তোমাকে আমার একটা প্রিয় জায়গায় নিয়ে যাই।” “কোথায়?” “আগে চল তারপর দেখবে।” নিতু শক্ত করে ধরে বসে থাকল। আরও কিছু পরে তারা শহরের প্রান্ত পেরিয়ে একবারে শান্ত, বড় রাস্তায় চলে এলো। সে রাস্তায় আর মানুষজন তেমন দেখা যাচ্ছিল না। বেশ কিছুক্ষণ পরে পরে বাস বা ট্রাক চলে যেতে দেখা গেল।

একটা কাঁচাবাজার পার হয়ে আবার বড় রাস্তায় উঠলে নিতু জানতে চাইল, “আর কতদূর তপু ভাই?” “এই তো চলে এলাম।” “এটা কি অনেক দূর?” “ধুর বোকা, দূর কোথায়?” খানিকটা যাওয়ার পরে মটর বাইক বড় রাস্তা থেকে নেমে একটা সরু পায়ে চলা পথ দিয়ে আগাতে লাগল। ঝঁকিতে বাইক থেকে নিতুর পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, খুব সাবধানে কাঠ হয়ে বসে থাকল। সামনে তাকিয়ে দেখল ছোট ছোট টিলার মতো। টিলা ওখানে কোথা থেকে এলো? নিতু জানতই না তার বাসার এত কাছে এমন পাহাড় টাহাড় আছে! একটা বড় জায়গা জুড়ে উঁচু উঁচু টিলাগুলো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে। নিতু অবাক হয়ে দেখছিল, পাহাড় বোধ হয় এমনই হয়। সে শুধু ছবিতে দেখেছিল আগে, ছবিতে পাহাড়ের রঙ জায়গায় জায়গায় সবুজ অথবা নীল। ওখানে সবুজ ঘাসে ঢাকা বিছানার মতো। সিনেমায় গানের দৃশ্যে নায়িকারা আনন্দে ওড়না উড়িয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে যেমন ছুটে যায়, নিতুর ইচ্ছে হচ্ছিল মটরবাইক থেকে নেমে, দৌঁড়ে একটা টিলার ওপরে সেরকম করে উঠে যায়, তারপর একেবারে চূঁড়ায় দাঁড়িয়ে দেখে নিচের পৃথিবীটা কেমন দেখায়। ওপর থেকে তপু ভাইকে দেখতে কেমন লাগবে? টিলাগুলোর একেবারে পাশে এসে তপু ভাই মটর বাইক থামাল, বলল, “এবার নামো নিতু।” “এটা কোথায়?” “এটা এমন একটা জায়গা যে কেউ জানে না। গোপন জায়গা বলতে পার।” “মানে?” “মানে এটা তো শহর থেকে একটু দূরে তো তাই কেউ অত আসেটাসে না।” “আমাদের এখানে পাহাড় আছে আমি জানতাম না, তপু ভাই।” “হা হা হা… পাহাড় কোথায় বোকা? আসো দেখাই-” নিতু তাকে অনুসরণ করল।

একটা টিলা পেরোলে সামনে আরেকটা। সেটাকে পাশ কাটিয়ে যেই এগিয়েছে নিতুর চোখের আর পলক পড়ছিল না। সামনে বিশাল এক দীঘি আর তার ওপরে হাজার হাজার গোলাপি পদ্ম- যেন নিতুর দিকে তাকিয়ে। পুরো দীঘিটাই শুধু সবুজ আর গোলাপিতে মাখামাখি। নিতু থমকে দাঁড়াল, চোখ ফেরাতে পারল না। দীঘির চারদিকে সারি হয়ে টিলাগুলো, কোথাও কোনো ফাঁক ছিল না যে বাইরের কিছু দেখা যাবে। বাইরে থেকে এজন্যই বোঝা যায়নি দীঘির অস্তিত্ব। একটা সাদা বক দুদিকে পাখা মেলে কোথা থেকে যেন উড়ে এসে পাড়ে বসল। নিতু তখন আর নিজের মধ্যে নেই, হঠাৎ তপুর হাত চেপে ধরে বলল, “এটা কি একটা দীঘি তপু ভাই?” “হ্যাঁ, দিঘীই তো, দেখতে পাচ্ছো না? আর তোমার পাহাড় হলো এই দীঘির মাটি দিয়ে তৈরি, মানুষের বানানো দীঘি আর পাহাড়, বুঝেছ? হা হা হা…. আস বসি ওই গাছের নিচে।” “তুমি কি এখানে প্রায়ই আস?” “দু’তিনবার এসেছি।”

কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না নিতু। বারবার যেন ভুলে যাচ্ছিল সে কোথায় আছে, কার সাথে আছে, কেমন সব গোলমাল লাগছিল। কাছাকাছি একটা পদ্মের দিকে একভাবে তাকিয়ে ছিল, মাঝখানে গাঢ় গোলাপি আর ধারের দিকে আস্তে আস্তে ফ্যাকাশে, ওপরে একটা ভোমরা উড়ে উড়ে বসছিল বারবার। বকটা খুঁটে খুঁটে কিছু খাচ্ছিল। আরেক পাড়ে এক সাথে বেশ কিছু দুধসাদা বক দাঁড়িয়ে ছিল। বোধ হয় এখানে মাছ পেত তাই ভীড় করত। চারদিকে কোথাও কোনো মানুষ ছিল না, টিলার সারির বাইরেও যেন আর কিছু নেই, সেখানেই সেই ঘেরাটোপের মধ্যে চারদিকের পৃথিবীটা যেন শেষ হয়ে গেছে। কোনো শব্দ ছিল না, এমনকী দূরে পাখিদের নড়াচড়ার শব্দ, তপু ভাই আর নিজের নিঃশ্বাস পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিল নিতু। তার মনে হলো এটা কি অপার্থিব কোনো জগত? স্বপ্ন নয় তো! মনে হলো নিজেকে চিমটি কেটে দেখা যেতে পারে।

হঠাৎ একটা নীল পাখি নিতুর মাথার উপর দিয়ে উড়ে এসে সামনের পদ্মফুলগুলোর পাশে বসল। ঠোঁট আর চোখ তীক্ষ্ণ করে পানিতে মাছ খুঁজতে লাগল। “এটা কি মাছরাঙা তপু ভাই?” “হ্যাঁ, আর কিছুদিন পরে শীত এলে শীতের পাখিরাও আসবে দল বেঁধে। তখন অবশ্য এখানে একটু ভিড় হবে, দূর থেকে মানুষ বেড়াতে আসবে, পাখি দেখতে আর পিকনিক করতেও আসবে।” “আশ্চর্য লাগছে, বাসার কাছেই এমন একটা জায়গা আছে অথচ আমি জানিই না! আসলে জানবই বা কী করে, যাই হোক, তোমাকে কী যে বলব, তপু ভাই, আজ এত ভালো লাগছে, মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি, সুন্দর আর লম্বা একটা স্বপ্ন।” উত্তেজনায় নাকি কৃতজ্ঞতায় নিতুর গলা ধরে এলো, চোখ ভিজে গেল। নাক দিয়ে জোরে বাতাস টেনে সে নিজের অনুভূতিটা লুকাতে চাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ বলল, “তপু ভাই, শীতের পাখিদের কী মজা না, কত জায়গা, কত দেশ ঘুরতে পারে!” “মজা আর কী? দুদিন পরপর দূরে উড়ে যাওয়া, ক্লান্তি আর তাছাড়া নিজের বাড়ি ফেলে এসে আবার নতুন করে বাসাবাড়ি বানানো- সেসব ঝামেলাও তো আছে।” “তবু, একখানে ভালো লাগল না তো চলে গেলাম অন্য কোথাও, মজা না?” “বাসায় তোমার ভালো লাগে না, তাই না নিতু?” “তুমি কি করে জানলে?” মুখ নিচু করে জানতে চায় নিতু। “তুমি খুব ইমোশনাল নিতু, ঋতু কিন্তু এরকম নয়। সে খুব শক্ত।

আমাকে তার আর ভালো লাগে না, আমি জানি। সে একজন মানুষকে বেশিদিন ভালোবাসতে পারে না, কারো জন্য তার মায়া হয় না।” “বোঝোই যখন তাহলে কেন বারবার আপার খোঁজে আস?” “আমার শুধু মনে হয় ঋতুর কোনোদিন আমার কথা মনে পড়বে, সে হয়তো আমাকে খুঁজবে- আমি তো আর তার মতো শক্ত নই! তবে আর বেশিদিন আসব না, আমিও চলে যাব শীতের পাখিদের মতো।” “কোথায়?” “আমেরিকা।” “তাই নাকি! কবে?” “এই তো, বি কম পরীক্ষার পর। বাবা রাজি হয়েছে। যাওয়ার চেষ্টা করছি, দেখি কী হয়।” নিতু চুপ করে থাকল কারণ কথা বলতে গেলেই কেঁদে ফেলবে, মনে হলো তপু ভাই নিশ্চয় আপার উপর রাগ করেই চলে যাচ্ছে। তার ইচ্ছে করল ওই মুহূর্তে তপু ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলে, “তপু ভাই তুমি প্লিজ যেও না।” নিজেই নিজের ভাবনার জন্য লজ্জা পেল। তপু ভাই হয়তো ভালোই থাকবে সেখানে গেলে। একই শহরে বসে থেকে আপার জন্য কষ্ট পেয়ে পেয়ে কী লাভ? দূরে গেলে ভুলে যাবে সেটাই তো ভালো। তারপর আবার কেন যেন অবাধ্য মনটা ভেতরে ভেতরে উচ্চারণ করতে থাকল, “তপু ভাই, আমি যে তোমাকে আর দেখতে পাব না- সেটা কি তুমি একবারও ভেবেছ?” তখন সত্যিই নিতুর চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি ঘাসের উপরে পড়ে শিশিরের বিন্দুর মতো হয়ে থাকল। তপু দুই হাত পেছনে ঠেস দিয়ে পা এলিয়ে বসে ছিল, মুক্তোর মতো বিন্দু দুটোর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে বলল, “আরে, কী হলো নিতু? তোমাকে নিয়ে তো দেখি ভারি ঝামেলা! কাঁদছ কেন আবার?” নিতুর ইচ্ছে করল তপু ভাইয়ের হাতটা একটু ধরে তারপর যত কান্না গলার তাছে আটকে আছে সব উগরে দেয়। তার বদলে নিতু কেবল একটু ফুঁপিয়ে উঠল একবার।

তপু তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসল, বলল, “প্লিজ চুপ কর, হঠাৎ কেউ চলে এলে ভাববে আমি তোমাকে জোর করে এই নির্জন জায়গায় ধরে এনেছি। প্লিজ কান্না থামাও।” নিতু সাথে সাথে চোখমুখ মোছা শুরু করল। তারপর চুপচাপ দেখতে লাগল সামনের ফুলগুলোকে। অন্য ভাবনায় ব্যস্ক হতে চাইল, এই ফুলেরা কি প্রতিদিনই এমন করে ফোটে? নিতু কখনও পদ্ম দেখেনি আর একসাথে এতগুলো তো নয়ই। কোনোদিন লাল বা নীল শাপলাও দেখেনি। কেবল সাদাটা দেখেছিল, বাসার আশেপাশের ডোবায় যেগুলো ফুটে থাকে। নিতু ভাবছিল আর হাসছিল, নিজের মনেই বলে উঠল, “আমি আসলে কিছুই দেখিনি।” তপু বলল, “কী বললে, নিতু?” নিতু মুখ নিচু করে বলল, “কিছু না, তপু ভাই।” বাতাসে নিতুর খোলা চুল উড়ে উড়ে মুখের উপর আছড়ে পড়ছিল, হাত দিয়ে খোঁপা করতে চাইল। তপু বলল, “রাখো না, ভালো লাগে তোমাকে খোলা চুলে।” নিতুর হাত থেমে গেল, তপুর দিকে তাকিয়ে হাসল। দেখল তপু ভাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিতুর মনে হলো এভাবে কেউ কখনও তাকায়নি তার দিকে।

তারপর মাথা নিচু করে ঘাস খুঁটতে খুঁটতে তপু বলল, “নিতু, তুমি দেখতে একেবারে ঋতুর মতো, এটা কি তুমি জানো? শুধু ঋতুর চুল কোকড়া আর তোমারটা ঝরঝরে সোজা।” নিতু দেখল তপু ভাইয়ের মুখে সেই বিষণ্নতা আবার ভর করেছে। গত বছরদুয়েক ধরে নিতু তাকে যেমন দেখছিল। মাথা নেড়ে সে ’হ্যাঁ’ বলল আর মুখে বলল, “আপা তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে, তাই না তপু ভাই?” “হ্যাঁ, তা তো দিয়েছেই, কষ্ট কি আর চাইলেই সবাই দিতে পারে?” টিলার ওপারে সূর্য লাল হতে হতে ডুবে যাচ্ছিল।

পুরো জায়গাটা আরও থমথমে হয়ে গেল। ধীরে ধীরে কেমন যেন বিষাদে ডুবে গেল সবকিছু। ওরকম সুন্দর একটা পরিবেশ অথচ এত মন খারাপ করা! নিতু আগে কখনও জানত না যে ভয়ঙ্কর সুন্দর কিছু দেখলে কোনো যন্ত্রণা চেপে ধরতে পারে। আর ওই বেদনায় যে তার চিৎকার করে কাঁদতে সাধ হচ্ছিল, তা-ও নয়। কিন্তু যেন কারও সহানুভূতি পেতে ইচ্ছে করছিল… কার? হয়তো সে ছিল তপু ভাই। নিতুর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সেই মুহূর্তটিতে সে জানতে পেরেছিল, পৃথিবীর সব সৌন্দর্যই সৃষ্টি হয়েছে মানুষকে অসহায় করে ফেলার জন্য। সূর্যটার দিকে তাকিয়ে তপু ভাই বলল, “নিতু, চোখ সরিও না, দেখ এক্ষুণি উধাও হয়ে যাবে তোমার ওই পাহাড়ের নিচে।” নিতু সেদিকে তাকিয়েই ছিল। কদিন আগেও ছাদ থেকে এরকম ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকালে তার কাছে মনে হতো আকাশ জুড়ে বিশাল একটা ডিমপোচ। তখন আর কেন যেন কিছুতেই তেমন মনে হয়নি। চোখের সামনে পুরো জায়গাটা অন্যরকম হয়ে গেল। একই পদ্ম, বক, দীঘি, অথচ একবারে আলাদা ছবি তখন। যেমন নিতুদের বাসার সাদাকালো টেলিভিশনে দেখা একই বিজ্ঞাপন চাচিদের রঙিন টেলিভিশনে অন্যরকম লাগত, নিতু খেয়াল করেছে।

তখন অবাক হয়ে আবিষ্কার করল, এতদিন সে কেবল চোখ দিয়ে দেখত, সেদিন দেখছিল চেতনা দিয়ে, অনুভূতি দিয়ে। চোখ আর চেতনা একসাথে মিলে যে ছবি তৈরি করছিল তা হয়তো কখনও হারিয়ে যাবে না। কোনোদিন ভুলবে না সেদিনের সেই সন্ধ্যাটা। ধূসর আকাশে লাল বৃত্তটা হারিয়ে গেলেও নিতু সেদিকেই তাকিয়ে থাকল। স্তব্ধ হয়ে থাকা নিতুকে দেখে তপু বলল, “উঠবে না? রাত হয়ে যাবে বাসায় যেতে যেতে, অসুবিধা নেই তো?” “বাসার কথা তো আমার এতক্ষণ মনেই পড়েনি, তপু ভাই, চল চল, বাবা হয়তো এতক্ষণে বাসায় চলে এসেছেন।” গেটের সামনে এসে বাইকে ব্রেক করার সাথে সাথে বাসায় চাপা উত্তেজনা প্রথম লক্ষ করল নিতু। চাচা গেটের সামনে পায়চারি করছিলেন। পাড়ায় ইলেকট্রিসিটি ছিল না। অন্ধকারেও চাচার অস্থির চলাফেরায় ভয়াবহ কিছুর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।

ওরা নামতেই চাচা দৌঁড়ে এসে জানতে চাইল, “নিতু, ঋতুকে দেখেছ নাকি কোথাও?” “নাহ্ কেন কী হয়েছে?” “ঋতু এখনও বাসায় ফেরেনি।” “চলে আসবে চাচা, আপনি এত অস্থির হচ্ছেন কেন?” “কী জানি মা, তাকে নাকি এক বখাটে ছেলের সাথে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে চড়তে দেখা গেছে। তোমার বাবার অফিসের পিয়ন দেখেছে। এখন কী হবে মা? আমাদের মানসম্মান তো আর কিছুই রইল না। তুমি বরং তোমার মায়ের কাছে যাও।” নিতু বাসায় ঢোকার আগে তপুর দিকে একঝলক তাকাল। তার মুখটায় যেন ওই মুহূর্তে কেউ চাচার মুখের চেয়েও বেশি কালি লেপে দিয়েছে। মানসম্মান যা যাওয়ার, গেছে যেন তার। চাচা কোনো কথা না বলে লাফিয়ে মোটর বাইকের পেছনে উঠে বসল, পা জায়গামতো রাখতে রাখতে বলল, “তপু, চল তো ঋতু যেসব বাসায় যায়, একবার খুঁজে আসি। বাসস্ট্যান্ডেও না হয় যাই একবার।” ৪ লম্বা বারান্দার শেষ মাথায় শোয়ানো ইজি চেয়ারে বাবা বসে ছিলেন। অন্ধকারে স্থবির বাবাকে স্বর্গের গেটের পাহারাদার বলে মনে হলো নিতুর কাছে। মনে হচ্ছিল কিছুই দেখছে না বা ঝিমিয়ে পড়েছে কিন্তু স্বর্গের সীমায় পা দিলেই যেন খপ করে ধরে ফেলবে। নিতু যেই গুটি গুটি পায়ে তার পাশ দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল, বাবার হুঙ্কার শোনা গেল, “এই যে একজন এসেছে! আরেকজন কই? এত দেরি করে কোথা থেকে আসছ?” “আমি তো তপু ভাইয়ের সাথে একটু বাইরে গিয়েছিলাম, বাবা।” “কোন তপু? ঋতু কোথায়?” “তপু ভাই, বাবা। আমি বের হওয়ার আগেই আপা বেরিয়ে গেছে।” “বাহ্! ছেলেটা হাতের মুঠোর বাইরে চলে গেছে আর তোমরা দু’ বোন মিলে করছটা কী? তোমাদের মা কিছুই জানে না! তুমি তোমার মাকে না বলে বাইরে গিয়েছ কেন?” “মা তো তখন ঘুমাচ্ছিল বাবা, আমি চাচিকে-” “ঘুমাচ্ছিল তো কী হয়েছে? যাও উপরে যাও।”

বাবার শেষ ধমকটা সারা বাড়িতে গমগম করতে লাগল। সামনে দাঁড়ানো নিতুর কানে তালা লেগে গেল। জীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে ওঠার সময়ে নিতুর মনে হলো, বছরের পর বছর দুই-তিন প্রজন্মের ব্যবহারে ক্ষয়ে যাওয়া এই বাসার ভিতটা আজ সত্যিই নড়ে উঠল, তবে বাবার চিৎকারে নয়, আপার চলে যাওয়াতে। নিতু জানতই এমন কিছু একটা হবে। আপাকে আজ এই ছেলের সাথে কাল ওই ছেলের সাথে এখানেওখানে দেখা যেত, নিতুর বান্ধবীরাও বলত। ছোট শহর, সবাই সবাইকে চিনত। মা অনেক মানা করেও ঠেকাতে পারেনি আপাকে। বাবা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিসে কাটিয়ে এসবকিছুর বাইরে ছিল সহজেই। আপাকে নিয়ে নিতুর ভাবনা হতো ঠিকই কিস্তু আপা ওরকম কিছু একটা করলে পরিস্থিতিটা ঠিক কেমন হতে পারে তা নিয়ে তেমন কিছু ভেবে রাখেনি। মা মরার মতো বিছানায় শুয়ে ছিল, দরজার কড়ার শব্দে ধরফড় করে লাফ দিয়ে উঠে বলে, “ঋতু এলো?” তাকে দেখে মনে হলো হঠাৎ করেই তার বয়স বেড়ে গেছে। কপালে সবসময় টিপ থাকত, সেটা নেই, শাড়ি আলুথালু। মা বুকের কাছে শাড়ির পাড় সবসময় টানটান করে রাখত কিন্তু এখন সব অগোছালো। বিকেলের ঘুম থেকে উঠে চুলে চিরুনি পড়েনি, বোঝাই যাচ্ছিল। বিছানায় নিতু মায়ের পাশে বসল। মা মরা মরা গলায় জানতে চাইল, “নিতু, তোর কি মনে হয়- ঋতু আসবে না?” দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিতু দেখল সাড়ে সাতটা বাজে। মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে বলল, “আমি কী করে বলব মা, আরেকটু দেখি।” “সত্যি করে বল, তোকে কি কিছুই বলে যায়নি?” “সত্যি মা আমাকে কিছুই বলে যায়নি। জানলে আমি এত নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াই? অন্তত তোমাকে তো বলতাম!” মা হতভাগ্যের মতো কান্না শুরু করল। ওভাবে করে মাকে কখনও কাঁদতে দেখেনি নিতু, যেন বুকের গভীর থেকে চাপ চাপ বেদনা উঠে আসছিল। নিতু ঠিক জানত না, মায়ের অতটা ভেঙে পড়া কি আপার ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা ভেবে নাকি নিজেদের অপমানের কষ্টে? তখনও পাড়ায় কেউ জানেনি, কাল সবাই যখন জানবে- কী হতে পারে তখন! নিতু চুপ করে বসে ভাবার চেষ্টা করল। মাকে সান্ত¦না দিতে ইচ্ছে হলো না। নিতু জানত সান্ত¦না দিয়ে কেনো লাভ নেই। চাচি নিঃশব্দে ঘরে এলো, মায়ের ঘাড়ে হাত রাখল।

নিঃসন্তান চাচি কি ওই মুহূর্তে মায়ের আর্তনাদের মানে ধরতে পারছিলেন? নিতু সবসময় দেখত তাদের ভাইবোন তিনজনকে নিয়ে কোনো ঝামেলা হলে চাচি যদি আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে আসত তো মা বলত, “তোমার ছেলেমেয়ে নেই, খুব ভালো হয়েছে। থাকলে বুঝতে কী জ্বালা!” তখন চাচিও কিছু বলছিল না আর মা-ও কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিল না। তবে চাচির স্পর্শ পেয়ে মাথা ওঠাল মা, তার গায়ে হেলান দিয়ে নতুন করে ডুকরে কেঁদে উঠল। সেদিন বোধ হয় মায়ের মনে হয়েছিল যে চাচিও তার দুঃখ বোঝে। রাত নটার মধ্যে তপু ভাই চাচাকে নিয়ে ফিরল, ছোট শহরে রাতের ফাঁকা রাস্তায় এমাথাওমাথা ঘুরে চক্কর দিয়ে আসতে কতক্ষণ আর লাগে। তপু ভাই ঠোঁট উল্টে ইশারায় ঋতুকে খুঁজে না পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে দিলো আগেই। চাচা এমন মুখ নিয়ে মায়ের ঘরের দিকে গেলেন যেন আপাকে খুঁজে না পাওয়াটা তারই অক্ষমতা। নিতুর মা দৌঁড়ে গিয়ে চাচার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, “কী হলো? কোথায় গেছে ঋতু, জানতে পেরেছ?” “না, তবে ধারণা করছি রতন নামে একটা ছেলের সাথে সে ঢাকার বাসে চড়ে চলে গেছে।

তাকে শেষ দেখা গেছে বাসস্ট্যান্ডে রতনের সাথে। এর বেশি কিছু জানা যাচ্ছে না। রতনের মা বললেন রতন আজ ঢাকায় গেছে। ঢাকায় কোথায় গেছে তা অবশ্য জানে না আর ঋতুকেও চেনে না।” “রতন কে?” “ওই তো, ওই পাড়ায় থাকে।” নিতুর মা ধপ করে বিছানায় বসে পড়েন। মনে হয় আর কিছু জানার আগ্রহ নেই। তপু বলে, “চাচা, আমি তাহলে আসি।” “হ্যাঁ বাবা, তোমাকে অনেক কষ্ট দিলাম।” তপু ভাইয়ের ঘাড়ে হাত রাখেন চাচা। “না না, আমি কোনো খবর পেলে জানাব।” নিতু তপুর পেছনে পেছনে বারান্দায় আসে। বলে, “তপু ভাই তুমি রতনকে আগে থেকেই চিনতে, না?” “হ্যাঁ।” “আপা আর রতনের ব্যাপারেও জানতে?” “জানতাম।” “তারপরেও তুমি আপার জন্য অপেক্ষা করছিলে!” “করছিলাম। ভেবেছিলাম ঋতু একদিন বুঝবে আর আমার কাছে ফিরে আসবে।” “এখন কী হলো, আপা তো চলেই গেল!” “কেউ চলে যেতে চাইলে তো তাকে আটকানো যায় না। আমিও চলে যাব। ভালো থেক নিতু, যাই।” তপু ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল রিংকু গেট ঠেলে ঢুকছে।

তপুকে দেখে বিরক্ত হয়ে বলল, “কী ব্যাপার, তুই এত রাতে!” “কারও বোন হারিয়ে গেলে সে নিজে যদি খুঁজতে না যায় তখন অন্য মানুষকে আসতে হয়।” “বোন হারিয়ে গেলে মানে? অ্যাই নিতু, কী বলছে এ?” “ভাইয়া, আপা রতন নামে কার সাথে যেন ঢাকায় পালিয়ে গেছে।” “রতন! ওই হারামজাদাটার সাথে? আমার পলিটিকাল এনিমির সাথে ঋতু ভেগে গেল? আমি পার্টি অফিসে মিটিং করছি রাত দশটা পর্যন্ত। কেউ আমাকে বললও না যে শয়তানটা আমার বাড়ি থেকে বোনকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে!” “উঠিয়ে নিয়ে নয় ভাইয়া, আপা নিজের ইচ্ছেতেই গেছে তার সাথে।” “ইমপসিবল! আমাকে এক্ষুণই আবার পার্টি অফিসে একবার যেতে হবে। শালাকে খুঁজে বের করতে হবে।” ভাইয়া ঘুরে দাঁড়ায় দেখে তপু ভাই বলে, “যা, আবার যা, গিয়ে দেখ এতক্ষণে তুই নিজেই ওর শালা হয়ে গেছিস কি না।” রিংকুকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। তপু মোটর বাইকে স্টার্ট দিলে নিতু আর দাঁড়ায়নি। তাকিয়েও দেখেনি রিংকু তখনও হা করে তপু ভাইয়ের দিকে তাকিয়েই আছে নাকি চলে গেছে।

কী যায় আসে? ভাইয়া বাসায় ছিল না থাকার মতোই। কখন আসত কখন যেত কেউ বলতে পারত না। নিতুর বাবা তো তাকে সেই কবে বাসা থেকে চলে যেতে বলেছিলেন। কয়েক দিন রাগ করে এদিক সেদিক ঘুরে তারপর মায়ের কান্নাকাটির চোটে আবার ফিরে এলো। মায়ের তার একমাত্র ছেলেকে ছাড়া চলত না। মায়ের পক্ষপাতিত্বের জন্য বাবা বিরক্ত হতে হতে একেবারে চুপ হয়ে গেলেন। রিংকু বরাবর খুব ব্যস্ত, কী নিয়ে তা বোঝা যেত না। মাঝে মধ্যে চাচিদের ঘরে ফোন আসত ভাইয়ার জন্য, এপাশ থেকে শুধু শোনা যায়, “জি ভাই, হ্যাঁ ভাই, এখনই আসতেছি ভাই।” তারপর সে লাফ দিয়ে বেরিয়ে যেত। পার্টির দেয়া মোটর বাইক আর তার ওপরে বসা ভাইয়া, এক নিমেশে হাওয়া। মনে হতো কোনো ওস্তাদ তাকে আহ্বান করত, বাধ্য শিষ্যের মতো গায়ে শার্ট গলাতে গলাতে দিত দৌড়। বাসার কোনো কিছুর সাথে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। নিতু অবাক হয়ে লক্ষ করল আপার চলে যাওয়াতে মা-বাবা, চাচা যেমন বাসার মানসম্মান নিয়ে শঙ্কিত, ভাইয়া মোটেই তা নয়। সে তার পলিটিকাল এনিমির কাছে একরকম হেরে গেল এটাই ছিল তার জন্য বড় ব্যাপার। সে হয়তো সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে পার্টি অফিসে বসে রতনকে কোনো প্যাঁচে ফেলার মতলব আটছিল, আর তখনই কিনা রতন তার বোনকে নিয়ে বাসের টিকেট কাটছিল। এটা ভাইয়ার পলিটিকাল ক্যারিয়ারের জন্য বিষম ধাক্কা।

সে রাতে নিতুদের বাড়িতে কেউ কিছুই খায়নি। খাওয়ার কথাও কেউ বলেনি। যেন একটা মৃত কোনো লাশ পড়ে আছে বাসার কোথাও, একটা মৃতের বাড়িতে কী করে খাবারের আয়োজন হয়! অদৃশ্য লাশটাকে কিছুতেই পাশ কাটানো যাচ্ছিল না। নিতু যেদিকে তাকাল শুধু ঋতুকে দেখতে পাচ্ছিল, ঋতু হাসছে, নিতুকে ধমকাচ্ছে… নিচে বাবা বারান্দায় ইজি চেয়ারে অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। মা অজ্ঞানের মতো পড়ে ছিলেন, মাঝে একবার জ্ঞান ফিরে আসার মতো হলে বললেন, “ঋতু এলো? দেখ তো নিতু নিচে গিয়ে ঋতু এলো নাকি!” অন্ধকার আরও গাঢ় হলো। নিস্তব্ধতার মাঝখানে দূরে রাস্তার স্বাধীন কুকুরের ডাক শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। রাত বাড়লে বারান্দায় বাবাকে ডেকে নিতু বলল, “বাবা আপনাকে মশা কামড়াচ্ছে, ঘরে গিয়ে ঘুমান। কিছু খাবেন?” “আর কী খাব? এখানেই ঘুমাই, তুমি তোমার মায়ের কাছে যাও।”

অসহায় শোনাল বাবার গলা। পরপরই চোয়াল শক্ত হতে থাকে তার, কঠিন সংকল্প যেন তার মুখের শিরাগুলো ঘনঘন কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল, অসহায় কণ্ঠস্বরটি আকস্মিক ভারী হলো, “শোনো নিতু, আমার দুই ছেলেমেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এবার তোমাকে কিন্তু আমি কিছুতেই নষ্ট হতে দেব না।” “আমি তো কিছু করিনি, বাবা।” “করনি তাতে কী, করতে কতক্ষণ? আমি তোমাকে সে সুযোগ দেব না।” “বাবা, আপনি শান্ত হয়ে ঘরে গিয়ে ঘুমান।” নিতু জোর করে বাবাকে উঠিয়ে নিয়ে নিচের তলার একটা ঘরের দিকে নিয়ে গেল। বাবার এত কাছাকাছি অনেকদিন আসা হয়নি। তিনি ছেলেমেয়েদের সাথে সবসময় দূরত্ব রাখতেন, তাদেরকে দম দেয়া পুতুল মনে করতেন, যা বলা হবে ততটুকুই তারা করবে- এমনই ছিল তার ধারণা। কিন্তু সেরকম হয়নি। দুটো ছেলেমেয়েই সামান্য বড় হতে না হতেই তাঁর শত্রু হয়ে গেল।

নিজের আশেপাশে যে ভয়ের ইমেজ বাবা বানিয়ে রেখেছিলেন তা আসলে কবে ভেঙে গুড়িয়ে গেছে, বাবা নিজেই জানতেন না। ছেলেমেয়েগুলো ভয়ের কিংবদন্তী বাবাকে লুকিয়ে সবকিছু করতেই স্বস্তি পেত। বাবা যে কথায় কথায় বলতেন, ‘ব্যস, এটাই আমার শেষ কথা-’ বাবার সেই কথাকে অচল প্রমাণ করাই যেন রিংকু আর ঋতুর জেদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কারণ তারা বারবার তা করে দেখিয়েছে। বাবাকে শুইয়ে দিয়ে পাতলা চাদরে ঢেকে বেরিয়ে এলো নিতু। অন্য সময় রাতে ঘুরঘুটি অন্ধকারের মধ্যে বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে থাকতে হলে নিতু ভয় পেত। অথচ সেদিন ঘোর অমাবশ্যায় নিতুর ভয়ডর সব উবে গিয়েছিল। সেখানে তীব্র একাকিত্ব আর অনিশ্চয়তার ঝড় জায়গা করে নিলো। কেন যেন বারবার ভাবতে ইচ্ছে করছিল আপা কোথাও আটকে গেছে, কোনো ঝামেলায় পড়েছে, ফিরতে দেরি হচ্ছে, এমন কি একেবারেই হতে পারে না?

মনে পড়ল, আপা তো আরও একদিন বেশ রাত করে বাসায় ফিরেছিল। এসে বলেছিল রাস্তায় কী একটা মিছিলটিছিলের জন্য দেরি হয়ে গেছে। নিতুর মনে মনে নিজের ইচ্ছেগুলো আওড়াচ্ছিল, তেমন কি আজও হতে পারে না? আজ তেমন হয় না কেন? মিছিলের চেয়েও জটিল কিছু হোক, আপা এসে বলুক কেন দেরি হলো, কেউ কিচ্ছু বলবে না, সবাই খুশি হবে, নিতু জানত। কিছুদিন আগে আপা ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুলে বসে ভ্রু আঁকতে আঁকতে বলেছিল, “নিতু, আমার নতুন ফ্রেন্ড কাল কী বলে জানিস?” “কী?” “বলে, ঋতু তোমার মতো সুন্দরী মেয়েরা যদি শুধুমাত্র একজনের হয়, তাহলে চলে? এরকম অপ্সরীদের থাকা উচিৎ সকলের মনোরঞ্জনের জন্য হা হা হা…” “তোমার কোন ফ্রেন্ড বলেছে আপা?” “র- বাদ দে, তুই চিনবি না।” আপা ‘র’ বলেই থেমে গিয়েছিল। কেন? আপা কি তখনই জানত যে সে তার সাথে পালিয়ে যাবে? তাই রতনের নামটা জানাতে চায়নি! আপা এতদিন ধরে হিসাবনিকাশ করে তাদের সকলকে এই অশান্তি দিয়ে গেছে।

রাতের নিস্তব্ধতায় মায়ের ঘর থেকে চিৎকারের শব্দ নিতু স্পষ্ট শুনতে পেল। সিঁড়ি ভেঙে দৌঁড়ে যেতে তার বলতে গেলে কোনো সময় লাগত না। মা ঘুমের ঘোরে মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন আর কী সব বলছিলেন, নিতু তার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারল না। একবার শোনা যায় গেল, “ঋতু- আর সামনে যাস না, পানিতে পড়ে যাবি। সেদিন তোর মতো তিন বছরের একটা বাচ্চা ডুবে মরল, দেখিসনি? রিংকু কই? রিংকু- ছোট বোনটাকে একটু দেখে রাখবি না? কোথায় রিংকু?” নিতু ‘মা মা’ বলে তাকে ওঠাতে চাইল, শরীরটা আরও বেশি এলিয়ে পড়ল মেঝেতে। আবার গভীর ঘুম, নিতুর অসহায় লাগছিল, মাকে তো তার পক্ষে টেনে বিছানায় তোলা সম্ভব না। তাই তার মাথার নিচে বালিশ দিয়ে দিলে মেঝেতেই ঘুমিয়ে থাকেন তিনি। চাচি কি আজ ব্লাড প্রেশারের ওষুধ ভুলে ডাবল ডোজ দিয়েছিল মাকে? এভাবে অজ্ঞানের মতো ঘুমাচ্ছেন কেন? নিতু ভাবল চাচিকে ডাকবে। কিন্তু অত রাতে ডাকতে কেমন সঙ্কোচ হলো। ডাকবে কি ডাকবে না- ভাবতে ভাবতে মায়ের পাশে নিজেও শুয়ে পড়ল সে।

আধো তন্দ্রার মতো কিছুক্ষণ কাটল তারপর হঠাৎ পিছলে ওপর থেকে ধড়াম করে নিচের দিকে পড়ে যাওয়ার ওজনহীনতা! এক সেকেন্ডেরও কম কিন্তু অনুভূতিটা মাথা থেকে পায়ের বুড়ো আঙুল পর্যন্ত ঝাঁকিয়ে ঘুম ভাঙাল। চমকে উঠে দেখল ছাদ অনেক উঁচুতে, সে কোথায় পড়ে গেছে? পরমুহূর্তেই বুঝতে পারল সে মেঝেতে আর পাশে মা অঘোরে ঘুমিয়ে। কান্না পেল- ‘আপা’ বলে একটা চিৎকার করতে ইচ্ছে করল, রাগে না দুঃখে- নিতু জানে না। প্রথম যখন শুনেছিল তখন থেকেই আপার উপর অসম্ভব রাগ হচ্ছিল। তখন কেন যেন আস্তে আস্তে সেটা আর জমে থাকা গম্ভীর রাগ থাকছিল না, চোখ বেয়ে গলে গলে বেরিয়ে এলো। নিতু চোখ বন্ধ করে ফেলল। বন্ধ চোখের সামনে আপা বহাল তবিয়তে চলাফেরা করা শুরু করল। ওই মেঝে সেদিন সকালেও আপা মুছেছিল। নিতু মেঝের উপর আলতো করে হাত রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল।

আপার সেই শেষ ছোঁয়াটার উপর আঙুলগুলো বিস্তৃত করে মনে মনে বলল, “আপা, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ এটা নিয়ে ভাবার রুচি এই মুহূর্তে কারও নেই। তুমি বাড়ি ছাড়ার সাথে সাথেই সবার কাছে মরে গেছ। এখন জীবিত মানুষেরা শুধু তাদের মানসম্মান নিয়ে চিন্তিত। আমিও তাদেরই দলে, আপা।” কাঁদতে কাঁদতে নিতু ভোরের দিকে একসময় ঘুমিয়েও গেল। ভয়াবহ সকালটা নিষ্ঠুরের মতো এলো আবার একই সময়ে। মায়ের প্রলাপে নিতুর ঘুম ভাঙল, “তোর বাবার কোনো আক্কেল আছে? এতদিনের জন্য ঋতুকে ফুপুর বাড়িতে রেখে এলো! মাকে ছাড়া একা একা এত ছোট বাচ্চা কতদিন থাকতে পারে? রিংকু তোর বাবার সাথে গিয়ে ঋতুকে নিয়ে আয়- যা না বাবা।” নিতু চমকে উঠে মায়ের গায়ে হাত দিয়ে দেখল জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর। স্কুলে না গিয়ে নিতু বসে বসে জলপট্টি দিলো মায়ের কপালে। এমনিতেও ওই অবস্থায় সে স্কুলে যেতে চায়নি। সবাই কত প্রশ্ন করবে! কী জবাব দেবে সে? হয়তো অসহায়ের মতো কেঁদেও ফেলতে পারে। রাস্তায় বের হলে সবাই নিশ্চয়ই তার দিকে ভুত দেখার মতো তাকিয়ে থাকবে। মনে মনে হাসবে। কেউ বলেও ফেলতে পারে, “আরে ওই যে ওর বোন, সেদিন যে রতনের সাথে পালিয়ে গেল।”

“তারপর কী হলো?” “কী আর হবে, কদিন ঘুরেফিরে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে আসবে। এসব মেয়েদের কী আর সংসার হয়?” “আর যদি না আসে!” “তাহলে বুঝবে যে রতন একেবারে গায়েব করে ফেলেছে, কোথায় পাচার করবে কেউ বলতে পারবে না।” “ইস্,মেয়েটা খারাপ হয়ে গেল।” “মানুষ করতে পারেনি ছেলেমেয়েগুলোকে, বুঝলে? ভালো করে মানুষ করলে তো আর এমন হয় না।” দুটো অচেনা কন্ঠস্বর ঋতুর মাথার ভেতর কথোপকথন চালাচ্ছিল, মাথা তখন পুরো তাদের দখলে। তাচ্ছ্বিল্যভরা গায়েবি আওয়াজগুলো থেকে চাইলেও ছাড়া পাওয়া গেল না । কখনও কখনও শব্দের সাথে আকৃতিও যোগ হচ্ছিল। রসের সন্ধান পাওয়া চোখে, বিকৃত আর ভেংচি কাটা মুখগুলো কথা চালিয়ে গেল বহুক্ষণ। মা জ্বরের ঘোরে দিনের পর দিন পড়ে থাকলেও বাবার চেঁচামেচি অস্বাভাবিকরকম বেড়ে গেল। রান্নাটা বেশিরভাগ চাচিই দেখত। নিতু মায়ের কাছে বসে থাকত, বাসা থেকে বের হতো না। ভাইয়া মেহমানের মতো আসত-যেত, মাঝে মাঝে মায়ের বিছানায় বসে ইনিয়ে বিনিয়ে আপার জন্য খুব দুঃখ করত। সে সময় ওর মুখটা নরম হয়ে যেত। আবার একটু পরেই হিং¯্র চোখ ভেসে উঠত, রতনকে পেলে নাকি কুচিকুচি করে কেটে ফেলবে, এটাই ওর প্রতিজ্ঞা। পারিবারিক না রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা, তা বোঝা যেত না। এমনিতে তার দিনকালও ভালো যাচ্ছিল না। ঢাকা ইউনিভার্সিটি আর চারুকলার ছেলেরা প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য জোর আন্দোলন শুরু করেছে তখন। তারা বলছিল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় আসার পদ্ধতিটি সঠিক নয়। আর প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করতে গিয়ে নাকি তিনি দুর্নীতি বিকেন্দ্রীকরণ করেছেন। প্রশাসনের একেবার উঁচু থেকে নিচু পর্যায়ে একইরকমের ঘুষ আদানপ্রদান চলছিল। শুরুতেই সারা দেশের ছাত্র-শিক্ষকরা আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেছিলেন।

দেশের সব ইউনিভার্সিটি থেকে প্রতিনিয়ত আন্দোলন দানা বাঁধার নতুন নতুন খবর পাওয়া যাচ্ছিল। এসব খবরের প্রভাবে শহরের অন্যান্য পার্টির ছেলেরা কদিন হলো বেশ দুঃসাহস দেখাচ্ছিল। তাদের আবার ভয় দেখিয়ে ঠা-া করতে হবে, দরকার হলে দু-একটা লাশও পড়তে পারে। রতন ফিরে এলে তার লাশটাই আগে পড়ত, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এতবড় ঢাকা শহরে ঋতুকে নিয়ে কোথায় সে ঘাপটি মেরে ছিল- ভাইয়া দিনের পর দিন খোঁজ লাগিয়েও কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। রিংকু সব মিলিয়ে অসম্ভব দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিল। কিন্তু ভয় পেলে তো চলবে না! তারা হলো গিয়ে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন। কার এত সাহস আছে তাদের গায়ে হাত দেবে? জ্বর ভালো হলেও নিতুর মা আর বিছানা ছাড়তে পারেননি, শরীরে কোনো না কোনো একটা ঝামেলা লেগেই ছিল। মেয়ের চিন্তায় শুয়ে শুয়ে তিনি অকুলপাথারে ভাসতেন দিনভর।

দুপুরবেলা নিতু বিরস মুখ নিয়ে মায়ের পাশে বসে একটা বই পড়ছিল। চাচি হঠাৎ দৌঁড়ে এসে আস্তে করে দরজা ভিড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “নিতু, খবর আছে।” “কী হয়েছে?” “ঋতু ফোন করেছিল।” “আপা? কখন? কী বলল?” “আস্তে বলো- ঋতু রতনকে বিয়ে করেছে। রতনের মামার বাসায় লুকিয়ে আছে, ভালো আছে। বারবার করে বলল আমরা যেন দুশ্চিন্তা না করি। সময়মতো চলে আসবে।” নিতু চাচিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। চাচি মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “মন খারাপ কর না মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।” নিতুর মা ধড়পড় করে উঠে বসলেন, “তোমরা কী ‘ঋতু ঋতু’ বলাবলি করছিলে?” ৫ এই প্রথম রিংকুর পলিটিকাল ক্যারিয়ার পরিবারের কাজে এলো। রাস্তায় কি এখানে-ওখানে কেউ তাদের ঋতুর ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করল না। নিতু যেরকম ভয় পেয়েছিল তার কিছুই হলো না। মা ভালো হয়ে যাওয়ার পর সে স্কুলে যাওয়া শুরু করল। ঘনিষ্ট বান্ধবীরা তাকে টেনে স্কুল বিল্ডিং-এর পেছনের বাগানে নিয়ে গিয়ে বলল, “কী হয়েছে, ঘটনা কী বল তো!”

দু’একজন যারা দুনিয়ার ভাও নিতুর আগেই বুঝে গেছে তারা বলল, ঋতু আপা তো গেছেই নিতু, তার আর কী! ঝামেলা যা হবে, তোকেই পোহাতে হবে, দেখিস।” নিতু তেমন কিছু বুঝল না। সে কেবল মানুষের খারাপ কথা বলা নিয়ে আশঙ্কায় ছিল কিন্তু ভাইয়ার কল্যাণে তেমন কিছু হয়নি। বাড়ি বয়ে এসে একটা কথা বলার সাহস কারও ছিল না। নিতু জানত না যে ভাইয়াকে সত্যি সবাই এত ভয় পায়। ভাইয়া একদিন বলেছিল যে সবাই ভয় পেলে অনেক মজা লাগে। শুনে নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল নিতুর কাছে। কিন্তু এই প্রথম সুফলটা ভোগ করল। এছাড়া পরে তাদের কী সমস্যা হতে পারে সেটা তার কাছে পরিষ্কার হয়নি। ঋতু চলে যাওয়ার পর থেকে, সে ঘরের যে কাজগুলো করত, সব নিতুকে করতে হতো। বাসার প্রতিটা ঘর পরিষ্কার করা, ওপর নিচের লম্বা বারান্দা ঝেড়ে মুছে সাফ করা তখন নিতুর দায়িত্ব।

কিন্তু রিংকুর ঘরে খুব কম যেত। ভাইয়া পছন্দ করত না। বেশ কয়েকদিন পরে একবার গিয়ে নিতু আবর্জনার স্তুপ হয়ে থাকা ঘরটি একটু গুছিয়ে দিয়ে আসত। ভাইয়া নিতুকে ঘরে দেখলেই হয়তো ধমকে বলবে, “আমার জিনিসপত্রে হাত দিবি না, নিতু।” তাই সেদিকে না যাওয়াই তার জন্য ভালো ছিল। এখন কোনো উপায় নেই তাই যেতে হচ্ছে। ভাইয়ার ঘরটি বাসার অন্য সব ঘর থেকে ছিল আলাদা, দামি দামি জিনিসপত্রে ঠাসা। বাসার অন্য সব ঘরে সেই আদ্যিকালের ফার্নিচার, রঙ ওঠা আর নড়বড়ে। জানালার পর্দাগুলোর অনেক জায়গায় ধুতে ধুতে লম্বালম্বি ফেঁসে গেছে। বাতাসে পর্দা নড়ে গেলে নিতু আবার কুচির মধ্যে ফেঁসে যাওয়া জায়গাটা লুকিয়ে রাখত। মা অনেক সময় মাসের শুরুতে পর্দা বদলানোর, কী একটা নতুন ডাইনিং টেবিল কেনার পরিকল্পনার কথা বলতেন। কিন্তু নিতু জানত, মাস শেষ হতে হতেই সেই স্বপ্নটা প্রতিবারের মতো হারিয়ে যাবে। তবু কথাটা বলার সময়ে মাকে কিছুই বলত না। অনাগত সুখের আনন্দে মায়ের উদ্ভাসিত মুখটা দেখতে ভালো লাগত। অনেক চেষ্টা করেও মা সংসারের কিছুই আর বদলাতে পারেনি। অথচ ভাইয়ার ঘরটা নিতুর চোখের সামনে একেবারে বদলে গেল।

বাবা বরাবরই আপত্তি করেছেন তাই ভাইয়া চাইলেও তাদের পুরো বাসাটাকে বদলে ফেলতে পারেনি। একদিন একটা চব্বিশ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন এনে ভাইয়া বসার ঘরে লাগিয়ে রেখেছিল, একটা কুরুক্ষেত্র হয়ে গেল নিতুদের বাসায় সেদিন। ভাইয়া ভেবেছিল বাবাকে খুব অবাক করে দেবে। সেদিন ভাইয়ার বদৌলতে বসার ঘরের যেখানে ছোট সাদাকালো টেলিভিশন মুখ গোমড়া করে পড়ে থাকত, সেখানে রঙিন টেলিভিশনটি মাথা উঁচু করে হাসতে লাগল। দুপুর বেলা চ্যানেল খুলত না, তাই নতুন টিভিতে ছবি কেমন দেখা যায় কাউকে দেখাতে পারছিল না ভাইয়া। শেষে আবার দৌঁড়ে গিয়ে যেন কার কাছ থেকে একটা ভিসিআর আনল। বাবার ঘর থেকে টেবিল ফ্যানটা এনে ভিসিআরের দিকে তাক করে চালিয়ে দিলো। বড়সড় একটা ক্যাসেট তার মধ্যে ঢোকাতেই সিনেমা শুরু হল। সিলসিলা। ভাইয়া সিনেমার প্রশংসা শুরু করল, “রেখা আর অমিতাভের অ্যাক্টিং দেখলে বুঝবি অ্যাক্টিং কাকে বলে!” আপার দিকে তাকিয়ে বলল, “আর এই সিনেমা করতে গিয়ে ওদের প্রেম হয়ে গেছে.. হা হা হা…।” নিতুকে বলল, “যা চাচিকে ডেকে নিয়ে আয়।” এমন গর্ব নিয়ে আদেশ করল যেন বোঝাতে চায়, “রাজার ঘরে যে ধন আছে, টোনার ঘরেও সে ধন আছে।” চাচি দেখে খুব খুশি যিনি জন্মেছেন হিংসা ব্যাপারটা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে। চাচিও তাদের সাথে সিনেমা দেখতে বসে গেলেন। সবাইকে আনন্দ দিতে পেরে সবচেয়ে বেশি খুশি ভাইয়া, খবর দেখার সময়ে বাবা যে চেয়ারে বসতেন, সেটাতে পা উঁচু করে বসে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। মা তো আনন্দে আত্মহারা! বাবার পক্ষে কখনও যে জিনিস কিনে আনা সম্ভব হয়নি, তিনি জানেন, ছেলে তা এনেছে, এ তো খুবই আনন্দের ব্যাপার।

নেদারল্যান্ডসের রঙধনু রঙের পপি ক্ষেতে মুগ্ধ নিতু যখন পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিল ঠিক তখন বাবা ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। আরামে এলিয়ে বসা থেকে নড়েচড়ে উঠতে না উঠতেই রাগে পাগল হয়ে যাওয়া গলা সবাই শুনতে পেল, “এই টেলিভিশন কার? কে এনেছে?” “আমার, আমি এনেছি,” ভাইয়া আস্তে আস্তে বলল। “আমার টেলিভিশন কই?” “দোকানে দিয়ে এসেছি বিক্রি করার জন্য। কে আর কিনবে আজকাল ওই পুরোনো টিভি, তবু দিয়ে এলাম, যদি বিক্রি হয়। এটাতে আরও ভালো দেখা যায়, দেখেন-” “তুই এখনই তোর অসৎ টাকা দিয়ে কেনা এই জিনিস নিয়ে আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা। আর আমার টিভি এনে যেখানে যেভাবে ছিল ঠিক সেরকম করে রেখে দে। যা এখনই।” “টাকার আবার সৎ-অসৎ কী বাবা? একটা ভালো জিনিস আমাদের বাসায় থাকুক, আপনি চান না? আমরা একটু ভালো থাকি, আপনি চান না কেনো বাবা?” “নেতাদের চামচামি, সাধারণ মানুষ আর অন্য দলের ছেলেদের ঠ্যাঙানোর বিনিময়ে তুই যে টাকা পাস, সেটাই অসৎ টাকা।

আর আমার মতো কেরানির ঘরে এই জিনিস মানায় না। এটা নিয়ে এখনই বের হ। আমার বাসার পরিবেশ নষ্ট করবি না, চলে যা।” “আপনার জন্য আমরা কি আমাদের জীবনে নতুন কোনো কিছু করতেও পারব না বাবা? এই ঘুণে ধরা বাসায় এভাবেই বেঁচে থাকতে হবে আমাদের? এত সুন্দর টিভি এখন আমি কোথায় ফেলে দেব বলেন তো!” “তার আমি কী জানি, তুই এখনই আমার টিভি এনে দে।” নিতু আর তার চাচি আড়াল থেকে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে শুনছিল। তাদের গলাবাজির মাঝখানে নিতুর মা এসে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “তুমি কি আমার ছেলেটাকে শখ করে একটা জিনিসও আনতে দেবে না বাসায়? তোমার ভয়ে সে তার মটর সাইকেল বাইরে রাখে। এখন টিভি তো আর বাইরে রাখার জিনিস না, এটা অন্তত ঘরে রাখতে দাও।” “আমি তোমার ছেলেকে এই বাসায় থাকতে দিয়েছি শুধু তোমার কথায়। তারপর ওর আর কিছু রাখা আমার পক্ষে সম্ভব না। তুমিই তার নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। তোমার প্রশ্রয়েই সে এত সাহস পায়। আমি মরে গেলে বাসাটাকে যা খুশি সে করতে পারে। তার চাচারও কোনো ছেলেপুলে নেই, সুতরাং পুরো বাসাটাকেই সে সাঙ্গপাঙ্গদের জন্য উৎসর্গ করতে পারে। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে নয়।”

মায়ের জেদ রক্ষা হবে ভেবে রিংকু তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু মা যখন চোখ মুছে বললেন, “অ্যাই যা, তার-টার যা আছে সব খুলে নিয়ে যা। আর তোর বাবার মূল্যবান টিভিটা এনে দে,” তারপর আর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা গেল না, আস্তে আস্তে সে তারগুলো খোলা শুরু করল। ঋতু পেছন থেকে এসে ফিসফিসিয়ে বলছিল, “ভাইয়া তোমার ঘরে নিয়ে গিয়ে রাখ না, বাবা জানতে পারবেন না।” সেটাই করেছিল রিংকু। ঋতু না বললেও তা-ই করত। একসময় পুরো বাসাটা প্লাস্টার আর রঙ করাতে চেয়েছিল সে। জায়গায় জায়গায় প্লাস্টার খসে, মেঝে উপড়ে এমন ভয়ালদর্শন হয়েছে যে তার বন্ধুবান্ধব আর পার্টির লোকজনকে বাসায় ডাকতে পারত না। বাবা বলেছেন তাঁর নিজের যখন সামর্থ হবে, তিনি করাবেন, রিংকু যেন তার বাড়ির দেয়ালে হাত না দেয়। এদিকে চাচাদের অংশটা ঠিকই প্রতিবছর বর্ষা চলে গেলে নতুন রঙে রঙিন হয়ে টান টান চামড়ার তরুণীর মতো তাদের বুড়ো বাসার পাশে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভেংচি কাটত, রিংকুর ভালো লাগত না। বলতে বলতে হতাশ হয়ে সে তার নিজের ঘরে প্লাস্টার আর রঙ করিয়ে নিয়েছিল।

বাবা জানতে পারেননি। দোতলার শেষ মাথায় যেখানে রিংকুর ঘর, সেদিকে বাবা সাধারণত যেতেন না। তার অজান্তেই ধীরে ধীরে রিংকুর ঘরের ফার্নিচার বদলে গিয়েছিল, পর্দা বদলেছিল, ছোট আর গোল একটা কার্পেট খাটের সামনে মেঝের খুঁতগুলো ফুল লতাপাতার আড়ালে ঢেকে দিয়েছিল। জরাজীর্ণ বসার ঘরের বদলে সেদিন রিংকুর ঘরেই বড় টেলিভিশনটা তাই আরও বেশি মানিয়েছিল সত্যি। বাবার উপরে রাগ করে টেনে টেনে তারগুলো খুলে রিংকু টিভিটা ভিসিআর থেকে আলাদা করে নিয়ে যখন বেরিয়ে যায়, ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে গরগর করে মাকে বলেছিল, “চার ঘন্টার জন্য ভিসিআর আর এই ক্যাসেটটা ভাড়া করে এনেছিলাম, বাবার জন্য ভাড়াটাও নষ্ট হয়ে গেল! এমন সুন্দর সিনেমাটা দেখতে পারলে না তোমরা।” মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল, “মন খারাপ করিস না বাবা, পরে দেখব, তুই যখন নিজে ভিসিআর কিনবি তখন আবার এই ক্যাসেটটা আনিস।”

পরে সে একটা ভিসিপি কিনে এনেছিল। ঋতু আর মা দুপুরে মাঝে মধ্যে সেখানে বসে সিনেমা দেখত। নিতু হিন্দি বুঝত না, কোনো আকর্ষণও বোধ করত না। হয়তো মায়ের কথাতেই, সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই ভাইয়া ভিসিপিটা কিনে এনেছিল। এজন্য নিশ্চয়ই তাকে পার্টির বেশি রিস্কি কোনো কাজ করতে হয়েছিল। কী তা অবশ্য নিতুরা জানতে পারেনি। নিতু তার বাবার মনোভাব জানত, তাঁকে ভয় পেত। তাই মা-বোনের সাথে ভাইয়ার তৈরি মহলে ঢুকতে অস্বস্তি হতো তার। মনে আছে প্রথম যখন পার্টির কাজ করে বেশ ভালো টাকা সে পেয়েছিল তখন নিতুকে নিয়ে গিয়ে একটা জামা কিনে দিয়েছিল, ঋতু আর তার মায়ের জন্য শাড়ি কিনেছিল। বাবার জন্য কিনতে সাহস পায়নি। একদিন অফিস থেকে ফিরে বাবা নিতুর গায়ে সেই জামা দেখে সামান্য হেসে বলেছিল, “বাহ্! চাচি কিনে দিয়েছে বুঝি? পছন্দ কার, তোর না চাচির?” “বাবা, চাচি না, ভাইয়া কিনে দিয়েছে, ভাইয়ার পছন্দ।”

“ভাইয়া কিনে দিয়েছে, সে টাকা পেল কোথায়, টিউশনি করছে নাকি আজকাল?” “আমি জানি না, বাবা।” নিতু মিথ্যে কথা বলেছিল বাবার ভয়ে। কে জানে বাবা চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলেন কি না। আর বাবা তো একদিন না একদিন জানবেনই ভাইয়ার রাজনীতিতে জড়ানোর কথা। মাঝখান থেকে এই এক জামার জন্য নিতুর উপর দিয়ে ঝড়ের প্রথম ঝাপটাটা বয়ে যাক সেটা সে কিছুতেই চায়নি। পরে বাবা বাইরে থেকে জানতে পেরেছিলেন। সেই জেনে ফেলাটাও হয়েছিল খুব অদ্ভুতভাবে। নিতুর বাবা যে পত্রিকা অফিসে কাজ করতেন, সেই ‘দৈনিক তিস্তা’ অফিসে একদিন খুব ভাঙচুর হলো। তিন দিন আগে সরকারি কোনো একটা কাজের তুমুল সমালোচনা করে রিপোর্ট ছাপানো হয়েছিল। সরকারের আদেশে সেই পত্রিকা বন্ধ করার কথা ছিল, কী কারণে দেরি হচ্ছিল বোঝা যায়নি। নিতুদের এলাকার বহুবছরের পুরোনো আর জনপ্রিয় কাগজটির বিক্রি ওই রিপোর্ট ছাপানোর পর আরও বেড়ে গেল। রিপোর্টের ফলো আপ পড়ার জন্য মানুষ এমনভাবে কেনা শুরু করল যে পরে দ্বিতীয়বার ’নগর সংস্করণ’ ছাপতে হতো। সরকার কিছুই করছে না অথবা করতে অনেক সময় লাগবে ভেবে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন এক বিকেলে সেখানে হামলা করল। রিংকুকেও যেতে হয়েছিল, হয়তো না গিয়ে কোনো উপায় ছিল না। বাবার সাথে দেখা হয়ে যাবে ভেবে হয়তো অফিসের ভেতরে সে ঢোকেনি, বাইরে পাহারায় ছিল।

একটু দূরে তাদের সমর্থনে পুলিশও ব্যারিকেড বানিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন এই ভাঙচুরের সময় অন্য কোনো দলের মানুষ গিয়ে বাগড়া দিতে না পারে। অফিস পুরো তছনছ করে ফেললে ভেতর থেকে পত্রিকা অফিসের মানুষেরা প্রাণভয়ে এদিকওদিক ছুটে যাচ্ছিল। হুড়োহুড়ি আর ঢিল ছোঁড়াছুঁড়িতে ভাঙা কাচ লেগে নিতুর বাবার হাত কেটে গেল। রক্ত বন্ধ করার জন্য আরেক হাত দিয়ে চেপে ধরে, দৌঁড়ে আরও অনেকের সাথে অফিসের পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে এলেন। সেখানে ইয়া বড় এক হকিস্টিক হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে রিংকু, চোখেমুখে উন্মাদনা, বাবাকে দেখেও চিনতে পারছে বলে মনে হলো না। তিনি হাতের ব্যথা, আত্মরক্ষার প্রয়োজন সবকিছু ভুলে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। ভুত দেখার মতো চমকে জানতে চাইলেন, “এই রিংকু, তুই এখানে কী করছিস?” “বাবা আপনি দৌঁড়ে যান, এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন না, যান।” “তুই আগে বল, তুই এখানে এসেছিস কেন? তুই কি ওই ছেলেগুলোর দলের যারা আমার অফিস ভাঙছে?” “আপনি যান, এখানে দাঁড়ানো নিরাপদ নয়, সবাই চলে গেছে।” “তুই আমার কথার জবাব দে আগে-” “আমার সাথে এভাবে চেঁচিয়ে কথা বলবেন না, এটা রাস্তা, আপনার বাসা নয়।” “রাস্তা বলে কি তুই যা খুশি তাই করে বেড়াবি?” নিতুর বাবা কোনো জবাব না নিয়েই সেদিন বাসায় চলে এসেছিলেন। রিংকু আর কোনো কথা না বলে পত্রিকা অফিসের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

তিনি কিছুক্ষণ বিস্মিত চোখে রিংকুর চলে যাওয়ার পথটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হকিস্টিকের চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করেছিলেন, কী রঙ ছিল সেটা? মনে পড়েনি, ভাবছিলেন, তখন যদি তিনি আবার অফিসে ঢুকে গিয়ে ছেলের দলকে ভাঙচুর করতে বাঁধা দেন, তাহলে কি রিংকু ওই হকিস্টিক দিয়ে তার মাথায় একটা বাড়ি দেবে? অফিসে ধীরে ধীরে গিয়ে ঢুকতে ইচ্ছে করেছিল। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন চারতলা বিল্ডিং-এর সমস্ত জানালার কাচ টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে চারদিকে। ভেতরে আর তেমন শোরগোল শোনা যাচ্ছিল না, বোধ হয় ভাঙার মতো আর কিছু ছিল না। ভেতরে যাবেন ভেবে ঘুরে দাঁড়াতেই হঠাৎ বিল্ডিং থেকে জুনিয়র সাংবাদিক আনিস দৌঁড়ে এলো,“শফিক ভাই, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আসেন আসেন। আমি গার্ডের বাথরুমে লুকিয়ে ছিলাম, এখন ফাঁক পেয়ে বেরিয়ে এলাম,” হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, “ইস্, এ তো দেখি অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে, আসেন তো-” জুনিয়র সাংবাদিক আনিসের কথায় হাতের আঘাতের কথা মনে পড়েছিল তার। তার আগে ব্যথাটা একটুও টের পাননি। কতক্ষণ সেখানে ওইভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাও মনে করতে পারছিলেন না। আশেপাশে তখন আনিস ছাড়া কেউ ছিল না। পুরো রাস্তা যতদূর দেখা যায় জনমানবহীন। মনে হচ্ছিল শহরে কারফিউ হয়েছে। বাসায় ফিরেছিলেন রাত করে, সরকারী হাসপাতাল থেকে হাতে চারটা সেলাই আর ব্যান্ডেজ নিয়ে। আনিস সাহেব হাসপাতাল হয়ে নিতুদের বাসায় তাকে পৌঁছে দেন। যাওয়ার সময়ে ঋতুকে বললেন, “ঠিক বুঝতে পারছি না, শরীরে আর কোথাও কোনো আঘাত লাগেনি কিন্তু কেমন যেন মুষড়ে পড়েছেন। শুধু হাতের এটুকু আঘাতে তো এমন হওয়ার কথা নয়।” ঋতুকে চুপ করে থাকতে দেখে বেরিয়ে যেতে যেতে আবার বললেন, “নিজের এত বছরের অফিস চোখের সামনে ভাঙচুর হতে দেখে হয়ত মনে আঘাত পেয়েছেন। ঠিক হয়ে যাবে। আমি এসে খবর নেব। পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাবে আপাতত। অফিস তো এমনিতেই কিছুদিন বন্ধ থাকবে।

বাসায় রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।” সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত নিতুর বাবা ঘুমাতে পারছিলেন না। ঋতু বারবার জানতে চাচ্ছিল, “ব্যথা করছে বাবা?” বাবা কোনো উত্তর দেননি। রাত বারোটার দিকে বাবা নিতুকে ডেকে বলেছিলেন, “তোর চাচাকে ডাক। চাচা ঘুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে উঠে এলে, সবাইকে স্তম্ভিত করে বাবা তার হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন। একটাই কথা বারবার বলছিলেন, “ভাই রে আমি হেরে গেছি, আমি হেরে গেছি রে ভাই!” প্রথম প্রথম কয়েকদিন নিতুর বাবা ঝিম মেরে বারান্দায় বসে থাকতেন, কারো সাথে কথা বলতেন না। একটা প্রশ্ন বেশ কয়েকবার করলে তারপর উত্তর দিতেন। তার কিছুদিন পরে পত্রিকা অফিস আবার খুলে গেলে তার মনের জোর ফিরে আসে। তিনি আবার স্বমূর্তি ধারণ করেন। বাসায় সারাক্ষণ চেঁচামেচি চলতে থাকে। তখন একবার তপু বাসার সামনে এসে দাঁড়ালে বাবা ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “এই এদিকে আসো, তুমিও কি রিংকুর সাথে আছ নাকি?” “রিংকুর সাথে কোথায় চাচা?” “আরে বাবা, তুমিও কি ওই নেতাটেতা নাকি?” “না চাচা, আমি ওসবের মধ্যে নেই।” “তোমার বাবা তো তাহলে ভাগ্যবান!” নিজের ভাগ্যকে বসে বসে দোষারোপ করা ছাড়া নিতুর বাবার আর কিছুই করার ছিল না। কারণ রিংকু তখন পুরোপুরি তার মুঠোর ভেতর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। ৬ একবার ছুটির দিনে বেলা বাড়লেও ঋতু বিছানায় গড়াগড়ি করছিল। নিতুকে ডেকে বলেছিল ভাইয়ার ঘরটা গুছিয়ে আসতে। নিতু গিয়ে দেখে ভাইয়া বাথরুমে, শাওয়ারের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বিছানা ঠিক করার জন্য যেই বালিশ হাতে উঠিয়েছে, দেখে তার নিচে নিঃশব্দে শুয়ে আছে রিভলভার। কালো কুচকুচে আর বরফের মতো ঠান্ডা। হাতে নিয়ে ভাবছিল নিতু, এই ঠান্ডা জিনিসটা থেকে এত গরম ধোঁয়া ওঠা গুলি বেরিয়ে যায়! ভাইয়া কি কাউকে তার উত্তপ্ত গুলির স্বাদ পাইয়ে দিয়েছে এর মধ্যেই? রিভলভারের উপরে হাত রেখে নিতুর শরীরটাও সেটার মতোই শীতল হয়ে যাচ্ছিল। কত রকমের ভাবনা আসছিল মনে।

ভাইয়া কি সন্ত্রাসী? আজকাল পত্রপত্রিকায় যাদের বলা হয় পলিটিকাল ক্যাডার, ভাইয়া কি সেই রকমের একজন মানুষ? যাদের ভয়ে পুরো বাংলাদেশের মানুষ সন্ত্রস্ত হয়ে আছে, যাদের স্বার্থে আঘাত করলে মানুষের জীবনের শেষ দিনটা চলে আসে, ভাইয়া কি সেরকম একজন? ভাইয়া এখন সমাজের জন্য বিপজ্জনক! তার আপন ভাই, দুষ্টামি করে এই তো কদিন আগেও স্কুলে যাবার আগে চুলের বেণি টেনে খুলে দেরি করিয়ে দিত, রাস্তায় হেঁটে আসতে দেখলে ডেকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে উঠিয়ে নিত। সেই ভাইয়া এখন আশেপাশের যে কোনো মানুষের জন্য ভয়ানক। নিতুর হাত আর চলছিল না, শাওয়ারের শব্দ হঠাৎ থেমে গেলে নিতু তাড়াতাড়ি চাদরটা ঠিক করে বেরিয়ে আসতে থাকে। রিংকু কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখে নিতু থতমত খেয়ে চলে যাচ্ছে। তার একটু পরেই রান্নাঘরে বসে মায়ের আদরের ছেলে রুটি ছিঁড়ে খাচ্ছিল আর মায়ের সাথে হাসছিল, গল্প করছিল। রান্নাঘরের আরেক দিকে বসে নিতুর শরীর থেকে ঘাম ছুটতে থাকে। দৌঁড়ে গিয়ে ভাইয়ার বালিশের নিচে দেখে রিভলভার নেই। আবার ফিরে এসে তার পকেটের দিকে বারবার চোরা চোখে তাকাচ্ছিল সে। রিংকু অনেকক্ষণ ধরে নিতুকে খেয়াল করছিল। বাসা থেকে বেরিয়ে যাবার সময় পকেট থেকে রিভলভারটা নিয়ে নিতুকে বলে, “এই বোকা, তুই এটা খুঁজছিলি?” নিতুর মুখ সাদা হয়ে যায়।

কোনো কথা খুঁজে পায় না সে, কেবল ফ্যালফ্যাল করে কালো জিনিসটার দিকে তাকিয়ে থাকে। রিংকু বলে, “শোন, এটা থাকা মানেই কি আমি মানুষ খুন করে বেড়াচ্ছি? আমাকে যদি কেউ অ্যাটাক করে তো সেটা ঠেকাতে হবে না? সেজন্যই তো পার্টি আমাকে এটা দিয়েছে, এতে এত ভয় পাওয়ার কী হলো!” নিতু কোনো উত্তর দেয়নি। সেদিন থেকে ভাইয়া তার কাছে অনেক দূরের অচেনা একটা মানুষ। যতই চেষ্টা করুক, কোনোদিন সে আর ভাইয়ার কাছে যেতে পারবে না, সেদিন থেকে নিতু সেটা জেনেছিল। আপা চলে যাবার পর তখন আবার তাকে ভাইয়ার ঘর গোছাতে হচ্ছিল। তার ব্যক্তিগত এসব অবৈধ জিনিস দেখতে নিতুর মোটেও ভালো লাগত না। সেদিন খাটের নিচে ঝাড়– দিতে গিয়ে কিসে যেন ঝাড়–টা বারবার লাগছিল। নিতু মেঝেতে শুয়ে দেখে খাটের নিচে একেবারে শেষ মাথায় ছোট একটা ছালার বস্তার মতো।

ঝুল ঝাড়া ঝাড়– দিয়ে টেনে বের করতে বেশ কষ্ট হলো। বস্তা খুলে দেখে নিতুর চোখ ছানাবড়া, ছালা ভরা ফেনসিডিলের খালি শিশি। হলদে বাদামি কাচের বোতলগুলোর দিকে তাকিয়ে নিতুর চোখে পানি এসে যায়। আজ যদি আপা থাকত তো এখনই ডেকে তাকে দেখানো যেত। এই সেই জিনিস যেটা নিয়ে তপু ভাইয়ের সাথে আপার ঝগড়া হলো, তপু ভাই তাহলে সত্যি বলেছিল। হঠাৎ তপু ভাইয়ের জন্যও মন কেমন করে ওঠে। আর তো এলো না! তপু ভাই নিজের থেকে না এলে নিতুর পক্ষে তার খবর নেয়া সম্ভব না। তাছাড়া নিতুর সামনে টেস্ট পরীক্ষা, বাসার কাজের বাইরে সে যেটুকু সময় পায় পড়াশোনা করে কাটায়। তবু মাঝে মাঝে তপু ভাইয়ের কথা খুব মনে হতো। মাস ছয়েকের বেশি হলো তার সাথে দেখা নেই। নিতুর যেমন চোখে প্রায়ই ভেসে ওঠে যে সে পদ্মদীঘির ধারে তপু ভাইয়ের সাথে বসে আছে, সেরকম কি তপু ভাইয়েরও হয়? মাঝে মাঝে সামনে বই খোলা পড়ে থাকে, নিতু জানেই না যে সে চেয়ার থেকে উঠে কোথায় চলে গেছে! তার কেবলই মনে হয় এলোমেলো বাতাসে তার চুল উড়ে উড়ে নাকেচোখে আছড়ে পড়ছে, সে বাঁধছে না কারণ তপু ভাই বাঁধতে দিচ্ছে না। এই সামান্য একটুখানি মুহূর্ত এত মধুর কেন? এটা একটা সুন্দর স্মৃতি নাকি কষ্টের? এত সুন্দর সময় নিতুর জীবনে আর আসেনি কিন্তু সেটার কথা ভাবতে গেলে চোখ ভরে আসে কেন?

ঋতু মাসে একবার দুবার ফোন করত কিন্তু নিজের কোনো ফোন নম্বর কখনও দিত না। জিজ্ঞাসা করলে বলত বাসায় ফোন নেই। একবার নিতুর সাথেও কথা হলো, কিছু কথা বলার পরে কেমন যেন অপরাধী গলায় আপা নিতুর কাছে জানতে চাইল, “তপু ভাই কেমন আছে রে?” নিতু যখন বলল জানে না তারপর কিছুক্ষণ আপা কোনো কথা বলেনি। সেই নীরবতাটুকুর মধ্যে নিতু অনেক কিছু শুনতে পেয়েছিল। কেন যেন মনটা বলেছিল, আপা ভালো নেই। কিন্তু আপা সবসময় মুখে বলে সে খুব আনন্দে আছে আর তার সংসার খুব সুন্দর করে গুছিয়েছে। রতনের বাবা-মা নাকি তাদের মেনে নেবে না তাই এখানে আসে না, ওখানে চাকরি পেয়েছে। আগেও রতন একটা রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিল, ঢাকায় গিয়ে আরও বেশি জড়িয়ে পড়েছে। সরকারি দল ছাড়া বাকী সব দল তখন এক হয়ে গেছে। তাদের সবার এখন একটাই দাবি যে তারা বর্তমান সরকারের পতন চায়। রতন সেসব সাংগঠনিক কাজে খুব ব্যস্ত থাকে। এখানে আসতে পারে না তার আরও একটা সমস্যা হলো ভাইয়া। রতনের সাথে ভাইয়ার পুরোনো শত্রুতা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে এটাই আপার ভয়। যদিও আপাকে বলা হয়নি কিন্তু নিতু জানত তখন ভাইয়াই বেশি ভয়ে আছে। মাঝে মাঝে দিনের পর দিন ভাইয়া বাসায় ফিরত না। নিতুর মা অস্থির হয়ে থাকতেন। বারবার চাচার কাছে গিয়ে বলতেন, “পার্টি অফিসে গিয়ে একটা খবর নিয়ে আসো তো, ছেলেটা কদিন ধরে ফেরে না- আমার কেমন ভয় ভয় করছে।” চাচা হয়ত অনিচ্ছায় যেতেন কখনও, ভাবীর কথা ফেলতে পারেন না। কিন্তু সেখানে গিয়ে কিছুই জানতে পারতেন না। ভাইয়া কোথায় থাকে না-থাকে এসব যেন খুব গোপন ব্যাপার।

মাকে নির্ঘুম কয়েকটা রাত দেবার পর যেদিন ভাইয়া বাসায় ফেরত আসত, কোথায় ছিল মা মরিয়া হয়ে জানতে চাইলে শুধু বলত, “নিরাপদ জায়গায় ছিলাম।” “নিরাপদ জায়গাটা কোথায় বল না!” “ঠিকই বলেছ মা, আমাদের জন্য আর নিরাপদ জায়গা বলে কিছু নেই। অন্য সব শালারা একসাথে হয়ে গেছে। কোথায় যে যাব, এই সরকার তো মনে হয় পড়ে যাবে।” “তাহলে তোর কী হবে রিংকু?” “কী আর হবে? যতদিন পারি পার্টির কাজ তো করতেই হবে, পরে দেখা যাবে। কিন্তু ইদানিং আমার জন্য কোথাও আর নিরাপদ নাই।” “তাহলে তুই এসব ছেড়ে দিস না কেন বাবা?” “ছাড়া যায় না মা। একবার ঢুকে গেলে আর বের হওয়া যায় না।” “তাহলে তোর বাবা যে বলেছিল এসব লাইন ভালো না, সেটাই কি ঠিক?” ভাইয়া আর কথা বলেনি। তার চালচলন দেখলে বোঝা যেত সে ধাওয়া খাওয়া মুরগির মতো এখানেওখানে ছুটে বেড়াচ্ছে। পেপারে নানান জায়গার গন্ডোগোলের খবর আসত, শুধু মারামারি, ভাঙচুর আর মৃত্যু। ভাইয়ার দলের কেউ মরে গেলে বিষণœ হয়ে দুই হাতে তালি বাজানোর মতো করে পেপারটা মুচড়ে বন্ধ করে ফেলত সে। ভাবটা এমন দেখাত যেন সে সেখানে থাকলে একহাত দেখে নিত। আর যখন অন্য কোনো দলের কেউ মারা যেত মুখের সামনে পেপারটা আরও বিস্তৃত করে মেলে ধরে বত্রিশটা দাঁত বের করে হাসত আর দাঁতে দাঁত চেপে বলত, “দেখ শালারা আন্দোলনের মজা কত, এবার টের পাবি!” নিতুর খারাপ লাগত, মানুষ মারা যাওয়াতে কেউ এভাবে খুশি হতে পারে নাকি? সে যে দলের মানুষই হোক না কেন।

সাধারণ মানুষও তো মারা যাচ্ছিল অনেক। কয়েকদিন আগে নূর হোসেন নামে একটি ছেলে তার খোলা বুকে আর পিঠে সাদা রঙ দিয়ে ’স্বৈরাচার নিপাত যাক’ আর ’গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাস্তায় নেমেছিল। মিছিলের সামনের দিকে থাকা টগবগে সেই ছেলেটাকে পুলিশ গুলি করে মেরেছে। তারপর থেকে আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে। সবশ্রেণির মানুষ প্রায় প্রতিদিন রাস্তায় নেমে আসছে। প্রতিদিন লাশ নিয়ে মানুষ মিছিল করছে, সব পার্টিই দাবি করছে যে মারা গেছে সে তাদের লোক ছিল, তারপর লাশ নিয়েও টানাহেচড়া লেগে যাচ্ছে, বিভিন্ন রকম রিপোর্টিং হচ্ছে একই ঘটনার। পুরো সময়টাই খুব বিভ্রান্তিকর। নিতুর কাছে অবশ্য মনে হতো, মানুষের মধ্যে এখনও মনুষত্ব আছে বলেই মানুষ একটা লাশকে নিজেদের দলের বলে পরম মমতায় হাতে তুলে নিচ্ছে, সৎকার করছে। যেদিন এটুকুও আর অবশিষ্ঠ থাকবে না সেদিন বোধ হয় লাশটা রাস্তায়ই পড়ে থাকবে, শকুনে খুঁটবে, আর সবাই যে যার মতো মুখ ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, বলবে, আমরা কেউ ওকে চিনি না। নিতুদের ছোট শহরে তেমন বোঝা যেত না কিন্তু এরওর কাছে শোনা যেত ঢাকার অবস্থা উত্তাল। ভাইয়া সেব নিয়ে একদম চুপ। পারতপক্ষে সে বাবার সামনে পড়ত না। কোনোদিন সকাল সকাল নিচ তলা থেকে পেপার নিয়ে ওপরের ঘরে যেতে যদি বাবার সাথে চোখাচোখি হতো, বাবা মুখ ঘুরিয়ে নিত। বাবা যেন বাসায় ভাইয়ার অস্তিত্ব স্বীকার করতে আর রাজি নন। কোনো কোনো সময় মনে হতো বাবা ভাইয়াকে ভুলেই গেছেন।

কিন্তু আবার চাচার সাথে কথা বলতে গেলে কখনও কেমন উদাস হয়ে যেতেন। বলতেন, “এখন দেশে যদি একটা মুক্তিযুদ্ধ হতো আর রিংকু তার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তাহলে আমরা কত খুশি হতাম! কিন্তু এটা কী ধরণের কাজ করছে সে? পড়াশোনা বাদ দিয়ে মাস্তানী করে বেড়াচ্ছে! এইসব মাস্তানরা নিজেদের গুলিতেই নিজেরা মরে, জানিস? এই সরকার পড়ে গেলে ওকে শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাবে, দেখিস।” নিতুর চাচা বলেছিলেন, “ভাইজান, দেশে তো যুদ্ধই হচ্ছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের রিংকু মুুক্তিযোদ্ধা নয়, রাজাকার!” আজকাল মাঝে মাঝে বাবা নিতুকে জিজ্ঞাসা করেন, “তোর পড়াশোনা কেমন হচ্ছে? সামনে পরীক্ষা না?” “ভালো হচ্ছে, বাবা।” “পড়াশোনাটা অন্তত তুই ঠিকমতো করিস, আর দুজন তো করল না।” “আমি করব, বাবা।” “নিতু, তুইও কি ঋতুর মতো-” বলতে গিয়ে বাবার যেন লজ্জা লাগল। হয়তো ভয়ও পান উত্তর কী আসবে সেটা ভেবে, আবার আমতা আমতা করে বলেন, “তুইও কি ঋতুর মতো কিছুর মধ্যে জড়িয়ে গেছিস নাকি?” “না, বাবা।” “ঋতুর বয়স আঠারো হয়ে গিয়েছিল তাই তোর চাচা মানা করল। বলল, কোনো লাভ হবে না। তা না হলে আমি ঠিকই ওকে খুঁজে আনতাম, থানায় যেতাম। এখন তুই কিছু করলে কিন্তু আমার চেয়ে ভয়ঙ্কর কেউ হতে পারবে না, মনে রাখিস।” “আমি ওরকম কিছু করব না, বাবা, আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন।” “নিশ্চিন্ত! সে তো আমি তোর দুই ভাইবোনকে নিয়েও ছিলাম। তাই তারা আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। এখন তোকে নিয়ে আমার চিন্তা না করে উপায় নেই। যাই হোক আমি যখন যা বলব, তুই তা-ই করবি। করবি তো?” “করব, বাবা।” নিতু জানত না কেন তাকে দিয়ে প্রায়ই এসব প্রতিজ্ঞা করানো হচ্ছিল।

তার সামনে পরীক্ষা, ভীষণ পড়ার চাপ আর প্রতিদিন স্কুল যাওয়া সবকিছু নিয়ে সে মোটামুটি ব্যস্ত। এদিকে রাস্তাঘাটের অবস্থাও তখন খুব খারাপ। দুপুরের পরপর প্রায়ই স্কুল থেকে আসতে ভয় করত। রাস্তায় সারাক্ষণ সরকার সমর্থনকারী আর সরকারবিরোধী মিছিল লেগেই থাকত। স্কুল থেকে বেরিয়ে রাস্তা ভালো করে বুঝেশুনে রওনা দিলেও আবার হঠাৎ কোনো মিছিলের সামনে পড়ে যেত। আর দুই দলের মিছিল দুর্ভাগ্যক্রমে সামনাসামনি হলে তো আর রক্ষা নেই, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়ে যেত, ককটেল ফাটত। রাস্তা চলাফেরার জন্য খুবই ভয়ানক হয়ে গেল। নিতু আর পাড়ার আরও তিনটি মেয়ে একদিন ধাওয়ার মধ্যে পড়ে স্কুল থেকে বাসা পর্যন্ত পুরোটা পথই দৌঁড়ে এসেছিল। বাসায় হাঁফাতে হাঁফাতে ঢুকেছে কোনোরকম প্রাণ বাঁচিয়ে। মা দেখে চমকে উঠে বলেছিলেন, “বাদ দে তো, এরকম সময়ে স্কুল যাওয়ার দরকার নেই।” “পরীক্ষার আগে আর মাত্র একটা সপ্তাহ ক্লাস আছে মা। এই এক সপ্তাহ যেতেই হবে।” স্কুলে যাওয়ার সময়ে নিতু প্রতিদিন তপু ভাইদের বাসার গলির সামনে দিয়ে যেত, যদি তপু ভাই বের হয় বাসা থেকে, হয়ত দেখা হয়ে যেতে পারে। ’কুকুর হইতে সাবধান’ লেখা সাইনবোর্ড দেখে যে রাস্তায় আগে ওইটুকু জায়গা দ্রুত চলে যেত তখন সেখানে হেলেদুলে ধীরে ধীরে আগাত। বান্ধবীরা বলত, “কী হলো নিতু পেছনে পড়ে যাচ্ছিস কেন?” নিতু লজ্জা পেয়ে আবার পা চালাত। কিন্তু তপু ভাইয়ের সাথে কোনোদিন দেখা হতো না। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পর নিতুর মনে হতো, তপু ভাই বোধ হয় আমেরিকা চলেই গেছে। তারপর মন খারাপ করে সে বাসায় ফিরে আসত। নিজের ঘরে একা হলে কেমন যেন অভিমান হতো, তপু ভাই কি যাওয়ার আগে একবার বলে যেতে পারল না? যাওয়ার আগে একবার এসে জিজ্ঞাসা তো করতে পারত, নিতু তোমার পাহাড়ঘেরা পদ্মদীঘির পাড়ে আর একবার যাবে? তপু ভাই আসলে ভুলেই গেছে যে নিতু নামে কেউ ছিল ও পাড়ায়। নিতুদের টেস্ট পরীক্ষা যেদিন শেষ সেদিন পরীক্ষার হল থেকে রাস্তার তীব্র চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছিল। ভীষণ শব্দের ভেতরে মেয়েরা কষ্ট করে পরীক্ষা দিচ্ছিল। ইনভিজিলেটর জানালায় মুখ বাড়িয়ে বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। পরীক্ষা যখন প্রায় শেষের দিকে তখন নিতুদের স্কুলের বাংলার স্যার দৌঁড়ে দৌঁড়ে বিভিন্ন রুমে গিয়ে চিৎকার করে বলছিলেন, “সবাই শোনেন, সরকার পড়ে গেছে, আমরা জিতেছি- স্বৈারাচারের পতন হয়েছে!” সরকারী স্কুলের লম্বা বারান্দায় সরকার পতনের জন্য এরকম উল্লাস বোধ হয় কেউ কোনোদিন দেখেনি। পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই বাইরে থেকে একদল মানুষ ঢুকে পড়েছিল স্কুলে, বলে দিলো, “আজ স্কুল ছুটি। আমাদের বিজয় হয়েছে।”

নিতুরা রাস্তায় বের হলো। এই শহরে এত মানুষ আছে নিতু কখনও ভাবেনি। ঈদ বা দূর্গাপূজার সময়েও এত মানুষের সমাগম কখনও দেখা যায়নি। প্রেসিডেন্টের নিজের এলাকায় তার পতনে মানুষের এরকম আনন্দমিছিল নিতু কখনও কল্পনা করেনি। মিছিলের তালে তালে স্রোতে বয়ে যাওয়ার মতো নিতুরা বাসার দিকে যেতে থাকে, মাঝে মাঝে হাঁটতে হয় না, এমনিতেই এগিয়ে যায়। মানুষ নানারকমের আনন্দধ্বনি করতে থাকে। ভীড়ের মধ্যে কেউ হঠাৎ স্লোগান দিতে শুরু করল, বাকিরা এমন করে তাল মেলাচ্ছিল যেন কতদিনের রিহার্সেল করা! উত্তেজনায় মানুষেরা নিজেদের গায়ের শীতের কাপড়, টুপি, মাফলার শূন্যে ছুঁড়তে থাকে আর লাফিয়ে লাফিয়ে পতনশীল কাপড়গুলো ধরছিল। একসাথে তাদের মজা করতে দেখে মনে হয় সবাই সবার বহুদিনের চেনা। দৈনিক তিস্তার এক পাতার একটা কাগজ বের হয় সেদিন দুপুরেই। উপরে তারিখ, ৬ই ডিসেম্বর, ১৯৯০, বিশেষ সংখ্যা। পুরো পাতা জুড়ে বড় হেডলাইন, ’স্বৈরাচারের পতন হয়েছে’। পেপার মেলে ধরে মানুষ কতকগুলো নাম ঘনঘন উচ্চারণ করছিল, ড: মিলন, আভি, নিরু, আমান আরও কিছু নাম যেগুলো নিতু ঠিকমতো বুঝতে পারছিল না। মানুষের সাথে বয়ে যেতে যেতে অস্পষ্ট সেসব নিতুর কানে আসছিল। বাসার কাছাকাছি এসে হঠাৎ করে নিতুর মনে হলো, আচ্ছা, ভাইয়া কোথায়? সে এখন কোথায় থাকতে পারে? প্রচণ্ড দুঃশ্চিন্তায় নিতুর সমস্ত শরীর হিম হয়ে আসে। বাসার দরজা ঠেলে ঢুকতে পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখল বসার ঘরে কিছুু মানুষ বসে আছে, বাবার সাথে কথা বলছে। বাবারও কি আজ অফিস ছুটি হয়ে গেল তাড়াতাড়ি? বারান্দা পেরিয়ে যাওয়ার সময়ে বাবা তাকে ডাকলেন, অতিথিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, বাবার কলিগ কয়েকজন, সাথে আরও দু’একজন। তারা যা যা জিজ্ঞাসা করেন নিতু জবাব দিয়ে বাসার ভেতরে চলে গেল। ওপরে গিয়ে দেখে মা আর চাচি চিন্তিত মুখে বসে আছেন। নিতু ভাবে ভাইয়ার জন্য মা নিশ্চয়ই চিন্তায় আছেন আর চাচি সান্ত¦না দিচ্ছেন।

কিন্তু নিতুকে অবাক করে দিয়ে চাচি শুরু করেন, “নিতু শোন, আজ তোমার বিয়ে।” স্বৈরাচারমুক্ত সেই দিনে পুরো দেশ মুক্ত হলেও শুধু নিতু স্বৈরাচার থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ৭ একটু আগে রাস্তায় ভিড়ের মধ্যেও গায়ের পুলওভারটা খোলার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু চাচির কথায় মেরুদন্ড বেয়ে সরু ঘামের ধারা নিচের দিকে বয়ে চলার সুড়সুড়ি নিতু স্পষ্ট টের পেয়েছিল। প্রথমে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে তারপর চিৎকার করে, “বিয়ে মানে?” চাচি খাট থেকে লাফিয়ে নেমে এসে নিতুর মুখ চেপে ধরে বলল, “আস্তে! নিচে লোক বসে আছে, দেখনি? বর হলো তোমার বাবার কলিগের ভাগনে। ভাইজান বিয়ে ঠিক করেছেন।” তারপর ধীরে ধীরে নিতুর মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে বলল, “প্লিজ চিৎকার কর না লক্ষ্মীসোনা, কী করবে বলো, তোমার বাবা ঋতু আর রিংকুর কাজকর্মে খুবই দুঃখ পেয়েছেন। তাই এরকম অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।” “তাদের জন্য বাবা আমাকে এভাবে শাস্তি দেবেন চাচি? আমি তো কিছু করিনি! আমি তো-” “তা তো আমরা জানি নিতু কিন্তু তোমার বাবাকে বোঝাবে কে?” নিতুর আর কিছু বলতে ইচ্ছে হয়নি। সেখানে মৌন মা আর অসহায় চাচির সামনে বসে এটাসেটার জবাব চাওয়ার কোনো মানে হতো না, ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল সে। মাথা ঝিমঝিম করছিল, এসব কি বাস্তবে ঘটছে? তার কি জোরে চেঁচিয়ে কাঁদা উচিৎ? বাবাকে ডেকে বলে দেবে যে সে বিয়ে করবে না? নাকি আপার মতো পালিয়ে যাবে বাসা থেকে! কোথায় যাবে, কার সাথে যাবে? বাবা কিছুতেই এভাবে সবার ঝাল তার একার উপরে ঝাড়তে পারেন না! পেছন থেকে মা পিঠের উপরে আলতো করে হাত রাখলেন, চাচি পাশে বসে নিতুর হাত ধরল।

কী করবে ভাবতে ভাবতে নিতু কেন যেন তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়ে। মা আর চাচির এইসব স্পর্শের সান্ত¦না অসহ্য লাগে, দুজনের হাত সরিয়ে দেয় নিজের শরীরের উপর থেকে। ভেতরের অভিমান নিজেকে বারবার বলতে থাকে, আমার কাউকে চাই না, কাউকে লাগবে না। এই একটু আগে পরীক্ষার হলে শেষ প্রশ্নোত্তরটা লিখতে লিখতে নিতু ভাবছিল আজ থেকে সপ্তাহখানেক রেস্ট নিয়ে আবার নতুন করে ফাইনাল পরীক্ষার জন্য পড়তে বসবে। রাস্তায় যতক্ষণ ছিল, অনেক মানুষের মুক্তির আনন্দ দেখতে দেখতে নিজেকেও কেমন যেন মুক্ত, স্বাধীন মনে হচ্ছিল। তারপর ইঁদুরের মতো নাচতে নাচতে এসে ফাঁদের মধ্যে ঢুকেছে। বুঝতে পারল, এখন হাতপা ছুঁড়ে কোনো লাভ নেই।

চাচি আবার ধীরে ধীরে বোঝাতে শুরু করল, “নিতু, এমন হঠাৎ করে বিয়ে তো কতজনেরই হয়। তাই বলে সবাই তো অসুখী হয় না! তুমি দুঃখ পেওনা, মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।” নিতু কিছু বলেনি, নিঃশব্দে কাঁদছিল। সারাদিন তেমন কিছু না খেলেও ক্ষিদেটা কেন যেন একটুও জানান দেয় না। চাচি একবার খেয়ে নেয়ার কথা বললে খাবারের উপরও রাগ হয়। এমনিতে আপার উপরে রাগ করে দু’দিন পর্যন্ত না খেয়ে থাকার রেকর্ড আছে নিতুর। সেবারে বোধ হয় সেই রেকর্ডটা ছাড়িয়ে যেতে পারে। হঠাৎ চোখমুখ মুছে মায়ের দিকে ফিরে বলে, “মা, তুমি ভাইয়ার হয়ে বাবাকে এতকিছু বলতে পার, আজ আমার জন্য একটু বলো না কেন?” “তোর বাবা আমাকে চুপ করে থাকতে বলেছে। আর ঋতু আমার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। তার এই কাজের পরে আমার আর কোনো মুখ নেই। আমাকে মাফ করিস। আর শোন, কোনো মা চায় না তার এরকম একটা বাচ্চা মেয়েকে এভাবে ভাসিয়ে দিতে।” নিতু মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুখটা নিচু করে কোলের দিকে তাকিয়েই মা কথা বলে যাচ্ছিল।

মাঝে মাঝে চোখ-নাক আঁচল দিয়ে মুছে নিচ্ছিল। ফর্সা নাকের চূড়াটা লাল হয়ে ছিল, সর্দি টানার আওয়াজ করতে করতে মা বলছিল, “একটা গায়ে হলুদের আয়োজন নেই, পাড়ার লোককে ডাকা নেই, একটা বেনারসী নেই, এটা কেমন বিয়ে?” কথার শেষে আবার কান্নার টান ওঠে নিতুর মায়ের। মাকে দেখে নিতুর একটুও মায়া হয়নি, বরং কেন যেন খুব রাগ লাগছিল। ভাইয়া থাকলেও কোনো লাভ হতো না, আর সে আগামী কিছুদিন বাসায় আসবে বলে মনেও হয়নি। কোথায় গাঢাকা দিয়ে থাকবে কে জানে! হয়ত তার কোনো নিরাপদ জায়গায়। সেদিন ভাইয়ার জন্য নিরাপদ জায়গার সত্যিই খুব টানাটানি পড়েছিল নিশ্চয়ই। বাবা হঠাৎ ঘরে এসেছিলেন।

নিতুর তাকাতে ইচ্ছে করেনি বাবার দিকে। বাবা হন্তদন্ত হয়ে চাচিকে বললেন, “কই, তোমরা এখনও বসে আছ? এটা তো শোক করার মতো কোনো বিষয় নয়, খুবই আনন্দের ব্যাপার, এত ভালো ছেলে পেয়েছি, ঢাকায় বড় ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে, একমাত্র ছেলে, গ্রামে বাড়িঘর, জমিজমা আছে- এর চেয়ে বেশি আর কী চাই? ঋতুর ব্যাপারটা জেনেও তারা রাজি হয়েছে। বোঝ না, এটা আমাদের জন্য কত সৌভাগ্যের ব্যাপার। পরে এমন তো আর না-ও পেতে পারি। যাও যাও তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিচে আস-” “কিন্তু বাবা, আমার তো সামনে পরীক্ষা-” “তা তো আমি জানি, তুমি পরীক্ষার পরেই যাবে এ বাসা থেকে। আমার কি সেসব নিয়ে চিন্তা নেই ভেবেছ? আজ শুধু কাবিন হবে আর কিছু নয়, তোমাকে কেউ নিয়ে যাচ্ছে না।” “এত তাড়াতাড়ি কেন আমার বিয়ে দিচ্ছেন বাবা, আমি আর একটু পড়ি-” “পড়বে তো। তারা বলেছে তুমি বিয়ের পরেও যতদিন খুশি পড়তে পার। আমি বলেছি আমার মেয়েটার পড়ার শখ। ভেবো না মা, রেডি হয়ে নাও, কিছু খেয়েছ?” প্রশ্নের উত্তর না শুনেই নিতুর বাবা যেমন তাড়াহুড়ো করে এসেছিলেন সেভাবে আবার বেরিয়ে গেলেন। নিতু মনে মনে বলল, আমি খেয়েছি কি না-খেয়েছি তাতে আপনার কী যায়-আসে বাবা! আপনার কথামতো সব হলেই তো হলো। আপার কথা মনে হলো তখন, পালিয়ে গিয়ে আপা বেঁচেছে, তার বরের বাড়ির লোকজন আস্তে আস্তে মেনে নেয়া শুরু করেছে। চাচা বলছিলেন রতন ভাইয়ের বাবা চাচার সাথে বাজারে দেখা হওয়াতে ডেকে কথা বলেছেন। তখন সরকারি দল ক্ষমতা হারিয়েছে, আপাকে নিয়ে রতন ভাইয়ের শহরে ফিরে আসতেও কোনো অসুবিধা ছিল না। আপা ভালোই থাকবে, মাঝখান থেকে নিতুই ফাঁদে পড়ল। আপা কি কোনোদিন একথা বুঝবে? যাক্, নিতুকে এভাবে শাস্তি পেতে দেখলে যখন সবার ভালো লাগবে তাহলে তাই হোক।

নিতু নিজের ঘরে কাপড় বদলাতে যাওয়ার জন্য ক্লান্তভাবে উঠে দাঁড়াল। মা আর চাচি অবশ্য আশা করেননি ব্যাপারটা এত সহজে মিটে যাবে। এমনিতে কেউ কোনো কারণে নিতুর চড়া গলা শোনেনি কিন্তু আজ আশা করেছিল তাকে বোঝানো শক্ত হবে। কিন্তু তেমন কিছুই নিতু করেনি, স্বাভাবিকভাবেই চাচিকে জিজ্ঞাসা করল, “কী পরতে হবে?” চাচি তার নিজের একটা জমকালো শাড়ি এনে দেন। আপার ফেলে যাওয়া ব্লাউজ শাড়িটার সাথে মিলিয়ে নিতুর সামনে দিলে সে ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। মনে হলো সে যেন নিজে হাঁটছে না, চলন্ত পা তার শরীরের অংশ নয়, অন্য কারো ইচ্ছায় পা দুটো তার শরীরকে নিজের ঘরের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শরীরটা কেমন ভারী লাগল, আগাতে কষ্ট হচ্ছিল। কবে কোন একটা সিনেমায় দেখেছিল, একজন ঘোড়ায় চড়ে পালাচ্ছে আর পেছনে একদল মানুষ ঘোড়া ছুটিয়ে তাকে তাড়া করছে।

যেতে যেতে পাহাড়ের শেষ মাথায় খাদের ধারে এসে তার ঘোড়া মাটিতে ছেঁচড়ে থেমে যায়। পেছনে তাড়া করা অন্য ঘোড়াদের কাছে আসতে দেখে মানুষটি ঘোড়াকে সামনে যাওয়ার জন্য লাগাম ধরে টানাটানি করে। ঘোড়াটি আর কিছুতেই সামনে এগিয়ে সেই খাদে ঝাঁপ দেবে না। তাই সামনের পা দুটো উঁচু করে সশব্দে প্রতিবাদ জানায়। নিতুর নিজেকে সেই ঘোড়াটির মতো মনে হয়। তার পাগুলো জমে গিয়েছিল, অজানা খাদে সে কিছুতেই ঝাঁপ দিতে পারে না। কিন্তু পেছন থেকে তাকে ধাক্কা দেয়ার মানুষের অভাব ছিল না। নিতুর যখন শাড়ি পরা হয়ে গেছে, চাচি তার চুল বেঁধে তাকে সাজিয়েগুজিয়ে দিতে এলো। হঠাৎ বাসার গেটের দিকে শোরগোল শোনা গেল। দুজনে জানালায় মাথা বাড়িয়ে দেখল, একদল ছেলেপেলে চেঁচামেচি করে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। একটু দেরি হলে বোধ হয় চাচার তৈরি গ্রিলের নতুন গেটটা ভেঙেই পড়বে। চাচা দৌঁড়ে এলেন, গেটের ভেতর থেকে বললেন, “কী হয়েছে, তোমরা কী চাও?” তাদের মধ্যে দু’একটা কণ্ঠস্বর আকাশ কাঁপিয়ে বলল, “রিংকু কোথায়? রিংকুকে বাইরে আসতে বলেন।”

“রিংকু কোথায় তার আমরা কী জানি? সে বাসায় নেই।” “নেই মানে? সে বাসায় লুকায়ে আছে আর আমরা তার খোঁজে সারা শহরে চষে বেড়াচ্ছি। বেরিয়ে আসতে বলেন এখনই, না হলে ভালো হবে না।” “বললাম তো রিংকু নেই বাসায়।” “গেট খুলে দেন, আমরা দেখব।” “তোমরা দেখবে মানে, তোমরা কি পুলিশ? তোমাদের কাছে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে?” “আমাদের ওসব লাগে না চাচা, ভালোয় ভলোয় খুলে দেন, না হলে আমরা কিন্তু গেটের ওপর দিয়েও আসতে পারি।” বারান্দায় এই সময় নিতুর বাবা বেরিয়ে আস্তে আস্তে বলেন, “খুলে দাও, ওরা এসে দেখে যাক। চেঁচামেচিটা তো বন্ধ হবে, বাসায় একটা শুভ কাজ। ঘরে মেহমান তার মধ্যে এসব কী উপদ্রব! খুলে দাও গেট।” গেট খোলার সাথে সাথে পিলপিল করে ছেলের দল বাসার ভেতরে ঢুকে পড়ল। উন্মাদের মতো এঘর-ওঘর ঘুরতে লাগল। খাটের নিচে, র্পদার পেছনে, এমনকী ছাদের উপরে পানির ট্যাঙ্কির ভেতরেও মাথা ঢুকিয়ে টর্চ জ্বালিয়ে রিংকুকে খুঁজল তারা। বসার ঘরে ঢুকে আদেশের সুরে একজন বলল, “সবাই চুপচাপ থাকবেন।

এত লোক বাসায়, বিয়ে লেগেছে নাকি?” নিতুর বাবার কলিগরা আর সাথে যারা এসেছে, সব চুপসে গেল। শুধু নিতুর বাবা ব্যস্ত ছিলেন অস্থির পায়চারিতে আর চাচা থেমে থেমে তাকে অনুসরণ করছিলেন। ছেলের দল ওপরে উঠল, নিতুর ঘরে গিয়ে একজন আরেকজনকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, “বাহ্ আজকে দেখি খুব সাজগোজ করা হইছে- সাজলে তো দারুণ লাগে!” অন্য আরেকজন ধমকে উঠল, “ওই, তাড়াতাড়ি যে কাজে আসছিস সেইটা কর।” দুজনে ঝুঁকে খাটের নিচে খুঁজল, উঠে দাঁড়িয়ে হতাশ হয়ে বলল, “শালা নির্ঘাত পালাইছে!” নিতু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছেলেদের অস্থির ছোটাছুটি দেখছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে শুনতে পেল রিংকুর ঘরে ঢুকেছে তারা, লোভী একটি গলা বলছে, “বাপরে, কী ঘর বানাইছে মাইরি! দেখ্ পার্টি কত টাকা ছিটাইছে- এ তো শালা রাজপ্রাসাদ লুকায়ে রাখছে কুড়েঘরের ভিতর! বহুত টাকা খাইছ বাছাধন, এবার তোমার দিন শেষ।” দূর থেকেই বোঝা যায় রিংকুর ঘরে কী সব টানাহেচড়া চলছে। একটু পরে বেরিয়ে যাবার সময়ে নিতুর ঘরের সামনে দিয়ে গেল তারা, তাদের আক্ষেপ শোনা গেল, “বাড়ির অন্য কোথাও তো আর নেওয়ার মতো কিছুই নাই।”

নিচে গিয়ে নিতুর বাবা আর চাচার সামনে হাতের মিউজিক সিস্টেম আর স্পিকারগুলো দেখিয়ে একজন বলল, “রিংকুর ঘর থেকে নিয়ে যাচ্ছি। আইজ থেকে সাত দিন আমাদের উৎসব। গান বাজাব। রিংকুর সাহস থাকে তো গিয়া আমাদের কাছ থেকে ফিরায়ে আনতে কইয়েন।” বাকিরা জোরে হেসে উঠল যেন খুব মজার কোনো কৌতুক বলা হয়েছে। তারা বেরিয়ে গেলে নিতুর চাচা লাফিয়ে গিয়ে গেট লাগাল। বাবা বসার ঘরে ফিরে এলেন, বিব্রত মুখে জোর করে হাসি টেনে বললেন, “আজকালকার ছেলেরা কত বেয়াদব হয়ে গেছে দেখেন! তবে আমার এই ছোট মেয়েটা কিন্তু একদম অন্যরকম। সে আজ পর্যন্ত কখনও কথার অবাধ্য হয়নি।” আতঙ্কিত অতিথিরা আড়ষ্টতা কাটিয়ে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করলেন। একজন আমতা আমতা করতে করতে বললেন, “আপনি পুলিশে খবর দিতে পারতেন।” “কী লাভ বলেন? এসব ছেলেদের দৌড় আমার জানা আছে। আর আজকে পুলিশের কি আসার সময় আছে? তারা তো এখন রাস্তার পাবলিককে সামলাতেই ব্যস্ত।”

“তা ঠিক, কিন্তু কাজী সাহেবকে খবর দিয়েছেন?” “হ্যাঁ, রাস্তায় ঝামেলা তাই হয়তো দেরি হচ্ছে।” “চলে আসবেন,” নিতুর চাচা আগ বাড়িয়ে বলেন। অতিথিদের মধ্যে একজন বেশ হতাশ গলায় বলেন, “সত্যি আপনার ছেলেটার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল।” অন্যরা ওই বিষয়টিতে একমত হলেন, ধীরে ধীরে শান্ত গলায় নিজেদের মত জানাতে থাকলেন। তখন তার কপালে কী আছে এ নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। শুধু নিতুর বাবাকে দেখলে মনে হচ্ছিল নিতুর বিয়েটা নিয়েই তার সব চিন্তা, ভালোয় ভালোয় হয়ে গেলেই তিনি বাঁচেন। কী করলে কী হতো, কী করলে আজকের এই দিন দেখতে হতো না- এসব নিয়ে অতিথিদের পর্যালোচনার ভেতরে কাজী সাহেব চলে এলেন। তিনি আসার পরে আর দেরি করা যায় না, রাতের খাবারের সময় হয়ে যাচ্ছিল। চাচা এসে চাচিকে বললেন নিতুসহ নিচে আসতে। নিতুর মা এতক্ষণে বেশ জোরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। অতিথিদের মধ্যে একজন বললেন, “কাঁদবেনই তো, কী আর করবেন, মেয়ের বিয়ে হয়ে মেয়ে চলে যাবে, আর এক মেয়েকে তো নিজে হাতে বিদায় দিতেও পারেননি।” নিতু চোখ তুলে তাকায়নি। এসব কথার পিঠে বাবা-চাচারাও কোনো কথা বলবে না সে জানত। নিতু সেই যে চোখ নামিয়ে রেখেছে তো নামিয়েই রেখেছে, তাই জানতও না কার সাথে বিয়ে হয়ে গেল, তাকে শুধু যা যা বলা হলো সে যন্ত্রের মতো করতে থাকল। একটা সময়ে তার মনেও ছিল না যে এটা তার নিজের বিয়ে হচ্ছে, শুধু মনে হচ্ছিল যা হওয়ার হয়ে যাক তাড়াতাড়ি, সব শেষ করে এরা চলে গেলেই ভালো। শাড়ি-গয়না সব গায়ের থেকে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু বাবার আর বাসার সবার কথা চিন্তা করে চুপচাপ মুখ বন্ধ করে ছিল। মাথা নিচু করে সবার পা দেখতে পাচ্ছিল শুধু। সবাই কাজী সাহেবের কথার ফাঁকে ফাঁকে এমন জোরে জোরে ’আলহামদুলিল্লাহ্’ বলছিলেন যে মনে হচ্ছিল সেখানে যা কিছু হচ্ছে তা ভালো না হয়ে পারেই না। একেক সময়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করত তার। কোনোরকমে বিয়ের কাজটুকু শেষ হলে নিতুকে আর ধরে ওঠাতে হয়নি, বলার সাথে সাথেই সে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিলো। ঘরে গিয়ে খাটের এক মাথায় বসে জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকল।

তার মনে হলো সেদিন তার জীবনের সব আনন্দ আর রহস্য শেষ হয়ে গেল, এরপর আর কিছু দেখার নেই, জানার নেই, আর কিছু চাওয়ার নেই। তার ছোট পুকুরের মতো শান্ত জীবনের সেদিনেই সমাপ্তি। বাইরের জমাট অন্ধকারের সাথে তার নিজের কোনো পার্থক্য নেই। সে-ও এই অসীম অন্ধকারেররই একটি অদৃশ্য অংশ। আশেপাশের বাসার মেয়েরা কীভাবে যেন জেনে গেল। তখনই কয়েকজন নিতুর ঘরে চলে এলো তাকে দেখতে। নিতুর গাল টিপে কেউ বলল, “এত উদাস কেন, আজই চলে যাবে নাকি!” কেউ বলল, “বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ হয়ে গেল?” আবার কেউ ‘বর আজ এখানে থাকবে নাকি নিতু?’ বলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। বাকিরাও এ-ওর দিকে চোখ টিপে হাসল। তাদের হাসি দেখে নিতু ভয়ে কাঠ হয়ে গেল, অচেনা একটা লোক আসতে পারে, এখনই, এই ঘরে, বলতে পারে যে নিতুর সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে।

নিতুর মনে হলো তখনই সে নিজেকে এমন কোথাও লুকিয়ে ফেলতে পারত যে কেউ তাকে আর দেখতে না পায়! সে আছে কিন্তু সে নেই, এমন হতে পারে না? একটু পরে মেয়ের দল চলে গেল। মা আর চাচি ওপরে আর আসেনি, তারা মেহমানদের খাওয়াতে ব্যস্ত। বাসার সবাই একরকম নিতুর কথা ভুলেই গেছিল কিছুক্ষণ। আরও অনেক পরে চাচি এসে রাতে খাওয়ার জন্য সাধাসাধি করছিল, “তোমার কি অনশন শুরু হয়ে গেল? এবার ক’দিন চলবে?” একসময় সত্যি সেই অপ্রত্যাশিত সময়টাও চলে আসে যখন চাচি একজন মানুষকে নিয়ে তার ঘরে আসেন। সেই প্রথম নিতু তার দিকে তাকিয়ে দেখল। নিতুর নিজের করুণ পরিণতি, বাবা, আপা আর ভাইয়ার উপরে রাগ তখন এত প্রবল যে অন্য কিছু নিয়ে ভাবার মানসিকতা নেই। তবু এক নজরে বেটে আর কালো লোকটিকে তার কাছে খুব কুৎসিৎ মনে হলো। মনে হলো কোথা থেকে যেন সবার সামনে তাকে আক্রমন করতে আসছে আর সে প্রতিবাদ করার অধিকার হারিয়েছে। চাচি হাসতে হাসতে বলল, “নিতু, এ হলো বাদল, তোমার বর।

একদিনেরই ছুটি নিয়ে এসেছে, কাল চলে যাবে। তোমরা তাহলে কথা বলো, কেমন?” মায়ের চেয়েও বেশি যার উপর নির্ভর করা যায় সেই চাচিকে কী ভয়ানক নিষ্ঠুর লাগল তখন নিতুর কাছে! যাবার সময়ে দরজার কপাটদুটো টেনে দিয়ে চলে গেলেন তিনি। লোহার কড়াগুলো সশব্দে দরজার উপর পড়ল আর তারপর থেকে সব নিস্তব্ধ। অনেকক্ষণ পরে লোকটিই প্রথম কথা বলল, “তুমি বিয়ের কথা জানতে না, তাই না?” “না।” “তোমাকে বলা হয়নি কেন? তুমিও কি কারও সাথে পালিয়ে চলে যাচ্ছিলে নাকি?” নিতু কোনো কথা বলেনি। এসব কথার কোনো জবাব নেই। আর নিতু যদি মুখ খোলে তো কত বিষ যে গড়িয়ে পড়বে তার সীমা নেই। তাই চুপ করে থাকল। একসময় নিতুর দুই ঘাড়ে হাত রেখে নিতুকে ঝাঁকিয়ে সে বলতে লাগল, “বিয়ে হয়েছে বলে কি মন খারাপ?” নিতু শুধু আস্তে করে বলল, “না, আসলে আমি জানতাম না তো, তাই।”

“জানতে না তো কী হয়েছে, এখন তো জানলে।” একটু থেমে আবার বলল, “আমাকে তোমার ভালো লাগেনি, না? এজন্য মন খারাপ, আমি বুঝেছি। কাকে তোমার ভালো লাগে?” “আপনি বুঝতে পারছেন না, সেরকম কিছু নয়।” “আমাকে আপনি বলছ কেন?” “অচেনা কাউকে প্রথমে তো আপনিই বলি।” “অচেনা মানে? একটু আগে তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেল না?” নিতু চুপ করে ছিল। বাদল মুখের সামনে এসে বলল, “নিতু, তুমি খুব সুন্দর। তুমি আসলে তোমার ছবির চেয়েও সুন্দর। কারও কারও ক্যামেরা ফেস অনেক ভালো হয়, সামনাসামনি দেখতে পেতনির মতো। তুমি তা নও। ছবিতে তোমাকে এত সুন্দর লাগছে দেখে আসলে আমি টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম সামনাসামনি কী যে দেখব! তবে এখন বুঝতে পারছি চিন্তার কিছু নেই। তোমার জন্য নিশ্চয়ই এখানকার অনেক ছেলে পাগল হয়ে আছে।

আর তাই তোমার বাবা তোমাকে বিয়ে দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে, তাই না?” “না, সেরকম কিছু না।” “ও বুঝেছি, বলতে চাও না। ঠিক আছে, আস্তে আস্তে বলবে। আমি অবশ্য সব কথা সরাসরি, মুখের উপরে বলি। আমার কোনো কিছু নিয়ে কোনো রাখঢাক নেই। আর একটা কথা, আমি কান্নাকাটি একদম পছন্দ করি না, আমার সামনে কখনও ভ্যানভ্যান করে কাঁদবে না। এখন যাও, গিয়ে দরজার খিলটা লাগিয়ে দিয়ে এসো।” নিতু চমকে নিজের গালে হাত দিয়ে দেখল বামচোখ দিয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ছে।

তাড়াতাড়ি মুছে ফেলল সে। ওটা তার ইচ্ছাকৃত কান্না নয়। কাউকে দেখিয়ে কাঁদার স্বভাব তার নেই। নিতু মনে মনে হাসল, লোকটার কী ভালো লাগে না লাগে কত পরিষ্কার করে বলল অথচ নিতুর কথা জানতে চাওয়ার কোনো আগ্রহ ছিল বলে মনে হয় না। বাবা খুব ভালো ছেলে পেয়েছেন নিতুর জন্য যাকে কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাননি। তিনি নিশ্চয়ই নিচের তলায় অনেকদিন পর নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন আজ। বাবা তার পিতৃত্বের দায় পরিশোধ করেছেন। এখন নিতুর পালা। নিতু যন্ত্রের মতো উঠে গিয়ে দরজার খিল ওঠায়।

৮ দশ-বারো দিন নিতুকে কোথাও দেখা যায়নি। নিজের ঘর থেকে বেরই হয়নি। ছাদে যেতে ভালো লাগেনি। মা কি চাচি ঘরে এলে কারও সাথে কথা বলতেও ভালো লাগেনি। সত্যিই অনশনের ব্যাপারে নিতু সেবার আগের রেকর্ড ভেঙেছিল। তৃতীয় দিন রাতে চাচি জবরদস্তি তাকে কিছুটা খাওয়াতে পেরেছিল। তারপর আবার একভাবে পড়ে ছিল বিছানায় উপুড় হয়ে। চাচি বারবার এসে বলে গেল, “নিতু চুলে জটা ধরে যাবে, যাও উঠে পড়।” নিতু ওঠেনি, মনে জোর পায়নি আর শরীর তো চলছিলই না। মনে মনে বারবার ভাবছিল, এভাবেই পড়ে থাকতে থাকতে একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে না সে? এমন পৃথিবীতে সে থাকতে চায় না যেখানে সবাই তার বিপক্ষে।

কেউ যাকে ভালোবাসে না তার তো আর বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। বাসার প্রতিটা মানুষের বিচরণের শব্দ, খোলা জানালায় বয়ে আসা উত্তরের হিম বাতাস, মধ্য দুপুরে একটা-দুটো ফেরিওলার ডাক সমস্ত কিছু নিষ্ঠুর লাগত। সব কিছুতেই খামাখা কান্না পায়। শীতে শরীরে কাঁপুনি উঠে যেত তবু উঠে গিয়ে জানালা লাগাত না। কেমন যেন নিজেকে ক্রমাগত শাস্তি দিতে ইচ্ছে হতো। মনে হতো শীতের বাতাস এসে তার হাড়ে হুল ফুটিয়ে যাক, সেটাও তার একরকম শাস্তি। আবার কখনও কান্নার দমকে শরীর কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ থেমে যেত। কারও মুখ যেন সামনে আসত। মনে হতো তাকে সব বলা যায়, কিছুটা ভার দেয়া যায়। তপু ভাই! চোখ বুজলে দেখা যেত সেই পদ্মদীঘির পাড়ে পা ছড়িয়ে তপু ভাই বসে আছে।

জানতে ইচ্ছে করত, এখন কি শীতের পাখিরা এসেছে? মনে হতো বলে, একবার দেখিয়ে আনলে না আমাকে! ভাবার চেষ্টা করত, তপু ভাই কি বলেছিল যে শীতের পাখিরা এলে তাকে আবার নিয়ে যাবে? কিছুই কেন যেন ঠিকমতো মনে পড়ত না। না খেয়ে থাকতে থাকতে মাথা কাজ করত না, নাকি সত্যিই সে সব ভুলে যাচ্ছিল! আলনার দিকে চোখ গেলে ওপরের তাকে আপার সালোয়ার-কামিজগুলো পাট পাট করে ঝোলানো। নিতু একদিনও ধরেনি, ইচ্ছেই হয়নি।

বাসায় থাকলে আপা কতবার বলত, “ত্ইু কিন্তু আমার জামায় হাত দিবিনা। সেবার ব্রোকেটের কামিজটা চাচি এত শখ করে বানিয়ে দিল, তুই পরে গলার কাছে ফাঁসিয়ে নিয়ে আসলি। আর শোন, আলনার এই উপরের তাক কিন্তু আমার, এখানে তোর কাপড় রাখবি না একটাও।” কাপড়চোপড়ের খুব শখ ছিল ঋতুর। রিংকু সহায় ছিল সেজন্য। আপার সেই সারি সারি কাপড় একইভাবে পড়ে থাকল আলনায়। মাঝখান থেকে আপা কোথায় চলে গেল! বাথরুমে আপার টুথব্রাশটাও গ্লাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকত, নিতু ফেলেনি। ড্রেসিং টেবিলে আপার চিরুনি, সাজগোজের কিছু জিনিস তেমনই পড়ে থাকত সবসময়। নিতু শুধু এদিকওদিক করে প্রতিদিনের ধুলোর স্তর মুছে নিত।

ঋতুর এসব সম্পত্তি তো দূরের কথা, শক্ত হয়ে থাকা টুথব্রাশটাও নিতু ফেলতে পারত না কিছুতেই। আপার চলে যাওয়ার দিনটা যত দূরে সরে যাচ্ছিল, তার ফেলে যাওয়া জিনিসের মূল্য নিতুর কাছে ততই বেড়ে যাচ্ছিল। সেই ঘরে আপা হাসত, তার দুটো পা আগাত-পেছাত, তার শরীর এ ঘরের বাতাস টানত, কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়াত- ভাবতে ভাবতে আবার গভীর কান্নায় ভেঙে পড়ত নিতু। স্কুলের বান্ধবীরা একদিন দল বেঁধে নিতুকে দেখতে এলো। অবাক হলো ওরা, বলল, “আরে আমরা তো ভেবেছিলাম এসে দেখব তুমি গয়নাগাটি পরে ঝমঝম করে ঘুরে বেড়াচ্ছ। তোমার এমন অবস্থা কেন?” একজন বলল, “বর পছন্দ হয়নি নিতু?” আর একজন কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, “বর কী কী করল বলবে না?” হাসতে হাসতে তারা বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। যাবার সময়ে মনে করিয়ে দিলো, “পরীক্ষার ফর্ম ফিলআপের কথা আবার ভুলে যেও না যেন। আগামী সপ্তাহে, চলে এসো কিন্তু।” নিতু মাথা নাড়ল। তারা চলে গেলেই আবার বিছানায় এলিয়ে দিলো শরীর। নিতু আসলে ভুলেই গিয়েছিল তার ফাইনাল পরীক্ষার কথা। তখন মনে পড়লেও মনে হলো, কী হবে আর পরীক্ষা দিয়ে! নিতুর বাবা পরম তৃপ্তিতে বারান্দায় পায়চারি করতেন, মাঝে মাঝে হাত দুদিকে ছুঁড়ে গলা কেশে পরিষ্কার করতেন। নিতু ওপর থেকে শুনতে পেত। বাবার কথা বলার ভঙ্গিই বদলে গেছে তখন।

কোনো খেলায় শেষ চালে জিতে যাওয়ার মতো খুশি থাকে তার গলায়, শুনলে নিতুর গা জ্বলে যেত। নিচে বারান্দায় বসে চাচা একদিন নিতুর বাবাকে বললেন, ভাইজান, “এভাবে নিতুর বিয়ে দেয়াটা কি ঠিক হলো? সে তো খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।” “কয়েকদিন পরে ঠিক হয়ে যাবে।” “তবু, তাকে কিছুই জিজ্ঞাসা না করে এভাবে-” “ঋতু কি আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা করেছিল যাওয়ার আগে?” “কিন্তু একজনের অপরাধে আরেকজনকে-” “আমার যা ভালো মনে হয়েছে, আমি করেছি। কয়েকটা দিন যাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।” ঠিক হওয়ার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। নিতু তার নিজের ঘরে নিজেকে আটকে রাখল। তার এই নীরব প্রতিবাদে মা আর চাচির বুক ফেটে যেত।

একদিন হাঁফতে হাঁফাতে চাচি এসে বললেন, “নিতু, শোন, শোন কে ফোন করেছে-” “কে?” “আরে ঋতু! সে এখানে এসেছে। শ্বশুড়বাড়িতে উঠেছে। রতনের বাসার সবাই তাকে মেনে নিয়েছে। গলা শুনে মনে হলো খুব খুশি। যাক্, সে ভালো আছে।” “ও।” “কীসের ‘ও’! ওঠ তো তুমি, বুঝতে পারছ না ঋতু এখানে আসবে দু’এক দিনের মধ্যে। ঘরবাড়ি গোছগাছ কর, তোমাকে এভাবে দেখলে তার খুব কষ্ট হবে, ওঠ।”

“দেখুক। তার জন্যই তো আজকে আমার এই অবস্থা, চাচি।” “কেন এভাবে ভাবছ, নিতু? মানুষের বিয়ে হয় না? আগে আর পরে। তোমার না হয় একটু আগেই হয়েছে। আর ঋতু তো ভালো আছে, আমাদের খুশি হওয়া উচিৎ।”

জানালার বাইরে সাদা মেঘের উড়ে যাওয়া দেখে নিতুর মনে হলো, সত্যিই তো, তার খুশি হওয়ার কথা! ভীষণ খুশি হওয়ার কথা। আপাকে নিয়ে একসময় কত খারাপ খারাপ খেয়াল আসত! বেশিরভাগ সময়েই মনে হতো আপার সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে না। রতন ভাই আপাকে কোথায় যে গুম করে দেবে! আবার মনে হতো এই শহরে কোনোদিন আসতে পারবে না সে। কখনও টেলিফোনে কথা হলেও মনে হতো আপা কিছু লুকাচ্ছে, সে সুখে নেই। ভাইয়ার মতো রতন ভাইও হয়তো পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।

আপা একা হয়ে গেছে, কষ্টে আছে। অথচ আজ আপার সুখে থাকার খবর শুনে এরকম অশান্তি লাগছে কেন? আপা খারাপ থাকলেই কি সে খুশি হতো? নিজের ভাবনার জন্য খুব লজ্জা হলো। সাদা মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনের ওপর থেকে কালো পর্দা সরে যেতে লাগল। সেই আগেকার মতো ছাদে গিয়ে মেঘের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশের এই দিক থেকে ওই দিক পর্যন্ত চোখটা বুলিয়ে নিতে ইচ্ছে করল। পৌষের চড়া রোদ জানালা গলে বিছানার উপরে এসে পড়ে ছিল। সেই রোদ গায়ে মাখতে মাখতে অনেক দিন পরে নিজে থেকে উঠে বসল সে।

এলোমেলো ছড়ানো চুলগুলো পেঁচিয়ে খোঁপা করতে গেল, খোঁপার প্যাঁচ শেষ করার সাথে সাথেই বারবার খুলে পড়ছিল। মনে মনে হাসল আর ভাবল, চাচি যে কী বলে! এত ঝরঝরে, স্কেল দিয়ে টানা সরলরেখার মতো চুলে কখনও জটা ধরে? এই ক’দিনের মধ্যে নিতুকে একবার মাত্র ঘর থেকে বের হতে হয়েছিল। চাচি এসে খুব টানাটানি করে নিয়ে গিয়েছিল বাদলের ফোন ঢাকা থেকে। আগেও ফোন করেছিল, নিতু যায়নি দেখে চাচি বলেছে বাসায় নেই। শুনে বাদল খুব উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল, “পরীক্ষার জন্যই তো সে সেখানে রয়ে গেল, অথচ কোথায় আবার টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে?” চাচি বানিয়ে বলেছিল যে নিতু পড়ার কাজেই বাইরে গেছে। আর তারপর আরেকদিন ফোন করল ভরা সন্ধ্যায়।

তখন আর বলা যায়নি যে নিতু নেই। তাই নিতুকে ফোন ধরতে যেতে হয়েছিল। বিরক্তি লুকিয়ে আস্তে করে নিতু বলেছিল, “হ্যালো-” “যাক্ আজ তো দেখছি বাসায় আছ! তা কেমন আছ?” “ভালো, আপনি ভালো আছেন?” “হ্যাঁ, তোমার বাবা তো বললেন যে তুমি নাকি পড়ালেখা নিয়েই থাক, পড়াশোনা করছ ঠিকমতো?” “হ্যাঁ।” “শোন, শুধু পরীক্ষার জন্যই তুমি ওখানে পড়ে আছ, মনে রেখ। তা না হলে আমার মা তো বাড়িতে একা, সেখানেই তোমাকে রেখে আসতাম। আমার তো এখানে নতুন চাকরি, মেসে থাকি। যতদিন বাসা নিতে না পারি, তুমি দেশের বাড়িতে মায়ের কাছে থাকবে।” “জি।” “কী তখন থেকে শুধু ‘হ্যাঁ’ আর ‘জি’ করে যাচ্ছ? আমার সাথে কথা বলতে তোমার অসুবিধা?” “জি না।” “সেদিন ফোন করে তোমাকে পাইনি। অফিস থেকে তো আর সবসময় ফোন করা যায় না। তুমি এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি করবে না যখনতখন। আমি পছন্দ করি না। বাসায়ই থাকবে সবসময়, বুঝলে? তুমি নিশ্চয়ই এখন আরও সুন্দর হয়ে গেছ, তাই না? বিয়ের পর তো তেমনই হওয়ার কথ। কী সব হরমোনাল ব্যাপারস্যাপার আছে না?” নিতু কোনো জবাব দেয়নি। ফোন কানে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হয় ওপাশে বাদলের মুখে লালা এসে পড়েছে। ভীষণ লোভী গলায় কথা বলছিল। নিতু অবাক হয়ে ভাবছিল, এই মানুষটি যা যা বলবে, তাকে শুনে যেতে হবে। লাইন কেটে দিলে সে আবার ফোন ঘোরাবে। তার অধিকার নেই বলার যে, আপনার কথাবার্তা আমার কাছে কুৎসিৎ লাগে, আমি কথা বলব না।

দু’দিন আগে তার জীবনে যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না, এখন এটা কেমন উড়ে এসে জুড়ে বসা? যা বলবে তা-ই করতে হবে তাকে। তার পছন্দটা সে বলবে কিন্তু নিতুর পছন্দের কী হবে? সেটা জানার কোনো আগ্রহ ছিল না তার। তার সাথে কী করে বন্ধুত্ব হবে? একদিন সত্যি তার সাথে চলে যেতে হবে ভাবতে রাগে-দুঃখে নিতুর চোখ ফেটে পানি এসেছিল। তবু ফোন নিয়ে দাঁড়িয়েছিল যতক্ষণ ওদিক থেকে আদেশ-নির্দেশের ফিরিস্তি শেষ না হয়। বাদল ফোন রাখলে চাচিদের ঘর থেকে বেরিয়ে আমলকি গাছের নিচের উঠোন পেরিয়ে কোনোরকমে নিতু বারান্দায় উঠেছে। তখন যেন তার পায়ে আগানোর কোনো শক্তি ছিল না। সেদিন সূর্য মেঘের আড়াল থেকে বেরুতেই পারেনি, সারাদিন ঘন কুয়াশায় আকাশ মোড়ানো। তাই সন্ধ্যার আগেআগেই চারদিকে থমথমে রাতের আভাস। মেঝের সিমেন্ট উপড়ে লাল ইট বেরিয়ে পড়া সিঁড়িতে পা দিতেই নিতুর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। একদিন বাদল এসে বলবে, নিতু চলো। তারপর এই সিঁড়ির শেষ ধাপটা পেরিয়ে চলে যেতে হবে। কিছু বলার থাকবে না। কেউ আটকাতে পারবে না। কান্না এসে ধাক্কা দিলে গলার কাছে কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু তার মাঝে আবার অভিমান এসে কান্নাটাকে থামিয়ে দেয়। ভালোই হবে

। নিতুর বাবা-মা তো তা-ই চেয়েছিল। তারা তো এটাই চেয়েছিল যে নিতু খুব কষ্ট পাক। একটা অচেনা লোকের সাথে ঘরে ঢুকে নিতু দরজা বন্ধ করে দিক, একটা অচেনা বাড়িতে চলে যাক। সবাই তাই চেয়েছে। তাই হোক। দু’দিন পরে সত্যিই ঋতু এলো। সাথে তার বর রতন। চাচি আর মা সারাদিন ধরে নতুন জামাইকে খাওয়ানোর জন্য অনেক কিছু রাঁধল। নিতুর বাবা বিরক্তভাব নিয়ে অফিস থেকে এসে ঘরে ঢুকলেন। যেন মেয়ে আসাতে ঠিক আনন্দিতও নন, আবার মানাও করলেন না। ঋতু এসেই মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল অনেকক্ষণ।

তারপর পেছনে নিতুকে দেখে আবার তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকল। নিতুর বাবা বিব্রত ভঙ্গিতে রতনের সাথে কথা বলা শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পরে মনে হরো রতনকে ভালোও লেগে গেল। ভালো লাগার কারণ এখন সে সেখানেই তার বাবার নাইট কোচের ব্যবসায় ঢুকে পড়ছে। সে ব্যবসাটাকে আরও বড় করবে। ছাত্র রাজনীতি করে তার বহু মানুষের সাথে জানাশোনা হয়েছে, সুতরাং তার জন্য কাজটা সহজ হবে। সে এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হয়ে গেঝে। রিংকুর মতো বখে যাওয়ার দিন তার শেষ। মেয়ের সংসার দাঁড়িয়ে যাওয়ার খবর শুনতে কার না ভালো লাগে। নিতুর বাবা-মাও খুব খুশি। অনেক দিন পরে দেখা হওয়ার আবেগ সামলে নেয়ার পরে দেখা গেল ঋতু সত্যি ভালোই আছে।

তার কথাবার্তা শুনলেই বোঝা যায় সে সুখে আছে। রতনের আর শ্বশুড়বাড়ির সুনাম তার মুখে লেগে আছে। সেখানকার সবাই তাকে পছন্দ করেছে। চাচি বলল, “আমাদের ঋতুর যা চেহারা, পছন্দ না করে উপায় আছে?” ঋতুর মা কেঁদে কেঁদে বলেন, “ঋতু, তুই ফিরে এলি মা কিন্তু আমার রিংকুটা যে কোথায় আছে, কেমন আছে তার একটা খবরও জানি না।” ঋতু একফাঁকে নিতুকে টেনে নিয়ে উপরের ঘরে চলে গেল। সামনে বসিয়ে জানতে চাইল, “তোর কী হয়েছে বল তো? চেহারার এরকম অবস্থা করলি কী করে?” “কই?” “বর পছন্দ হয়নি, না?” “জানি না।” “তুই না বললেও আমি জানি, তুই ভালো নেই আর এজন্য আমিই দায়ী। আমি খুব স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম রে- তোর কথা একবারও ভাবিনি।” নিতু কোনো কথা বলল না। ঋতু তাকে জড়িয়ে ধরল। বোনের ছোঁয়ায় যেন আর নিজেকে ধরে রাখা গেল না, হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে নিতু, বলল, “কেন তোমরা সবাই মিলে আমার সাথে এমন করলে আপা? আমি তো কারও কোনো ক্ষতি করিনি। আমি তো আমার মতো ছিলাম।”

“নিতু, ছেলেটাকে কি তোর সত্যিই ভালো লাগেনি?” “লাগেনি বললে কী করবে আপা? পারবে সবকিছু বদলে দিতে? বাবা আমাকে খাঁচার মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিলো, কী করবে তুমি? বলা নেই কওয়া নেই, বাসায় এসে শুনি বিয়ে, এভাবে হয় নাকি, আপা?” “আমি বুঝি নিতু, তবু কয়েকটা দিন দেখ। এত তাড়াতাড়ি কিছু বলা যায় না। আমাকে মাফ করিস, সব দোষ আমার।” নিতু আরও শক্ত করে আপাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকল, বোঝে না তার কেন এমন হচ্ছে, সব জমানো কান্না আপার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে ইচ্ছে হলো।

এতদিন মনে মনে আপাকে যত অভিশাপ দিয়েছে সেসবের জন্য অনুতাপ হলো, যার ওপর রাগ তাকেই সব বলতে সাধ হলো। নালিশের মতো সব গড়গড় করে বলতে মন চাইল। বাদল সেদিন কেমন জোর করে টান মেরে তার শাড়ি খুলে ফেলেছিল সে কথা বলতে ইচ্ছে করল। কোমরের কাছে শাড়ির এক জায়গায় ফেঁসে গিয়েছিল। নিতু ভাঁজের মধ্যে লুকিয়ে রেখে চাচিকে ফেরত দিয়ে এসেছে। চাচি কিছু জানতে চায়নি। ঘাড়ের কাছে বাদল কামড়ে দিয়েছিল। নিতু কোনো শব্দ করেনি। তারপর কয়েকদিন হাই নেকের জামা পরে, ওড়না গলায় পেঁচিয়ে নিতু উপুড় হয়ে বিছানায় পড়ে থেকেছে। বাদলের ছোঁয়ায় কোনো আদর ছিল না, শুধু ক্ষুধা ছিল। বাদল কাছে এসেছিল কিন্তু কখনও নিতুর মুখের দিকে তাকায়নি। শুধু নিতুর বুক আর কোমরে তার চোখ অস্থির ঘোরাফেরা করছিল। তার কথায় কোনো ভালোবাসা ছিল না, কেবল আদেশ।

সে যেন সেই আগেকার দিনের মতো নিতুকে কিনে নিয়েছে। তার জীবনে এরপর কী হবে না-হবে, সে কোথায় যাবে না-যাবে সব সিদ্ধান্ত এখন থেকে বাদল নেবে। একদিনের জন্য কোথা থেকে এসে অদ্ভুত একটা মানুষ হৈ হৈ করে চর দখলের মতো নিতুকে দখল করে চলে গেল, কেউ মানা করল না, বরং সবাই খুশি হলো। নিতু মনে মনে এইসব কথা আওড়ায় আর ঋতুর বুকে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে। তার মনে হলো কিছুই বলার দরকার নেই, আপা যেন এমনিতেই সব বুঝে যাচ্ছে। মাথায় হাত বুলিয়ে আপাও মনে মনে অনেক কথা বলছিল। নিতু শুনতে পাচ্ছিল। পরদিন সকালে ঋতু আবার এসে উপস্থিত। সে একা আর সাথে একটা বড় ব্যাগ। এসেই বারান্দায় চাচিকে দেখে ঘোষণা দিলো, “তোমাদের সাথে কয়েকটা দিন থাকতে এলাম চাচি।” “সে তো খুব ভালো কথা, কিন্তু রতন কই?” “আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে, কাল হয়ত আসবে একবার।”

“তাকেও আমাদের এখানে থাকতে বল।” “থাকবে থাকবে।” তারপর দুমদাম করে উপরে উঠে গিয়ে নিতুকে বলে, “অ্যাই ওঠ। যা রেডি হয়ে নে, আজ না তোর পরীক্ষার ফর্মফিলাপ, তাড়াতাড়ি কর।” আপা কীভাবে জেনে গেল কে জানে। নিতু বাধ্য হয়ে উঠে স্কুলের দিকে রওনা দিলো। স্কুলে থাকার পুরো সময়টা খুব আড়ষ্ট। কে জানে কে আবার কী বলে! কেউ কিছু না বললেও নিতুর মনে হয় সবাই তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। কিছুদিন আগে পাড়ায় নিতুর চেয়েও বছরখানেকের ছোট রুমুর বিয়ে হয়ে গেল। পরদিন সে সারা পাড়ায় শাড়ি পরে বরকে নিয়ে ঘুরছিল, এবাড়ি ওবাড়ি গিয়ে বরকে দেখাচ্ছিল। একদিনের মধ্যে তার চেহারা বদলে গিয়েছিল। তার চলাফেরায় গয়না আর ভারী শাড়ি ঘষার খসখস শব্দ। ভীষণ খুশি হয়ে সে সবাইকে গয়না দেখিয়ে বলছিল, কোনটা কার পছন্দ, কে কোনটা দিয়েছে। তার খুশি দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছিল নিতুর।

তারপর থেকে যতবার রুমুকে দেখেছে কেবল আনন্দে ভাসতে দেখেছে। মনে হতো, এই বিয়েটাই একটা বিষয় যার জন্য রুমু এতদিন ধরে অপেক্ষা করছিল। নিতুর কেন তেমন হতে পারে না? সে কি কখনও রুমুর মতো হতে পারবে? স্কুলের মেয়েরা বলল, “ওমা, তোমার শুনলাম বিয়ে হয়েছে, দেখে তো বোঝাই যায় না।” কী আশ্চর্য! বিয়ে হলে কি গায়ে লেখা থাকবে নাকি যে দেখেই বোঝা যাবে? তাদের এসব কথাও নিতুর অসহ্য লাগে।

নিজেকে ছাড়া আর সবাইকে দেখে মনে হয় কত সুখী! কারও যেন কোনো চিন্তা নেই, গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সব। নিতু কেন ওদের মতো চিন্তাহীন হতে পারে না? কোনোরকমে ফর্মফিলাপ শেষ করে সে বাসার দিকে পা চালায়। শুধু নিতুর প্রিয় ভারতী ম্যাডাম ফর্মফিলাপের সময় কাছে এসে বলেন, “দেখ মেয়ে, পড়াশোনাটা আবার ছেড়ে দিও না যেন!” সেদিন বেশ রাতে দুই বোন যখন জেগে জেগে গল্প করছিল তখন হঠাৎ গেটের বেল বাজল। এত রাতে কে আসতে পারে ভাবতে ভাবতে নিতু নেমে এসে দেখে রিংকু।

প্রায় মাসখানেক পরে বাসায় ফিরে এলো সে। নিতুর দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসেই ওপর তলায় চলে গেল। নিতু পেছনে পেছনে এসে দেখল রিংকু ঋতুর সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে। রিংকুর চেহারা উদভ্রান্ত, কোথায় কোথায় পালিয়ে থেকেছে এ ক’দিন কে জানে, গালের হাড় বেরিয়ে গেছে, কাপড়চোপড় ময়লা। রিংকু নিতুকে আসতে দেখে বলল, “নিতু, আমি ভাত খাব। দেখ তো গিয়ে রান্নাঘরে কী আছে।” “এতদিন কোথায় ছিলে, ভাইয়া?” “সে অনেক জায়গায়, যা তাড়াতাড়ি আমার ক্ষিদে পেয়েছে।” “আমি ভাত দিচ্ছি, তুমি কাপড় বদলে এসো।” দুই বোন বসে ভাইকে দেখল। রিংকু ব্যস্ত হয়ে বড় বড় লোকমা তুলে খেতে লাগল। দেখে মনে হলো অনেকদিন ঠিকমতো খাওয়া হয়নি। ক্ষিদেটা যখন একটুখানি কমে এলো তখন মুখ ওঠাল, ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি শুনেছি যে রতন ফিরে এসেছে।

তখনই বুঝলাম বাসায় এসে তোকে দেখব। রতন তো শুনলাম রাজনীতি করাও ছেড়ে দিয়েছে। এমনিতে অন্য পার্টির হলেও ছেলে ভালো।” নিতু বলল, “ভাইয়া, তুমি যে ফিরে এলে, অসুবিধা হবে না? একদল ছেলে এসেছিল একদিন তোমার খোঁজে। আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। ওরা যদি আবার আসে?” “না অসুবিধা নেই। সব শান্ত হয়ে গেছে। নেতাকে দিয়ে বলিয়ে ম্যানেজ করেছি। কী আর করব, ওদের পার্টিতে জয়েন করতে হবে, তাহলেই সব ল্যাঠা চুকে গেল।” “ব্যস?” “ব্যস। এটাই তো রাজনীতি, যেদিকে বৃষ্টি আসবে সেদিকে ছাতা মেল, হয়ে গেল। আর আমার পার্টি তো ফিনিশ। এখন ওদের দলে যোগ দিলে অন্তত আমার জানটা বাঁচে। আমি কাজ জানা মানুষ, তাদেরও লাভ, আমারও লাভ, কথাবার্তা সব হয়ে গেছে প্রায়। সেজন্যই তো ফিরে আসতে পারলাম। কদিন পরেই দেখবি ফুলের তোড়া দিয়ে ওই ছেলেপেলেই আমাকে বরণ করতে আসবে।” ঋতু বলে, “ভাইয়া তুমি তো জানো না, বাবা নিতুর বিয়ে দিয়ে দিয়েছে?” “কী! কার সাথে?” “তার কলিগের ভাগনের সাথে।”

“তাই নাকি? বলেছিলাম না, বাবা একটা হিটলার? এবার বুঝলি? ক্লাস নাইনে উঠে আমি বললাম, বাবা, আমি আর্টস পড়ব। তিনি বললেন, না তোকে সায়েন্স পড়তে হবে। তখন থেকে আমার পড়ার ইচ্ছেটাই গেল চলে। সারাজীবন তিনি-” হঠাৎ বারান্দায় বাবার গলা শুনতে পাওয়া গেল, “এত রাতে কে কথা বলে ওখানে?” নিতু বেরিয়ে গিয়ে বলল, “বাবা, আমরা। ভাইয়া এসেছে।” “এতদিন পরে সুপূত্র কোথা থেকে উদয় হয়েছে? শোন, নেতাটিকে বলে দিও, বাসায় যেন কোনো আজেবাজে ছেলেপেলে তাকে খুঁজতে না আসে।

ঘরভর্তি মেহমানের সামনে আমার মানসম্মান তো আর কিছু রাখল না সেদিন।” হিটলারের গলার শব্দে ভাইয়ার হাত থেমে গেল। মুখের মধ্যে ভাত থাকলেও মুখ আর নড়ল না। দুই ঠোঁট চেপে থাকল। বাবার কথা ভাইয়া তো শুনতে পেলই, পাশের বাসার মানুষরাও হয়ত শুনে থাকবে, তাই নিতু তার নির্দেশ নতুন করে বাবাকে বলার কোনো দরকার আছে বলে মনে করল না। শুধু আসন্ন ঝগড়ঝাটির আশঙ্কায় চুপ করে থাকল। চেঁচামেচি শুনে নিতুর মা ঘুম থেকে উঠে এলেন। রিংকুকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। ৯ আগে প্রায়ই চাচিদের বাসার ফোনের লাইনে ঝামেলা হতো। দিনের পর দিন ফোন ডেড হয়ে পড়ে থাকত। চাচা নিজে যেত বা রিংকুকে পাঠাত টেলিফোন অফিসে।

বারবার অভিযোগ করার পরেও কোনো লাভ হতো না। তারপর হঠাৎ কোনোদিন লাইনম্যান এসে উপস্থিত হলে চাচা নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করত। তাকে, ’ভাই, চা-মিষ্টি খেও’ বলে কিছু টাকা ধরিয়ে দিত ফোন ঠিক হয়ে যাওয়ার পর। সেই সময় আর ফোন নষ্টই হচ্ছে না। নিতু কায়মনে প্রার্থনা করত ফোনটা যেন জনমের মতো নষ্ট হয়ে যায়। দু’চার দিন পরপর বাদলের ফোনের অত্যাচার তার আর সহ্য হতো না। পরীক্ষার পরে বাদলের সাথে রওনা দিতে হবে ভাবলে মনে হতো, পরীক্ষা শেষ হলে নিতু নিরুদ্দেশে চলে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে ভাবতে গেলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ত। সে বাসা ছেড়ে চলে গেছে আর তারপরের দুর্দশার কল্পিত দৃশ্য চোখের সামনে আসলে তার কান্না পেত।

ভাবত কেমন হবে যদি মনে করে সে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল, তারপর কোনো অপরিচিত বাসায় গিয়ে আশ্রয় নিলো। ভাবতে দোষ কী যে সে সেই বাসার কাজের মেয়ে হয়ে গেল? ছদ্মবেশে সেখানে থাকতে লাগল। সংসারের কাজকর্ম নিতু তো সব জানেই, কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তারপর অনেক দিন পরে সেই বাসার লোকেরা আবিষ্কার করল যে নিতু পড়ালেখাও জানে! সবাই নিশ্চয় ভীষণ অবাক হবে, পড়াশোনা জানে তো জানে, তাই বলে একেবারে এসএসসি পাস? এরকম রোমাঞ্চকর কল্পনায় নিতুর বহু সময় কেটে যেত। পরীক্ষার পড়া এমনিতেও খুব একটা আগাত না। নিজেকে কাজের মেয়ের চরিত্রে কল্পনা করে খুব মন খারাপ হয়ে যেত। আবার বাদলের হাত ধরে চলে যাওয়ার চেয়ে এরকম একটা পরিণতি অনেক সময় কাঁদতে কাঁদতে মেনেও নিতে ইচ্ছে করত। তারপর একের পর এক কল্পনা চোখের সামনে দেখতে পেত আর কেঁদে ভাসাত। সারক্ষণ আতঙ্কে থাকত, এই বুঝি ফোন এলো! চাচিকে তার নাম ধরে ডাকতে শুনলেই পেটের ভেতরে গুড়গুড় করত।

আর সত্যিই যখন ডাক আসত বাদলের ফোনের তখন নিতুকে যেতেই হতো। একবার ইচ্ছে করে না যাওয়ার জন্য অনেক কৈফিয়ত দিতে হয়েছিল। চাচিকে বলেছিল বলতে যে সে পাশের বাসায় গিয়েছে। আর পরে নিজেই ভুলে গিয়ে বাদলকে বলেছিল যে সে বাথরুমে ছিল। বাদল বলল, “ঠিক করে বলো তুমি কোথায় ছিলে, বাথরুমে নাকি পাশের বাসায়?” “আমি গোসল করছিলাম।” “তুমি কি গোসল করতে যমুনায় গিয়েছিলে যে এতক্ষণ লাগল? আমি আধা ঘন্টা পরে আবার ফোন করে শুনি তুমি নাকি পাশের বাসায় গিয়েছ?” “ও হ্যাঁ, গোসল করে আমি পাশের বাসায় গিয়েছিলাম মনে হয়।” “মনে হয় মানে কী, গিয়েছিলে নাকি যাওনি? আর সে বাসায় তুমি কেন যাও? কে আছে সেখানে? কোনো ছেলে আছে?” “না, ওটা তো শেফাদের বাসা, আমাদের স্কুলে পড়ে, ওরা চার বোন, ভাই নেই।”

“তোমার এখন দিনরাত পড়াশোনা করার কথা আর তুমি পাড়া বেড়িয়ে বেড়াচ্ছ? তার চেয়ে আমি তোমাকে আমার মায়ের কাছে রেখে আসি।” “না না, আমি অন্য কোথাও যাই না, আমি তো বাসায়ই-” “তোমার গুন্ডা ভাই আর ঘরপালানো বোন নাকি ফেরত এসেছে? বাহ্! একেবারে চাঁদের হাট বসেছে নিশ্চয় তোমাদের বাসায়। সেখানে কি আর পড়াশোনার পরিবেশ আছে?” “কিন্তু আমি তো আমার ঘরেই থাকি।” “বুঝেছি বুঝেছি, শোন শুক্র-শনিবারের সাথে মিলিয়ে একদিন ছুটি পেলে আমি চলে আসব। রাতে আমার আসতে ইচ্ছে করে তোমার কাছে। আমি জানি, ওই দিনই তোমার প্রথম, তাই না?” নিতু আর কোনো উত্তর দেয়নি। এসব কথা বাদলের মুখে খুব অশ্লীল শোনাত।

স্কুলে মেয়েরা এ ধরনের কথা বলে হেসে গড়াগড়ি খেত। নিতুও তাদের সাথে হেসে গড়িয়ে পড়ত একসময়। বাদলের কর্কশ গলায় এসব শুনলে সেরকম কোনো আনন্দ হতো না। বাদলের মুখে তার শোনা সবচেয়ে প্রিয় কথা হলো, ’আচ্ছা, রাখি’। এটা বলেই বাদল ঠাস করে টেলিফোন রেখে দিত। নিতুর ’আচ্ছা’ কিংবা ’ঠিক আছে’ শোনার জন্য তার আর সময় থাকত না। প্রথমে একদিন নিতু ’ঠিক আছে’ বলে দেখল ডায়াল টোন শোনা যাচ্ছে। তারপর থেকে আর বলত না। ’আচ্ছা রাখি’ শুনলেই তার ভালো লাগত। কথা বলে ফিরে এলে আরেক যন্ত্রণা। চোখমুখ কালো দেখলে চাচি আর আপা অবশ্যই খুঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করত, “বাদল কী বলে নিতু যে তোর মুখ ওরকম হাড়ির মতো হয়ে যায়?” আর ভাইয়া সামনে থাকলে বলত, “মনে তো হচ্ছে ব্যাপারস্যাপার সুবিধার না! আমাকে বল, তারপর দেখ শালার কী করি।”

রিংকু ফিরে আসার পর অনেক বদলে গিয়েছিল, সারাক্ষণ বাসায় থাকত, দিনের বেলা বসে বসে রেডিও শুনত। মিউজিক সিস্টেম চলে গেছে বলে কোনো দুঃখ ছিল না। বলত, “দেখিস, ওই শালাদের পার্টির টাকা দিয়ে আবার কিনব।” আসার দু’চারদিন পর থেকে আবার নিজের ঘরে দরজার কড়াদুটোতে একটা বড় তালা লাগিয়ে রাখত। বারান্দায় বসে থাকলেও তালা লাগানো, কাউকে ঘরে ঢুকতে দিত না। নিতুর মা ঘর পরিষ্কার করার কথা বললে বলত, “আমিই পরিষ্কার করে নেব।” তিনি অবাক হয়ে যেতেন। এক গ্লাস পানিও যাকে ঢেলে খাওয়াতে হতো, সে কি না ঘর আর বাথরুম পরিষ্কার করছে? মনে মনে ভাবতেন, বেশ কিছুদিন বাসার বাইরে থেকে তো ভালোই উন্নতি হয়েছে ছেলের! নিজের কাজটা অন্তত করতে শিখেছে। নিতুও লক্ষ করেছে আগে ভাইয়া আপাকে অন্তত ঘরে ঢুকতে দিত, তখন তার জন্যও ঢোকা মানা।

ভাইয়ার সব গোপন ব্যাপার জানার অধিকার একমাত্র আপারই ছিল। তখন তার কাছে ভাইয়ার ঘরটা রহস্যময় একটা এলাকা বলে মনে হতো। আরও একটা ব্যাপার সে খেয়াল করেছিল, ভাইয়ার ক্ষিদে অনেক বেড়ে গেছে। সে অনেক বেশি খাবার চেয়ে নিচ্ছিল মায়ের কাছ থেকে। রান্নাঘরে মায়ের আঁচলের পাশে আয়েশ করে সে তখন খুব কমই খেতে বসত। খাবারগুলো নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিত। তারপর আবার একসময় এঁটো বাসনপত্র রান্নাঘরে রেখে যেত। সত্যি নিতুর এসব দেখে অবাক লাগত।

কারণ ভাইয়া নিজের ঘরে বসে এক কাপ চা খেলেও নিতু ঘর গোছাতে না যাওয়া পর্যন্ত সেই চায়ের কাপ সেখানেই পড়ে থাকত, চায়ের তলানি শুকিয়ে চামড়ার মতো হয়ে কাপে দাগ বসে যেত। আর তখন তার চেয়েও তাজ্জব করা ঘটনা হলো শুধু বাসার খাবারে ভাইয়ার আবার কখনও কখনও কুলাত না, বেশিরভাগ রাতের দিকে বাইরে থেকে প্যাকেটে করে খাবার এনে দ্রুত বারান্দা পেরিয়ে টুক করে নিজের ঘরে ঢুকে যেত। সত্যি ভাইয়ার ক্ষিদে খুব বেড়ে গিয়েছিল। এক রাতে ভাইয়া খাবার নিয়ে এসেছে ভেবে গেট খুলতে গিয়ে নিতু দেখল গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে বাদল। তাকে দেখে নিতু ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। নিতুকে একরকম ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাদল ঢুকতে ঢুকতে বলল, “চলে এলাম।” “সে কি, কালও তো টেলিফোনে কথা হলো, আসবেন, বলেননি তো?” “তাতে কী হয়েছে? আমি আসাতে তোমার কোনো অসুবিধা হলো নাকি? আর শোন, তুমি আজ, এই মুহূর্ত থেকে আমাকে ‘আপনি’ বলা ছাড়। আমার বয়স কি বেশি লাগে তোমার কাছে? নিজেকে একেবারে কচি খুঁকি মনে কর? বারো বছরের পার্থক্য তো কোনো ব্যাপার না। আমার বাবা-মায়ের বয়সের পার্থক্য ছিল সতের বছর। হান্ড্রেড পার্সেন্ট সুখী সংসার।”

নিতু ঝুঁকে বাদলের হাত থেকে ব্যাগ নিলো। ব্যাগ ভারী দেখে নিতুর হাতপা ঠান্ডা হয়ে গেল। বাদল নিশ্চয়ই অনেক দিন থাকবে। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠার সময়ে তারা প্রথম পড়ল রিংকুর সামনে। বাদল হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে আর পেছনে পেছনে নিতু ব্যাগ টেনে টেনে ওঠাচ্ছে দেখে রিংকুর মুখ থেকে এমনিতেই বেরিয়ে গেল, “বাহ্!” নিতুর কানের কাছে মুখ এনে বলল, “বাবা সাংঘাতিক চিড়িয়া যোগাড় করেছে তোর জন্য। তোর ভবিষ্যৎ আমি ফকফকা দেখতে পাচ্ছি।” বাদল হাত বাড়িয়ে দিলো রিংকুর দিকে, “শ্যালক নাকি? সম্পর্কে ছোট হলেও বয়সে আমি তোমার চেয়ে বড়ই হব। এমনিতে অবশ্য আমার বয়স খুব বেশি না। তা কবে ফেরা হলো?” “এই তো কয়েকদিন আগে।” “পার্টি তো একেবারে ডুবে গেছে, না? খুব ধরপাকড় হচ্ছে ঢাকায়। অভি আর নিরুকে খোঁজা হচ্ছে। অবশ্য পাওয়া যাবে না, বর্ডার পার হয়ে গেছে এতক্ষণে। তোমার কী অবস্থা? একদিন তো গুন্ডা-পান্ডা কিসিমের কিছু ছেলেপেলে এসেছিল বাসায়। তোমাকে পেলে খুব পেটাত।”

“রাজনীতি নিয়ে আপনার খুব আগ্রহ, না?” “না না, ওটা তো ভাই তোমার ডিপার্টমেন্ট।” রিংকু বাদলকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির সামান্য খালি জায়গা কাজে লাগিয়ে দ্রুত নেমে গেল, মুখে বিরক্তি। আর সে চলে যাওয়ার সাথে সাথে নিতু দেখে বাদলের মুখ থেকে হাসিহাসি ভাবটা হঠাৎ করে মিলিয়ে গেল। যেন এতক্ষণ একটা সাজানো ভঙ্গি মুখে সাইনবোর্ডের মতো টাঙানো ছিল। তখন আর তার প্রয়োজন নেই। ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে বলল, “তোমার ভাইটা তো দেখি আস্ত একটা বেয়াদব!” নিতু কিছু বলেনি। বাদলের সাথে খামাখা এসব নিয়ে কথা বলার কোনো মানে হয় না। তার চেয়ে যেটা জানতে চাওয়া জরুরি তা হলো বাদল এখন খাবে কি না। তাদের সবার রাতের খাওয়া অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। নিতু বলে, “আপনি কি ভাত খাবেন?” “তুমি আবার আমাকে আপনি করে বলছ? মাঝখানে বাস একবার দাঁড়াল, সেখানে আমি খেয়ে নিয়েছি। আর আমি এখানে খেতে আসিনি। হ্যাঁ, খেতে অবশ্য আমি এসেছি, তোমাকে।” “এই কথাগুলো আপনি এমন করে বলেন কেন?” “কেন? ভালো লাগে না তোমার, না? শোন ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেমের কথা বলা আমার স্বভাবে নেই। ওই সব ভালোবাসাটাসার আমি ধার ধারি না।

যেটা সত্যি সেটা বললাম, ব্যাস। তোমার ভালো লাগতে পারে, না-ও লাগতে পারে। আমার করার কিছু নেই। এখন যাও দরজা বন্ধ করে দিয়ে আস, ভীষণ ঠান্ডা বাতাস আসছে। এই উত্তরবঙ্গে এত শীত, মানুষ থাকে কী করে?” নিতু দরজা বন্ধ করে ফিরে এসে বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইগুলো গোছাচ্ছিল। কেমন অস্বস্তি লাগে, তার একার, নিজস্ব আধিপত্য চর্চার ঘর যেন বেদখল হয়ে গেল। একটা অপ্রত্যাশিত সঙ্গী তার ঘরের প্রিয় জায়গাগুলোতে অনায়াসে বিচরণ করছিল। থেকে থেকে তার নড়াচড়ার শব্দে সে চমকে চমকে উঠছে। বইগুলো একটার উপরে আরেকটা নিয়ে নিতু পড়ার টেবিলের দিকে আগাল। “আচ্ছা নিতু, বইগুলো বিছানায় কী করছিল?” “দেয়ালে হেলান দিয়ে বিছানায় বসে পড়ছিলাম।” “আশ্চর্য! তাহলে চেয়ার টেবিল আছে কী করতে? বিছানায় গড়াগড়ি করে পড়ে শয়তান।

পড়ার ইচ্ছা না থাকলে মানুষ এরকম করে।” নিতু কোনো কথা বলেনি, তার এতদিনের অভ্যাস এই মানুষটা বদলাতে চাচ্ছে কেন? নিতুর একটাও ভালো স্বভাব সে খুঁজে পায়নি। নিতু যা যা করে সবকিছুতেই তার আপত্তি। নিতুর বিশ্বাস করতেও কান্না পাচ্ছিল, এই লোকটার সাথে সংসার করতে হবে। ভালোবাসা অবশ্য সে আশা করত না। এরকম লোকের জন্য তার নিজের ভালোবাসা আসাটাও এক বিরল ব্যাপার হবে। আপা সবকিছু নিয়ে বেশি চেঁচামেচি করে বলে মা তাকে সাবধান করে বলতেন যে, বোবার কোনো শত্রু নাই। সেই মুহূর্তে বাদলের সাথে শত্রুভাব কমানোর জন্য নিতু মায়ের সেই বাণীর সারকথা পালন করছিল। ঘাড় জড়িয়ে ধরে বাদল বলল, “কিছু বলো না কেন নিতু, আমি ভালো মানুষ না, তাই না? তুমি কেমন মানুষ চেয়েছিলে?” নিতুর চোখে পানি এসে যায়।

সে কেমন করে এরকম একটা মানুষকে বোঝাবে যে কেমন মানুষ সে চেয়েছিল! নিতুর চোখের পানি খেয়াল করার সময় বাদলের ছিল না। নিতু টের পাচ্ছিল তার কামিজের নিচে বাদলের হাত ঢুকে যাচ্ছে। ভোরে বাদল দৌঁড়ে এসে নিতুকে ঝাঁকিয়ে ডাকল। নিতু টের পেয়েছিল যে বাদল ঘুম থেকে উঠে বাইরে গেছে, সকালে হাঁটা তার অভ্যাস। রাতে ঘুমানোর আগে বলেছিল যে খুব ভোরে তাকে উঠতে হয়, না হলে নাকি সে মারা যাবে। ভোরের পরে বিছানা নাকি কাঁটার মতো হয়ে যায়, কাঁটাগুলো সমানে তার পিঠে খোঁচা দেয়।

আর তার সাথে থাকতে হলে নিতুকেও এই অভ্যাস করতে হবে, সকালে উঠতে হবে। আজ ভোরে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে সে বলেছিল, “নিতু, এটা তোমাদের বাড়ি, ঘুমিয়ে থাকলে থাকতে পার কিন্তু আমাদের বাড়িতে যাওয়ার পরে এসব চলবে না। বাড়ির বৌ এভাবে সূর্য ওঠার পরেও পড়ে পড়ে ঘুমাবে, ইম্পসিবল্!” রাতে বাদল ঘুমিয়ে যাওয়ার পরেও নিতু অনেকক্ষণ ধরে নখ দিয়ে খাটের পাশের দেয়ালের ওপর আঁচর কাটছিল। সাদা দেয়ালের চামড়া ছোট ছোট টুকরো হয়ে মেঝের উপরে চাক চাক পড়ে ছিল।

তখন নিতুর চোখ ভরা ঘুম। আর তাছাড়া এই ঘন কুয়াশার ভেতরে মেঘে ঢাকা সূর্যকে টেক্কা দেয়ার জন্য উঠে পড়ার প্রশ্নই ওঠে না। তবু বাদলের ঝাঁকানিতে নিতু লাফিয়ে ওঠে। “কী হয়েছে?” “নিতু তোমার ভাই তো একটা ভয়ানক জিনিস!” “কেন? কী করেছে সে?” “সে যেন তার ঘরে কাকে লুকিয়ে রেখেছে, তোমরা জানো না।” “কী যে সব বলছেন সকাল সকাল!” “আমি ঠিকই বলছি। বারান্দায় হাঁটতে গিয়ে স্পষ্ট শুনলাম ভেতরে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। দরজায় টোকা দিলাম, আলাপ বন্ধ।” “ভাইয়া হয়ত টিভিতে কোনো সিনেমা দেখছে।” “এই ভোরবেলা কেউ সিনেমা দেখে? তাহলে আমি টোকা দেয়ার পরও দরজা খুলল না কেন?” “হয়তো দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছে আর দরজার শব্দ শুনতে পায়নি।” “শোনো নিতু, তোমার পরীক্ষা শেষ হলেই আমি তোমাকে নিয়ে যাব। এ বাড়ির অবস্থা ভালো না।

বিয়ের দিন একপাল ছেলে হুড়মুড় করে ঢুকে গেল, এখন আবার কোন ঘোগের বাসা বানিয়ে রেখেছে ঘরের মধ্যে- কখন যে কী হয়। আমার তো এখনই চলে যেতে ইচ্ছে করছে। ভেবেছিলাম শণিবার নাইট কোচ ধরব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আজকেই চলে যাই।” নিতু মনে মনে ভাবল, ভালোই হয়েছে, শাপে বর হয়েছে। ভয় পেয়ে বাদল যদি আর না আসে, সেটাই ভালো। মনে মনে নিতু ভাইয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ। বাদলের দিকে তাকিয়ে দেখল বিছানায় পা ঝুলিয়ে চিন্তিত মুখে বসে আছে, মুখে ভয়ের ছাপটাও স্পষ্ট , কপালে সামান্য ঘাম।

এমনিতে শীতে কাঁপছিল বলে মনে হয় দুদিন থাকার জন্য ব্যাগভর্তি শীতের কাপড় এনেছে। নিতুর অত ঠান্ডা লাগত না কিন্তু ঢাকা থেকে কেউ এখানে এলে শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। বাদল এবার ভাইয়া আর শীত দুটোর ভয়ে ভেগে যাবে ভেবে তার ভালোই লাগল। আর এটা ভাবতেও মজা লাগল যে লোকটা এমনিতে সারাক্ষণ খুব হম্বিতম্বি করে কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব ভীতু। বাদলের দিকে তাকিয়ে থাকলেও নিতুর মাথায় ভাইয়ার ঘরের ব্যাপারটা ঘুরছিল। এক মাস ধরে ভাইয়ার ঘরে তালা কেন? তার মনে নতুন করে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। নাস্তার টেবিলে বাবা কিংবা চাচার সাথে কথা বলার সময়ে মনেই হতো না যে বাদল নিতুর সাথে এমন চেঁচামেচি করে কথা বলতে পারে। তাদের সবার সামনে ভেজা বেড়াল হয়ে থাকত। বললেও কেউ বিশ্বাস করত না সে নিতুর সাথে কীভাবে কথা বলত।

কেউ মনে হয় তাকে বিয়ের রাতে বেড়াল মারার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছিল, প্রয়োগ করেছিল নিতুন উপরে। বাবা আর চাচাকে ভাইয়ার ঘরে ভোরের আলাপ-আলোচনার বিষয়টা বাদলের বলার ইচ্ছে ছিল। খুব নিরিহ মুখ করে শুরু করেছিল, “আমার আবার সকালে হাঁটার অভ্যাস। তো আজ সকালে বারান্দায়-” ঠিক সেই সময়ে ভাইয়া রান্নাঘরে এলো আরেকটা রুটি নিতে। ভাইয়াকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বাদলের। ’বারা-ন্দা-য়’ বলার পরে মুখ আর বন্ধ হয়নি, হা হয়ে ছিল।

চাচা বললেন, “বারান্দায় হেঁটেছ?” সে জ্ঞান ফিরে আসার মতো তাড়াতাড়ি বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বারান্দায় খুব কুয়াশা ছিল।” রিংকু এক ঝলক তার দিকে তাকিয়ে না দেখার ভান করে রুটি নিয়ে চলে গেল। এমনিতেও রিংকু বাবার সাথে খেতে বসে না। তাই বিষয়টা কেউ ধরতে না পারলেও বাদল ঠিকই ধরেছিল যে তাকে একটা ওয়ার্নিং দেয়া হয়ে গেল। বাদলের এত সাহস নেই যে রিংকুকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে। সেদিন দুপুরের পরে ঋতু নিতুর বর দেখতে এলো। ঋতুকে দেখেই বাদল অবাক হয়ে গেল, “এ কী! এ তো দেখি একদম ফটোকপি!” বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেও ঋতু বাদলের মধ্যে খারাপ লাগার মতো কিছুই খুঁজে পেল না। মনে মনে খুশিই হলো নিতুর জন্য।

আর যাবার সময়ে নিতুর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “বিশ্বাস কর, আমি খুব টেনশনে ছিলাম। তোর বরকে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। চেহারাটাই সব নয় নিতু, মানুষটা ভালো হলেই হলো। মন খারাপ করিস না।” নিতু ঠিক করল আর কাউকে কিছুই বলবে না। বলে কোনো লাভ নেই। বাদল খুব ভয় পেলেও একটা কিছুর টানে সে রাতেও রয়ে গেল, সন্ধ্যা হতে না হতেই ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিল, শীতে সে নাকি জমে যাচ্ছিল। বাদলের কথা প্রলাপের মতো মনে হলেও, ভাইয়ার বদলে যাওয়া অনেক আচরণের সাথে মিলিয়ে তার ঘরে কারো থাকার সম্ভাবনাটা নিতু কিছুতেই মাথা থেকে উড়িয়ে দিতে পারল না। পরদিন বাদল চলে গেলেও নিতু কড়া নজর রাখছিল ভাইয়ার ঘরের উপরে।

কোনো প্রয়োজন ছাড়াই সে খামাখা বারান্দার ওই কোণে দাঁড়িয়েছিল, কান পেতে শোনার চেষ্টা করছিল, বই নিয়ে বারান্দার এমাথা-ওমাথা হাঁটছিল। কিছুই ধরতে পারনি তবু। তবে কয়েকদিন পরে এক দুপুরে ভাইয়ার ঘরের দরজায় নিতু প্রায় নাক লাগিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ দরজার দুটো কপাট হাট হয়ে খুলে গেলে নিতু চমকে ওঠে, আর একটু হলে ভেতরের দিকে পড়ে যাচ্ছিল। হাতের বই মেঝেতে, নিতু ঝুঁকে ওঠায়ওনি, ভাইয়া সোজাসুজি তাকিয়ে ছিল দুই কপাটে দুই হাত দিয়ে। “অ্যাই তুই এখানে কী খুঁজিস?” “কিছু না, ভাইয়া।” “শোন, যা খুঁজছিস সেটা নেই, চলে গেছে।” “চলে গেছে মানে?” “চলে গেছে মানে চলে গেছে। অভি আর নিরু ভাইকে লুকিয়ে রেখেছিলাম আমার ঘরে, প্রায় দেড় মাস। নাম শুনিসনি? ডঃ মিলনকে যারা গুলি করল। তোর বর টিকটিকির মতো লেগে গেল। শীতের ভেতর মধ্যরাতেও শালা আমার ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকল। এরপর আর রিস্ক নেয়া যায়? শালা যদি পুলিশে খবর দিত! নিজেকে শালা ম্যাকগাইভার মনে করছিল, তারটার কিছু একটা দিয়ে আমার ঘরের দরজা খোলার চেষ্টা করল কয়েকবার। দুদিন খুব ঝামেলা করল শালা টিকটিকি। তাই ওদের জন্য আবার নতুন জায়গা খুঁজে বের করতে হলো, বুঝলি? আর তুই এখন খামাখা বায়োনিক ওম্যানের মতো আমার ঘরের দরজায় কান পেতে আছিস।” নিতু কোনো জবাব না দিয়ে হা করে শুধু শুনল।

সারা বাংলাদেশের পুলিশ যাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে, ডঃ মিলনের খুনী সেই অভি আর নিরু তাদের বাসায় নিতুর ঘরের মাত্র কয়েক ফুট দূরে আরাম করে দেড় মাস কাটিয়ে গেল! হিমশীতল মেঘলা দুপুরেও নিতুর গলার কাছে ঘাম জমে গেল। বাবা জানলে কী হতো? আর পুলিশ জানলে? বাদলের কথাটা কানে বাজে, তোমার ভাইয়া তো ভয়ানক জিনিস! বাদল কি পুলিশ পাঠাবে তাদের বাসায়? কে জানে! সে ভেবেছিল বাদল সন্দেহপ্রবণ আর কথায় কথায় জেরা করা বাদলের অভ্যাস, তাই এসব আবোলতাবোল বকছে। কিন্তু তখন রিংকু বলাতে তার মুখ সাদা হয়ে যায়। তাকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিংকু মুখের সামনে তুড়ি মেরে বলল, “কী রে, কী হলো? স্ট্যাচু অফ লিবার্টি হয়ে গেলি নাকি?” নিতু কোনোরকমে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ঘরে ফেরত এলো। শীতে আর ভয়ে। ১০ নিতু যা ভেবেছিল তাই, বাদল আর আসেনি তার পরীক্ষার আগে।

ফোন করেছিল অনেকবার, বারবার দিনের হিসাব শোনাত নিতুকে। ঠিক কতদিন পরে, কোন সময় সে এসে নিতুকে নিয়ে চলে যাবে এই কথাটা যে সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কতবার বলত তার সীমা নেই। নিতু চুপচাপ শুনত, মনে মনে ভাবত, কয়েকদিনের ভেতরে এই শহরে কি সারাদেশে একটা কোনো লন্ডভণ্ড কাণ্ড হয়ে যেতে পারে না যাতে তার যাওয়া পিছিয়ে যায়? এই তো কদিন আগেই শুনেছিল একটা উল্কাপি- নাকি গ্রহাণুপুঞ্জ ধেয়ে আসছে, এসে সোজা পড়বে পৃথিবীর ওপরে আর তারপরে চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যাবে না কোনোকিছুর।

তা-ই না হয় হোক! সবাই মরল, নিতুও মরল, সেটাই ভালো। দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও তেমন কিছুই ঘটেনি। সারাদিন মাথা গুজে পড়াশোনা করার পর বিকেলের দিকে মাথা ঠান্ডা করতে নিতু ছাদে যেত। বেশিরভাগ দিনেই সূর্য মেঘের আড়ালে, দিনের বেলায়ও ঘন কুয়াশায় চারদিক থমথমে হয়ে থাকত। আকাশের দিকে কয়েক ফুট পরে আর কিছুই নজরে আসত না। কেবল রহস্যময় ধূসরতা, দেখলে মনে হতো একটা ভারী কোনো ঢাকনা দিয়ে নিতুদের বাড়ির চারদিকটা ঢাকা। কল্পনা করতে ভালো লাগত এই ঢাকনার বাইরে কিছু আছে, দূরে। কিন্তু কোথায় বা কী- ততদূর নিতু কল্পনা করতে পারত না। ধূসর আকাশ দেখলে তার কেবলই মনে হতো একটা পুরো আকাশের রহস্য তখন তার জীবনে। সামনে কী আছে তার কপালে, সে কিছুই জানত না। নিতুর মা বেশ কয়েকবার রিংকুকে বলেছিল, “রিংকু, একবার বাদলদের বাড়ি গিয়ে দেখে আয় না কেমন বাড়িঘর-” “কেন?” “বাহ্, নিতু দুদিন পরে সেখানে যাবে না? তুই আগে থেকে দেখে আয় একটু।” “তো তোমরা কিছুই না দেখেশুনে ওর বিয়ে দিলে কোন দুঃখে? ও কি ঋতুর মতো পালিয়ে যাচ্ছিল?” “না তা তো যায়নি, তোর বাবা বলল ভালো পাত্র পেয়েছে।”

“তাহলে তো হয়েছেই, এখন আমি গিয়ে দেখে এসে কী করব?” “আশ্চর্য, তুই ওর বড় ভাই, ওকে নিয়ে তোর কোনো ভাবনাচিন্তা নেই?” “আমি ওই টিকটিকির বাড়িতে যেতে পারব না।” “টিকটিকি মানে?” “সে তুমি বুঝবে না।” নিতুর মা কিছুই বুঝতে পারেননি, বোনের নতুন বরকে একজন টিকটিকির মতো ছাদে হামাগুড়ি দেয়া একটা প্রাণী মনে করছে কেন, এই ব্যাপারটা তার কাছে পরিষ্কার হয়নি। তিনি যেমন কখনই রিংকুর মতিগতি বোঝেন না তাই এই কথাকেও তেমন দুর্বোধ্য একটা কিছু ভাবতে তার কোনো অসুবিধা হয়নি। কী আর করা, নিতু নিজে গিয়েই তার শ্বশুড় বাড়ির সব অবস্থা জানবে, তার আগে জানার কোনো উপায় নেই। তবু তিনি এটা জেনে খুশি যে নিতু চলে যাওয়ার আগে তার বাবা আর চাচা মিলে যে বিদায় অনুষ্ঠান করবে বলে ঠিক করেছে সেখানে বাদল তার মাকে নিয়ে আসবে।

সুতরাং অন্তত নিতুর শাশুড়িকে দেখলেও মায়ের মনটা কিছুটা শান্ত হবে। একটা আন্দাজ তো করতে পারবেন যে নিতু কোথায়, কেমন পরিবেশে, কার কাছে থাকবে। অনুষ্ঠানের আগের দিন যথারীতি উঠোনে আর ছাদে সামিয়ানা টাঙানো হলো। বাসার ছাদ থেকে তার ফেলে ঝুলানো হলো লাল-নীল ছোট বাতি। উঠোনের মাঝখানে একটা বাঁশ থেকে দড়ি চলে গেছে চারদিকে। দড়িতে নানান রঙের কাগজের ত্রিভূজ বাতাসে পতপত করে উড়ছিল। নিতুর বাবার আপত্তি সত্বেও চাচা অনুষ্ঠানের প্রায় পুরো খরচ জোর করে ধরিয়ে দিলেন, বারবার বলতে থাকলেন, “আমার একটা মেয়ে থাকলে কি আমি করতাম না ভাইজান? আর নিতু তো আমারই মেয়ে।”

এসব কথা শোনার পরে নিতুর বাবা আর আপত্তি করলেন না। উঠোনের একধারে তিনদিকে দুটো করে ইট রেখে চুলা বানানো হলো। ভোরবেলা থেকে সেই চুলায় বাবুর্চিরা বড় বড় হাড়ি চড়িয়ে রান্না শুরু করে দিলো। নিতু পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকে বাড়িতে বসে বসে দুঃস্বপ্নের প্রহর গুনছিল। বারান্দায় এসে দেখল ধোঁয়ায় পুরো উঠোন ভরা, কিছুই দেখা যায় না। ধোঁয়া আর কুয়াশায় মাখামাখি উঠোনের দিকে নিতু জলভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। কাঠ দিয়ে চুলায় আগুন ধরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু আগুন কিছুতেই জ্বলছে না, জ্বলতে জ্বলতে বারবার নিভেও যাচ্ছে। এই অপচেষ্টায় কেবল ছাইরঙা ধোঁয়ায় নিতুদের উঠোন ভরে গেছে। কুয়াশায় সব চ্যালা কাঠ ভিজে জবজবে হয়ে আছে, চাচা উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন খুব চিৎকার করছে। বিষয়, কাঠগুলো কাল কিনে এনে উঠোনে এভাবে খোলা ফেলে রাখা হয়েছে কেন। এদিকওদিক ঘি আর মশলার গন্ধ ছড়িয়ে আছে। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ধোঁয়ার ভেতরে দাঁড়িয়ে সকাল থেকে তামাশা দেখতে লেগে গেছে। কেউ কেউ আবার মাঝে মাঝে দৌঁড়ে এসে নিতুকেও দেখে যায়। বিয়ের সাথে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার একটা সম্পর্ক আছে তা তারা ইতিমধ্যে জেনে গেছে। তাই নিতুর মন খারাপ করে থাকা তাদের কাছে স্বাভাবিক। চাচি পেছন থেকে এসে নিতুকে জড়িয়ে ধরল।

মুখ না দেখেই চাচি বুঝে গেছে সে একটু সান্ত¦না চায়। বলল, “নিতু দেখ, এবারে আয়োজন করে তোমার বিয়ে হচ্ছে, রান্না হচ্ছে, দেখ ডেকোরেটরের লোকজন ছাদের উপরে চেয়ার সাজাবে একটু পরে, মানুষজন আসবে, খাওয়া-দাওয়া হবে। আর মন খারাপ করে থেক না। কাল তো আমাদের ছেড়ে চলেই যাবে, আজকের দিনটা একটু হাসিখুশি থাক।” নিতু চাচির কথার কোনো জবাব দেয়নি। তার আরও বেশি কান্না পেল। চোখ মুছে চাচির শরীর জড়িয়ে নিচে উঠোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। পেছন থেকে ঋতুও এসে তাদের দুজনকে জড়িয়ে ধরল। তারপর তিনজন মিলে কাঁদে তারা। নিতুর কাছে মনে হলো, এসব অর্থহীন, সবকিছু সাজানো, এই বিয়ে আর এখন আবার অনুষ্ঠান, সমস্ত কিছ শুধু নিতুকে কষ্ট দেয়ার জন্য যদিও সে কারও কোনো ক্ষতি করেনি। বাসার কাউকে আর আপন মনে হতো না নিতুর কাছে।

অথচ তাদের ছেড়ে চলে যেতে হবে ভেবে এক জনম কেঁদে কাটাতে ইচ্ছে হতো। যে বাবার উপরে এত রাগ, তাকে ফেলে চলে যেতে হবে বলেও খারাপ লাগছিল। চাচা কোত্থেকে এসে বলল, “আরে, তোমরা কী শুরু করলে, একটু পরেই তো বাদল তার মাকে নিয়ে চলে আসবে, নিতুকে তৈরী কর!” ওপর থেকেই দেখা যাচ্ছিল ব্যস্ততার মাঝে আজ অনেক দিন পরে নিতুর বাবা বিভিন্ন কাজের জন্য রিংকুকে ডাকছেন, রিংকুও দৌঁড়ে দৌঁড়ে আসছে, কাজকর্ম তদারকি করছে। কতদিন পরে বাবা ভাইয়ার সাথে কথা বলল নিতু মনে করতে পারছিল না। এটা একটা আনন্দের ব্যাপার হতে পারে কিন্তু সেটা দেখেও নিতুর কেবলই কান্না পচ্ছিল। নিতুর চাচিদের দিকে একটা ঘর গোছগাছ করা হয়েছে বাদলের মায়ের জন্য। আসার পরে তাকে প্রথমে অবশ্য নিতুদের দিকেই বসানো হলো। দেখলে মনে হচ্ছিল সারাক্ষণ তিনি নাক সিটকে বসে আছেন।

নিতুকে দেখে এক ঝলক খুশির রেখা দেখা গেল তবে একটু পরে আবার তা মিলিয়ে গেল। মনে হলো টেনশনে পড়লেন, ছেলের বৌ এত সুন্দর হয়েছে, এটা ঠিক ভালো হলো কি না, তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। বেশি সুন্দরীরা আবার কোনো কাজের হয় না, সারাটা দিন ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসেই তাদের সময় কাটে। নিতু লক্ষ করল ঘরে যখন নিতু ছাড়া কেউ নেই তখন তিনি বাদলকে বলছেন, “তুই তো কইছিলি এর ভাইবোন সব পলাইয়া গেছে। এখন আবার আইল কেমনে? খালি চেহারা দেইখা বিয়া করলি? ভাই তখন কইল শহরের উপ্রে দোতলা বাড়ি, এখন তো দেখি একদম ভাঙাচুরা।” নিতুর উপস্থিতি তিনি গ্রাহ্যই করলেন না। এমনিতে কথা বলেননি দেখে সবাই ভাবল তিনি ক্লান্ত।

শুধু নিতুর কাছেই ধরা পড়ল যে বাবা তার হাত-পা বেঁধে তাকে কোন গর্তে ফেলে দিয়েছেন। সিনেমার ডায়ালগের মতো বলতে ইচ্ছে করল, বাবা, তার চেয়ে আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলেননি কেন? রাতে যখন অতিথিদের খাওয়ানো হচ্ছিল, ঋতু একটা মনমরা ভাব নিয়ে এসে নিতুর পাশে বসল, “নিচে দেখলাম তপুর বাবা-মা এসেছে। চাচা দাওয়াত দিয়েছেন হয়তো।” নিতু চমকে ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তপু ভাই এসেছে?” বলার সময়ে সে জানে তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। নিজেকে তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক করার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ঋতু একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “নাহ্।” “আপা, তুমি আশা করেছিলে যে তপু ভাই আসবে?” “আমি তো জানিই না যে ওদের বাড়িতে দাওয়াত দেয়া হয়েছে।” “তোমার কি তপু ভাইয়ের কথা মনে পড়ে, আপা?” “না।” ছোট্ট ’না’ জবাবটা দিতে ঋতু বেশ সময় নেয়, যেন একটু ভেবে বলতে হয় তাকে। বলার পরেও অজানা একটা ভাবনাকে অনুসরণ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর নিতু কৌতুহলী চোখ ঋতুর মুখের উপরে স্থির করে রাখে। সেখানে কিছুই পায় না। নিতু আবার বলা শুরু করে, “আপা, তপু ভাই তোমাকে অনেকবার খুঁজতে এসেছিল। তুমি বলতে মানা করতে তাই বলিনি। শেষ এসেছিল যেদিন তুমি চলে গেলে।” “জানি।” “কী করে জানো?” “তপু আমাকে একটা চিঠি লিখেছিল।”

“কোথায়?” “ঢাকায়, রতনের মামার বাসার ঠিকানায়। আমি জানি না, যে ঠিকানা আমরা সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখলাম সেটা তপু কী করে বের করে ফেলল। চিঠিতে লিখেছিল যে সে তখনও আমার অপেক্ষায় আছে। আমি চলে যাওয়ার দিনে এসেছিল তারপর চাচাকে নিয়ে আমাকে খুঁজে বেরিয়েছে, এসবও লিখেছিল।” “তুমি উত্তর দাওনি?” “না, সেই চিঠির কোনো উত্তর হয় পাগলি? আমি তো রতনকে বিয়ে করেছি ততদিনে। রতন আমাকে ভালোবাসে, আর কতজনকে ঠকাব বল!” “তুমি সুখে আছ, আপা?” “হ্যাঁ, তুইও সুখী হবি, দেখিস।” আপার মুখে ’সুখী হবি, দেখিস’ শুনে নিতুর সামনে বাদল আর তার মায়ের মুখ ভেসে উঠল।

ভেতরে ভেতরে একটা দীর্ঘশ্বাস দানা বাঁধলেও আপার সামনে তা গোপন করল। নিতুর শাশুড়ি এমনিতে কোনো কিছুতেই খুশি না, মুখ দেখলে মনে হচ্ছিল তার কেবলই বিরক্ত লাগছে, বাবুর্চিদের রান্না ভালো হয়নি বলেও বেশ কয়েকবার মন্তব্য করা হয়ে গেছে। “এই তরকারি তোমরা খাও কেমনে, খালি ঝোল, তরকারিতে এত পানি দেওনের দরকারটা কী পড়ল? মনে হয় যেন সাঁতরাইয়া খাইতে হইব।” “এখানকার তরকারি আসলে এমনই।” “সেইটাইতো কই, আজব রুচি এইখানকার মাইনষের।” “আপনার কষ্ট হচ্ছে, মাকে বলব ভুনা করে রাঁধতে।” “কইও। আমার তো শরীরটা ভালো ঠেকে না, আইজ কাইলের মধ্যে বাসে উঠা সম্ভব না। দুই-তিন দিন পরে যাব।”

“জি, আমি বলে দেব।” মাথা নিচু করে সায় দিলেও নিতুর অদ্ভুত লাগছিল। এরা তাড়াতাড়ি বাসা থেকে চলে গেলেই সে বাঁচে। তাতে করে তাকেও চলে যেতে হবে, সে জানত। কিন্তু এখন যতবার তার শাশুড়ির ব্যাবহারে মা অথবা চাচি বিব্রত হচ্ছেন, ততবার সে নিজেই যেন লজ্জিত। যদিও এতে তার কোনো হাত নেই বরং আরও বেশি করে গলা ফাটিয়ে বলতে পারত যে দেখ, তোমরা আমাকে কোথায় পাঠিয়ে দিচ্ছ। কিন্তু তেমন কিছুই করতে ইচ্ছে হয়নি। বেশ অস্বস্তি লাগছিল। রাতে বাদল ঘরে আসার আগে শাশুড়ি নিতুকে বলে, “তোমার চাচার তো কোনো পোলাপাইন নাই, তো বাড়িঘর তো মনে হয় তোমরাই পাইবা, নাকি?” “জি, আমরা তো একসাথেই থাকি।” “এখন তো একসাথেই রইছ। আমি কইতেছি, চাচার মরণের পরে তোমরা ছাড়া আর তো কেউ নাই সম্পত্তি দাবি করার।” “না, তা তো নাই।”

“তোমাদের ভিতরে মাইয়ারা সম্পত্তি পায় তো? নাকি আবার তোমার ওই মস্তান ভাইটাই সব নিয়া নিবে?” “আমি আসলে এসবের কিছু জানি না।” “জানো না মানে? জানতে হইব। স্বামী মারা যাওয়ার পরে এতবছর বাপের বাড়িতে সব সম্পত্তি আমি আগলাইয়া বইসা আছি না? না হইলে বাদলারে পড়ালেখা করাইতে পারতাম?” চুপ থাকা ছাড়া নিতুর কিছু করার ছিল না কারণ এইসব জটিল বিষয় নিয়ে তার ভাবেনি আগে। এখন এসবের উত্তর কী দেবে। তিনি হয়ত অনেক ঠেকে শিখেছেন, রাতারাতি নিতুর পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। তাই চুপ করে থাকাই নিতুর কাছে সহজ মনে হলো। তবু অবাক লাগল, এ বাড়িতে যে তিনি অতিথি তা মনেই হয় না। যেন কতদিনের পরিচিত, অনায়াসে সোজা বৈষয়িক ব্যাপারে নাক গলাতে পারেন। কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, বাদলের মায়ের ব্যাবহারে তার লজ্জা পাওয়ার কী আছে!

অথচ তার লজ্জা লাগছিল। বাদল এসে বলল, “প্রেশারের ওষুধ খাইছ মা?” “হ্যাঁ।” “তোমার কোনো সমস্যা নাই তো? কিছু লাগবে?” “না কিছু লাগবে না।” “চল তাইলে তোমারে ঘরে দিয়া আসি।” “চল।” তারা চলে গেলে নিতু একটু সহজ হয়ে বসল। সেই প্রথম তাদের দুজনের মধ্যে একটা ভালো কিছু তার চোখে পড়ল। বাদল তার মায়ের ব্যাপারে খুব সচেতন। এমন করে কথা বলছিল, যেন বাদল নয়, চোখ-মুখ খুব আদুরে হয়ে যায়। সবসময় নিতুর কাছে যে হম্বিতম্বি করে আসছিল, মায়ের সাথে কথা বলতে গেলে তেমন না।

বেশ মিষ্টি গলাও একটা তাহলে বাদলের ছিল। সারাদিন লোকজন নিতুর ঘরে এসে তাকে দেখে গিয়েছে। সবাই শুভকামনা জানিয়ে গেছে। বেশিরভাগ সময়ে শাশুড়ি পাশে বসে ছিলেন। নিতুর সৌভাগ্য যে কারও সামনে তিনি তেমন মুখ খোলেননি। বাদল ছাড়া আর কারও জন্য তার তেমন কোনো হাসিমুখ বা মিষ্টি ভাষা নেই হয়তো। তিনদিন পরে শেষপর্যন্ত সেই সময় এলো যে নিতু সত্যিই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। ঋতু আগের দিন এসে সব গোছগাছ করে দিয়েছিল। নিতুর তেমন কোনো কাজ ছিল না বসে বসে মন খারাপ করে থাকা ছাড়া। দুপুরে মনে হলো এত বেশি কান্না পাচ্ছে বরং একটু ছাদে যাওয়া যাক। ছাদে ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে সেখানকার আগের অনেক ঘটনা ছবির মতো চোখের সামনে আসছিল। সিঁড়িঘরের যেদিকে ছায়া পড়ে সেখানে দাদি বেঁচে থাকতে তাদের পিকনিক হতো। দাদি, ঋতু আর নিতু।

রিংকু শুধু খাওয়ার সময়ে দৌঁড়ে আসত। পুরোনো লোহার কড়াইয়ের উপরে দাদির হাতে বানানো মাটির চুলায় রান্না হতো শুধু তাদের তিনজনের জন্য। কড়াইয়ের কানদুটো ধরে বাতাসের গতিবিধি অনুযায়ী চুলাকে এদিকসেদিক টেনে নিয়ে যাওয়া যেত। ঋতু আর নিতু অসীম উৎসাহে নিচে মায়ের রান্নাঘর থেকে চ্যালাকাঠ টেনে নিয়ে আসত। পানি, ডাল-চাল যা লাগে বয়ে বয়ে এই ছাদের উপরে আনতে হতো। দাদির হাতের সেই খিচুড়ির স্বাদ এখনও নিতুর মুখে লেগে আছে। যেদিন খিচুড়ি রান্না হবে সেদিন আগেই নিতুর মাকে দাদি বলে দিত, “আইজ কিন্তু আমাদের তিনজনার রান্না করার দরকার নাই, বউ, আইজ আমরা জুদা হইলাম।” তারপর ছাদের ওপরে পিকনিক।

যতক্ষণ চুলায় আগুন, তাদের দুই বোনোর উৎসুক দুই জোড়া চোখ হাড়ির হলুদ বুদবুদের উপরে স্থির। আর দাদির হাতে বাঁশের চোঙা, থেকে থেকে চুলার আগুনে ফু দিতে ব্যস্ত। মুখ সরিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে লালচে চোখের পানি মুছে মুচকি হাসত দাদি। নিতুর কাছে সে হাসির অর্থ ছিল, এই তো হয়ে গেল, আর একটু! দাদি যখন ঘোষণা দিত, ‘যাও এইবার প্লেট নিয়াইসো,’ সিঁড়িতে দুই বোনের হুড়োহুড়ি লেগে যেত। তারপর ছাদের ওপরে বসে খাওয়া। খাওয়ার সময়ে দাদি তার জীবনের অনেক আগের কোনো গল্প বলত। বিয়ের পরে প্রথম প্রথম রান্না করতে কেমন কষ্ট হতো, শাশুড়ি রান্না খেয়ে কী বলত, কোনদিন কী পুড়ে ছাই হলো, বাসায় কেউ খেতে পারল না- নানান সফলতা আর লজ্জার কাহিনী। সেসব কথা বলার সময়ে তার মুখটা হয়ে যেত একবারে লাজুক কিশোরীর মতো। সব গল্পের শেষে একটু হেসে বলত, “আল্লাহ্ যা করে ভালোর জন্যই করে, বুঝলেন আপুরা?” ছোট্ট হাত দিয়ে উত্তপ্ত খিচুড়ি লোকমা বানিয়ে মুখে পুরতে পুরতে নিতু দাদির মুখের লালচে মেঘ দেখত। চুলার তাপে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠা কুচকানো চামড়া দেখতে কেমন টানটান লাগত! দাদির গল্প, খিলখিল হাসি আর দীর্ঘশ্বাস এই ছাদে তখনও ভাসছিল।

নিতু যেন সামান্য লাফিয়ে লাফিয়ে মুঠোর মধ্যে ধরতে পারবে তাদের। আবার হয়তো আপা চিৎকার করে নিতুকে ডাকছে, ধেয়ে আসা শব্দতরঙ্গ নিতুর কানেই যাচ্ছে না। কোন চিন্তায় ডুবে হা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আপা এসে হয়তো বেণি ধরে টেনে বলছে, “কী রে ডাকছি কখন থেকে, কথা কানে যায় না?” আপার পেছনে ছুটছে তাকে ধরার জন্য সারা ছাদময়। নিচের বারান্দায় মুখে শেভিং ফোম লাগানো ভাইয়া মাথা বাড়িয়ে বলছে, “তোরা কী শুরু করলি, ছাদ মনে হচ্ছে ভেঙে পড়বে।” কোনোদিন মরিচের গুড়ো আর লবণ বাটিতে নিয়ে ঋতু এসে বলত, আয় পেয়ারা খাই। সেদিন নিতুর মুখে পেয়ারার স্বাদ বেড়ে যেত; বলত, “সত্যি আপা, নিচে গিয়ে সেই রান্নাঘর থেকে এসব আনতে ইচ্ছে করে না, এমনিতেই খাই কিন্তু মরিচ দিয়ে ভীষণ মজা লাগছে।” ঋতু রাগ দেখিয়ে বলত, “অলস কোথাকার, নিচে গিয়ে লবণ-মরিচ এনে খাবি- তা-ও পারিস না!” ভাইয়া ছোটবেলায় সিঁড়িঘরের ছায়ায় বসে তারে টাঙানো ঘুড়ির সুতোর মধ্যে হাত দিয়ে ঘষে ঘষে কী যেন সব লাগাত।

নিতু হাত দিতে গেলেই ধমকে উঠত। সেই ধমকটা এখন কানে বাজত। আবার একটু পরে নিতুর ছোট হাত সামনে বেড়ে গেলেই চোখ পাকিয়ে বলত, “অ্যাই, আবার? কাঁচের গুঁড়ো আছে, বলেছি না?” একবার পাড়ারই একটা কাঠের ফার্নিচারের ছোট ফ্যাক্টরিতে গিয়ে নিতু হাতে করে সেখানে পড়ে থাকা লম্বা একটা কাগজ এনেছিল। শক্ত কাগজটা বাদামি রঙের, ওপরে বালু আর আঠার মতো কিছু লাগানো, ঘষা দিলেই যেন চামড়া উঠে যাবে। কেন যেন সেটা দেখে মনে হয়েছিল ভাইয়ার ভালো লাগবে। বাড়ি ফিরে ভাইয়াকে দেয়ার জন্য খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে দেখে ছাদে বসে সে ঘুড়ির সুতোয় মালিশ করছে। নিতুর হাতে সেই কাগজটা দেখে ভাইয়ার সে কী খুশি! হাত বাড়িয়ে নেয়ার সময় বিস্ময়ে চোখ গোল গোল করে বলেছিল, “শিরীষ কাগজ! কোথায় পেলি, নিতু?” তারপর নিতুর উপরে খুশি হয়ে তাকে সুতোয় মালিশ করার আঁঠালো জিনিসটা একটু ছুঁতে দিয়েছিল। নিতু ধরে দেখেছিল কেমন শক্ত শক্ত আঠা, দানাগুলো আঙুল থেকে ছাড়ছেই না। একটুও মজা লাগেনি, হতাশ হয়েছিল সে।

আবার হয়তো রোদের মধ্যে খুব জোরে হঠাৎ বৃষ্টি এসে গেল; নিচের উঠোন থেকে চিৎকার করে চাচি বলছে, “নিতু ছাদে আমার শাড়ি, ইস্ ভিজে গেল, দৌঁড়ে যাও তো-” নিতু দোতলা থেকে বড় বড় লাফ মেরে, একবারে তিনটা-চারটা সিঁড়ি ভেঙে এসে দেখে পাশাপাশি দুটো তারে ’এম’ অক্ষরের মতো করে মেলে রাখা চাচির কড়কড়ে শুকনো শাড়িতে ফোটা ফোটা বৃষ্টির পানি পড়ে বলপ্রিন্টের মতো হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি তার থেকে শাড়ি ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে ঝোড়ো বাতাসে নিতুর সারা শরীরে শাড়ি পেঁচিয়ে গেল। বাতাসের ঝাপটায় চোখও খোলা গেল না। দ্রুত শাড়ির প্যাঁচ খুলতে গিয়ে চাচির গলা আবার শুনতে পেল, “নিতু শাড়ি এনেছ?” ’আসছি’ বলে চিৎকার করে নিতু শাড়ির এলোমেলো প্যাঁচসহই বাড়ন্ত বৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে সিঁড়িঘরের দিকে দৌড়াল। হাজার হাজার মুহূর্তকে একটিমাত্র ফ্রেমে বেঁধে রাখলে দেখতে যেমন হবে নিতুর সামনে তখন সেই ফ্রেমটা ঝুলছিল। এই ফ্রেমটা খুব গোপনে সেখান থেকে সে সাথে নিয়ে যাচ্ছিল। একেবারে অদৃশ্য জিনিস, কেউ জানবে না, সে না চাইলেও তার সাথে এটা চলে যাবে। হয়তো কখনও অব্যাবহারে উপরে ধুলো জমে যাবে, তাতে কী! সে যখন খুশি বের করে মুছে নিয়ে দেখবে।

ছবিগুলো তার সাথে কথা বলবে, হাসবে, কাঁদবে। এই যেমন তখন বলছিল। একটি ছবিও তো স্থিরচিত্র নয়, হাজার ছবির মধ্যে যখন যেটাকে খুশি সেটাকেই করা যায় গতিময়। মন ভরে দেখা হয়ে গেলে আবার সযতনে গোপন করে ফেলবে। তার এই সতের বছরের জীবনে এছাড়া তো আর কিছুই ছিল না যাকে সে নিজস্ব সম্পদ বলতে পারত। আমলকি আর পেয়ারা গাছে একটি পাতাও অবশিষ্ঠ নেই তখন। কেবল ভৌতিক হাত-পায়ের মতো ডালপালাগুলো চারদিকে প্রবাহমান। খটখটে শুকনো ছাদের কোথাও গালিচার মতো শ্যাওলা নেই। এদিকওদিক ছাদ ফূঁড়ে যে আগাছাগুলো বের হয়েছিল তা-ও অতিথিদের খাওয়ানোর দিন সামিয়ানা টাঙানোর আগে বেশ ভালো করে শিকড়সহ সাফ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও তখনও ঝাড়খণ্ডের কাঠির অর্ধবৃত্তাকার দাগ দেখা যাচ্ছিল। দাগে দাগে কাটাকাটি হয়ে ছিল জায়গায় জায়গায়। নিতুর চোখের পানি ছাদে পড়ার সাথে সাথে ছাদ তার খটখটে শরীরে শুষে নিলো। যেই ছাদ নিতুকে অসংখ্য সুন্দর মুহূর্ত দিয়েছিল তাকে দেবার মতো নিতুর কাছে এছাড়া আর কিছুই ছিল না। মানুষ আসে, মানুষ চলেও যায়, এরকম শুকনো ছাদ পড়ে থাকে, হয়ত কোথাও একটু ক্ষয়ে যায়, তবু বয়সের চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর দাঁড়িয়ে থাকে অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে। শুধু নিতুর কেন, তার মা, দাদি, আপা কিংবা ভাইয়া সবারই কি অগুনতি প্রিয় মুহূর্ত ওই ছাদের ওপরের বাতাসে খেলছিল না? কালবৈশাখী ঝড় দু-একদিন খুব তোড়জোড় করে এসেছিল। মনে হলো বাইরে যেন সব ল-ভ- হয়ে যাচ্ছে।

অনেক তর্জনগর্জন চলল কিন্তু বৃষ্টি আসেনি। শুধু ধুলায় সবকিছু ঢেকে যাওয়াতে চারদিক আরও মলিন, আর বিষণ্ন হয়ে গেল। যখনতখন হু হু বাতাস এসে ধুলাকে উস্কে দিচ্ছিল। ধুলাগুলো ভরহীন উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল। তাদেরও যেন নিতুর মতো দিগি¦দিকজ্ঞানশূন্য হয়ে কোনোদিকে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করত। কিন্তু ধুলা একা একা তো কোথাও যেতে পারে না, উঠতে পারে না, বসতে পারে না, বাতাস তাকে ভাসায় আর নামায়। নিতুকে সাহায্য করার মতো খোলা হাওয়া নেই যা তাকে পলকা করে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, আর কোনোদিন বাস্তব জীবনের কঠিন বেড়াজালে বাঁধা পড়তে দেবে না। রাস্তার পাশে একগাদা ধুলা ঘুরতে ঘুরতে ঘূর্ণীঝড়ের মতো একটা কেন্দ্র বেছে নিয়ে দশবারো ফুট উপরে উঠে গেল। ধুলার সেই ঘূর্ণীর দিকে নিতু একভাবে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ ঘূর্ণী একটু সরে গেলেই রাস্তায় একটা মটর বাইক দেখা গেল।

তপু ভাই আসছিল, সে দিকেই। প্রথমে ধুলার ঝড়ের পেছনে ক্ষীণ হয়ে যাওয়া রাস্তায় মনে হলো আবছা কল্পনা। ধীরে ধীরে ঘূর্ণী দুর্বল হয়ে তপু ভাই স্পষ্ট হলো। নিতুর জীবনে এর মধ্যে কত কিছু বদলে গেল, তবু কয়েক মাসের সব স্মৃতি এক পলকে হাওয়া হয়ে গেল তার। উত্তেজনা উড়ে উড়ে বসা চিকন ধুলার স্তর ফেলে তার সমস্ত বিবেচনা শক্তি আড়াল করে দিলো। লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি, বারান্দা আর উঠোন পেরিয়ে গেটের কাছে যেতে তার একটুও সময় লাগল না। সে আসলে জানেই না কী করে ছাদ থেকে গেট পর্যন্ত চলে এলো। আর দিনটাকে মনে হচ্ছিল যেন তপু ভাইয়ের সাথে সেই পদ্মদীঘিতে যাওয়ার পরের দিনমাত্র! মাঝখানে কিছু নেই, কোনো দুর্ঘটনার কোনো অস্তিত্ব নেই।

গেট খুলে হাঁফাতে হাঁফাতে নিতু বলল, “তপু ভাই, তুমি!” “কেমন আছ নিতু?” “এতদিন পরে আসলে তপু ভাই! এতদিন আসনি কেন?” “আমি তো এখানে ছিলাম না, তোমরা সব ভালো?” “আপা ফিরে এসেছে।” “তাই? আমি ঋতুর খোঁজে আসিনি নিতু। আমি এখন তাকে আর খুঁজি না। তোমাকে বলেছিলাম না, আমেরিকা যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছি, সেজন্য এতদিন ঢাকায় ছিলাম। টোফেল কোচিং করতে হলো, পরীক্ষা তারপর ভর্তি, ভিসা- সেসব অনেক ঝামেলার ব্যাপার। তবে সব শেষ। এইতো কাল রাতে এসেছি বাসায়। এর মাঝে এক-দুই দিনের জন্য এসেছিলাম একবার। আবার চলে গিয়েছি। তো, সাতদিন পরে আমার ফ্লাইট। সবার সাথে দেখা করা দরকার। আজ তোমাকে দেখতে এলাম। ভাবলাম দেখি তুমি সেই পদ্মদীঘির পাড়ে যেতে চাও নাকি। শীতের পাখিরা এখনও নিশ্চয়ই আছে। যাবে?” ভেতর থেকে চাচির গলা শুনতে পাওয়া গেল, “নিতু, রেডি হচ্ছো না? কোথায় গেলে?” নিতুর চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল সে, গালের পানির ধারার উপরে হাত ঘষতে ভুলে গেল। চাচির গলা শুনে তপু অবাক হয়ে বলে, “তুমি কোথাও যাচ্ছ নাকি নিতু? কাঁদছ কেন?” “তপু ভাই, আমার বিয়ে হয়ে গেছে।

আজ আমি চলে যাচ্ছি।” “তোমার বিয়ে হয়ে গেছে?” “তোমার বাবা-মা এসেছিল অনুষ্ঠানের দিনে।” “তাই? তারা জানে না যে আমি তোমাদের চিনি, তাই বলেনি। তাছাড়া আমিও তো আর এখানে ছিলাম না যে জানব। এই কয়েক মাস আসলে খুব ব্যস্ত ছিলাম। করো সাথে যোগাযোগ তেমন একটা হয়নি। ভালো বিয়ে হয়েছে নিশ্চয়ই তোমার।” “তুমি যদি শুধু একটা দিন আগে আসতে তপু ভাই! আমি যেতাম তোমার সাথে।” কথাটা বলতে বলতেই বাদলের মুখ মনে পড়ল। নিজের কথা নিজের কানেই মিথ্যে হয়ে বাজল। নিতু জানত সে কখনও তপু ভাইয়ের সাথে যেতে পারত না। সে জানত সেই পদ্মদীঘিতে তার এ জনমে আর কখনও যাওয়া হতে পারে না। তবু তপুকে সামনে পেয়ে মিথ্যে আফসোসটা জানাতে ইচ্ছে করল। মিথ্যে হলে কী, তার নিজের জানায় সবচেয়ে বড় সত্যি! তাই বলতেই থাকল, “আমার কতবার ইচ্ছে হয়েছিল সেই দীঘিতে আর একবার যাই। দিনের পর দিন ভেবেছি, আজ হয়ত তুমি আসবে আর আমি তোমাকে বলব সেখানে নিয়ে যেতে।”

“এখন তুমি শ্বশুড়বাড়ি যাচ্ছ, সেখানে অনেক নতুন জিনিস দেখবে। মন খারাপ কর না। আনন্দে থেক, কে জানে, ওরকম একটা দীঘি তো সেখানেও থাকতে পারে!” “তুমি আবার কবে আসবে তপু ভাই?” “তিন-চার বছরের আগে তো না। তুমি আজই যাচ্ছ, ব্যস্ত নিশ্চয়ই। আমি তাহলে আসি। ভালো থেক নিতু।” তপু কেন যেন নিতুর শেষ কথা না শুনেই মটর বাইকে স্টার্ট দিয়ে দিলো। নিতুর মুখ থেকে যন্ত্রের মতো বেরিয়ে যাওয়া ভাবলেশহীন ’তুমিও ভালো থেক’ কথাটা আর তপুর কানে পৌঁছায়নি। তার চোখ তখন রাস্তায়, সামনের দিকে। নিতু তপুর চোখের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল, চোখগুলো একটু বিষণœ কি? ১১ সারারাত বাসের ভেতরে থাকা নিতুর জন্য একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। সামনে বাসের ছাদ থেকে একটা ছোট টেলিভিশন ঝোলানো, তাতে চলছিল সিনেমা। মাঝরাতে কেউ কেউ চোখ কচলে সিনেমায় মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছিল।

বাসসহ ফেরি পার হতে হলো। সরকার পড়ে যাওয়ার পরে ভাইয়া যখন বাড়ি ফিরল, কী যেন একটা কথায় বলেছিল, “মানুষজন আমাদের নেতাকে যমুনা ব্রিজটাও করতে দিল না। দেখতি এই ব্রিজ হয়ে গেলে উত্তরবঙ্গের মানুষদের কত লাভ হতো।” আপা বলছিল, “তা এতই যখন ইচ্ছে ছিল তো ব্রিজ করল না কেন তোমাদের নেতা?” ভাইয়া বলল, “সময় আর পেল কই? নামিয়ে দিল। অন্য কোনো সরকার করবে না দেখিস, যা টাকা তোলা হয়েছে সব খেয়ে ফেলবে। ঢাকায় যাওয়া চিরকালই লম্বা সময়ের একটা ঝক্কি হয়ে থাকবে।” সে যাই হোক, নিতুর বেশ ভালোই লাগছিল। আরও অনেক সময় কেটে যাক এই পথে পথে। যেখানে পৌঁছবে সেটা কেমন, কোথায় এসব নিয়ে ভাবতে আর ভালো লাগছিল না। ফেরির রেলিঙের দিকে তাদের বাসটা দাঁড়িয়ে, সামনে যদিও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ছিল যে বাস ফেরিতে ওঠার সময় যেন সব যাত্রী নেমে দাঁড়ায়, কিন্তু কেউই নামেনি। তাই নিতুরাও নামেনি। তার জানতে ইচ্ছে করছিল কেন নামতে বলা হয়েছে কিন্তু কেন যেন নিজে থেকে একটি কথাও বাদলকে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করল না। থাক্, একটা প্রশ্নের উত্তর নাই-বা জানল। কী আসে যায় তাতে? ঘাটে এই মাঝরাতেও জমজমাট পরিবেশ।

খাবারের দোকানগুলোতে বিরাট বিরাট গামলায় তরকারি রান্না করা, উপরে টুকটুকে লাল তেল-ঝোল ভাসছিল। মানুষ বুভুক্ষের মতো হাপুস হুপুস খাচ্ছে। ওই মধ্যরাতে তারা খাচ্ছিল কেন, তখন তো রোজার সময় না! নিতু যা দেখছিল তাতেই তার মনে প্রশ্ন আসছিল। আপা সাথে থাকলে সব উত্তর পাওয়া যেত। আপা নিশ্চয়ই এসব সব জানত। তবে একসময় আপা বিরক্ত হয়ে বলত, “উহ্ নিতু এই কেন কেন থামা তো। ঘুমাতে দে।” বাদল আর বাদলের মা প্রায় সারারাতই বাসের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিল। তারা বলতেও পারবে না বাস কখন ফেরিতে উঠেছে। যখন বাস চলছিল, মাঝের সিটে বসা নিতুর উপরে পালাক্রমে তারা দুজন ঘুমের ঘোরে হেলে হেলে পড়ছে। নিতুর খুব বিরক্ত লাগছিল কিন্তু কিছু বলতে পারেনি, শুধু হালকা করে ধরে মাথাগুলো সরিয়ে দিয়েছে। বাস ফেরি থেকে নিচে নামার পরে তার নিজেরও একসময় ঘুম পেয়ে গেল। তবু সে খুব চেষ্টা করছিল যেন ঘুমিয়ে না পড়ে। আশেপাশের অনেকে মুখ হা করে ঘুমাচ্ছে, দেখতে বড্ড বিশ্রী দেখায়। নিতু কিছুতেই সেভাবে ঘুমাতে চায়নি।

আর এই যে বাইরে অন্ধকারে মাঠ, ক্ষেত, ছোটছোট ঝোপ-ঝাড়, কখনও দোকানপাট পেরিয়ে যাচ্ছে, নিতু এসবের ছায়া ছায়া দৃশ্য থেকে কিছুতেই চোখ সরাতে পারছিল না। এদিকে তাদের ওদিককার মতো কুয়াশা ছিল না, সামান্য চাঁদের আলোতে সবকিছু রহস্যময় লাগছিল। মাঝে একটা অদ্ভুত আকৃতির গাছ দেখে যেই একটু অবাক হতে গেছে, ভালো করে দেখল যে সেটা আসলে একটা খড়ের ঢিবি। আবার ঘন গাছপালা ঘেরা এক একটা গ্রাম, গ্রামের সবাই ঘুমিয়ে আছে, নিস্তব্ধ রাস্তা, উঠোন। তারা কেউ জানত না নিতুর কথা, নিতু এ পথ দিয়ে যাচ্ছে, অন্ধকারে স্তব্ধ হয়ে থাকা বাড়িঘর আর টিনের ছাদ মুগ্ধ চোখে দেখছে। কেউ যেন চমৎকার সব গ্রাম, ছোট ছোট পুকুর, নালা, ক্ষেত এসবকিছুর নিখুঁত ছবি এঁকে তার ওপর আচ্ছা করে পাতলা কালি লেপে দিয়েছে। আকাশ-বাতাস সব ছাইরঙা হয়ে গেছে। সকালে যাদুর কাঠির মতো আলোর ছোঁয়ায় সব আবার জেগে উঠবে, ছাইরঙ মিলিয়ে যাবে, কালির স্তর সরে গিয়ে ঝকঝকে দিন শুরু হবে।

এই পুকুরে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা সাঁতার কাটবে, মাঠে দৌঁড়ে বেড়াবে, মেয়েরা ঘরের কাজে ব্যস্ত হবে, উঠোনে ঝাড়– পড়বে। কাল সকালে নিতু কোথায় যাবে, সে জায়গায় আর কে কে থাকবে, কেমন হবে তারা, সেই ছবিটার ওপর থেকে ধোঁয়া ধোঁয়া পর্দাটা কখন উঠে যাবে, এসবকিছুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ সেই চিন্তাটা খুব নাড়াচ্ছিল তাকে। চলতে চলতে বাস বেশ বড় একটা ঝাঁকি দিলে বাদল সরু চোখে নিতুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে ইশারা করে বিরক্ত হয়ে বলল, “কী দেখ বাইরে? ঘুমাওনি?” নিতু মাথা নেড়ে ‘না’ বললে একইরকম বিরক্তি নিয়ে বলল, “ঘুমাও, আরও অনেকক্ষণ আছে।” তার কথামতো নিতু চোখ বন্ধ করে যখন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে তখন ঢাকাও চলে এসেছে। সেখান থেকে আবার আরেকটা বাসে করে বাদলদের গ্রামে যেতে যেতে দুপুর গড়িয়ে গেল। সেখানে সারি সারি ছোটবড় কাঠের দোতলা বাড়ি। নিতু এরকম বাড়িঘর কখনও দেখেনি।

দরজায় আর দেয়ালে বেশ কারুকাজ করা। এরকম কাঠের বাড়ির কথা অবশ্য সে শুনেছিল। জাপানে মানুষ ভূমিকম্পের হাত থেকে বাঁচার জন্য এরকম কাঠের বাসা বানায়। কিন্তু এখানে এই গ্রামে তার কী প্রয়োজন তা ঠিক বুঝতে পারছিল না। বাদল আর তার মায়ের কথা থেকে সে জেনেছিল তাদের পরিবারের অনেক মানুষ জাপানে চলে গেছে। তারা কী সেখানকার বাসাবাড়ির মতো বাসাও বানিয়ে ফেলেছে এখানে? নিতুর কাছে খুব অবাক লাগে এসব ভেবে। জায়গাটার নাম লৌহজং। পদ্মার তীর ঘেঁষে পুরো জায়গাটা দাঁড়িয়ে। নিতু অবশ্য পদ্মার দেখা তখনও পায়নি, ধলেশ্বরী পার হয়েছে। রাতের অন্ধকারে দেখা কুচকুচে কালো যমুনার চেয়ে অনেক সুন্দর। পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার সব ক্লান্তি চলে গেল। শহরের একটাই লম্বা বড় রাস্তা। সে রাস্তা থেকে বামদিকে একটার পর একটা গলি ঢুকে গেছে।

রাস্তা থেকে গলিগুলো একটু নিচের দিকে ঢালু হয়ে রওনা দিয়েছে। গলির দুই ধারে সারি সারি বাসা। একেকটা একেকরকম। কোনোটা ইটের, কোনোটা কাঠের। সেরকমই একটা গলির শেষপ্রান্তে বাদলদের বাসা, সামনে বড় গেট। যদিও গেটের দুদিকে ইট-সিমেন্টের পিলার কিন্তু চারদিকে কোথাও পাঁচিল নেই। পাঁচিল না থাকলেও লোহার শিকের গেটটা বন্ধ কারে রাখা। বাগানের ধারে কোথাও কোথাও বাঁশের বেড়ার অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছিল আবার কোথাও একেবারে উধাও। গেটের সামনে লাল মাটি আর কাঁকড় বিছানো রাস্তা সোজা গিয়ে জং ধরা টিনের চালওলা, পুরোনো একতলা বাসায় উপস্থিত। বাদল রিক্সা থেকে নেমে গেট খুলে স্যুটকেস টেনে ঢোকাতে লাগল। নিতুও আরেকটা স্যুটকেস নিয়ে টানা শুরু করল।

গেট পেরিয়ে নিতু এগিয়ে গেলে তার ইচ্ছে হলো পেছনে তাকিয়ে দেখে, বাদল কি আবার গেট লাগিয়েও রাখবে? তালাটালা লাগালেও নিতু অবাক হবে না। বাদলের স্বভাবে নিজেকে অন্ধের মতো নিয়মে বেঁধে ফেলার একটা ব্যাপার আছে। কেবলই নিয়ম মেনে চল, উচিৎ-অনুচিত ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই। লাল রাস্তার মাঝামাঝি যেতেই দেখে উঁচু বারান্দার ওপরে কাঠের ভারী দরজা জোরে শব্দ করে খুলে গেল। ভেতর থেকে নিতুর সমান বা তার চেয়েও বড় কিছু ছেলেমেয়ে ছুটে বেরিয়ে এলো। একজন দৌঁড়ে এসে স্যুটকেসটা নিতুর হাত থেকে ছোঁ মেরে নিতে নিতে বলল, “ছি ছি আমরা থাকতে নতুন বউ নিজের স্যুটকেস টেনে আনছে! আসেন ভাবী- বাদল ভাই যদি একটা খবর দিত!” আরেকজন বাদলের হাত থেকে স্যুটকেস নিয়ে বলল, “একটা খবর দিলে না কেন বাদল ভাই?” বাদল এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না, না শোনার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল। নিতু বুঝতে পারে না, বাদল আসলে এদের কথায় বিরক্ত নাকি রাস্তার ধকলে ক্লান্ত। মেয়েরা কলকল করতে করতে নিতুকে বাসার ভেতরে নিয়ে গেল। তাদের আন্তরিকতা নিতুর ভালো লাগল। এতক্ষণ এতটা রাস্তায় বাদল আর তার মা থাকা সত্ত্বেও যে একা একাই আসছে বলে মনে হচ্ছিল সেই ভাবনাটা কেটে গেল।

যেন পরম মমতায় তারা তাকে ওখানে স্থান দিতে যাচ্ছে। দরজার পরে ফাঁকা ঘরটি পেরিয়ে ভেতরে বড় উঠোন। গোল উঠোনের চারদিকে আলাদা আলাদা বাড়ি, কোনোটা নতুন বানানো, কোনোটা কাঠের, পুরোনো। বারান্দায় বেঞ্চের উপরে একজন বয়ষ্ক মানুষ খালি গায়ে শুয়ে ছিলেন। নিতুকে নিয়ে মেয়েরা হাসাহাসি করে আসছে দেখে সামান্য ওঠার ভঙ্গি করে পাশে খুলে রাখা গেঞ্জি হাতড়ে খুঁজতে লাগলেন। তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাদল বউ নিয়া আইলো নাকি?” তাঁর সামনে এসে বাদলের মা নিতুকে বললেন, “তোমার মামা শ্বশুড়, সালাম কর।” তিনি গেঞ্জির খোঁজে বেঞ্চের এদিকওদিক চিন্তিত হয়ে তাকাচ্ছিলেন। পায়ে নিতুর হাতের ছোঁয়া পেয়ে চমকে উঠে তার মাথায় হাত রাখলেন, “থাউক মা, বাঁইচা থাক।” ঝুঁকে সালাম করতে গিয়ে বেঞ্চের পেছনে দেয়ালের পাশে নিচে ঝুলতে থাকা গেঞ্জি নিতু হাতে টেনে নিলো।

উনি নিতুর চিবুকে হাত রেখে বললেন, “দেখ দেখ, কী সুন্দর বউ হইছে বাদলের!” নিতু মেঝে থেকে ওঠার আগে আস্তে করে গেঞ্জিটা মামার কোলের উপরে রেখে উঠে দাঁড়াল। কোলে গেঞ্জির ছোঁয়া পেয়েই মামা হেসে ফেলেন। এক পলকের জন্য নিতুর সাথে চোখাচোখি হলো তাঁর। নিতুও মুখ টিপে হাসল। ওইটুকু সময়ের জন্য যখন তাদের দৃষ্টি মিলে গেল, নিতু জানত, তখনই মামার সাথে একটা বন্ধুত্ব হয়ে গেছে তার। ততক্ষণে বাড়ির সব মানুষ সেখানে জমে গেল। বাচ্চা-কাচ্চাসহ প্রায় বিশ পঁচিশজন মানুষের একটা মিছিলের সাথে নিতু বারান্দা ধরে সামনের দিকে আগাল। মেয়েরা নিতুকে একটা ঘরের সামনে এনে দাঁড় করাল। বাদলের ঘর। দরজা খোলার পরে দেখা গেল খাটের ওপরে আর চারপাশে সুতো দিয়ে ঝোলানো শুকনো বেলি, গন্ধরাজ আর গাঁদা। সাদা ফুলগুলো শুকিয়ে আর পচে বাদামি হয়ে গেছে, সুতা বেরিয়ে আছে জায়গায় জায়গায়।

এমনিতে টানটান করে বিছানা পাতা। একজন এগিয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি টেনে টেনে সুতাগুলো ছিঁড়তে লাগল। বাদল তার কাছে জানতে চাইর, “অ্যাই মন্টু, এসব কী রে? আমার ঘরে এগুলো কে করছে?” “আমার সবাই মিলে করছিলাম বাদল ভাই।” “কেন? আমি তোদের বলছি শুকনো ফুল দিয়ে আমার ঘর সাজাইতে?” “না বাদল ভাই, যেদিন তোমাদের আসার কথা ছিল সেদিন আমরা সাজাইলাম, তারপর ভাবলাম আসার খবর পাইলে আবার ঠিক করে সাজায়ে রাখব, তুমি তো খবর দাও নাই।” “খবর দেয়া অত সোজা? আর তোরা কেন এসব করবি আমার ঘরে? যা এখান থেকে।” মন্টুর সাথে আরও দুএকজন সুতো ছিঁড়তে হাত লাগাল। বিছানায় ঝরে পড়া মরা ফুলগুলো একটি মেয়ে আলতো হাতে ওঠাল। পুরো ঘরের পরিবেশে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এলো। নিতুর পিঠ থেকে আলতো হাতগুলো ধীরে শিথিল হয়ে সরে গেল।

সবাই নিতুর সামনে হতভম্ভ, ওরা নিশ্চয়ই দেবর-ননদ তার, তাকে খুশি করার জন্য এসব করেছিল। নিতুর ইচ্ছে করল বলে যে সাজানোটা খুব সুন্দর হয়েছিল, ইস্ সময়মতো আসা হলে দেখতে পেতাম আর তখন হয়তো ঘরে ফুলের গন্ধও ছিল! তাদের শহরে তো আজকাল সবাই কাগজের ফুল দিয়ে বিয়েবাড়ি আর বাসরঘর সাজায়। এই ছেলেমেয়েগুলো কষ্ট করে তাজা ফুল দিয়ে ঘরটা সাজিয়ে রেখেছিল ভাবতে ভালো লাগছিল তার। অনেক কথা মুখে আসলেও বাদলের ভয়ে কিছুই বলতে পারল না। একে সে নতুন বউ, সবার সামনে হঠাৎ বাদলের কথার প্রতিবাদ করাটা ঠিক হবে না, সে জানত, তার ওপর কিছু বললে বাদল যদি সবার সামনেই তাকে ধমকে উঠত সে ভয়ও ছিল। এটা যেন ঠিক ধমক খাওয়ার ভয় না বরং সে যেন তার সাথে বাদলের দুর্ব্যবহারের বিষয়টা লুকিয়ে রাখতে চাইত। বাড়িতেও বাদল যে আর সবার সাথেও অভদ্রভাবে কথা বলে, সেটা বুঝতে নিতুর আর বাকি থাকে না। সব সুতো ছেঁড়া হয়ে গেলে সেগুলোকে গোল বলের মতো করে মন্টু বেরিয়ে গেল।

অন্যরাও একে একে চলে গেল। শুধু নিতুর একেবারে পাশে দাঁড়ানো একটি মেয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “ভাবী এখন যাই।” কত ভালো হতো এদের সবার নাম জানলে, সবার সাথে পরিচয় হলে! বাদল আর তার মায়ের গম্ভীর মুখ ছাড়াও এ বাড়িতে কতকগুলো হাসিমুখ খেলা করে দেখেই নিতুর মন ভরে গিয়েছিল। বাদল সোজা গিয়ে কাপড় বদলাতে শুরু করে যেন কিছুক্ষণের জন্য নিতুর অস্তিত্ব ভুলে গেল। নিতু আর বিছানায় বসে থাকল মন খারাপ করে। বাদল ফিরে এসে বলল, “কী হলো, বসে আছ কেন? রাস্তার কাপড় ছাড়বে না?” “তুমি ওদের এভাবে ধমকালে কেন? ওরা তো শখ করে-” “এরা সব আমার মামাত ভাইবোন। ওরা জানে আমি এসব পছন্দ করি না। ধমক দেয়ার দরকার ছিল। আর আমি ওদের যা ইচ্ছে বলি, তোমার তাতে সমস্যা কী?” “মানে ওরা তো এগুলো আমাদের জন্যই করেছিল-” “কী ভালো করেছে? এই দেখ কী হয়েছে-” বালিশের নিচে পড়ে থাকা পচে গলে যাওয়া একটা বেলি চ্যাপটা হয়ে বিছানার সাদা চাদরে দাগ বসিয়েছিল। নিতুর চোখের সামনে বাদল সেই পচা ফুলটা দোলাচ্ছিল। নিতুর বলতে ইচ্ছে করল, তারপরও ওদের মনে এভাবে দুঃখ দেয়ার কী হলো! কিন্তু কিছুই বলল না।

আশেপাশের মানুষের যে অনুভূতি আছে, তার ব্যাবহারে তারা কেউ কষ্ট পেতে পারে, এসব বিষয়ে আদৌ বাদল জানে কি না, নিতুর সন্দেহ ছিল। তাই এসব আবেগের কথা আর না বাড়িয়ে নিতু স্যুটকেস খুলে কাপড় বের করল। স্যুটকেসের তালায় চাবি ঘোরাতে ঘোরাতেই বাদলের নাক ডাকার শব্দ পেল, মানুষটা কেমন যন্ত্রের মতো, এই দিনেদুপুরে পড়ল আর ঘুমাল। অনেকদিন আগে মা একবার রিংকুর ছোটবেলার গল্প বলতে গিয়ে বলেছিল, “বিশ্বাস কর, রিংকু যতদিন ছোট ছিল, শুধু সে ঘুমিয়ে পড়লে আমার মাথা ঠান্ডা হতো। জেগে থাকলে আমি সবসময় তটস্ত থাকতাম কখন কী অঘটন ঘটে!” তখন নিতুর হরো সেই অবস্থা। বাদল ঘুমিয়ে থাকলেই একমাত্র নিতু বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারত। না হলে বাতাস ফুরিয়ে একটা গুমোট ভাব নিতুকে ঘিরে ধরত। আনন্দঘন পরিবেশের উপরে বেদনার আস্তর লেপে দেয়ার জন্য বাদলের একটা-দুটো কথাই যথেষ্ট। স্যুটকেসের ডালা খুলতেই ভেতর থেকে নিতুর নিজের ঘরের গন্ধ উড়ে এসে নাকে লাগল।

প্রতিটা কাপড়ে সেই ঘরের গন্ধ। নিতুর চোখ ভরে এলো। এই গন্ধ থাকবে না, ক’দিনেই হারিয়ে যাবে। কাপড়গুলো মুঠোর মধ্যে খামচে ধরে ব্যস্ত হয়ে নাকের কাছে ধরল সে। চলে যাক গন্ধ, তবু এই গন্ধের স্মৃতি তার নাকে লেগে থাকবে। মানুষ কেন বোঝে না যে মানুষ কেবল মাটিতে বাঁচে না? মানুষ বাঁচে আকাশে, বাতাসে, গন্ধে- সবকিছুর মধ্যে দিয়ে যে জায়গার মানুষ সেখানে তার একটা অদৃশ্য শিকড় গজিয়ে যায়। সে তো আর বৃক্ষ নয় যে শিকড়টা দেখা যাবে! তাই কেউ যখন অদৃশ্য শিকড়টা কেটে ফেলে, তার রক্তক্ষরণও দেখা যায় না, ব্যথাটা বোঝা যায় না। মূলটা কেটেই এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় আনতে হয় মানুষকে। কারণ অতলে চলে যাওয়া শিকড় উপড়ে আনা যায় না। কোনোদিন তেমনি নিতুকেও কেউ উপড়ে আনতে পারবে না। যতদিন সেই কাটা শিকড়ের কিছু অংশ চেনা জায়গায় গাঁড়া, সেখান থেকে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ হতেই থাকবে। বাদল পাশ ফিরলে নিতু কাপড়গুলো নাক থেকে সরিয়ে চোখ মুছে নিলো।

বাদলকে ঘুমাতে দেখে আবার নাকে ধরল, নিঃশব্দে কাঁদল। বাদলকে তার এই আবেগ সে কোনোদিন দেখাবে না। বাদল তাকে সেরকম শিকড়বাকড়ওলা কোনো প্রাণী মনে করে না। তার অতীত-বর্তমান কোনোকিছুর ব্যাপারেই বাদল এই পর্যন্ত এতটুকু আগ্রহ দেখায়নি। কেবল সে যা চাইত নিতুর কাছে, সেটাই বলে গেছে। ঘরের মেঝেটা ধোঁয়ার মতো রঙের। জায়গায় জায়গায় আবার হাত দিয়ে লেপার মতো দাগ আর অমসৃন। নিতুর ঘরের ঠান্ডা লাল মেঝে যেন শরীর এলিয়ে দিতে বলত শুধু। ওখানে খালিপায়ে হাঁটতে ইচ্ছে করছিল না। বদলে পরার কাপড় হাতে নিয়ে নিতু ভাবল ঘর থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবে, কার কাছে জানতে চাইবে বাথরুম কোন দিকে। বাইরে বারান্দা ফাঁকা, কোথাও কেউ নেই। বাদলের উপরে রাগ করে যে যার ঘরে চলে গেছে। ডানদিকের একটা ঘর থেকে কে যেন খোলা দরজা আর চৌকাঠের ফাঁক দিয়ে নিতুকে দেখছিল। চোখের মণি আর পাপড়ির নাড়াচাড়া দেখা যাচ্ছিল। বামে তাকিয়ে দেখল সেদিকেও তাই, এক জোড়া নয় বেশ কয়েক জোড়া চোখের মণি তাকে বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু কেউ সামনে আসছিল না। বাদলের ভয়ে তারা কেউ নিতুর সাথে কথা বলতে পারছিল না কিন্তু নতুন বউকে দেখার লোভও সামলাতে পারছিল না। তারপর বামদিকের ঘর থেকে একটা ছয়-সাত বছর বয়সী বাচ্চা মেয়ে দৌঁড়ে এসে ছোট্ট আঙুলের ইশারায় একদিকে তাক করে দেখিয়ে আবার ছুটে গিয়ে ঘরের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। নিতু সেদিকে তাকিয়ে দেখে দুটো ঘর পরেই বাথরুম।

এত দ্রুত মেয়েটি চলে গেল যে ইচ্ছে থাকলেও তাকে গাল টিপে আদর করা গেল না। নিতু বাথরুমের দিকে চলে গেল। বড় একটা কলতলার মতো ঘর। এমনভাবে বাননো যে দরজা লাগিয়ে দিলে এই দিনে দুপুরেও প্রায় অন্ধকার। মেঝে কোথাও পিচ্ছিল আছে কি না নিতু জানত না। দরজা লাগানোর আগেই লক্ষ করে উল্টোদিকের কোণে একটা টিউবওয়েল বসানো, নিচে বালতি আর মগ। লাইটের সুইচ কোথায় কে জানে। নিতু সেভাবেই অন্ধকারে গোসল সারে। এ বাড়িতে এভাবেই ধীরে, বুঝে শুনে তাকে পা ফেলতে হবে সে জেনে গেছে। বের হতে গিয়ে দেখে বাথরুমের দরজায় বাদল দাঁড়িয়ে। ঘুম অনিচ্ছাকৃত ভাঙার বিরক্তি নিয়ে বলে, “এতক্ষণ ধরে কী করছিলে বাথরুমে? ওই যে ওইদিকে রান্নাঘর, যাও দেখ মা কী করছে।” বারান্দার কাপড় মেলার দড়িতে তোয়ালে মেলে নিতু বাদলের কথামতো উঠোনের উল্টোদিকে দৌঁড়ে চলে গেল। এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করছে বাচ্চারা, বড়রা। কিন্তু কেউ আর তাকে সেভাবে লক্ষ করছে না। বাদলের মা আরেকজন মহিলার সাথে বসে কথা বলছিলেন, সামনে চুলায় রান্না। একটি মেয়ে চুলার আগুন ঠিক করে দিচ্ছে বারবার। নিতু ঝুঁকে সালাম করতে গেলে সাথে সাথেই মহিলা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, বলেন, “আমি তোমার মামি-শাশুড়ি মা।

থুতনিতে হাত দিয়ে বলেন, কী সুন্দর বউ হইছে আপা, কিন্তু এ তো একেবার বাচ্চা মেয়ে!” বাদলের মা চুলার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে ওঠেন, “বাচ্চা কোথায় দেখলা?” “খালি হাতেপায়ে বড় হইলেই কি হয়? মুখ দেখলেই বোঝা যায় বয়স। এ তো মনে হয় আমার রিনা-মিনার বয়সীই হবে।” “তোমার মেয়েদের তুমি কেন বিয়া দিতাছ না সেইটা তোমার ব্যাপার কিন্তু বিয়া এই বয়সেই হওয়া উচিৎ। ভাইজান ঠিকই করছে বাদলের জন্য।” “আপা, আমার ইচ্ছা আরেকটু পড়ুক ওরা।” “আরও পইড়া কী হবে? যা পড়ছে তাতেই তো দেখি চ্যাটাং চ্যাটাং কথা কয়।” বাদলের মামি চুপ করে থাকেন। নিতুর সামনে হয়ত একটু অপ্রস্তুত হন। বাদলের মায়ের সেসব খেয়াল নেই।

বলেই যেতে থাকেন, “কী দিনকাল পড়ছে আর তোমার মাইয়ারা প্রতিদিন দুই মাইল হাঁইটা কলেজ যাইতেছে। তোমার সারাপেটে কলিজা হইয়া গেছে। একটা দুর্ঘটনা হইলে তখন টের পাইবা, তার আগে না। তখন দেখা যাবে এইসব বড় বড় কথা কোথায় থাকে।” “পাড়ার অন্য মেয়েরাও তো যায় আপা, দল বাঁইধা যায় তারা, পল্টুও তো থাকে তাদের আগে পিছে।” “থাক থাক আর তর্ক কইর না, আমি কোন বিপদের কথা কই তুমি ঠিকই জানো।” “শ্বশুড় বাড়িতে কি কোনো বিপদ হইতে পারে না, আপা?” “এইটা তুমি কী কও? শ্বশুড়বাড়িতে আবার কিসের বিপদ?” মামি মনে হয় আর কথা বাড়াতে চান না। একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন। নিতুর মনে হলো এই নিঃশ্বাস তার মেয়েদের বিপদের কথা চিন্তা করে নয়, বরং বাদলের মায়ের সাথে এ বিষয়ে কথা না বলাই ভালো এমন একটা সিদ্ধান্ত। নিতু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব যুক্তিতর্ক নীরব শ্রোতার মতো শুনে গেল। তার বুকটা ঢিপঢিপ করতে করছিল, বাদলের মায়ের এইসব কথার মানে কী? তার কি কলেজ যাওয়া হবে না? জিজ্ঞাসা করার প্রশ্নই ওঠে না।

কিন্তু প্রশ্নটা জিবের আগায় বেরিয়ে আসার সুযোগের অপেক্ষায় লাফালাফি করছিল, কিছুতেই লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার অনুমতি পায়নি। নিতু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই ছিল। মামি আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ান, বলেন , “যাই আপা, রান্না চুলায়।” যাওয়ার সময়ে নিতুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আমার ঘরে আইস মা একবার, এখন যাই, আচ্ছা?” নিতু মাথা কাত করে সায় জানাল। মামি রান্নাঘরের দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই নিতুর শাশুড়ি মটরশুটি ভরা গামলা এগিয়ে দিয়ে বলেন, “তুমি আর খামাখা খাড়ায় আছ কেন? হাত লাগাও। এখানে কী আর আমরা আসব বইলা কেউ রাইন্ধা রাখবে? আমাদেরই কইরা নিতে হবে।”

নিতু চুল থেকে ফোটা ফোটা পানি পড়ে রান্নাঘরের মাটির মেঝেতে মিলিয়ে যাচ্ছিল। মামী দরজার কাছে থেকে মুখ বাড়িয়ে আবার বলেন, “আগে খবর পাইলে কিন্তু তা-ই করতাম আপা, তবুও তো সেই কথাই বলতে আসছিলাম যে আপনারা আইজ আমাদের সাথে যা আছে তা দিয়াই একটু খান। আপনিই তো রাজি হইলেন না।” “তোমাদের খাওয়ায় ভাগ বসাইতে চাই না। নিজে কইরা খাওয়াই ভালো।” “নতুন বউ একদিন না হয় একটু বসা থাকত।” “কেন্ সে আবার কী করছে? আমি আর বিউটিই তো সব করলাম।” মামি আর কথা বাড়ানো উচিৎ নয় ভেবে বোধ হয় তাড়াতাড়ি পা চালান। নিতু মাথা নামিয়ে না শোনার ভান করে মনোযোগ দিয়ে মটারশুটির খোসা ছাড়াতে থাকল। মামি সরে না গেলে তাকে নিয়েই ঝগড়া লেগে যাচ্ছিল। তার জন্য সেটা খুব বিব্রতকর হতো আজ এই শুরুর দিনটাতে। মনে মনে মামির প্রতি কৃতজ্ঞ হয় সে। হঠাৎ শাশুড়ি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “শোন মেয়ে, তোমার করতে ইচ্ছা হইলে কর না হইলে না কর। আমার কোনো অসুবিধা নাই, বুঝলা?”

“আমি তো কিছু বলিনি, আম্মা, আমার কোনো অসুবিধা নাই।” “মুখে মুখে কথা কইও না। আর ওই যে তোমারে তার ঘরে যাইতে কইল আর তুমি ঘাড় কাত কইরা ’হ্যাঁ’ কইলা- এইখানে অনেক শরিকের ঘর আছে বুচ্ছ? যখনতখন যেখানে সেখানে যাওয়া কইলাম আমি পছন্দ করি না। সেই কথাটা তোমারে জানাইয়া রাখলাম।” নিতু মাথা নাড়ল। এটা হয়ত মামির রাগ তার উপরে পড়ল। কিন্তু কেন এই বাড়ির সবার উপরে এদের এত রাগ সেটা তার কাছে খুব রহস্যময় লাগল। সামনে বসা বাদলের মায়ের ব্যবহার দেখে নিতুর মনেই হয় না এটাই তার পরিবার। এরকম কথায় কথায় ধমকে ওঠা কাউকে সে কী কখনও আপন করে নিতে পারবে? বাদলের মায়ের মধ্যে সে যদি তার নিজের মা আর চাচিকে খুঁজতে যায় তাহলে ব্যর্থই হবে হয়তো। কোনো শীতের দুপুরে বলা চাচির কথা তখন কানে বাজে, “নিতু রাখ তো, এইকটা মটরশুটি কি আমি ছাড়িয়ে নিতে পারব না? তুমি পড়তে যাও।” নিতু মাথা নিচু করে ছিল বলে তার চোখের ভিজে যাওয়া বাদলের মা দেখতে পায়নি।

কিন্তু তারই বয়সী বিউটি কড়াইয়ে সবজি নাড়তে নাড়তে কয়েকবার চোরা দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো নিতুর ওপরে। যেন নিতুর চোখের পানি গড়িয়ে পড়লে সেটা একটা গল্প হতো। নিতুর মনে হলো, এ সে নিজে নয়, এ তার নিজের জীবন নয়। সে যেন কারও ভূমিকায় অভিনয় করতে ওখানে গেছে, মেয়াদ শেষ হলেই বাসায় ফিরে যাবে। রান্না শেষ হলে নিতু যখন খাওয়ার জন্য বাদলকে ডাকতে গেল, দেখে বাদল ভয়ানক রক্তচক্ষু নিয়ে বিছানায় বসে আছে। হাত শরীরের দুপাশে বিছানায় রাখা। মাথার উপরে বনবন করে ফ্যান চললেও তার কপাল আর গালের পাশে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মাথাটা একটু ঝুঁকে আছে। সেভাবেই লাল চোখগুলো উপরের দিকে নিতুকে খুঁজে নিলো। দেখে মনে হয় কাউকে খুন করার ফন্দি আঁটছিল। নিতু তাকে কী বলতে এসেছিল ভুলে গেল। তাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লাফ দিয়ে উঠে দরজা লাগাল বাদল তারপর ঘুরেই নিতুকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিলো।

কী যেন একটা বিশ্রী আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিতুর উপর। বিছানায় পড়েই নিতুর মুখ থেকে ’আহ’ শব্দ বেরিয়ে আসতেই বাদল একহাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। আরেক হাত নিতুর কামিজ খোলায় ব্যস্ত। চুলের পানিতে কামিজ ভিজে পিঠের সাথে এমনভাবে লেপ্টে গেছে, সহজে খুলতে না পেরে বাদল যেন ছিঁড়ে ফেলবে। এক দিক থেকে সেলাই ছিড়ে যাওয়ার পটপট আওয়াজ কানে এলো। নিতুর চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল কিন্তু জানত সে কাঁদছে না। আর এ-ও জানত যে এই স্পর্শ ভালোবাসার নয়, কিছুতেই নয়। তবু যেন কিছু বলার অধিকার ছিল না। বাদলের নিচে পিষে পিষে নিতুর আত্মা ক্ষয় হতে থাকে শুধু। ১২ ঘর, রান্নাঘর আর বাথরুম এই ত্রিভূজের বাইরে পা দেয়ার সাহস নিতুর হয়নি। সকাল সকাল বারান্দায় মামার সাথে দেখা, “কী নতুন বউ, ভালো আছ? বাড়ির অন্য সবার সাথে আলাপ হইছে?” মামার কণ্ঠস্বরটা যেন অন্য কোনো আকাশ থেকে ভেসে এলো। এরকম মায়া করে কথা বললে নিতুর কান্না পেয়ে যেত। তার সারাক্ষণই মনে হতো সে যেন কোথায় ভুলভাল জায়গায় এসে পড়েছে।

মামার গলা মনে করিয়ে দিত, ওখানে আনন্দ আছে, জায়গাটি বসবাসের অযোগ্য নয়। তড়িঘড়ি করে উত্তর দিত নিতু, “নাহ্ কারো সাথে তো এখনও আলাপ হয়নি। ভালো আছি মামা, আপনি ভালো?” “আলাপ হয় নাই মানে!” মামা উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘরগুলোর দিকে মুখ তাক করে চিৎকার শুরু করে দেন, “এই মন্টু, রিনা, মিনা, পুতুল, পাভেল তোরা কই রে? বাড়িতে একটা নতুন বউ আসছে আর তোরা তার সাথে কথাও বলিস নাই এখনও? আশ্চর্য! তাড়াতাড়ি আয়।” তার চিৎকারে ঘর থেকে ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে আসল। তবে বাদলের পাশের ঘর থেকে তার মা একবার বিরক্ত মুখ নিয়ে উঁকি দিয়েই উধাও। মামাকে মানা করা বোধ হয় তার সাধ্যের বাইরে।

দেবর-ননদরা এসে তাকে ঘিরে ধরল। ননদরা এমন করে যেন মমতার ছোঁয়া। তারা খুশি যেন অপেক্ষায় ছিল কখন মামা নিতুকে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। তাদের হাসিহাসি মুখগুলো দেখে নিতুর ভয়, ক্লান্তি সব চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল যে মনে হলো তাদের সে আগে থেকেই চিনত। মনে মনে ভাবছিল, কী অদ্ভুত এই জগৎসংসার! যেখানে তার ভালোবাসা পাওয়ার কথা, স্নেহ পাওয়ার কথা সেখানে অবহেলা আর বিরক্তি ছাড়া কিছুই পায়নি। অথচ একদল তারই মতো মুখ সে আশাই করেনি ও বাড়িতে। তারা যেন তাকে কাণায় কাণায় ভরিয়ে দেয়ার জন্য একেবারে প্রস্তুত হয়ে ছিল। এটাই কী সংসারের নিয়ম? একদিক থেকে যেন সব কেড়ে নেয় আবার আরেক দিক থেকে কেবল ভরে দিতে থাকে। হঠাৎ কোন মুহূর্তে যে কার পাত্র ভরে যায় কেউ বলতে পারে না। মন্টু আর পুতুল হয়ত নিতুর চেয়ে বড়ই হবে। বাকিরা সমান অথবা ছোট। এরা সবাই বাদলের দুই মামার ছেলেমেয়ে। বড় মামা বিয়ে করেননি। সারাদিন ওই বেঞ্চিতেই বোধহয় তাঁর সময় কাটত শুয়েবসে। বাইরের দিকে যে যায়-আসে তাকে দাঁড় করিয়ে কিছুটা সময় আলাপ করা, এটাই ছিল তাঁর কাজ। কথা বলতেন খুব হাসিমুখে, মজা করে।

মন্টুর ঘাড়ে হাত রেখে বলেন, “শোনো বউ, তোমার এই দেবরটা হইল একটা তলাবিহীন ঝুঁড়ি। তাকে তুমি যতই খাওয়াও না কেন সে কখনও বলবে না যে তার পেট ভরছে।” মামার কথা শুনে মন্টু পেটের উপরে বৃত্তাকারে হাত বোলাতে লাগল। “আর এই যে রিনা আর মিনা এরা দুইজন হইল চলন্ত ড্রেসিং টেবিল। যেখানে যায় সেখানেই সাজগোজ করতে থাকে। সারাদিন এইসব নিয়াই থাকে।” তাদের দুজনের দিকে একসাথে তাকিয়ে নিতু দেখে এই সাতসকালেই তাদের পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো, কপালে টিপ। মামা পুতুলের দিকে আঙুল দিয়ে বলেন, “এইটা হইল বইয়ের পোকা। সারাদিন পড়ে, রাইতের অন্ধকারে লাইট জ্বালাইতে না দিলেও পড়তে পারে। ওর চোখ বিড়ালের মতো। কী এত পড়ে তা ওই জানে।” নিতু তাকিয়ে দেখল মোটা চশমায় পুতুলকে সত্যি জ্ঞানী বলে মনে হয়। পাভেল তাদের চেয়ে একটু ছোট, পুতুলের ছোট ভাই।

তার ব্যাপারে বোধহয় ভয়াবহ কিছু বলা হবে দেখে সে আগে থেকেই বড় মামাকে একটু হালকা ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে দিয়ে বলল, “মামা হইছে, আপনি যান তো, আমরা নিজেরাই ভাবীর সাথে আলাপ করতে পারি।” মামা হতাশ হয়ে বললেন, “আচ্ছা আচ্ছা আমি যাই। যে পার আগে আমাকে এককাপ চা দাও।” পুতুল লাফিয়ে উঠে বলল, “চাচা, আমি আনতেছি।” বাকিদের কলকাকলি চলতে থাকে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়েই। হঠাৎ বাদলের মা ঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে নিতুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আইজ বাদল চইলা যাইব, কত কাজ ঘরে, আর তুমি এইখানে খোশগল্প কইরা দিন পার করবা?” রিনা মুখ ঘুরিয়ে বলে, “এখনও তো ঠিকমতো সকালই হয় নাই ফুপু, দিন যায় ক্যামনে?” “তোমাদের সকাল হয় নাই অলসগুলান, আমার ঘরে অনেক কাজ আছে।” “বাদল ভাইরে একটা কাজের মাইয়ার সাথে বিয়া দিলেই পারতা ফুপু।”

“ঘরের কাজ করলে কেউ কাজের মাইয়া হইয়া যায় না। বেয়াদব হইয়া গেছ। সঠিক সময়ে বিয়া না হইলে এইরকম বেয়াদব হয় মানুষ। বিয়া হইলে দেখব কাজ না কইরা কী কর।” “কাজ করব না ফুপু। শাশুড়ি থাকলে তো করবই না।” রিনা আর মিনা হাসতে হাসতে নিতুকে চোখ টিপে দিলো। নিতু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। রিনা-মিনা দৌঁড়ে পালিয়ে যেতে থাকলে নিতুও ঘরের দিকে চলে এলো। বাদলের মায়ের সাথে তাদের কথা শুনে পুতুল ছাড়া অন্যেরা আগেই উধাও। পুতুলইশুধু বলল, “ভাবী, তোমার মুখটা এত ভার কেন? কী হইছে?” নিতু কোনো উত্তর দেয়নি। সামনে তাকিয়ে দেখল বারান্দায় বাদল এসে দাঁড়িয়েছে। শাশুড়ির ঘরের দিকে চলে যায় নিতু, বুঝতে পারে পেছনে পুতুল সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। নিতুর কী হয়েছে তা সে কখনও কাউকে বলতে পারবে না। সে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছিল না, কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি।

বাদল তার সাথে পশুর মতো আচরণ করলে সে কাকে বলবে? এসব কী বলার মতো কথা? কেউ বুঝতেই চাইবে না। সারারাত তার মনে হয়েছিল সে একটা কোরবানির পশু। তাকে হাত-পা বেঁধে বারবার শুইয়ে দেয়া হচ্ছে আর সে সুযোগ পেলেই লাফিয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। এসব কথা কখনও কাউকে বলা যায় না। চাচি বারবার বলে দিয়েছিল, “শশুড়বাড়ি কেমন লাগছে আমাদের জানিও কিন্তু, চিঠি লিখ।” কিন্তু এসব কথা নিতু কাউকে লিখতেও পারত না। শুধু একঝাঁক হাসিখুশি মুখের মাঝখানে সামান্য কিছু সময় সে সবকিছু ভুলে গিয়েছিল। সত্যি মানুষের ভোলার ক্ষমতা কী অসাধারণ! নিতু ধরেই নিয়েছিল, তার জীবনে সামনে আর কোথাও ভালোবাসা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভাবত আপার মতো আর কেউ আপন হবে না, চাচির মতো বুকে টেনে নেবে না। কিন্তু কত সহজেই পুতুলের গলায় তার জন্য আপার মতো উৎকণ্ঠা দেখতে পেল। শাশুড়ির ঘরে হেঁটে যেতে যেতে নিজেকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও ততটা দুর্ভাগা মনে হয় না।

দুপুরের দিকে বাদল চলে গেল। প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে সে বাড়িতে আসবে আর ছুটির পরে চলে যাবে, এমনই নিয়ম। যাওয়ার সময় নিতুর দিকে তাকায়নি বাদল। যেন নিতু সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল না। শুধু মাকে বলল, “মা, গেলাম।” নিতু অবাক হয়ে ভাবছিল প্রায় চব্বিশ ঘন্টা বাড়িতে নিতু বাদলের সাথে কাটাল অথচ বাদল তেমন কোনো কথাই বলেনি। একবারও জানতে চায়নি এই বাড়িটা নিতুর কেমন লাগছে। অথবা আরও অন্যকিছু, কতকিছুই তো জানতে চাইতে পারত! ভাইবোনগুলোকে যে ধমকে দিলো তারপর তাদের সাথেও আর কথা বলেনি। এই সমস্ত আচরণ নিতুর কাছে খুব অস্বাভাবিক লাগছিল। কিন্তু এসব বাদলকে বলেই বা কী লাভ! রেগে যেতে পারে। খাওয়ার পরে শাশুড়ি ঘুমিয়ে পড়লে নিতু বারান্দায় বসে থাকল। তার তো আর দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল না। শব্দহীনতায় বেশ দূর থেকে মামার কাশির শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। সেই শব্দ লক্ষ্য করে নিতু বাসার সামনের দিকে চলে এলো। মামা বেঞ্চে খালিগায়ে শুয়ে ছিলেন।

নিতুকে দেখে একটু হাসলেন, গেঞ্জি খোঁজেননি আর। যেন নিতু আপন হয়ে গেছে, তার সামনে খালি গায়ে থাকলে কোনো অসুবিধা নেই। নিতুকে দেখেই, “আরে নতুন বউ, আসো আসো। কী বাদলের জন্য মন খারাপ?” “মামা, আপনি আমাকে নিতু ডাকেন। আমার নাম।” “ঠিক বলছ, নিজের নামই মানুষের পরিচয়।” উঠোনের দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে নিতু বলল, “আচ্ছা মামা, সবদিকে গাছ আর বাড়ির ছাদ দেখা যায় কিন্তু রান্নাঘরগুলোর পেছনে কিছু নেই কেন? শুধু আকাশ আর কেমন ফাঁকা ফাঁকা।” “হা হা হা… তুমি সেইটা দেখ নাই এখনও, না? এইটা তো এক মহারহস্য মা। তোমার দেবরননদরা কই? তারা এখনও তোমারে দেখায় নাই কেন? সব ঘুমাইল নাকি!” “বোধ হয় তাদের ফুপুর ভয়ে আসে না।” “হা হা হা.. তুমি যাও তো ওই যে ওইদিকে রিনাদের ঘর, ড্রেসিং টেবিলের সামনে বইসা আছে নিশ্চয়ই আর এইদিকে পুতুল, গিয়া দেখবা চোখ গোল গোল কইরা পড়তেছে। যে কোনো একটাতে গিয়া ওদের বের কইরা আনো। ওরাই তোমারে নিয়া যাবে।”

“আমি তাদের ঘরে গেলে মা যদি রাগ করেন!” “রাখ তো তোমার রাগ! বলবা আমি যাইতে বলছি।” নিতু পুতুলের কাছে যায়নি। সে যদি সত্যিই পড়তে থাকে তো পড়ুক। তাকে বিরক্ত না করাই ভালো। সে রিনা-মিনাদের কাঠের দোতলা ঘরে উঠল। কাঠেরই সরু সিঁড়ি। এরকম ঘরে সে আগে কখনও ঢোকেনি। সামান্য মচমচ শব্দ, ছাদটা বেশ নিচু, মাথা সামান্য ঝুঁকে সিঁড়ির শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়। ঘরের ঠিক মাঝখানটাতে মনে হয় না কেউ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে। রিনার গলা শোনা গেল ওপর থেকে, “কে?” নিতু ততক্ষণে ওপরে মুখ বাড়িয়ে বলে, “আমি।” দুজনে একসাথে চিৎকার করে উঠল, “ভাবী!” সত্যিই তারা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে ছিল। দেখলে মনে হতো না এক বছরের ছোটবড়, মনে হতো যমজ। দুজনের মিষ্টি শ্যামলা মুখে বড় বড় কালো চোখগুলো যেন সারাক্ষণ কথা বলত। দুজনেরই কোমর ছাপিয়ে কাল কুচকুচে চুল। রিনা পেছনে দাঁড়িয়ে মিনার চুলে বেণী করে দিচ্ছিল। বিকেলে বোধ হয় বিশেষ সাজগোজের নিয়ম আছে তাদের, যেমন ঋতুর ছিল।

তাদের দিকে তাকিয়ে নিতু ভাবছিল, আচ্ছা, আপা এখন কী করছে? একটু পরে আপাও কি সেজেগুজে রতন ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবে? আপার সংসারটা ভালোমতো দেখাই হলো না। নিশ্চয়ই খুব পরিপাটি, ঠিক আপা যেমন ভাবে চলাফেরা করত। গানও নিশ্চয়ই গায় এখনও। রতন ভাই বসে বসে শোনে হয়তো। হয়ত ভালো লাগলে একই গান আবার গাইতে বলে। আপা হয়তো হাসে, তারপর আবার গায়। রতন ভাইয়ের কথা বলতে গেলেই আপার মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে যায়, এখনও। নিতু লক্ষ করেছে, সুখের কথা বলতে হয় না, সেটা চোখেমুখে লেখা থাকে। আপার চোখেমুখে সুখ অমোচনীয় কালিতে নিজের নাম লিখেছে। আপা ফিরে আসার পর একটি দিনের জন্যও সেই লেখা তার মুখ থেকে হারায়নি, সারাক্ষণ জ্বলজ্বল করেত। নিতুর তেমন হয়নি। কখনও হবে না। মিনার বেণীর মাথায় ব্যান্ড লাগাতে লাগাতে রিনা বলল, “কী ভাবো ভাবী, আমরা কিন্তু সারাদিন ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে থাকি না, চাচা খামাখা বলে।” “তা তো দেখতেই পাচ্ছি,” মুখ টিপে হেসে বলে নিতু।

“হা হা হা… কিন্তু তুমি এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন? নতুন বউ, সাজসজ্জা কর, শাড়ি পর। চেহারা বেশি সুন্দর বলে কি একটুও সাজবা না? চল তোমাকে শাড়ি পরায়ে দেই। তারপর-” মিনা বলল, “ব্যস! রিনা এবার কাজ পেয়ে গেছে। তোমার আর বাঁচার কোনো উপায় নাই ভাবী। ওর সাজানো শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুমি নড়তেচড়তেও পারবা না।” রিনা ধমকে উঠল, “আশ্চর্য! নতুন বউকে আমি সাজাবো না? কোন শাড়িটা পরাব বল তো?” নিতু বলল, “আমার স্যুটকেসে শাড়ি আছে। আমি নিয়ে আসছি দাঁড়াও।” “চল আমরাও যাই তোমার সাথে।” স্যুটকেস খুলে নিতু নিজের কাপড়চোপড় সরিয়ে দেখে সাত-আটটা শাড়ি। প্রতিটার ভাঁজের ভেতরে ব্লাউজ-পেটিকোট ভাঁজ করে রাখা। ঋতু সুন্দর করে সব গুছিয়ে দিয়েছে। ঠিক যেমন নিজের জন্য করত। রিনা বলে, “সুন্দর গোছানো তো, আমার এত অগোছালো থাকে, কামিজ পরলাম, সাজলাম-গুজলাম তো ওড়না আর পাই না। শাড়ি যেটা পরব ঠিক করি, ব্লাউজ যে কোথায় রাখছি মনে করতে পারি না। বড় যন্ত্রণা।

মিনা খুঁজে দেয়, না হইলে যে কী হইত!” “আমারও তাই হয়। আমি অত কাপড়চোপড় গোছগাছ করে রাখতে পারি না। আমার বোন এসব গুছিয়ে দিয়েছে। আমার বড় বোন, ঋতু।” ঋতুর নাম বলতে গিয়ে নিতুর গলা ধরে এলো। শাড়ির ভাঁজগুলোর উপরে হাত বোলাল। চোখ ভরে এলো কিন্তু নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। তাকে নিয়ে রিনার সাজগোজ খেলার আনন্দকে মাটি করতে চায় না। রিনা অস্থির হাতে দু-তিনটে শাড়ি সরিয়ে একটা বেছে নিলো। বলল, “এই তো এইটা ঠিক আছে। তোমারে খুব মানাবে। অবশ্য তুমি যা সুন্দর, যা পরবা তা-ই মানাবে, ভাবী।” তারপর একটু থেমে স্যুটকেসের ডালা ফেলে দিয়ে বলল, “তোমার বোনও কী তোমার মতোই সুন্দর?” “আপা আমার চেয়ে সুন্দর। তার চুল খুব কালো আর কোকড়া, আমার মতো বাদামি ধাঁচের না। সে অনেক সুন্দর।” নিতুর দৃষ্টি শূন্য হয়ে গেল।

সামনে যা আছে দেখতে পায় না, চোখ ভরে গেল। আপার মুখ মনে পড়লে বুকের ভেতরে কেমন ব্যথা লাগে, চাচি আর মায়ের মুখ মনে এলেও, তারাও কী তাকে তার মতো করে মনে করছে? নিতু নেই, বাসাটা কি একটুও খালি খালি লাগছে না? অবশ্য সে তো আর ঋতুর মতো হৈ চৈ করে বাসা মাতিয়ে রাখত না, নিজের ঘরে বা ছাদের এক কোণে কোথাও ঘাপটি মেরে পড়ে থাকত। নিতুর থাকা না-থাকা নিয়ে হয়তো তাই করো তেমন কিছু মনে না-ও হতে পারে। আপার চলে যাওয়াটা ছিল খুব চোখে পড়ার মতো। সবসময় নিচে থেকে চিৎকার করে নিতুকে ডাকত। কেন একটু দূরে গেলেই নিতুকে আপার প্রয়োজন পড়ত, কে জানে। কাছে থেকে আস্তে ডাকা, আস্তে-সুস্থে কথা বলা আপার স্বভাবের মধ্যে ছিল না। সারাদিন ওপর তলা থেকে নিচের দিকে না-হয় নিচের উঠোন থেকে ওপরে মুখ করে চেঁচাত আপা।

সে চলে যাওয়ার পরে এক পলকে সমস্ত চেঁচামেচি উধাও হয়ে গিয়েছিল। ভ্যাপসা গরমের রোদেলা দুপুরে বাসাটা খাঁ খাঁ করত। নিতু তখন বুঝেছিল, আপা থাকতে তার উপস্থিতিটা যেমন জোরালোভাবে জানাত তেমনি তখন নিস্তব্ধতা যেন আরও বেশি করে তার অনুপস্থিতিটা জানান দিচ্ছিল। শব্দহীনতা তীব্র আর ভয়ানক হয়ে নিতুর কানে বাজত, কল্পিত প্রতিধ্বনিতে নিতুর কেবলই কান্না পেত। সেই তুলনায় নিতুর থাকা না-থাকাটা প্রায় একইরকম। কেউ বুঝতেই পারবে না নিতু ঘরে আছে নাকি বাইরে গেছে। নিতু একেবারে সাধারণ। সে কোথাও গাঢ় কোনো ছাপ ফেলতে পারত না, ভালো অথবা খারাপ কোনো ছাপ। সে থাকা না-থাকাতে তেমন কোনো দৃশ্যমান পার্থক্য হয় না। রিনা নিতুর চোখে কী যেন পড়ে ফেলে, জড়িয়ে ধরে বলে, “ভাবী, মন খারাপ করো না। কয়েকদিন পরে দেখো তোমার বোন আসবে আমাদের দেখতে, বলবে, তোমরা কারা যাদের জন্য আমার বোন আমার কথা ভুলেই গেছে?” ধরা পড়ে গিয়ে নিতু চোখ মোছে, রিনার কথায় হাসে।

রিনা আর কোনো কথা বলার সুযোগ দেয় না, হাত ধরে টানতে টানতে বলে, আসো তো তাড়াতাড়ি, বিকেল পার হয়ে যাচ্ছে।” শাড়ি পরে নিতু চুপচাপ টুলের উপরে বসে ছিল। রিনাকে কিছু করতে মানা করেনি। রিনা আর মিনার তামাশা দেখতে দেখতে মনে হয় ক্লান্তি কেটে যাচ্ছিল। দুজন মিলে অনেক সাজায়, প্রতিটা ব্যাপারেই তাদের মতের অমিল, আবার নিজেরাই মিটমাট করে। নিতুর চোখ সাজাতে গিয়ে তো প্রায় ঝগড়াই লেগে গেল। একজন বলে বাদামি রঙের আইশেড লাগাও তো আরেকজন বলে নীল। শাড়ির মধ্যে দুটো রঙই ছিল। কিছুতেই আর সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না, তর্ক বেড়েই যাচ্ছিল। চোখ বুজে অপেক্ষা করতে করতে নিরুপায় হয়ে নিতু বলল, “সন্ধ্যা হয়ে যাবে একটু পরে, ছাই রঙের আইশেড লাগাও। তাছাড়া শাড়িতে ছাই রঙও তো আছে।” শেষ করে নিতুর দিকে তাকিয়ে দুজনেই মুগ্ধ।

রিনা মিনাকে বলল, “আমরা সাজলে মানুষ ভাবতে পারে যে শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হয়ে গেছে। কিন্তু ভাবীকে দেখ, একেবারে পরী!” মিনা বলে, “এরকম সুন্দরী বউ আমাদের পাড়ায় মানুষ জীবনেও দেখেনি। ভাবী, চল চল নিচে যাই। সবাই তোমারে দেখুক।” উঠোনে বড় মামা আর বাদলের মা দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। রিনা-মিনার সাথে নিতুকে এভাবে দেখে তারা চমকে ওঠেন। মামা হাততালি দিয়ে জোরে হাসেন,” বাহ্! আমি জানতাম তোরা ওকে নিয়ে খেলা শুরু করে দিবি। খুব ভালো হইছে। বড়ই সুন্দর লাগতেছে নতুন বউকে!” বাদলের মা জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করেন। রিনা বলল, “ফুপু তুমি বললা না কেমন হইছে?” “ভালোই তো!” “ব্যাস? শুধু ’ভালোই তো’?” “না, বেশ ভালো। বাদলা সুন্দর বউ আনছে।” “তাইলে আর রাগ দেখাইয়ো না ফুপু, আমরা সবাইরে নতুন ভাবী দেখাই।” বড় মামার সামনে বাদলের মা কিছুই বলতে পারল না।

মামাই বলেন, “দেখা, দেখাবি না কেন? এরকম বউ দেখছে নাকি কেউ?” মামার চেঁচামেচিতে বাসার সব ছেলেমেয়েরা ছুটে এলো। তারপর কার ইশারায় যেন আশেপাশের বাসার মানুষেরাও ধীরে ধীরে ভীড় জমাল। সবাই এসে নিতুকে দেখতে লাগল। এত প্রশংসায় অস্বস্তি লাগছিল নিতুর কিন্তু জানত এটাই নিয়ম, এভাবে চুপচাপ বসে থাকা, হেসে সবার প্রশংসার জবাব দেয়া, এরকম সবাইকে করতে হয়। রিনা, মিনারা সবাইকে চা নাস্তা খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক সময় ভীড় পাতলা হয়ে এলো। সন্ধ্যা হলে বাদলের মা এসে বলে, “ঘরে যাও।” ঘরে এসে নিতুর হঠাৎ করে মনে পড়ল, রান্নাঘরের পেছনে কী রহস্য তা তো কারও কাছে জানতে চাওয়া হলো না। কিন্তু এখন আর বেরিয়ে যাওয়াও যায় না, অন্ধকার হয়ে গেছে।

লাইট জ্বালিয়ে বসে থাকে সে। একা লাগে। সারাটা বাড়ি কেমন শান্ত হয়ে গেল। যে যার ঘরে চলে গেল। তাদের বাড়িতেও এমন নীরব সন্ধ্যা নামে কিন্তু এরকম দম বন্ধ হওয়া একাকিত কখনও চেপে ধরেনি। শাশুড়ি এসে বলল, “আর কতক্ষণ ঝলমলা পটের বিবি হইয়া থাকবা? কাপড় বদলাইয়া আস, কাজ আছে।” নিতু শাড়ি ছেড়ে এসে দেখল বাদলের মা তার ঘরে চৌকির উপরে চিৎ হয়ে শুয়ে, থামের মতো উরু পর্যন্ত শাড়ি জড়ো করে ওঠানো, ব্লাউজও খুলে ফেলেছে। অতি ব্যাবহারে পাতলা হয়ে যাওয়া শাড়ি কোনোরকমে বিশাল বুক ঢেকে রেখেছে, সামান্য আলোতেও সবকিছু স্পষ্ট। নিতু চমকে ভাবল, ঘরে ঢোকা ঠিক হয়েছে কি না। নিতুকে থমকে থাকতে দেখে বাদলের মা পাশে রাখা তেলের বাটি দেখিয়ে বলল, “যাও চুলার আগুনে গরম কইরা আনো। তেলের মধ্যে দুই কোয়া রসুন থেঁতলাইলা দিবা।” নিতু তেলের বাটি নিয়ে রান্নাঘরের দিকে আগাল।

সেখানে মাটিতে পা ছড়িয়ে বিউটি কাঁথার এক ধারে সেলাই করছিল। তাকে দেখে হেসে বলল, “ভাবী, আইজ থেইকা খালারে আর আমার মালিশ করতে হইব না, আপনি করবেন, খালা বলছে।” নিতু হেসে বলল, “অন্ধকারে সেলাই করছ কেন?” “কী করব, দিনের বেলায় তো সময় পাই না। এত আজাইরা কাজ দেয় বুড়ি!” “এভাবে বলতে হয় না বিউটি।” “কয়টা দিন যাউক, আপনিও আমার মতো কইরা কইবেন।” নিতু আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গরম তেলের বাটি নিয়ে তাড়াতাড়ি শাশুড়ির ঘরের দিকে হাঁটা দিলো। সে আসতে আসতে শাড়ি আরও উপরে উঠে গেছে। দুটো বিশাল কালো মসৃণ উরু পুরোপুরি উন্মুক্ত। অল্প পাওয়ারের লাইটের আলোতে নিতুর কাছে খুব অশ্লীল লাগছিল, সরাসরি তাকাতে পারছিল না। ঘরে ঢুকে বলল, “মা দরজা কি লাগিয়ে দেব?” “কেন? আমার ঘরে কেউ আসবে না।

দরজা লাগাইতে হবে না, তুমি তেল ঠা-া হওয়ার আগেই মালিশ কর।” নিতুর কাছে বাদলের মা তখনও আপন নয়, নিতুও নিজেকে কিছুতেই তার কাছের একজন হিসেবে ভাবতে শেখেনি তখনও। শুধু একটা পাতানো সম্পর্কই কি দুটো মানুষকে রাতারাতি কাছে আনতে পারে? নিতুর কাছে তাই প্রায় অপরিচিত একজনের শরীরে হাত দিতে কোথায় যেন বাঁধছিল। ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল। কাঁসার বাটিতে তেল বেশি গরম হয়ে গিয়েছিল। আঙুল ডুবিয়ে মনে হয় আঙুলের প্রান্ত পুড়ে গেল। আঙুল থেকে গরম তেল নামিয়ে রাখবে বলেই নিতু তাড়াতাড়ি শাশুড়ির ছড়িয়ে রাখা বাহুর উপরে চেপে ধরল। নরম মাংসের গায়ে তেলতেলে স্পর্শে নিতুর অসহ্য লাগছিল। চাচি যদি তাকে জড়িয়ে ধরত অথবা মা, আর তাদের নরম শরীর নিতুর গায়ে লাগত, তাহলে মনে হয় না তেমন লাগত।

খুব মমতায় চাচি জড়িয়ে ধরতে পারত। এই তো দুদিন আগে আসার সময়ে, চাচির বুকের স্পর্শ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চলে আসাই মুশকিল ছিল। নানান কথা ভাবতে ভাবতে একসময় বাটির পুরোটা তেল শরীরে শুষিয়ে দেয়, কেবল রসুনের কোয়াদুটো পড়ে থাকে। হঠাৎ নিতুর শাশুড়ি বেশ নরম গলায় বলেন, “ক্ষিদা পাইছে তোমার? যাও বিউটিরে ভাত দিতে বলো।” নিতু অবাক হয়ে যায় তখন তার গলা শুনে। তার আগে বাদলের মা এরকম স্বাভাবিক গলায় তার সাথে কথা বলেননি একবারও, যেন সবসময় কিসের একটা রাগ দেখাতেন। স্পর্শের মধ্য দিয়ে কি তার কাছে নিতুকে আপন লাগল? নিতুর ক্ষিদে পেয়েছে কি না সেটা চিন্তায় আসল! আপন মানুষদের জন্যই তো মানুষ এভাবে ভাবে। শাশুড়ির ওইটুকু কথায় নিতুর এতক্ষণের বিশ্রী অনুভূতির উপর একটা প্রলেপ পড়ে গেল। অস্বস্তিটা খানিকটা কমে।

দিনের বেলায় ঠা-া না থাকলেও রাতে হু হু বাতাসে নিতুর ভেতরে উথালপাতাল করতে থাকল, শীত শীত লাগছিল। গায়ের শালটা আরেকটু ভালো করে পেঁচিয়ে নেয়। কেন যেন মনে হয় এই শুকনো দিনেও বাতাসটা একটু অন্যরকম, বাতাসে ধুলো নেই বরং বাষ্পের গন্ধ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকারের গায়ে হেলান দিয়ে নিতু বুকভরে বাতাস নিতে থাকল। উঠোনের ওপরে অপার্থিব আলো, যেন গভীর কোনো গর্ত, উঠোনে পা দিলেই তলিয়ে যাবে পাতালপুরীতে। চারদিকের বাড়িগুলোর ছায়াচিত্র দেখা যায়, শুধু ধারগুলো স্পষ্ট, ভেতরে সব অন্ধকারের গ্রাসে। কী দ্রুত রাত গভীর হয় এই ছোট শহরতলিতে! নিতুদের বাড়ির মতো গাছের পাতায় শিশিরের টুপটাপ ঝরে পড়ার শব্দ নেই, কেবল গাঢ় নিস্তব্ধতা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো সে নিজেও অন্ধকারের কালো কুচকুচে গহ্বরে ডুবে যাচ্ছে, কেবল তলিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কাউকে ডাকছে না, বাঁচার জন্য হাত বাড়াচ্ছে না, কেন যেন ডুবে হিম হয়ে জমে যেতে ইচ্ছে করছে।

ওই নিরালা ঢের ভালো, মনে হলো কারও প্রতি কোনো দায় নেই, কারও কাছে কিছু আশা করারও নেই, কারও মুখ মনে আসে না। হঠাৎ মনে হলো বিগত জীবনের সব ছবি ঝাপসা হয়ে আসছে, সব হারিয়ে যাচ্ছে, মা, আপা, তপু ভাই সব প্রিয় মানুষদের মুখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারের শরীর চিরে ঘর থেকে ডাক ভেসে এলো, “বউ, এই শীতের মইদ্দে এত রাইতে ওইখানে কী কর? আচ্ছা যন্ত্রণা তো! ঘরে যাও।” শাশুড়ির ধমকে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকা দুঃস্বপ্ন পালিয়ে গেল। মোটা পুরোনো সাদাটে পিলারের গায়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে দৌঁড়ে ঘরে চলে গেল নিতু, কপাট লাগিয়ে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল, দুচোখে ঘুম জড়িয়ে আসছিল। সেদিন বিছানা শীতল।

১৩ দরজায় দুমদাম ধাক্কার শব্দ শুনে মনে হলো বাসায় ডাকাত পড়েছে। ডাকাত নয়, একটি বিরক্ত হওয়া কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল, “রাইতবিরাইতে বারান্দায় খাড়াইয়া থাক আর এখন বেলা কইরা পইড়া পইড়া ঘুমাও?” লাফ দিয়ে উঠল নিতু। চাদরের খোলসের বাইরে বেরিয়ে আসার সাথে সাথেই সকালের শিরশিরে ঠা-া চামড়ায় কামড় বসাল। মনে হলো যেখানে আছে সেখানে যেন তার থাকার কথা নয়। দরজায় আরেকটা ধাক্কার সাথে শোনা গেল, “কই, দুপুর পার কইরা উঠবা নাকি?” লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলল নিতু। বাইরের পৃথিবীটা ঘরের ভেতরে ঢুকে একটা ধাক্কা দিলো তাকে, সত্যি বেশ আলো ফুটে গেছে, ঘরের ভেতরে কিছুই বোঝা যায়নি।

আলোতে অভ্যস্ত হতে চোখ কিছুটা সময় নেয়, দেখে শাশুড়ি সামনে দাঁড়িয়ে। চৌকাঠ থেকে হাত সরাতে সরাতে বললেন, “আর কত ঘুমাইবা?” সকাল হলেও বাড়িতে তেমন কোনো মানুষের সমাগম দেখা যাচ্ছিল না, তার মানে তেমন সকাল হয়নি। এমনিতে নিতুর তো খুব বেলা করে ঘুমানোর অভ্যাস নেই। কিন্তু ফিরে গিয়ে ঘড়িও দেখতে ইচ্ছে হয়নি, কয়টা বাজে জেনেইবা কী করবে সে! রান্নাঘর থেকেই বাড়ির ছেলেমেয়েদের কলকল শোনা যায় বেশ কিছুক্ষণ পরে। বেশির ভাগেরই স্কুল কলেজে যাওয়ার তাড়া, কেউ ছুটছে তো কেউ পেছন থেকে ডাকছে। তাদের এই ব্যাস্ততা মুখ বাড়িয়ে দেখতে ইচ্ছে করে নিতুর, যেখানে বসে কাজ করছিল সেখান থেকে কেবল সবার চলে যাওয়া দেখতে পাচ্ছিল।

নানান রকমের স্কুল-কলেজের পোষাক পেছন থেকে দেখতে পেল বলে চোখ বারবার সেদিকে চলে যাচ্ছিল। শাশুড়ি ধমকে বলল, “কই চাইয়া রইছ? হাত কাটবা নাকি? পরে সব্বাই কইব, বউরে খুব খাটাইছি।” নিতু মুখ নিচু করে বাঁধাকপির কুচি আরও কত সরু করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিলো। রিনা আর মিনা বেরিয়েছে তখন, গলা শোনা গেল তাদের, রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে বলে, “ভাবী , উঠছ? আমরা যাই কলেজে।” নিতু তাদের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। মিনা বলল, “আর কয়দিন পরে তো তোমার আর এই সময় রান্নাঘরে আসা সম্ভব হবে না, তুমিও আমাদের সাথে কলেজে যাবা।” বলে তার ফুপুর দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে লাগল। বাদলের মা একেবারে না শোনার ভান করে কড়াইয়ে ভাজি নাড়ায় ব্যস্ত। নিতু তাদের চলে যেতে ইশারা করলে তারা মনে হয় আরও ক্ষেপে যায়, বলে, “ভাবীর কিন্তু আমাদের কলেজে যাওয়াই ভালো হবে, বুঝলা ফুপু? একা একা অন্য কলেজে গেলে আবার কী বিপদ-আপদ হয়!” এদিক থেকে কোনো উত্তর নেই।

তিনি কিছুই বলছেন না দেখে দুই বোন খিলখিল করে হাসতে হাসতে দৌঁড়ে চলে গেল। বাদলের মা এতক্ষণে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “মাইয়া দুইটা বেজায় বেয়াদব!” নিতু চুপচাপ হাত চালাচ্ছিল। বাদলের মা একটু পরপরই নানান প্রশ্ন করেন। “তুমি কি বুটের হালুয়া বানাইতে জান?” “কখনও বানাইনি, তবে দেখেছি বানাতে, পারব মনে হয়।” “নারকেলের নাড়–?” “বানাতে দেখেছি, পারব মনে হয়।” “গাছে একটা লাউ বেশ বুড়া হইয়া গেছে, দুধলাউ বানাইতে পারবা?” “আপনি বলে দিলেই পারব।” “আচ্ছা, তোমার মায়ে তাইলে তোমারে করাইছেটা কী? এক্কেরে আস্তা এত্তবড় মাইয়া, কিন্তু কোনো কাজই শেখায় নাই?” “আপনি বলে দিলে আমি ঠিক শিখে ফেলব, মা।” “শিখবা আর কখন, শুনলা না, তোমারে কলেজে যাইতে হবে?” “তার মধ্যেই শিখে নেব, কোনো অসুবিধা হবে না। কলেজে যেতে এখনও অনেক দেরি।”

“অত পইড়া কী হয়?” “বাবা তো বলেছিল যে আমি পড়ব এখানে এসে-” গলা নেমে গেল নিতুর। “কইছিল হয়তো, কতজনই তো কতকথা কয়! ভাই কইছিল পুরা বাড়িই নাকি তুমি পাইবা, পরে গিয়া তো দেখলাম কিছুই না।” “এসব কথা কিন্তু আমি জানি না। আমার মনে হয় আমার বাবাও জানেন না। আর তাছাড়া আমার আরও দুই ভাইবোন আছে, সব আমি নেব কেন?” “তুমি তো দেখি কিছুই জানো না। সব সময় অত কচি সাজার চেষ্টা কর কেন? সংসারের হালহকিকত মনে হয় কিছুই বুঝ না। তোমার ভাইবোনগুলা তো শুনছিলাম আর ফেরত আসবে না, ভাই বাঁইচা আছে কি না সেইটা কেউ জানে না, বোন হারাইয়া গেছে। তুমি জানো এই বাড়িতে বড় ভাইয়ের সম্পত্তিটা পাওয়ার জন্য আমারে কত যুদ্ধ করতে হইতেছে? কার জন্য করি? বাদল আমার একটাই সন্তান, তার বউ তুমি, আমি যা পাই, তোমাদেরই হবে, সেইটা বোঝ না?

এখন তুমি আবার দেখি ওই অন্য ভাইদের পোলা-মাইয়া আর বউয়ের সাথে ভাব জমাও।” “আপনি কি চান আমিও আমার ভাইবোনদের সাথে এইরকম ঝগড়া করি?” “তুমি কি করবা তার আমি কী জানি?” নিতু আর কোনো কথা বলেনি। বিউটির দিকে চোখ পড়াতে দেখল পরম আমোদে সে সব কথা গিলছে। যে যখন কথা বলছে তার দিকে আড় চোখে তাকাচ্ছে, শেষ হলে অন্য বক্তার দিকে। মুখ দেখে মনে হলো তার সামনে সার্কাস শুরু হয়ে গেছে, আর সার্কাসের প্যান্ডেলের ভেতরে দুই জোকার ব্যাডমিন্টন খেলছে। ভ্রু কুঁচকে মাথাটা পেন্ডুলামের মতো দুলেদুলে পুরো অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছে। নিতুর খুব লজ্জা লাগল। জমি, সম্পত্তি নিয়ে কাড়াকাড়ি কি ঝগড়া সে কোনোদিনও তাদের বাড়িতে দেখেনি। ভেতরে ভেতরে খুব অসহায় লাগে, সে কোথায় এসে পড়ল! তার ভূমিকাটা এখানে কী হওয়া উচিৎ বুঝতে পারেনি।

তবে বিষয়টা কিছুটা পরিষ্কার হলো, বড় মামা বিয়ে করেননি, এখন বাদলের মা চান তার পুরো অংশটা যেন বাদলের হয়। এই নিয়েই হয়ত সবার সাথে রেষারেষি। ওই দুদিনেই নিতুর চোখে পড়েছিল, সবার সাথে বাদলের মা যতই খারাপ ব্যাবহার করুক, বড় ভাইকে খুব তোয়াজ করে চলছিলেন, তাকে প্রতিবেলায় ট্রে তে সাজিয়ে খাবার পাঠিয়ে দেন। তার সাথে কখনও খারাপ ব্যাবহার করতে দেখেনি। বড় ভাইয়ের সম্পত্তির জন্যই তার একটা আলাদা কদর ছিল বাদলের মায়ের কাছে। সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারার মতো বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা নিশ্চয়ই তার দায়িত্ব নয়। তাই সেসব নিয়ে কথা না বলে যেই নিজের কাটাকুটিতে মনোযোগ দিতে গেছে, আকস্মিক বাদলের মা বেশ জোরে চমকে দিয়ে বলে, “এইটা কী, পিঁয়াইজ কেউ এইভাবে কাটে নাকি? তোমার মা তোমারে সত্যই কিছু শেখায় নাই, কুচি কুচি করবা তা-ও জানো না?” “কুচিই তো করলাম, মা।”

“এইভাবে কাটে? এইরকম গোল গোল? লম্বালম্বি কইরা কুচি করতে পার না? তরকারির বারোটা বাজাইয়া দিলা।” নিতু গোল গোল করে পিঁয়াজ কাটাই জানে, বুঝতে পারে না এতে সমস্যাটা কোথায়, কিছু না বুঝে ঝাঁঝে ভরে ওঠা চোখদুটো হাটুর সাথে ঠেকায়। বাদলের আরও কিছু একটা বলতে গিয়ে তার আগে দেখে দরজায় মুখ বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুতুল। নিতুকে কিছু না বলে পুতুলের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি আবার কী চাও?” চোখের চশমাটা নাকের ওপরে নেমে যাওয়াতে একটা আঙুল দিয়ে ওপরের দিকে ঠেলা দিয়ে পুতুল বলে, “পিঁয়াজ তো পিঁয়াজই ফুপু, লম্বা আর গোলে কী সমস্যা?” “তুমি সেইটা বুঝবা না, আমরা কখনও গোল কইরা কাটি না, আমাদের অভ্যাস নাই।”

“এইটা তো দেখি লিলিপুটিয়ানস আর ব্লেফুস্কোডিয়ানের সমস্যা হইল ফুপু। তারা যুদ্ধ করছিল ডিম লম্বা দিক দিয়া ভাঙবে নাকি চওড়া দিক দিয়া। ডিম তো ডিমই না ফুপু? উপর থেকে ফেইলা ভাঙ্গো আর আদর কইরা টোকা দিয়া ভাঙ্গো, বাইর তো হইয়া আসবে সেই হলুদ কুসুমটা, ব্যস! আরেকটা কথা, ডিম এমন একটা জিনিস যে খাওয়ার আগে তোমাকে ভাঙতেই হবে। কিন্তু লিলিপুটিয়ানস আর ব্লেফুস্কোডিয়ানরা ভাবল-” “তারা আবার কারা? যত্তসব আজগুবি কথা, যাও এইখান থেইকা- কলেজ যাও নাই কেন?” “আমার তো সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হয় নাই। শুরু হইলে যাব। আর তুমি এই প্রথম কলেজে যাইতে কইলা, কী ব্যাপার?” বাদলের মায়ের হাত খুন্তি নিয়ে দ্রুত কড়াইয়ে ঘোরাফেরা করতে থাকল। নাশতার ট্রে ইচ্ছে করে বিউটির হাত থেকে নিয়ে মামার ঘরে গেল নিতু। বাদলের মা শশুড় বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকে মামার দিকটাতেই থাকত।

ওই অংশটা নিজের মতো করে ব্যাবহার করত। একা মানুষ মামাকেই সেখানে অতিথি বলে মনে হয়। মামা বলল, “আসো আসো নিতু, কেমন লাগতেছে মা এইখানে?” “ভালো মামা।” “দাও দাও, আমার ক্ষিদা পাইছে।” মামা খেতে খেতে নিতু ঘরের এদিকওদিক একটু গোছগাছ করেন। দেয়ালে ঝোলানো সাদাকালো ছবিতে নিতুর চোখ চলে গেল। অনেক মানুষ লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে প্যান্ট আর হাতাকাটা গেঞ্জি পরে, সবার হাতে অস্ত্র। চারদিক থেকে বাদামি হতে থাকা ছবিটা একেবারে ঝাপসা হয়ে প্রায় মুছেই যাচ্ছে।

এককোণে কালচে পোকা লাগার দাগ। নিতু কাছে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করে। “ছবি দেখ?” “এইটা কাদের ছবি মামা?” “আমার আর আমার বন্ধুদের, আমারে পাইছ? বামদিক থেকে চার নম্বর- পাইছ?” “চেনাই তো যায় না।” “যাবে কীভাবে? বিশ বছর আগের ছবি।” “মানে মুক্তিযুদ্ধের? আপনি কি যুদ্ধে গিয়েছিলেন মামা?” “তা তো গেছিলাম, আটত্রিশ বছর বয়স ছিল আমার। গ্রামের স্কুলে পড়াই তখন। গ্রামের আরও অনেকে গেল, আমার চেয়ে অনেক ছোট ছোট ছেলেরা ঝাঁপাইয়া পড়ল। না গিয়া কোনো উপায় ছিল না। বাদল বোধ হয় আমাদের গল্প করে নাই তোমার কাছে?” অবাক চোখে মামার কথা শুনতে শুনতে নিতু বিব্রত হয়। তার মুখ দেখে মামা বললেন, “আমাদের কথা তো আস্তে আস্তে জানবাই, তুমি তোমার বাড়ির গল্প বলো- বাসার সবার কথা মনে পড়তেছে খুব, না?” নিতু মাথা নিচু করে হেসে বলল, “তা তো পড়ছেই মামা। কোনোদিন তো বাড়ির বাইরে কোথাও গিয়ে থাকিনি। বাড়ির কথা আর কী, মা আর চাচির কথা খুব মনে পড়ছে।”

“এই জায়গাটাকেই এখন বাড়ি মনে করতে হবে তোমাকে, বুচ্ছ মা? মন খারাপ কইর না। এইখানেই তুমি আনন্দ খুঁইজা নাও।” “আপনি আমাকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাবেন, মামা?” “সে কখনও শোনানো যাবে। সেসব অনেক পুরান কথা, অনেক বলছি, নতুন কইরা কী আর বলব!” “আমি তো শুনিনি মামা, আমাকে বলবেন। আমি তো কোনোদিন কোনো মুক্তিযোদ্ধাই দেখিনি।” “হা হা হা…. মুক্তিযোদ্ধা দেখার জিনিস, না?” “হবে না? তাদের কথা কত জায়গায় লেখা থাকে! মানুষ তাদের কথা জানতে চায়। আপনার কথা জানতে চায় না?” “আমার কথা কেউ জানতে চায় না। আমি তো আর মরি নাই! মইরা গেলে হয়তো সবাই আমার কথা খুঁটায়ে খুঁটায়ে জানতে চাইত- মইরা গেলে মিউজিয়ামে ছবি থাকত, নির্দিষ্ট দিনে সবাই যত্ন কইরা মনে করত, আমি কেমন ছিলাম, আমার আত্মত্যাগ, আমার পছন্দ-অপছন্দ এইসব নিয়া কথা বলত।” মামা যত্ন করে ভাতের লোকমা বানিয়ে কাঁসার প্লেটে তাকিয়ে হাসলেন। নিতু বিভ্রান্ত, একভাবে তাকিয়ে থাকল।

যুদ্ধে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরে আসা মানুষটির মরতে পারেননি বলে আফসোস হচ্ছে? নিতু কোথাও পড়েছিল যে স্বাধীন দেশ কোনো জীবিত গেরিলা চায় না। আপন মনে কথা বলতে বলতে ভাত খেতে থাকা মানুষটি অনেক মানুষের মাঝখানে ভেতরে ভেতরে আসলে খুব একা। সন্ধ্যার আগে আগে রিনা, মিনা আর পুতুলের মধ্যে কী যেন পরামর্শ হলো। ঘরের দরজায় হাতছানি দিয়ে ডাকল নিতুকে। “কোথায় যাব?” “আমাদের একটা জায়গা আছে, তোমাকে দেখাই।” রান্নাঘরের পাশ দিয়ে পেছনে চলে গেল ওরা। শুকিয়ে যাওয়া ঝোঁপ পেরিয়ে পুরোনো পাঁচিলে একটা ছোট, সরু দরজা। একে একে তারা দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল। নিতুর চোখে ধাঁধাঁ লেগে গেল। সামনে অবারিত চর, জায়গায় জায়গায় ঘাস দিয়ে ঢাকা, কোথাও সবুজ কোথাও মরা ঘাস। শেষ বিকেলের তীর্যক আলোয় বালু ঝিকমিক করছে।

একটু সামনে বিশাল নদী, পানির উপরে নরম রোদ, ঠিক ভোরের আলোর মতো। নদীর আরেক ধার অনেক দূরে দিগন্তে মিশেছে। গোধূলীর আলোয় পানি, মেঘ আর নীল রঙ হারাতে বসা আকাশ এমন ভাবে মিলেমিশে গেছে যে কোনোটির অস্তিত্ব আলাদা করে বোঝা যায় না। দিগন্তের সরলরেখাটি কোথাও আছে, কোথাও নেই। মেঘের পেছনে কোথাও কোথাও কেউ ইরেজার দিয়ে ঘসে দিয়েছে, একেবারে হাওয়া। নিতু হা করে সেই দিকে তাকিয়ে থাকল।রিনা হাত ধরে টেনে বলল, “কী হইল, আসো না!” নিতু আগাল। নদীটা যে কোথা থেকে আসছে বোঝা যায় না, আরেক দিকটাও মানুষের আগামী জীবনের মতোই রহস্যময়। চোখদুটো চাইলেও কেন যেন তার গতিপথ অনুসরণ করতে পারে না। নিতুর অবাক লাগল কোথাকার পাহাড়ের শীতল কোন বরফ গলতে গলতে কোথায় এসে পড়েছে! ঠিক যেন নিতুর মতো, দুদিন আগে কোথায় ছিল তারপর ভাসতে ভাসতে কোথায় এসে উপস্থিত। দূরে নদীর একটা বাঁক দেখা গেল নাকি ওগুলো শীতের চর নিতু বুঝতে পারল না, চরগুলোকে চারদিক থেকে দ্বীপের মতো ঘিরে পানি বয়ে যাচ্ছে।

যেদিকে সূর্যের আলো পড়েছে সেদিকে কালো পানির মধ্যে মাথা উঁচু করে সাদা চরগুলো লম্বালম্বি ভেসে ছিল, কোথাও সরু কোথাও একটু চওড়া। হঠাৎ মনে হলো এই নদীর ধার ঘেষে হাঁটতে থাকলে কী সে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে যাবে না? তারপর নিজের ভাবনায় নিজেরই হাসি পেল, এতদূর হাঁটা, সেটা কী সম্ভব? বিকেলের পড়ন্ত রোদে দূরের চরগুলোকে বিষণ্ন দেখায়, নিতুরা যেদিকে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে কিছু দূরে গরু চরছিল। সবুজ ঘাসের আশায় তারা এখানেওখানে মুখ দিয়ে মরা ঘাসের মাথাগুলো টেনে টেনে ছিঁড়ে নিচ্ছিল। লুঙ্গি পরা ছোট একটা ছেলে হাতে লাঠি নিয়ে তাদের এদিকওদিক থেকে পিটিয়ে একসাথে করার চেষ্টায় ছিল। সেদিনের মতো তাদের খাওয়ার সময় শেষ, হয়তো হেঁটে বাড়ি যেতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাবে। গরুগুলো যেতে যেতেও বালুতে মুখ ঘষে ঘষে ঘাস খুঁজছিল, তাদের ক্ষিদে মেটেনি।

একসাথে তাড়িয়ে এক জায়গায় আনার পরেও বারবার ছত্রভঙ্গ। সরু লাঠিটি সপাং সপাং তাদের পিঠে ব্যাবহার করা হচ্ছিল। নিতু নদী থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। তাই মাটিতে ছোট গাছের গোড়া আর শিকড়ে বারবার হোচট খাচ্ছিল। মিনা বলল, “কী হইল ভাবী, বালুতে হাঁট নাই বুঝি কোনোদিন?” নিতু বারবার কিসে হোচট খায় দেখেই হেসে আবার চোখ ওপরে তোলে। বালুতে হাঁটার অভিজ্ঞতা তেমন হয়নি, স্যান্ডেল যেন পেছন থেকে কেউ টেনে ধরছে আর সে আবার নিজের পায়ের সাথে তাকে ঠেলে সামনে পাঠাচ্ছিল। মনে পড়ল ছোটবেলায় বাবার সাথে তিস্তা নদীর কাছে ফুপুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। তখন প্রতিবছর বর্ষায় শুনত ফুপুদের বাড়ির উঠোনে বন্যার পানি এসে পড়েছে। কখনও খবর আসত গরুগুলোকে বারান্দায় উঠিয়ে রাখতে হচ্ছে কারণ গোয়াল ঘরে পানি থই থই করছে। তিস্তাপাড়ের মানুষদের জন্য বাড়িতে বন্যার পানি ওঠা একেবারে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সেবার নিতুরা গিয়েছিল বর্ষার শুরুতেই।

সেই প্রথম নিতুর বড় নদী দেখা, তাও আবার ভরা বর্ষায়। স্রোতের সেই ভয়ঙ্কর টান ভোলার না। বাবা বলছিল, “পাহাড়ী নদী তো, তাই খুব স্রোত।” যত পানি ছিল চোখের সামনে মনে হচ্ছিল সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। ছোট লাঠির টুকরো ফেললেও মুহূর্তের মধ্যে ভেসে দশ-বারো ফুট দূরে চলে যাচ্ছিল। নিতু শুকনো পাতা, এটাসেটা পানিতে ফেলছিল আর দেখছিল কোনটা কত জোরে চলে যায়। ফেলতে ফেলতে হঠাৎ পানিতে একটা পা ডুবে গিয়েছিল। নিজেকে সামলে কোনোরকমে পানিতে পড়া থেকে বাঁচিয়ে যেই পা তুলেছে দেখে পলি মেশানো ঘোলা পানির সাথে উল্টে পাল্টে নিতুর স্যান্ডেল প্রায় সাত-আট ফুট দূরে চলে গেছে। পাওয়ার আর কোনো আশা নেই জেনে নিতু আরেক পায়ের স্যান্ডেল খুলে সামনে গভীর পানির দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সেটা পাক খেতে খেতে দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতে সামান্য সময়ও লাগেনি।

এই পানি কারও নিজের বাড়ির উঠোনে, গোয়ালে স্রোতের মতো বয়ে যায়, নিতু ভাবতেই পারে না। কিন্তু যে কয়দিন সেখানে ছিল প্রতিদিন একটু একটু করে নদীকে ফুলে ফেঁপে উঠতে দেখছিল। প্রতি সকালে আরও উঁচু, আরও চওড়া হয়ে যেত। স্রোতের সেই উন্মাদনা দেখলে নিতুর দমবন্ধ হয়ে যেত। মনে হতো সে সেই পানির নিচে, ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে আবার মনে হতো, আচ্ছা, এই নদীতে বয়ে যাওয়া সব পানির ওজন কত হবে? তখন সেই শেষ চৈত্রে পদ্মা নদী সেই তুলনায় একেবারে শান্ত আর শীর্ণ। তাকালে মন একরকম প্রশান্ত হয়ে যায়। ছোট ছোট ঢেউগুলো ক্রমাগত ভাঙছে আর গায়ে আয়না দিয়ে আলো প্রতিসরনের মতো ঝিকমিক করছে। পুতুল বলল, “হাঁপায় গেলা নাকি ভাবী, কোনো কথা নাই যে!” “না না হাঁপাইনি, চারদিক এত সুন্দর, তাই দেখি। আমরা কি পানির দিকে যাচ্ছি?” “না, আমরা যাচ্ছি ওই যে দেখ একটা বটগাছ দেখা যায় তার নিচে।”

নিতু ডানদিকে তাকিয়ে দেখল কাছাকাছি একটা বটগাছ, ঝুড়ি নামা চারদিকে। আরও কাছে এলে দেখা গেল গাছের অর্ধেক শিকড় শূন্যে, নিচে থেকে মাটি সরে গেছে। মানে সেখানে পানি আসত, বাকি অর্ধেক তখনও শক্তপোক্তভাবে ঘাস আর মাটির নিচে অদৃশ্য। যেদিকে মোটা শিকড় উন্মুক্ত সেখানে মন্টু নদীর দিকে মুখ করে বসে ছিল। শব্দে ফিরে তাকিয়ে বলল, “আসলি একক্ষণে? এই নে-” মন্টুর হাত থেকে চানাচুরের ছোট ছোট প্যাকেট সবার হাতে চালান হয়ে গেল। নিতুর দিকে তাকিয়ে বলে, “কেমন লাগতেছে ভাবী আমাদের আড্ডার জায়গাটা?” “দারুণ, কী বলব, অসাধারণ! মনে হচ্ছে কোথাও বেড়াতে এলাম।” “আরে ধুর বেড়াইতে কেন? তুমি যখন খুশি আসতে পারবা। এইটা হইল বড় চাচার জমি ওই যে ওইদিকে তাল গাছের সারি দেখা যায় ওই পর্যন্ত।” মন্টুর আঙুলের ইশারা করা দিকে নিতু তাকাল। তালগাছ অনেক দূরে, সে ভালোমতো দেখতে পায়নি, বলল, “আচ্ছা, এই যে এখানে শিকড় বেরিয়ে আছে, মাটি সরে গেছে, এখানেও কি পানি আসে?” “আসে তো, বর্ষায় দেখবা এই বটগাছের গোড়া পানির নিচে। আমরা যখন ছোট ছিলাম এতদূরে পানি আসত না। এখন আস্তে আস্তে আমাদের বাড়ির দিকে পানি আসা শুরু হইছে। শহরের অনেক দিকে নদী ভাইঙা বড় হইয়া গেছে। বড় চাচা বলছে এইগুলাও কিছুই থাকবে না। আমাদের বাড়িঘর সব নাকি নদী খাইয়া ফেলবে।” “তাই নাকি? আচ্ছা যাদের বাড়ি নদীতে চলে গেল, তাদের কী হলো?” “কী আর হবে? কেউ একেবারে সর্বস্বান্ত হইয়া কোথায় যে চইলা গেল বলা যায় না। বুঝতে পারলে কেউ আবার আগে থেইকা পানির দামে জমি বিক্রিবাট্টা কইরা অন্য কোথাও ব্যাবস্থা কইরা নিল।

কেউ কেউ কাঠের বাড়ি পার্ট পার্ট খুইলা দূরের কোনো জমি যদি থাকে সেখানে নিয়া গিয়া আবার বানাইয়া নিল। এইখানকার মানুষের জীবনই এইরকম।” নিতু মুখে চানাচুর পুরল আর স্বাভাবিকভাবে বলা মানুষের সর্বনাশের গল্প শুনল। আশ্চর্য লাগে, কথাগুলোর মধ্যে হা হুতাশ নেই, ছোটবেলা থেকে ওরা এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত। নিতু কাঠের বাড়ির রহস্য ধরতে পারল, বাসাটা যে কোনো জায়গায় নিয়ে গিয়ে আবার ঝটপট বানিয়ে ফেলা যায়। মানুষ প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করতে কতরকমের উপায় বের করে ফেলে! যে পারে সে-ই টিকে থাকে। নিতুর মনে হলো তাদের বাড়ির দিকে বরং এরকম কোনো জীবন সংগ্রাম নেই। সেই কবে দাদা বাড়ি বানিয়েছে সেই বাড়িতে দাদা তার জীবন পার করেছে, বাবাও করছে, তারা করছে এরপর হয়ত ভাইয়া বিয়ে করলে তার বাচ্চারাও থাকবে। থাকার জায়গা নিয়ে তাদের কোনো অনিশ্চয়তা নেই, প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটি বাড়িতেই সন্তুষ্ট। চারজনে হাসাহাসি আর গল্প করতে থাকল। নিতু কিছুক্ষণ তাল মেলাল, আবার কিছুক্ষণের জন্য নদীর দিকে তাকিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে গেল। দূরে পাল তুলে নৌকা চলে যাচ্ছিল, একটু আগেও পালের ফ্যাকাশে লাল রঙটা বোঝা যাচ্ছিল, মাঝখানে সেলাই করে কোনো একটা হালকা হলুদ রঙের কাপড় দিয়ে মেরামত করা হয়েছে তা-ও বোঝা যাচ্ছিল। পরে আর বোঝা যায়নি, সূর্য নিচে নেমে যাওয়ায় সেই লালচে আলোর গোলকের সামনের সবকিছু ছায়া ছায়া হয়ে গিয়েছিল। নৌকার ওপরে একটি লোক সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, মাঝি নড়াচড়া করছিল, বৈঠা পানিতে পড়ছিল- সব বোঝা গেল কিন্তু কোনো রঙ নেই, কালচে ছাই রঙের ছবি। গাছপালাগুলোও দেখতে দেখতে একই রকম ছায়াচিত্র হয়ে গেল। ছোটবেলায় পাড়ার মিশনারি স্কুলের ফাদার বিকেলবেলা বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখাতেন। নিতু আর ঋতুও যেত ছবি আঁকতে। শেখা তেমন কিছুই হয়নি, পাখি আঁকলে হাতির মতো হয়েছে তাই দেখেই ফাদার হাততালি দিয়ে ‘ব্র্যাভো ব্র্যাভো’ বলে নেচে উঠেছেন।

বাসায় ফিরে সেই ছবি নিয়ে রিংকু অনেক ক্ষেপিয়েছে নিতুকে। ফাদার একদিন ছবি আঁকা শেখাতে গিয়ে বলেছিলেন, “আজ তোমাদের সিলুয়েট আাঁকা শেখাব।” ব্রাশে হালকা কালো কালি নিয়ে ইজেলের সাদা ক্যানভাসে কয়েকটা মাত্র টানে ফাদার ছায়ার মতো বাড়ি, গাছপালা তৈরি করেছিলেন। তারপর নিতুদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “কী, খুব সহজ না?” নিতু আাঁকতে গিয়ে দেখেছিল আসলে মোটেই তত সহজ নয়। কালির ছোপ কোথাও বেশি পড়ে যাচ্ছে, কোথাও নেই, সিলুয়েট ফুটছে না। রাগের চোটে ইচ্ছে করেছিল পুরো কাগজে কালি ঢেলে দেয়। কিন্তু তখন পদ্মার পাড়ে চোখের সামনে প্রকৃতি যাদুমন্ত্রে সিলুয়েট তৈরি করেছে, নিখুঁত ছবি। নৌকায় দাঁড়িয়ে থাকা সাইকেলের চাকার ফাঁকেও ওপাশের আলো নিভতে থাকা সূর্য দেখা যাচ্ছে। এমনই খুঁতবিহীন। পুতুল বলল, “অ্যাই চল সবাই। ভাবীকে নিয়ে আসছি আমরা, দেরি দেখলে ফুপু আবার খ্যাচখ্যাচ করবে।” উঠতে গিয়ে ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিতুর হঠাৎ মনে পড়ে এরকম সূর্যই সে দেখেছিল তপু ভাইয়ের সাথে, পদ্মদীঘির পাড়ে। সেই একই সূর্য এখানেও একইভাবে ডোবে। তপু ভাই কি এখন সূর্যাস্ত দেখছে? একেবারে আকস্মিক একটা কথা মনে পড়ায় শিউরে উঠল আর হাসলও মনে মনে, আমেরিকার মধ্যরাতের সময়ে সে তপু বাইয়ের সূর্য দেখা নিয়ে ভাবছে। এখানে চলে আসার সময় তপু ভাই বলেছিল, “নিতু, কে জানে, যেখানে যাচ্ছ সেখানেও তো এরকম একটা দীঘি থাকতে পারে!” নিতু মনে মনে বলে, শুধু একটা দীঘি নয় তপু ভাই, লক্ষ দীঘির সমান নদী আছে এখানে! তবু কেন আমার এত শূন্য লাগে? ১৪ রাতে যখন পুরো বাড়ি ঝিম মেরে থাকত তখন ঘরের কোণে নিতুর শাশুড়ি তেলতেলে চৌকির উপরে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকত।

ঘরের একদিকে টান টান করে গোছানো বিছানা আরেক দিকে সরু চৌকি রাখা। বছরের পর বছর তেল মালিশের কারণে কাঠের গায়ের আঁকাবাঁকা আঁচড়গুলোতে তেল ঢুকে ঢুকে পুষ্ট, উপরিভাগ কোনো পলিশ ছাড়াই তেলাপোকার গায়ের মতো রঙ। নিতুর হাত কখনও দ্রুত, কখনও ধীরে তার উন্মুক্ত শরীরের উপরে তেলের প্রভাবে পিছলে পিছলে যেত। শব্দহীন হালকা আলো-আঁধারির মধ্যে শাশুড়ির গলা নরম হয়ে আসত। এমন করে কথা শুরু করত যেন অনেক দিন পরে নিজের কথা বলার একজন মানুষ পাওয়া গেছে।

“বাদলের বাপ খুব বোকা ছিল বুঝলা? ছয় ভাইয়ের মইদ্দে সবচাইতে ছোট ছিল সে। বাদলের চাচাদের মতো চালাক-চতুর আর শয়তানও ছিল না।” “আচ্ছা।” “হঠাৎ ব্লাড প্রেশার বাইড়া নাকে রক্ত উইঠা মইরা গেল এক রাইতে। বাদলের বয়স মাত্র ছয় তখন। সুস্থ মানুষ ভাত খাইয়া, পান খাইয়া ঘুমাইল, মাঝ রত্তিরে গোঙাইতে গোঙাইতে মইরা গেল। ওই এক রাইতের ভিতরে আমার সব শ্যাষ।

বড় ভাইয়ের মাছের ব্যবসায় কাম করত বাদলের বাবা, নিজের বইলা কিছু ছিল না। সে মনে করত ভাইরা চিরদিনই তারে কোলে উঠাইয়া রাখব, তার বউ-পোলারেও কোলে উঠাইয়া নাচব। কিন্তু সেইরকম কিছুই হয় নাই। শুনতেছ?” “জি শুনছি।” “মাসদুয়েক বড় ভাই খাওয়াইল, বাদলের স্কুলের বেতন দিলো, তারপর শুরু হইল অশান্তি। এমন করত মনে হইত আমদের দুইজনরে চিনেই না। বাদলের স্কুলের বেতন বাকি পড়ল, চাইলেই কইত, এখন হাতে টাকা নাই। একসময় খাওয়াদাওয়ারও অসুবিধা হইতে লাগল।

টাকা-পয়সা জমিজমার কথা কইলে কইত, ভাই নাই, তাই তার কিছুই নাই। কেউ কেউ কইল জমিজিরাতের জন্য কেস করতে হবে। যারা অনেক দিন ধইরা তাদের চেনে তারা কইল, আমারে নাকি আমার ভাসুররা মাইরাও ফেলতে পারে। আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম এইখানে আর আমার থাকা চলে না। বুঝতে পারতেছ?” “জি মা।” “তাইলে কথা কওনা কেন?” “কী বলব?” “বলো, আমার আর থাকা উচিৎ ছিল?” “না।” “কিন্তু তবু আমি মাটি কামড়াইয়া পইড়া থাকলাম। আমি ইচ্ছা কইরা এই বাড়িতে ফেরত আসি নাই।

দিনের পর দিন কখনও না খাইয়াও থাকলাম। আমার স্বামীর ঘর ফেইলা আমি কেন যাব? কিন্তু বড় ভাইয়ের নজর অন্যরকম হইয়া গেল। মাঝ রাইতে আইসা আমার দরজার কড়া নাড়া শুরু করল, আমি দরজা খুললাম না… শুনতেছ? “জি।” “কয়েকদিন এইরকম চলল, বলল রাইতে দরজা না খুললে সে আমারে কোনো টাকাপয়সাই দিবে না। ভাবলাম তার বউরে কইয়া দেই। পরে দেখলাম ভাবী এমনিতেই তার এইসব স্বভাবের কথা জানে, তার কথার কোনো দাম নাই। বাধ্য হইয়া আমি আমার মেঝ ভাইরে জানাইলাম, ভাই কইল, তুমি চইলা আসলে সম্পত্তির কিছু পাইবা না। যত কষ্টই হউক, ওইখানে থাক। ছোট ভাইও তার কথায় সায় দিলো। বুঝলা তো, এইজন্য ওই দুই ভাই আমার চোখের বিষ হইয়া গেল।

শ্যাষে বড় ভাই গিয়া আমারে নিয়া আসল। পরে ছোট ভাই, পুতুলের বাপ মাফ চাইল। মাফ কইরা দিলাম, তারপর তোমার বিয়াও তো দিল সে। মেঝ ভাইরে মাফ করার আগেই সে মইরা গেল। ভাই মইরা গেলেও মন্টু, রিনা, মিনাদের আমরা বাড়ি থেইকা তাড়াই নাই। দেখলা তো? আমরা মানুষ খারাপ না। বাদলের চাচারা ছিল খুব খারাপ মানুষ। তাদের টাকাপয়সা ছিল কিন্তু বউদের সাথে কামের মানুষের মতো ব্যাবহার করত। কী হইল, চুপ কইরা আছ কেন?” “জি, আপনি বলেন।” “আমার পায়ের গোশগুলারে কাপড় চিপড়ানির মতো কইরা চিপড়াও। তারপর কি হইল জানো? বড় ভাই বাদলরে মানুষ করলেন, পড়াইলেন, ঢাকায় পাঠাইলেন। মেঝ ভাই তার ভুল বুঝতে পারছিলেন, তাই যুদ্ধের ভিতর যে আট-নয় মাস বড় ভাই ছিলেন না তিনি আমাদের দেখাশুনা করছেন। মন্টু তখন সবে জন্মাইছে। সেই গণ্ডগোলের ভিতরে ছোট্ট বাচ্চা নিয়া বউটা আমার খোঁজখবর নিছে। বউটা ভালো।” “তাহলে আপনি তার সাথে সবসময় ওরকম করেন কেন?”

“আমি কী করছি? তুমি দুইদিন হইল এই বাড়িতে আসছ, আমার কথার ভুল ধর?” জি না, মা, আমি তা বলছি না।” “যেইরকম বলতে দেখবা সেইটাই ঠিক। যাও ভাত দিতে বলো।” শাশুড়ি নিতুর হাতের নিচে থেকে পা সরিয়ে নিল।

নিতুর হাত থেমে যায়, বুঝতে পারে, সে শ্রোতা হতে পারে কিন্তু মতামত দেয়ার যোগ্যতা তার নেই। বৃহষ্পতিবার দুপুর থেকে নিতুর ভেতরে ভেতরে অস্থির লাগছিল। সাপ্তাহিক ছুটির রাতে বাদল এসে পৌঁছবে। তার খুশি হওয়ার কথা, সে জায়গায় ছিল আতঙ্কে ডুবে, কেউ ডাকলে চমকে উঠছিল। বিকেলবেলা গাছের গুড়িতে সবার সাথে বসে আড্ডার মাঝখানে বারবার অন্যমনষ্ক হয়ে যাচ্ছিল। রিনা-মিনা হাসাহাসি করছিল, “কী আজকে বাদল ভাই আসবে দেখে আমাদের কথা আর কিছুই শোনা যায় না, না ভাবী?” নিতু চমকে তাকাল, মুচকি হাসল। ভেতরে ভেতরে ভয় আর অস্বস্তি আরও গাঢ় হলো তার। রিনা-মিনা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি অকারণে। শুধু পুতুল নিতুর মুখের দিকে স্থির তাকিয়ে থাকল।

নিতু পুতুলের চোখে চোখ রাখল না। তার কেন যেন মনে হতো পুতুলের দিকে তাকালেই সে ধরা পড়ে যাবে। পুতুলের তাকানো দেখলে মনে হতো সে তার ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে, কোনো অনুভূতি তার চোখ এড়ায় না, তাকে ফাঁকি দেয়া সহজ নয়। থাকার জন্য জায়গাটা, সঙ্গী হিসেবে ওরা, সবাই চমৎকার। কিন্তু নিতু তো এখানে বেড়াতে আসেনি, সংসার করতে এসেছে। যার সাথে সংসার করতে এসেছে তাকে নিয়েই তার যত ভয়। আর সবাই তার আপন হলেও সে তার আপন মানুষটির আপন হতে পারেনি আর এক পলকের জন্য তাকেও আপন ভাবতে পারেনি। রাতে বাদল যখন এসে পৌঁছল নিতু তখন শাশুড়ির ঘরে মালিশে ব্যস্ত ছিল, বাদল বেশ কয়েকবার ডেকেছিল।

নিতু জবাব দিলেও ঘরে আসেনি। ভাবছিল শাশুড়ির নামে যতক্ষণ দেরি করে আসা যায় ততই ভালো। মালিশ শেষ করে গুটি গুটি পায়ে নিতু ফাঁসির আসামির মতো ঘরে ঢুকেছিল। লাইট অফ করে বাদল বিছানায় এমনভাবে শুয়ে ছিল যেন এসেই ধপাস করে পড়েছে। দরজার পথে আসা বারান্দার আলোয় দেখা যায় একটা পা বিছানার বাইরে, ব্যাগটা বিছানার পাশেই। নিতু ব্যাগটা হাতে নিয়ে বলল, “কাপড় ছাড়লেন না?” বাদল বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঝাঁকি দিয়ে দরজা লাগাল। তারপর নিতুকে কাঠের মতো কঠিন দুটো হাত দিয়ে চেপে ধরে বলল, “এত দেরি করলা কেন? আমার কাছে আসতে ইচ্ছা করে না, না?” নিতুর হাত থেকে ব্যাগ ছিটকে পড়ে গেল।

বাদলের হাতের চাপে বুক সংকুচিত হয়ে পাঁজরের হাড়গুলো যেন মটমট করে ভেঙে যাবে। নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করা তো দূরের কথা, নিঃশ্বাস পর্যন্ত টেনে নিতে পারল না। প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে বাদল উন্মাদ হয়ে গেল। ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “কেন আগে আস নাই?” ছাড়া পেয়ে নিতুর ফুসফুস ভরে ওঠে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “মায়ের কাছে ছিলাম তো!” “তাতে কী, তুমি দেখ নাই যে সেই ঘরের সামনে দিয়া ব্যাগ নিয়া আমি আসতেছি? দেখ নাই তুমি?” “দেখেছি।” “তারপরও তুমি আসো নাই কেন? আমি আসছি তোমার ভালো লাগে নাই, না? আমাকে তোমার ভালো লাগে না, তাই না? এখনও সমানে আমাকে ‘আপনি আপনি’ করতেছ কেন?” “ভাবলাম তুমি এসে গোছল করতে যাবা, আর আমি তো মায়ের ঘরে-” নিতুর কথা শেষ হতে পারল না।

রাগে থরথর কাঁপতে কাঁপতে বাদল বাঘের থাবার মতো হাত বাড়িয়ে নিতুর জামা খামচে তাকে টেনে নিলো। কাঁপতে কাঁপতে তার হাত যেন লোহার মতো শক্ত হয়ে গেল। স্পর্শটা কোনো মানুষের স্পর্শের মতো লাগেনি। হঠাৎ হ্যাঁচকা টানে নিতুর মুখ থেকে শব্দ বের হতে গেলে বাদল লোহার হাত দিয়ে চেপে ধরল। একটানে কামিজের চেন খুলে ফেলল। মুখ থেকে হাত সামান্য সরে গেলে নিতু কোনোরকমে বলল, “আমি তো চিৎকার করব না, তুমি আমার মুখ চেপে ধর কেন? আমাকে নিঃশ্বাস নিতে দাও!” বাদল কোনো কথা না বলে ভীষণ আক্রোশে নিতুর ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিলো। ব্যস্ত হাতদুটো নিজের আর নিতুর সব কাপড় খুলছিল। ঠোঁটের ব্যাথায় নিতুর শরীরটা যখন একটু বেঁকে যায় তখন ছেড়ে দিয়ে প্রায় ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখে তাকিয়ে বাদল বলে, “এটা তোমার শাস্তি।” বাদলের শক্ত শরীর একসময় ঘামে ভিজে শিথিল হয়ে এলো। নিতু মুখের ভেতরে ঠোঁট থেকে গড়িয়ে জমা হওয়া রক্তের নোনতা স্বাদ পেল তারপর। নিতু শাশুড়ির গলা শুনতে পায়নি। শাশুড়ি যখন ’বউ, কই গেলা, বিউটিরে ভাত দিতে কও নাই?’ বলে চিৎকার করে ডাকছিল নিতু তখন কলতলায় কুলির সাথে রক্ত বয়ে যেতে দেখে হাউমাউ করে কাঁদছিল।

কান্নার শব্দ নাকি কলতলায় রক্তের দাগ, যে কোনো একটা বা দুটোই লুকাতে সে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে জোরে জোরে কলের হাতল অবিরাম চেপে যাচ্ছিল। বিউটির ডাকাডাকিতে বেরিয়ে এসে দেখল শাশুড়ির ঘরের একধারে রাখা টেবিলে বসে বাদল পরম তৃপ্তিতে গল্প করতে করতে ধোঁয়া ওঠা ভাত মুখে পুরছে। কিছুক্ষণ আগে নিতু যার সাথে ছিল সে কিছুতেই এই মানুষ নয়। শাশুড়ি নিতুকে দেখে রাগ দেখিয়ে বলল, “আর কত দেরি করবা, পোলাটা এতদূর থেইকা আইল, ক্ষিদা লাগে না? ভাত না দিয়া তুমি গেলা গোসল করতে? তোমার দেখি কুনো কান্ডজ্ঞান নাই!”

নিতু তোয়ালেতে মুখ চেপে ধরে ছিল। চলে যেতে গেলে শাশুড়ি পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, “আবার না খাইয়া যাও কই? মহা যন্ত্রণা তো! আমি কী তোমারে তুইলা খাওয়াব? খাইতে বস।” নিতু মাথা নিচু করে বলল, “তোয়ালেটা রেখে আসি।” মুখ ঠিকমতো নাড়াতে না পারলেও কোনোরকমে খেয়ে নিতু ঘরে এলো। ঘর তো নয়, যেন মনে হয় কোনো বন্দী করা পশু সেধে খোয়াড়ে ঢুকে যাচ্ছে। সামনে শুধু একটাই রাস্তা। কাউকে এসব বললে এ নিয়ে বাদল যে কী করতে পারে তার কোনো ধারণা ছিল না। চুপচাপ সে খোয়াড়ে ঢুকে গেল। বাদল একইভাবে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিল। নিতু আসতেই গম্ভীর গলায় বলল, “এদিকে এসো।” নিতু আস্তে আস্তে বিছানার দিকে গেল। পরের নির্দেশটা না আসা পর্যন্ত কী করবে বুঝতে পারেনি তাই ঠায় দাঁড়িয়েই থাকে। বাদল বলে, “দাঁড়ায় আছ কেন? বসো।” আড়ষ্ট নিতু দূরত্ব রেখে বসল।

বাদল হাত টেনে কাছে আনল তাকে, বলল, “তখন দেরি করলা কেন? জানো না রাগ উঠলে আমার মাথা ঠিক থাকে না?” নিতু চুপ। নিতুর মুখ নিজের দিকে টেনে নিতে নিতে বলল, “দেখি, অনেক বেশি কাটছে?” নিতু মুখ সরিয়ে নিলো। বাদল নরম করে বলল, “দেখাও না, হা কর।” কণ্ঠস্বরে সহানুভূতির ভরসায় একটু এগিয়ে এসে মুখ হা করে দেখাল সে। বাদল মুখে কষ্টের ভঙ্গি এনে বলল, “ইস্ খামাখা দেরি করে ঘরে আসলা তখন, আমি রাগ সামলাইতে পারলাম না। ঠোঁটের ভিতরের দিকটা একেবার থেঁতলে গেছে!” পরমুহূর্তে মুখ আবার শক্ত হয়ে গেল। নিতুর মুখের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে ফেলল। নিতুর কোলের উপরে তার হাতটা ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “আজকের কথাটা মনে রাখবা। আর কখনও যেন এইরকম না হয়।” নিতুর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লে বাদল সে দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, “কাঁদতেছ যখন তার মানে বুঝতে পারছ কী ভুল করছ।

বুঝতে পারলে আর করবা না। মাফ চাওয়ার দরকার নাই। আমি তোমাকে মাফ করলাম।” মনে হলো বাদল পাশ ফিরে ঘুম। নিতু লাফ দিয়ে বিছানা ছাড়ল। আড়মোড়া ভেঙে বাদল স্বাভাবিক গলায় বলল, “আজকে বাসে খুব কষ্ট হইল। পাশে এমন এক লোক বসল, শালা সারা রাস্তায় বমি করতে করতে আসল। একটুও শান্তিতে বসতে পারলাম না। এখন আমি ঘুমাব। আর শোনো, তুমিও এখনই ঘুমাবা। এইখানে শোও।” বাদল আঙুল দিয়ে চেপে বিছানার দেয়ালের দিকের অংশটা দেখিয়ে দিলো। চাবি দেয়া পুতুলের মতো নিতু হামাগুঁড়ি দিয়ে বাদলের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

নিতুর সমস্ত শরীর ঘিন ঘিন করতে লাগল। একটা মানুষ সারা রাস্তায় বমি করল, গায়ে লাগিয়ে বাসায় এসে গোছল না করে বাদল তাকে… তারপর সেভাবেই বিছানায় নিতুর থেকে দুই ফুট দূরে শুয়ে আরাম করে ঘুমানোর আয়োজন করছে। নিতুর পা থেকে মাথা পর্যন্ত রি রি করে উঠল, সামান্য ঘুমিয়ে নেয়ার পরে আবার নোংরা শরীরে ঘুমন্ত নিতুকে জাপটে ধরবে, তার ওপরে পশুর মতো চড়ে বসবে। হাতের আঙুলগুলো শক্ত মুঠি বেঁধে দেয়ালে চেপে রাখল নিতু, সব বিরক্তি, কান্না, চিৎকার নীরব সেই মুঠির মধ্যে দিয়ে দেয়ালে চালান করে দিলো। তবু কিছু বলতে মন চায়নি। বাদলের ব্যবহারে যত বেদনা পায়, সেসব ছাপিয়ে আরও বেশি ঘৃণা হয় তার সাথে কথা বলতে।

পরদিনও সারাদিন পারতপক্ষে কারও সাথে কথা বলেনি নিতু। কারো সামনে পড়লেও মুখ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। তবু ধরা পড়ল। নিতুর ফুলে থাকা ঠোঁট একেকজনকে একেরকমের বার্তা দিলো। রিনা-মিনা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি, “ভাবী, বাদল ভাই যে বাড়িতে আসছে সেইটা তোমার ঠোঁট দেইখাই বইলা দেওয়া যায়।” মন্টু মুচকি হেসে সামনে থেকে সরে গেলো। পুতুল কেমন যেন চিন্তার ভাঁজ পড়া কপাল নিয়ে তাকিয়ে থাকল। নিতু পুতুলের দিকে সরাসরি তাকায়নি। তাদের রান্নাঘরের পাশ দিয়ে নিজের রান্নাঘরে ঢুকে গেছে।

বাদল বাড়িতে থাকার দুদিন নিতু কারো সাথে তেমন কথা বলেনি। ব্যস্ততা দেখিয়ে এড়িয়ে গেছে। ঘর থেকে নিতুকে বের হতে দেখলে রিনা বলল, “কী ভাবী, বাদল ভাই বাড়িতে আসছে বইলা আমাদের মনে হয় আর চেনই না!” উত্তরে নিতু শুধু মিষ্টি করে হাসল। দুদিন পরে বাদল চলে গেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। রাতে চিঠি লিখতে বসল। ঋতু, চাচি, মা সবাইকে আলাদা আলাদা চিঠি লিখল। প্রায় সবার চিঠিতেই বাড়ির, রিনা-মিনা, পুতুল আর মন্টুর কথা থাকত। পদ্মা নদীর পাশের বিকেলের আড্ডার কথা থাকত। মায়ের চিঠিতে শাশুড়ির কথাও থাকত। কিন্তু কোথাও কারও কাছে বাদলের ব্যাপারে কিছুই লিখত না। দশ-বারো দিন পরে চিঠিগুলোর উত্তর আসত।

নিতুর চিঠি ডাকে দেয়ার দায়িত্ব নিত মন্টু। ঋতু উত্তর লিখতে একটুও সময় নষ্ট করত না। সবাই নিতুর চিঠি পেয়ে জানতে পারত সে বেশ আনন্দেই আছে শশুড়বাড়িতে। শুধু প্রতিটি চিঠিতে ঋতুর একই প্রশ্ন থাকত, “বাদলের কথা কিছু লিখলি না যে! বাদল কেমন আছে? তোকে ভালো-টালো বাসে তো?” নিতু ভেবেই পেত না বাদলের কথা কী লিখবে! সারা সপ্তাহ ধরে সে মনে মনে কতকিছু ঠিক করে রাখত যে এবারে বাদল আসলে তাকে বোঝাবে তার কীসে কষ্ট হয়। নিতু প্রবলভাবে কল্পনা করার চেষ্টা করত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা কি এমনই হয়? বিয়ে হয়ে যাওয়া মানেই কি এত কষ্ট পাওয়া? বাড়ির সবাইকে আপন লাগত, সবার সাথে বন্ধুত্ব হলো অথচ বাদলের সাথে কেন বন্ধুত্ব হতো না?

ধীরে ধীরে একসময় আশাও ছেড়ে দিলো নিতু। কোনোরকমে দাঁতে দাঁত চেপে সপ্তাহের দুটো দিন পার করা। তারপর আবার ঝড়ের আগে কালচে মেঘের মতো মনে আশঙ্কা জমা হতো, আবার বৃহষ্পতিবার আসত। ঘনঘটা শেষে আকাশ একসময় ঝকঝকে পরিষ্কারও হয়ে যেত। কখনও নির্জন দুপুরে বিউটির কাছে তার সেলাইয়ের কাঁথাটা চেয়ে নিয়ে বারান্দায় বসে কিছু নকসা করত নিতু। তখন হয়তো গুনগুনিয়ে একটু-আধটু গানও গাইত। একদিন নিঃশব্দে বড় মামা এসে পেছনে দাঁড়ালেন, “বাহ্! গান জানো, তা তো বল নাই নিতু!” নিতু লজ্জা পেয়ে বলল, “না, মামা আমি গান জানি না।” আমি যে পরিষ্কার শুনলাম তুমি গাইতেছিলা, “মন মোর মেঘের সঙ্গী।”

“সত্যি মামা আমি গান জানি না। তবে আমার বোন গান গাইত। আকাশে দেখেন কত মেঘ কী তাড়াহুড়ো করে উড়ে যাচ্ছে- দেখে আপার গানের কথা মনে পড়ল তো, তাই।” “তোমার আপা গান শিখত?” “হ্যাঁ, গানের স্কুলে গান শিখত। স্কুলের অনুষ্ঠানে গান গাইত। সবাই খুব ভালো বলত।” “তাইলে তো দেখা হইলে তোমার আপার গান শুনতে হবে। তুমি গান গাইতে শিখ নাই?” “নাহ্ আমি কিছু শিখিনি। আমার লজ্জা লাগত আর তাছাড়া আমি পারতামও না। আপার সাথে গিয়ে গানের স্কুলের বারান্দায় বসে থাকতাম। গান শুনতে শুনতে মুখস্ত হয়ে যেত। কিন্তু আমার গলায় সুর নেই তাই কখনও গাওয়ার চেষ্টাও করিনি। স্কুলে বান্ধবীরা বলত, তোমার বোন গান-নাচ কত কিছু পারে আর তুমি তো একেবারে ঠনঠন! আমার মা-ও শুনছি গান গাইত ছোটবেলায়। পশ্চিম দিনাজপুরে ছিল তখন। তারপর সংসারে এসে মা আর বোধ হয় গায় নাই। আপাকে শিখিয়েছে।” কাঁথায় ফোঁড় তুলতে তুলতে আপনমনে হাসছিল সে। পাশে তাকিয়ে দেখল মামাও হাটু ভাঁজ করে ঝুঁকে সেলাইয়ের ফোঁড়ের গতি অনুসরণ করছেন। নিতু বলল,“ কী দেখেন মামা?” “এই যে তুমি সুচ উপর থেকে কাঁথায় ঢুকাইলা, সামনে নিয়া বের করলা তারপর একটু পিছনে নিয়ে ঢুকাইলা তারপর আবার আরও সামনে- এইটা দেখতেছি। একবার সামনে আগানো আবার পিছনে যাওয়া তারপর আবার সামনে।”

“এটা দেখার কী আছে মামা? এই সেলাইয়ের এটাই নিয়ম। একবার সামনে তারপর একটু পিছনে তারপর আরও সামনে এভাবেই আগাবে।” “এইটা দেইখা কী মনে পড়ল জানো?” “কী?” “যুদ্ধের সময়ে যখন আমরা কোনো মিশনে যাইতাম নিজেদের মধ্যে দুই দলে ভাগ হইয়া যাইতাম। এক দল প্রথমে আগাইত, কিছুদূর যাইত তারপর সিগনাল দিয়া দাঁড়াইয়া থাকত। তখন আর এক দল যাওয়া শুরু করত। আগের দলটা যেখানে দাঁড়াইয়া আছে সেইটা পার হইয়া আরও কিছুদূর গিয়া সিগনাল দিত। তখন পিছন থেইকা অন্য দল আবার যাওয়া শুরু করত। আমাদের আগানোর গতিপথটা ছিল ঠিক তোমার এই সেলাইয়ের সুচের মতো।”

“এইরকম কেন করতেন মামা? অনেক বেশি সময় লাগত না যাইতে?” “সময় তো লাগত দ্বিগুন। কিন্তু সামনে বা পিছন দিক দিয়া যদি কোনো শত্রু আক্রমন করে তাইলে যেন আরেক দল পিছন থেইকা পাল্টা আক্রমন করতে পারে সেই জন্য ওইরকম ভাবে যাইতে হইত।” “এইভাবে যেতে যেতে কখনও কেউ আক্রমন করল?” “করল তো কয়েকবার। আক্রমন হইল, পাহাড়ী ঝোপঝাড় জঙ্গলের ভিতরে মুখামুখি যুদ্ধ হইল।” “প্রথমে কি করে বুঝলেন যে আক্রমন হয়েছে? আপনি সামনে ছিলেন?” “না, সামনে ছিলাম না। পিছনের দলের সাথে দাঁড়াইয়া ছিলাম। আমাদের পাশ দিয়া আরেক দল সামনে আগাইয়া গেছিল। যতটা সময় পরে তারা পাখির ডাক অনুকরণ কইরা সিগনাল দিবে তার ঠিক আগ মুহূর্তে গোলাগুলি শুরু হইয়া গেল। গুলির শব্দে আমরা শুইয়া পড়লাম। আক্রমন করার জন্য মাটিতে ছেঁচড়াইয়া আগাইতে লাগলাম। দুই-তিন সেকেন্ড পরে আমার পাশে গাছের ডালে বারি খাইয়া ধুপ কইরা কী যেন একটা পড়ল। দেখি একটা রক্তমাখা হাত।

এক পলকেই চিনতে পারলাম আমার বন্ধু সগীর মাস্টারের হাত সেইটা। বড় গোল সাদা ডায়ালের ঘড়িটা আমার অনেক দিনের চেনা। গুলির ধাক্কায় হাত শরীর থেইকা ছুইটা গেছিল। উইড়া আসছে কিন্তু তখনও আঙুলগুলা সামান্য নড়তেছিল। আমার ইচ্ছা হইল হাতটা একটু ধরি।” নিতু ভয়ার্ত মুখে বলল, “আপনার বন্ধু মারা গেলেন?” “না। অল্প কয়েকজন পাক সেনা আমাদের আক্রমন করছিল তাদের সীমানার ভিতর ঢোকার কিছু আগে। পিছন থেইকা আমাদের দল পাল্টা আক্রমন করায় তারা সব মারা পড়ল। সগীর অজ্ঞান হইয়া পইড়া ছিল। পাক সেনাদের বেশ কয়েকজনের গায়ে গুলি লাগছিল। আর গুলির শব্দে তাদের আস্তানার সবাই সতর্ক হইয়া যাওয়াতে আমাদের সেদিনের মিশন আর শেষ হয় নাই। সগীররে ঘাড়ে নিয়া আর সবার সাথে আমি ফিরা আসছিলাম। অনেকদিন পরে সে সুস্থ হইছিল।

শুধু একটা হাত ছিল না তার শরীরে। পায়ে আঘাত পাওয়াতে হাঁটতেও পারত না। তাবুর মধ্যে শুইয়া শুইয়া কাঁদত।” “হাতের কষ্টে কাঁদতেন তিনি?” “না। আমাদের সাথে মিশনে যাইতে পারতেছিল না, সেই জন্য। আমরা কোনো মিশন থেইকা ফিরা আসলে কাঁদত আর বলত, গুলি লাগার পরে আমারে উঠাইয়া আনলা কেন? আমারে ফেইলা চইলা আস নাই কেন? অসুস্থ অবস্থায় আস্তানা বদলানোর সময় প্রতিবার বলত, আমারে আর টাইন না, ফেইলা চইলা যাও। শেষে সুস্থ হইল তখন যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। এখন বিক্রমপুরে থাকে তার ছেলের সাথে। ভালোই আছে, শুধু একটা হাত হারাইল।” নিতু বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকল বড় মামার দিকে। এত ভয়ঙ্কর স্মৃতি বলার সময়ে মামার গলা একটুও কাঁপল না, যেন কিছুই হয়নি বা প্রতিদিনই এরকম কিছু হতো। নিতু কোলে থামিয়ে রাখা সেলাইয়ের ফ্রেম উঠিয়ে নিয়ে বলল, “মামা ভাগ্যিস যুদ্ধে আপনার সেরকম কিছু হারায়নি!” “হ্যাঁ।” নিতু মাথার পেছনে দীর্ঘনিশ্বাস শুনল। তিনি বললেন, “যুদ্ধে সত্যি আমি কিছু হারাইনি। অনেক কিছু পাইছি। নয়-দশ মাসে আমি অনেক কিছু শিখছি। আস্তে আস্তে দেশটারে আরও বেশি ভালোবাসতে শিখতেছিলাম।

কিন্তু তখন কিছু না হারাইলেও পরে ধীরে ধীরে সেই সব পাওয়ার আনন্দ তো হারাইয়া গেল। আস্তে আস্তে সবাইরে চিনলাম। আমরা আসলে পাগল ছিলাম তাই ওইরকম কইরা ঝাঁপাইয়া পড়তে পারছিলাম।” “এমন করে ভাবছেন কেন মামা? এখন তো আবার সব ঠিকঠাক চলছে। স্বেরাচারী সরকার ক্ষমতা হারানোর পরে সবাই খুশি।” “কিন্তু সময়ের সাথে সবাই বদলাইয়া যায়, বুঝলা? আমি বদলাইতে পারি নাই তাই অচল হইয়া গেলাম। আজকে সবাই স্বৈরাচারের পতনে খুশি। কিন্তু যখন অসৎ উপায়ে ক্ষমতায় আসছে তখন বঙ্গবন্ধু কন্যা বিবিসি-তে সাক্ষাৎকারে বললেন, ‘আই অ্যাম নট আনহ্যাপি!’ পরে সেই ঘানি আট বছর ধইরা টানতে হইল। সবাই বদলাইয়া যায়।

যুগের সাথে সাথে যারা বদলায় তারা টিকে। মাঝখান থেকে আমার মতো লোকেরা সব জায়গায় হাইরা তারপর একসময় হারাইয়া যায়।” নিতুর হাতের সুচসুতো মামার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে থেমেই গেল। ১৫ রেজাল্ট বের হওয়ার পরে নিতুর কলেজে যাওয়া নিয়ে কোনো ঝমেলাই হলো না। ঋতু স্কুল থেকে সব কাগজপত্র তুলে পাঠিয়ে দিল আর বড় মামার আদেশে বাদল সুড়সুড় করে কলেজে ভর্তির জন্য টাকা-পয়সা যা লাগে দিয়ে দিলো। শাশুড়ি সামান্য আপত্তি তুলতেই বড় মামা বললেন, “বাড়ির সব মেয়েরা কলেজে যাচ্ছে, তাহলে নিতু যাবে না কেন?” পুতুলের বাবা আগের মাসে একবার দুদিনের ছুটিতে এসেছিলেন। ঋতু তার হাতে নিতুর জন্য জামা পাঠিয়েছিল।

সেই জামা উল্টেপাল্টে দেখেছিল সে, ভাঁজটা খুলতে ইচ্ছে করছিল না। আপার ছোঁয়া সেই ভাঁজে ভাঁজে। রিনা এসে টান মেরে খুলে বলল, “বাহ্! তোমার বোনের কিন্তু পছন্দ আছে। খুব মানাবে তোমাকে। কাল কলেজে পরে যেও।” পরদিন কলেজে সেই জামা পরে গিয়েছিল নিতু, তার নতুন বান্ধবী ফরিদাকে দেখানোর জন্য। ততদিনে ঋতুর গল্প শুনতে শুনতে ফরিদার প্রায় ঋতুকে চেনা হয়ে গেছে। কলেজ থেকে ফিরে যাওয়ার পথে ফরিদা নিতুদের বাড়িতে আসত, কিছুক্ষণ গল্প করত। জমিতে পানি উঠে যাবে বলে তাড়াহুড়ো করে ক্ষেত থেকে সব আলু উঠিয়ে নিয়ে পুতুলদের ঘরের নিচের তলাটায় রাখা হয়েছিল। বৃষ্টি হলেই বড় মামা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দেখতেন কোনো দিক দিয়ে পানি ঢুকল কি না। আলুর ঢিবির পাশে কেটে রাখা একটা গাছের গুড়ির উপরে বসে গল্প করত নিতু আর ফরিদা।

সারা বাড়িতে আলুর গন্ধ তার সাথে ক্ষেতের ভেজা ভেজা মাটির গন্ধ ঘুরে বেড়াত। বস্তায় ভরে প্রতিদিন কিছু মানুষ আলু নিয়ে যেত বাজারে। বাড়ি থেকে দূরে কোনো জমি থেকে পরদিন আবার ঠেলাগাড়ি ভরে আলু চলে আসত। মামা তাদের পাশে এসে বললেন, “এবারে এত ফলন হইছে বুঝলা, মনে হয় কোল্ড স্টোরেজে রাখতে হবে।” নিতু বলল, “সব আলু চলে যাবে? আমার কিন্তু এই মাটি মাটি গন্ধটা মজা লাগে!” “আজ-কালের মধ্যে আলু তো চইলা যাবেই। খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে, না হইলে এর পরে পচা গন্ধ পাবা। কিন্তু মাটির গন্ধ থাকবে না তাতে কী? আবার কিছুদিন পরে চাল আসবে। সেই গন্ধ তোমার আরও ভালো লাগবে।

নিজের বাড়িতে এসব দেখ নাই বুঝি?” “কী করে দেখব মামা, আমাদের বাড়ি তো একেবারে শহরের উপরে। আশেপাশে ক্ষেত-খামারের কোনো ব্যাপার স্যাপারই নাই। মানুষের গ্রামের বাড়ি থাকে, আমার তো তা-ও ছিল না। দাদা শহরে বাড়ি বানাইছিল আর নানা বাড়ি তো ইন্ডিয়ায়। আমরা কখনও যাইনি।” “এখন গ্রাম কেমন লাগে?” “নদী ভালো লাগে। নৌকায় উঠতে ইচ্ছে করে।” ফরিদা লাফিয়ে উঠে মামাকে বলল, “আচ্ছা চাচা, রিনা-মিনারা যে প্রতিবছর নৌকায় পিকনিকে যায়, এবার যাবে না? এবারে গেলে আমারে নিয়েন কিন্তু।” “নৌকায় পিকনিক!” লাফিয়ে উঠল নিতু। মামা বললেন, “ওইটা তো আমাদের প্রতিবছরের রুটিন। বর্ষাকালে আমরা বিরাট ছইওলা নৌকায় একদিন বেড়াইতে বের হব। তারপর সারাদিন নৌকায় ঘুরব। ইলিশ মাছ ধইরা নৌকার উপরেই রান্না হবে, ভাজা হবে।

তারপর খাওয়া। এবার তুমিও যাইও আমাদের সাথে ফরিদা। আর নিতু তো যাবেই।” “যাব না মানে?” “ঠিক আছে আমার এই আলুর ঝামেলাটা শেষ হোক তারপর আগামী সপ্তাহে বাদল আসলে তার সাথে কথা বলব। দেখি সে কবে যাইতে পারে।” নিতু অবাক হয়ে জানতে চাইল, “বাদলও যায় আপনাদের সাথে পিকনিকে?” “যাইতে তা চায় না, কেন জানি ঠাট্টা-ফাজলামী পছন্দ করে না। তবে আমি বললে যাবে।” নিতুর মুখ থেকে এক পলকে হাসি হারিয়ে গেল। মামা চলে গেলে ফরিদা নিতুর কাছে জানতে চায়, “আচ্ছা, বলো তো, তুমি তোমার বরের কথা বললে ওইরকম মুখটা হাড়ি বানাইয়া ফেল কেন? আর এত কথা বলো কিন্তু কোনোদিন তোমার বরের গল্প কর না।

বিষয়টা কী?” বিব্রত মুখে হাসি টেনে আনার চেষ্টা করতে করতে নিতু কোনোরকমে বলল, “না না সেরকম কোনো ব্যাপার না। কি বলব তার কথা?” “আমি কী করে জানব তুমি কী বলবা? আমার কি বিয়া হইছে? ইচ্ছা হইলে কত কী বলতে পার। সে তোমারে কত ভালোবাসে, তোমার সাথে কী কী করে হা হা হা…” নিতুর আড়ষ্টতা দেখে ফরিদা বলে, “বুচ্ছি তুমি লজ্জা পাও তাই বলতে পার না। আমাদের ক্লাসের শারমিনের বিয়া হইছে না? কোনো লজ্জাশরম নাই। দুইদিন পরে ক্লাসে আইসা এমন গল্প শুরু করল! কিছুই বলা বাদ রাখে নাই। আমার একসময় বললাম, অ্যাই তুই থাম আর বলতে হবে না, আমরা বুঝতে পারতেছি হা হা হা…” “নিতুও আড়ষ্টতা কাটিয়ে ফরিদার সাথে তাল মিলিয়ে হাসার চেষ্টা করে।” নিতু ভাবল বাদল কখনই পিকনিকে যাবে না। মামা বেশি চাপাচাপি করলে মাঝখান থেকে তার যাওয়াটাও বানচাল হয়ে যেতে পারে। শাশুড়ি যে সময়ে সবচেয়ে নরম থাকেন, সেই মালিশের সময় নিতু অল্প আলোয় অন্ধকারের দিকে মুখ করে বলল, “মা, মামা নাকি সবাইকে নিয়ে নৌকায় করে পিকনিকে যায়?” “যায় প্রতিবছর বর্ষায়। নদী ভরা থাকে, ইলিশ মাছ পাওয়া যায়, নৌকায় রাইন্ধা খায়।” “আপনি যান না?” “আমি কী যাব এইসমস্ত পোলাপানের সাথে?” “আপনার ছেলে যায়?” “একবার গেছিল মনে হয়। তুমি আমারে কেন এইগুলা জিগাও? শোন তুমি যদি ওদের সাথে যাইতে চাও তো আমি কিছু জানি না, বাদল জানে। সে যদি যাইতে বলে তাইলে যাইতে পার, ব্যস।” দেখা গেল বাদল ফিরে এলে মামার এক কথায় পিকনিকে যাওয়ার জন্য রাজি, পরের সপ্তাহে সে আসলে তারা যাবে এমন একটা পরিকল্পনাও হয়ে গেল।

নিতু ভেবে পেল না, যে ভাই-বোনদের ছায়াও সে মাড়ায় না তাদের সাথে সারাদিন কাটানোর প্রস্তাব খুশিমনে মেনে নিলো কেন। অবশ্য সেটা নিয়ে আর বেশি ভাবতেও চায়নি, খুশি ছিল এই ভেবে যে বাদল যাচ্ছে মানে তারও যাওয়া হচ্ছে। পরের সপ্তাহে বিশাল ছইওলা পেটমোটা চওড়া নৌকা বাড়ির পেছনের ঘাটে এসে দাঁড়াল। ভরা বর্ষায় নদী চারদিকে থইথই করছিল আর দাঁড়িয়ে থাকা নৌকাটি বিশাল হলেও ঢেউয়ের তালে দুলছিল। পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে আর বালুর সমুদ্র পেরিয়ে যেতে হয়নি। নদী তাদের বাড়ির একেবারে কাছেই উপস্থিত তখন। মনে হলো কয়েকদিনের মধ্যে পাঁচিলেও ঢেউ আঁছড়ে পড়তে পারে। মইয়ের মতো একটা জিনিস মাটি থেকে নৌকার গায়ে ফেলে রাখা, সবাই হাতে হাতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে মই বেয়ে তরতর করে নৌকায় উঠে গেল।

নিতুর অভ্যাস নেই, সে খালি হাতে উঠতে গিয়েও কয়েকবার থেমে গেল। তার অবস্থা দেখে রিনা-মিনা হেসে খুন, “ভাবী, সাঁতার জানো তো?” নিতু অপরাধী মুখ করে বলল, “না তো।” তারা বলে, “অসুবিধা কোথায়? বাদল ভাই জানে, নৌকা ডুবলেও চিন্তা নাই!” “নৌকা আবার ডুববে নাকি?” বলে নিতু তাকিয়ে দেখল বাদল রিনার কথায় নিঃশব্দে হাসছে। এক মুহূর্তের জন্য কেন যেন মনে হলো বাদল অন্যরকম হয়ে গেছে। মন্টু বলল, “ভাবী, নৌকা কি ডুবতে পারে না? রাস্তায় গাড়ি যেমন এক্সিডেন্ট হয়। তুমি সাঁতার জানো না সেইটা তোমার সমস্যা। টাইটানিকও তো ডুবছিল।” মন্টুর কথায় ভয় পেয়ে বাদলের দিকে তাকিয়ে দেখল তার মুখ ঘুরে গেছে, মুখে আর সেই মিটিমিটি হাসিটিও নেই। দুপুরের সূর্য তখন চড়ে গেছে মাথার উপরে কিন্তু বাতাসের উৎপাতে একটুও গরম লাগেনি।

ছইয়ের ভেতরে গেলে রীতিমতো আরাম, ছই ছাড়া বাকি পুরো নৌকাতেও অনেকখানি জায়গা, বাঁশ আর কাঠের পাটাতন। এতগুলো মানুষ হেসে খেলে অনায়াসে ঘোরাফেরা করতে পারে। মাঝনদীতে গিয়ে জেলেরা সপাং সপাং জাল ফেলছিল নদীতে, প্রতিবার জাল গোটানোর সময়ে উৎসুক চোখ, ততক্ষণে কিছু মাছ পাওয়া গেছে। লম্বা-চওড়া মাছগুলো দেখে নিতু অবাক হয়ে যায়, বর্ষার সময়ে বাড়ি বয়ে এসে যারা ঝাঁকাভর্তি ইলিশ মাছ মাথায় করে ‘বড় ইলিশ’ বা ‘পদ্মার ইলিশ’ বলে চেঁচাতে থাকে তাদের ইলিশের সাথে কোনো তুলনাই নেই। চাচি আর মা ঝাঁকার ইলিশ নাড়াচাড়া করে বলত, “ধ্যাত, এসব পদ্মার নয়, মেঘনার ইলিশ। স্বাদ হবে না।

আর সাইজ দেখছ কেমন, একেবারে জাটকা!” কিন্তু সেখানকার মাছ দেখলে চাচি আর মায়ের চোখ ছানাবড়া হয়ে যেত। মামা দাঁড়িয়ে থেকে জেলেদের বলছিলেন কখন কোথায় জাল ফেলতে হবে, ফাঁকে ফাঁকে এর-ওর দিকে তাকিয়ে নানান রসিকতা করছিলেন। দুজন মানুষ নৌকার উপরে চুলায় হাড়ি চাপাল, মাছও কাটল, মামা বুঝিয়ে দিলেন টুকরোগুলো কেমন হবে, কোনটা পাতলা, কোনটা মোটা। নিতুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আগে এইরকম ইলিশ দেখছ নাকি নিতু?” “না মামা, এত বড়ও দেখিনি, আর বরফে ডোবানো ছাড়া ইলিশ দেখব কী করে?” “ঠিক বলছ। এইটারেই বলে, রূপোর নদীতে রূপোর ইলিশ চোখ ঝলসানো আঁশ। এই ইলিশ এমন যে রানতে কোনো কেরামতি লাগে না। লবণ-ঝাল মাখাইয়া তেলে ডুবাইয়া ভাজলেই অমৃত হইয়া যায়। দেখবা, এই স্বাদ আর কোথাও নাই।” “আমার কাছে আজকে সবকিছুই এক্কেবারে নতুন।” পানি যেখানে বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে একটা বিন্দুতে নিচে ঢুকে যাচ্ছে সেখানে তারা কাঠির টুকরা ভেঙে ফেলছিল।

সেটা ঘুরতে ঘুরতে কেমন করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল। রিনা-মিনা আর ফরিদার হাসাহাসি একটু পরপরই তুঙ্গে উঠে যাচ্ছিল। নিতু বাদলের সামনে তাদের সাথে সেভাবে হৈ হল্লা করতে পারেছিল না। বাদল এত গম্ভীর যে তার অস্বস্তি লাগছিল। ওদের সবার থেকে খানিকটা দূরে বাদলের সাথে বসে দূরে পাটক্ষেতে বাতাসের খেলা দেখছিল। একদিকে তীরের দিকে আঙুল উঠিয়ে মন্টু বলল, “মামা, দেখছেন, এইখানে না শফিকদের বাড়ি ছিল। নদীতে মনে হয় ভাইঙ্গা পড়ছে। কিছুই নাই দেখছেন?” “তাই তো! এইদিকের একটা পাড়া ভাঙতেছে আমি শুনছি। কার কার বাড়ি যে গেল!” মামা বললেন, “বাদল, দেখলি আমাদের বাড়ির পেছনের পাঁচিলটা কিন্তু পড়ব পড়ব করতেছে।

বর্ষা গেলে এবারে পুরা বাড়ির পাঁচিল নতুন কইরা বানাইতে হবে। সামনে দিয়াও মাঝে মাঝে গরু-ছাগল ঢোকে।” “করেন মামা। পাঁচিল বানানো দরকার। আমি হিসাব-নিকাশ করে বলব কত লাগে। মন্টু কাজ দেখতে পারবে।” মন্টু হাসতে হাসতে নিতুকে বলল, “ভাবী শোনো তোমারে গল্প শোনাই। বাড়ির সামনের পাঁচিল গেল বর্ষায় ভাইঙা পড়ল। দেখছ তো বাদল ভাই তারপরেও গেট লাগায়ে রাখে সারাক্ষণ। একবার ঢাকা থেকে তার এক কলিগ আসল আমাদের বাসায় বেড়াইতে। রাত বারোটার দিকে আসছে। আমরা সবাই ঘুম। শুধু গেটের উপরে একটা অল্প পাওয়ারের বাল্ব জ্বলে, রাইতে গেট ছাড়া আশেপাশে আর কিছুই দেখা যায় না। আলোটা গেটের দুইপাশের পিলার পর্যন্তও পৌঁছে না। আর সেই রাতে ছিল ঘুরঘুটি অন্ধকার। গেটের ভিতরের দিকের ছিটকিনি মাটিতে নামানো ছিল। বেচারা গেটে দাঁড়াইয়া বহুক্ষণ চিল্লাপাল্লা করছে আমরা কেউ শুনতে পাই নাই। তারপর অনেক কষ্টে ব্যাগ নিয়া গেট টপকাইয়া বাসায় আসছে। গেটের উপরের শিক লাইগা তার শার্টের হাতা ছিড়ল। তারপর বাড়িতে তো রাইতে ঘুমাইল কিন্তু পরের দিন সকালে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বাইরের বারান্দায় বাইর হইয়া দেখে, মাঠের মাঝখানে খালি গেট ছাড়া চাইরদিকে আর কিছুই নাই। আমি বাইরের বারান্দায় ছিলাম। দেখলাম তার চোখ সরু কইরা খুলতেই মাথার উপর থেইকা দুই হাত ধপ কইরা নিচে খইসা পড়ল। আর মুখটা হা, বুঝলা?” নিতুর হাসি আর থামে না, বহুবার মন্টুর মুখে শোনা গল্প, তবু অন্যরাও হাসছিল।

নিতু মন্টুর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরল। বাদল শুধু তীক্ষè চোখে নিতুর দিকে তাকিয়ে থাকল। খাওয়ার সময় মন্টু নিতুর সামনে এসে বলল, “এই নাও ভাবী, তোমারে একটা বড় ইলিশের ডিম দিলাম। খাইয়া বলো স্বাদ কেমন। তোমার জন্য এইটা এক্সট্রা।” “দেখেই বোঝা যায়, খুব মজা হবে, এমন টাটকা তো আর কখনও খাইনি।” মাঝিসহ সবাই একসাথে খেতে বসল তারা। নিয়ন্ত্রনহীন নৌকা মাঝনদীতে বাতাসে আর ঢেউয়ের দোলে দুলছিল। সেই দুলুনির মধ্যে হাতে প্লেট নিয়ে খেতে সত্যিই অমৃতের মতো লাগে নিতুর। খাওয়ার পর্ব শেষ হলে মামা বাড়ির দিকে রওনা দিতে বলল। বিকেল হয়ে আসাতে সূর্যের তাপ কম তখন। হাটে হাড়ি ভাঙার মতো করে মামা বললেন, “অ্যাই শোন সবাই, সেদিন আমি শুনি কী, আমাদের বারান্দায় বসে কে যেন গুনগুন করে গান গাইতেছে- বল তো কে হইতে পারে?” সবাই একে একে জানতে চায়, “কে চাচা? কে চাচা?” শুধু নিতু লজ্জা পেয়ে বলল, “ভালো হবে না মামা! আমি আপনাকে বলেছি যে আমি গান জানি না।

গান গায় আমার আপা।” “এরেই বলে ঠাকুর ঘরে কে, কলা আমি খাই নাই- তোমরা কি তোমাদের ভাবীর গান শুনতে চাও না?” বাদল চমকে উঠে বলল, “নিতু আবার গান গায় নাকি!” “দেখ বাদল, তুই তো তোর বউরে খালি বিয়া কইরাই আনলি, এক ফোঁটাও চিনলি না।” এই কথা মামা বললেন বলেই রক্ষা, অন্য কেউ হলে বাদল তার ঘাড় মটকে দিত। রিনা-মিনা আর মন্টু চেপে ধরল নিতুকে, “ভাবী, প্লিজ একটা গান ধর।” তাদের অস্থির চলাফেরায় নৌকা কেঁপে উঠল খানিকটা।

মামা বললেন, “এদের লাফালাফিতে নৌকা ডুইবা যাওয়ার আগেই তুমি গানটা ধর, নিতু!” অনেক চেষ্টা করে নিতু বোনের মুখে শোনা কোনো গান হাতড়াচ্ছিল মনে মনে। কোনোটাই পুরোপুরি মনে পড়ল না। পিড়াপিড়িও চলছিল। নিতু শেষ পর্যন্ত সাহস করে গাইতে শুরু করল, সখী ভাবনা কাহারে বলে। বিকেলের নিস্তব্ধ নদীতে মৌন শ্রোতারা বসে থাকল, নিতুর চর্চাহীন কণ্ঠস্বর বাজছিল সেখানে। কিন্তু তারপর সবাইকে যেন গান আর নাচে পেয়ে বসল, একে একে নানান গান-নাচ শুরু করে দিলো তারা। নাচের তালে নৌকা দুলছিল আর তারা হেসে লুটোপুটি। হাড়ি আর প্লেটের পেছনে তাল দিয়ে তবলা বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে কখন যেন তারা বাড়ির ঘাটে চলে এলো। বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই বাদলের মুখ গম্ভীর। হাতে কিছু জিনিস নিয়ে নিতুকে রান্নাঘরের দিকে যেতে দেখে ইশারায় আসতে বলল।

নিতু বাদলের মুখ দেখেই বুঝল তার কোনো ভুল হয়েছে, তবে ভুলটা কী সেটা সে বুঝতে পারল না। ইচ্ছে করল সেখানেই তার এমন কিছু একটা হয়ে যাক যেন হেঁটে ঘর পর্যন্ত আর যেতে না হয়। বাদল ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। বাঘ যেমন শিকারের অপেক্ষায় থাকে তেমন ক্রদ্ধ চেহারায়। নিতু জানত এরপরে কী হবে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, বাদল নিতুকে ধাক্কা মেরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করেও ঝিম মেরে থাকে। এক সময় নিতুই বলল, “কিছু বলবে?” “আজকে আমি দেখতে গেলাম তুমি এদের সাথে বাড়িতে সারাক্ষণ কর টা কী।” “মানে?” “মানে বোঝ না? মন্টুর সাথে খুব ঢলাঢলি, না? আমি বাড়িতে না থাকাতে খুব সুবিধা হইছে! সারাদিন কী এইরকমই চলে নাকি?” “তুমি যেরকম ভাবছ সেরকম কিছু না, শুধু মন্টু কেন, আমি তো বাড়িতে সবার সাথে একই ভাবে-” “আমার চোখ ভুল হইতে পারে না। আমি ঠিকই খেয়াল করছি মন্টু তোমার সাথে কীভাবে কথা বলে, যেন কী আপন, আর তুমি তো হেসে হেসে গলে পড়।

আবার গানও গাও, সখী ভালোবাসা কারে কয়? বাহ্! ওর জন্যই তো গাইছ, ঠিক না? আর কোনো গান পাও নাই? কেন গাইছ এই গান? সত্যি করে বল।” কথা বলতে বলতে বাদল এসে নিতুর হাত পেছনে মুড়িয়ে ধরল। নিতু যতই ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করল সে ততই জোরে চেপে ধরল বারবার। বলতে থাকল, “কেন গাইছ? আর কখনও গাবা? বলো, গাবা আর কখনও?” নিতু ব্যথায় শরীর বাঁকিয়ে কোনোরকমে বলল, “না, গাইব না- আর গাইব না-” নিতুকে ছেড়ে দিয়ে বাদল উন্মত্তের মতো বিছানায় বসল।

নিতু কী করবে বুঝতে না পেরে সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। টিনের চালে আকস্মিক ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে কানে তালা লাগায় কেউ আর কথা বলল না। কোনো একটা তা-ব যেন তাদের মাঝখানে আরামদায়ক একটা দেয়াল তৈরি করল। তারপর বৃষ্টির শব্দের উচ্চতার সাথে তাল মিলিয়ে বাদল বলল, “আর গাবা না, আর এরকম মিন্টুর সাথে মাখামাখি করবা না, আমাকে ভালো লাগে না, না? আমি ওদের মতো তোমার প্রশংসা করতে পারি না, আমাকে কেন ভালো লাগবে? কিন্তু আমাকে তোমার ভালো লাগুক আর না লাগুক তাতে কিছু যায়-আসে না, বুঝলা? তুমি আমার বউ এইটা মনে রাখবা। আমি তোমাকে এইখানে আর রাখতে পারব না। আমি ঢাকায় বাসা নিব।” শেষের দিকে বাদলের মুখের পেশিগুলো কাঁপছিল, ঘামের নিচে কালো মুখ খয়েরি হয়ে যায়। তারপর আবার সেই পুরোনো আক্রোশে নিতুর উপরে আঁছড়ে পড়ে, নিতু কিছু বোঝার আগেই দেখে সে বাদলের দানব শরীরের নিচে। সন্ধ্যার পরে শাশুড়িকে মালিশ করতে গেলে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির সাথে নরম সুর মিলিয়ে তিনি বলতে থাকেন, “কী আর করবা, বাদলের স্বভাব হইছে তার চাচাদের মতো। তার বাবা কিন্তু এইরকম ছিল না। ভালো মানুষ ছিল, আগেই তো বলছি বোকা ছিল।

দুনিয়ায় বোকা মানুষদের মানুষ ভালো মানুষই কয়। বাদল সেইরকম হয় নাই। বাদল কোনো কিছু সোজাভাবে চিন্তা করতে পারে না।” নিতু এসব কথার কোনো জবাবই দেয়নি। জবাব আবার কী! উনি তো কোনো প্রশ্ন করেননি তাকে। নিতুর কাজ হলো চুপচাপ শুনে যাওয়া। কিন্তু উনি এসব কেন বলছিলেন? ভয়ঙ্কর বৃষ্টির শব্দের মধ্যে দরজায় কান লাগিয়ে না রাখলে বাদলের ধমকাধমকি তার শোনার কথা নয়। তিনি নিশ্চয়ই তাদের ঘরে আঁড়ি পেতেছিলেন অথবা বাদলকে অনেক দিন ধরে দেখতে দেখতে বাদলের গতিবিধি তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। সবার সাথে ঘুরতে গেলে কী হতে পারে সেসব তিনি আগেই জানতেন। নিতু ছোট নিঃশ্বাস ফেলল, বাটি থেকে বাদামি হয়ে যাওয়া রসুনের কোয়া সরিয়ে তেল উঠিয়ে নিলো। বৃষ্টি কমে এলে বাইরের বেঞ্চে মামার রেডিওর শব্দ নিস্তব্ধতাকে চিরে দিচ্ছিল।

অনুরোধের আসরের ন্যাকান্যাকা ঘোষক আর প্রেমের গান নিতুর মন গলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে গেল বহুক্ষণ। ১৬ পরদিন বিকেলে বাদল চলে যাওয়ার আগে নিতুকে ঘরে ডেকে নিয়ে কড়া গলায় বলল, “শোনো নিতু, যত ঢলাঢলি করার ইচ্ছা এই কয় দিনে করে নাও। বড় মামা আর মা যতই মানা করুক এবার আমি আর শুনব না। আমার এখন সামর্থ হইছে ঢাকায় বাড়ি ভাড়া কইরা তোমাদের নিয়া যাওয়ার, তাহলে যাব না কেন? আমি বাড়ি ভাড়া করলে মাকেও আমার সাথে যাইতে হবে। শহরে থাকতে পারবনা পারবনা অনেক বলছে, এবার আমি আর শুনতেছি না। আমি ওইখানে একলা থাকি আর আমার বউ এইখানে যা ইচ্ছা তাই কইরা বেড়াক, এইটা কেউ সহ্য করবে?” “আমার তো সামনে এইচএসসি পরীক্ষা, তারপরে না-হয়-” “তোমার পরীক্ষা তাতে আমার কি? আমি যখন নিতে আসব তখনই যাবা, পরীক্ষা দেয়ার দরকার নাই।

আমি যে ঢাকায় চলে যাই, তোমার মুখে তো কোনো হা-হুতাশ শুনি না। মনে হয় আমি এইখানে না থাকলেই তোমার ভালো! তোমার যেমন খুশি তেমনভাবে ঘুরতে পার।” বাদলের গলা চড়ছিল। নিতুর আর কিছুই বলতে ইচ্ছে করেনি। ভেবেছিল পরীক্ষার পরে বাদলকে বলবে নিজেদের বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসতে চায়, তখন সেসব প্রসঙ্গ অবান্তর। বাদল যেদিন এসে বলবে বাসা ঠিক করা হয়ে গেছে, সেদিনই রওনা দিতে হবে। বিছানার হাতের উপরে হাত রেখে মাথা নিচু করে বসে ছিল নিতু। বাদল চলে গেল, তারপরেও বসে থাকল সে। বাড়ির সবাইকে সে ভালোবেসেছে, মন বসে গেছে, এসব কি বাদলের জন্য খুবই বিরক্তিকর? নিতু ভালো আছে, হাসিখুশি আছে, সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না। এত সন্দেহ কেন ছিল তার মনে, কে জানে! নিজে ভালোবাসোনি, অন্য কেউ ভালোবাসছে তা-ও তার চোখে অসহ্য।

নিতু নীরবে কাঁদতে থাকে। অপরাধ না করেও তাকে শাস্তি পেতে হবে। সে বাদলের মতো নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে রাখতে পারেনি। বাদলের না থাকার সময়টা সে কেঁদেকেটে কাটাচ্ছে না, এটাও তার অপরাধ। সেই অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাকে ঢাকার একটি বাসায় আটকে থাকতে হবে। বরাবর সপ্তাহে দুদিন করে ধর্ষিত হতে হতো, এরপরে তা হয়ে যাবে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কাঁদতে কাঁদতে নিতুর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। পৃথিবীর সব কষ্ট কি তারই প্রাপ্য? এক সময় কান্না থামিয়ে নিজেকে ঠিকঠাক করে নিলো, ভাবল একাই গিয়ে নদীর ধারের বটগাছের গুঁড়িতে বসবে, নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলে ভালো লাগবে। পরমুহূর্তে মনে পড়ে নদী বর্ষার পানিতে উপচে বটগাছের গুঁড়ি পানির নিচে।

থই থই ঘোলা পানির ওপরে বটের ডালপালা আর ঝুড়িগুলো শুধু মাথা উঁচু করা। নিতুর মতো তাদেরও হয়তো প্রাণ খুলে শ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছিল। সন্ধ্যায় বারান্দায় নিতু বসে ছিল পিলারে মাথা ঠেকিয়ে। পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে উঠোনের মাটি খুঁটছিল, দৃষ্টি ছিল রান্নাঘরের চালের ওপারের আকাশের দিকে। কিছুই দেখছিল না, কেবল তাকিয়ে থাকা। বারান্দায় বড় মামা এসে বললেন, “কী গো মা, মন খারাপ?” “না, মামা।” “আমি জানি তুমি কেন মন খারাপ কইরা আছ।” নিতু চুপ। “শোনো, বাদল যাওয়ার আগে আমারে কইছে ঢাকায় বাসা নেওয়ার কথা। সে তো ঠিকই সিদ্ধান্ত নিছে। কাইল তুমি দেখ নাই নদীর পানি কত বাড়ছে আর কেমন কইরা আমাদের পাঁচিলের দিকে আগায় আসতেছে?

এই তো, আমাদের বাড়ি থেইকা কাছেই অনেক বাড়ি ভাইঙা গেছে। আমি বুঝতে পারতেছি আমাদের বাড়ি নদীতে চইলা যাইতে আর দেরি নাই। আমাদের সবাইকেই তো এইখান থেইকা সইরা যাইতে হবে।” মামা যেন বলতে বলতে নিজেই নিজের কথা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। নিজের কথার বাস্তবতায় তার নিজেরই ঘোর লাগল, গলা ধরে এলো, চুপ করে থেকে আবার বলা শুরু করলেন, “পৃথিবীতে কী চিরস্থায়ী হয় কও তো? কিছুই না। চারদিকে দেখ কত মানুষ বাড়ি ভাঙবে বইলা প্রতিদিন নতুন আশ্রয় খুঁইজা নিতেছে, আমাদের জমিজমা বেশি তাই দেরি হইতেছে কিন্তু ভয় পাব কেন? আমরাও আমাদের ব্যবস্থা কইরা নিব। জমিজমার ব্যবস্থা করতে হবে, নতুন বাড়ি বানাইতে হবে, মাইয়াদের বিয়া দিতে হবে, আমার তো এখন অনেক কাজ। আর এইসব কাজ ছাড়া আমি আর কী-বা করব জীবনে! বাদল যদি এখন তোমারে আর তার মারে ঢাকায় নিয়া যায় তো যাউক না! তুমি মন খারাপ কইর না। এই বাড়িও থাকবে না, আর আমরা কেউ এইখানে চিরজীবন থাকব না।”

“এই বাড়ি, এই উঠোন, কিছুই থাকবে না মামা?” “সত্যি বলতে কী, কিছুই থাকবে না। আমি গত বছরেই খেয়াল করছি পানি আগাইয়া আসতেছে খুব দ্রুত। ওদিকে শহরে ডিসি অফিসের দেয়াল পর্যন্ত পানি আইসা পড়ছে। অফিসারদের বাসাগুলান প্রায় দ্বীপের মতো হইয়া গেছে। কয়েকদিনের মদ্যেই ভাইঙ্গা পড়বে, সবাই জানে। আমাদের জায়গা বদলানো ছাড়া আর কোনো উপায় নাই, এইটা মাইনা নেওয়াই ভালো।” “আপনি এসব এত সহজে বলেন কী করে, মামা?” “আমি জানি এইটা মানা সহজ না। এই বাড়িতে আমি জন্মাইছি।

যুদ্ধের পরে জেতার আনন্দ নিয়া এই বাড়িতে আমি ফেরত আসছি। আমি জানি এইটা মাইনা নেওয়া সহজ না।” নিতুকে চুপ করে থাকতে দেখে মামা বললেন, “খুব আফসোস হইতেছে, না নিতু?” “হ্যাঁ মামা, খুব আফসোস হয়। সবাই একসাথে ছিলাম, আনন্দ ছিল, এখন কে কোথায় যাবে, কে জানে!” “মানুষের জীবনটাই এইরকম। মানুষ আফসোস করার ওস্তাদ। অপ্রিয় মানুষের জন্যও সমানে আফসোস হয় আর প্রিয় মানুষের জন্য তো আফসোস হবেই।” “অপ্রিয় মানুষের জন্যও আফসোস হয়, মামা?” “হয়।

শত্রুর জন্যও আমার আফসোস হইছিল। এখনও হয়। মাঝরাতে সেই আফসোস আমারে মাঝে মাঝে জাগায়ে তোলে। তারপরে আবার ঘুমাইয়া পড়তে অনেক সাধনা করতে হয়।” “সেটা কেমন মামা?” “যুদ্ধের সময়ে সিলেটে একবার টিলার উপরে আমাদের ঘাঁটি পড়ল। পাহাড়ের পায়ের কাছে গ্রাম। দলের তরুণ ছেলেরা সাধারণ মানুষের সাথে মিলতে যাইত, খবরাখবর আনত। তারা খবর আনল গ্রামে কতকগুলা রাজাকার আছে, গ্রামের মানুষদের নানান ক্ষতি করতেছে। তাদের প্রশ্রয়ে গ্রামে আর্মি আসে-যায়।

রাজাকারগুলা গ্রামের মানুষের ক্ষেতের ফসল কাইড়া আর্মিদেরকে দিয়া খুশি করতে লাগল। দিনদিন তাদের অত্যাচার বাড়তে লাগল। তাদের ভয়ে গ্রামের মাইয়ারা ঘরের মাচার উপর দিনরাত লুকাইয়া থাকত। তারপরেও রেহাই পাইতেছিল না। ঘাপটি মারা কয়েকটা রাজাকাররে একদিন কায়দা কইরা ধইরা আনল ছেলেরা। পাহাড়ের ধার ঘেঁইষা লম্বা লাইন কইরা তাদের দাঁড় করানো হইল। তাদের মধ্যে কেউ বয়ষ্ক, কেউ আবার এক্কেরে পোলাপান। ভাবত তারা আর্মিদেরকে সাহায্য কইরা কোনো পূণ্যের কাজ করতেছে, তারা হইল স্বেচ্ছাসেবক। লাইনে দাঁড় করানোর পরে একদিক থেইকা ব্রাশফায়ার শুরু করলাম আমরা। তখন একটাই শাস্তি ছিল, রূপকথার গল্পের মতো, গর্দান থেইকাই শাস্তি শুরু।

শুনানির পরে কোনো ছোট শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না, বিচার মানেই সরাসরি গর্দান নেওয়া। আর ওদিকে ব্রাশফায়ার একবার শুরু করলে কিন্তু আর সহজে থামানো যাইত না, তখন সামনে যে থাকে সেই মারা পড়বে, কোনো উপায় নাই। রাজাকারের লাইনের উপরে একটার পর একটা শরীর ঘাসের উপরে পইড়া যাইতেছিল। লাইনের শেষে একটা অল্পবয়সের ছেলে ছিল। তার গায়ে গুলি লাগার আগেই সে গুলি খাওয়ার ভান কইরা শরীরটা মাটিতে ছাইড়া দিল, তারপর হামাগুড়ি দিয়া পাহাড় থেইকা দিল লাফ। অনেক নিচে ঝোঁপঝাড়ের উপরে পড়ল।

আমার মাথায় খুন চাইপা গেল। মনে হইল তার কাছে আমি হাইরা গেছি। দৌড়াইয়া গিয়া নিচে তাকাইয়া দেখি, সে একটা গাছের উপরে পড়ছে। সম্ভবত বড়ই গাছ হইতে পারে। তার সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি আটকাইয়া গেছে ডালপালায়, নিজেরে ছাড়াইতে পারতেছে না, শুধু দাপাদাপি করতেছে। আর এত উঁচু থেইকা পড়ার জন্য তার হাতপা-ও ভাইঙা যাওয়ার কথা। কথা না, অবশ্যই ভাঙছিল। সেই জন্যেই সে গাছ থেইকা নামতে পারতেছিল না।” “তারপর কী করলেন মামা?” নিতু আঁৎকে উঠল কোনো ভয়ঙ্কর সম্ভাবনার কথা ভেবে।

“তারপর আমি উপর থেইকাই তারে গুলি করলাম। অনেক গুলি। তার শরীরটা ঝাঁঝড়া কইরা দিলাম। মাকড়সার মতো তার চারটা হাত-পা চারদিকে মেইলা যে দাপাইতেছিল, সেইটা হঠাৎ বন্ধ হইয়া গেল।” নিতু মুখটা কুঁচকে মামার দিকে তাকিয়ে ছিল। মামার চোখে তখনও জিঘাংসা দেখল সে, সেই চোখে কোথায় আফসোস! গল্প বলতে বলতে মামা বরং হাঁফাচ্ছিলেন। তারপর একটু চুপ করে থেকে মুখ থেকে হাত দিয়ে ঘাম মুছে নিয়ে একটা ছোট্ট নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “আমি তারে গুলি না করলেও পারতাম- সে তো প্রায় মইরাই গেছিল, অত উপর থেইকা পড়লে কেউ বাঁচে না কি? কিন্তু আমি নিজেরে থামাইতে পারি নাই। এখনও স্বপ্নে আমি সেই চারটা হাতপায়ের আউলাঝাউলা দাপাদাপি দেখি। আমার ঘুম ভাইঙা যায়। যতবার ঘুম ভাঙে, আমার আফসোস হয়। আমি তারে ওইভাবে গুলি না করলেও পারতাম।

সে হয়ত বাঁচতেও পারত। খোড়াইয়া খোড়াইয়া ঠিকই গ্রামে পৌঁছাইয়া যাইত। বাঁচার জন্য সে এত উঁচু থেইকা লাফ মারল। লাইনে দাঁড় করানোর পর থেইকাই সে পায়ে ধইরা মাফ চাওয়ার জন্য বারবার নিচু হইয়া যাইতেছিল। বুকে গুলি করব বইলা আমি ধমকাইয়া বলতেছিলাম, ‘অ্যাই হারামজাদা সোজা হইয়া দাঁড়া!’ কিন্তু লাফ দেওয়ার পরে তখন তার প্রাণটা ভিক্ষা দিলেও বোধ হয় পারতাম।” মামার মুখে তখন সত্যি বেদনা, দেখে মনে হলো কী যেন ভুল হয়ে গেছে তার। বারান্দার চেয়ারে বসে শূন্য দৃষ্টিতে মামা রান্নাঘরের ওপরে ঘন হয়ে ওঠা ধুন্দল গাছের ঝোঁপের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। নিতু মামার পায়ের কাছে বসে থাকল চুপচাপ। গভীর ভাবনার ঘোর থেকে বেরিয়ে এলে মামা আস্তে আস্তে বললেন, “সব ভাইসা যাবে নিতু, আমাদের এইখান থেকে ভাগতেই হবে। কোনো উপায় নাই।” নিতুকে চুপ করে থাকতে দেখে বড় মামা আবার বলা শুরু করলেন, “মন খারাপ কর কেন মা? তুমি তোমার নিজের সংসার গুছাইয়া নাও ঢাকায় গিয়া।

আমি আগেই বাদলরে ঢাকায় পাঠাইছি, জানতাম একদিন এইরকম সময় আসবে। মন্টুরেও পাঠাইয়া দিতে চাইছিলাম, সে যায় নাই। বাড়ির মেয়েদের বিয়া হইলেই এখন আমি নিশ্চিন্ত হইতে পারি।” নিতু কিছুই বলেনি। বাদলকে যতটুকু বুঝেছে তাতে নিজস্ব সংসারের শখ নেই তার। ভবিষ্যতের একাকী জীবনের কথা ভেবে সে ফুঁপিয়ে ওঠে। মামা তার মাথার উপরে হাত রাখলেন, “আরে পাগলী, আজকেই তো আর যাইতেছ না, সময় লাগবে। বাদল এতদিন কার কার সাথে যেন একটা ফ্ল্যাটে থাকত। এখন নতুন বাসা খোঁজা, কিছু ফার্নিচার কেনা, সময় লাগবে না? ততদিনে তুমি মন ঠিক কইরা ফেল। আর আমরা তো মাঝে মাঝে আসবই তোমার বাসায়। রিনা বা মিনা কি পুতুলের ঢাকায় বিয়া হইলে তো কোনো কথাই নাই। সবসময়েই দেখা হবে তোমাদের।” বাদলের মা দরজায় দাঁড়িয়ে শুনছিলেন তাদের কথা। ধীরে ধীরে সামনে আসেন, “এইবার কী তাইলে যাইতেই হবে ভাইজান?” “এইবার আর না যাইয়া কোনো উপায় নাই।” “আমি তো কোনোদিন শহরে থাকি নাই।”

“ভয় পাইও না, তোমার ছেলে আর ছেলের বউ তোমারে মাথায় কইরা রাখবে।” সেই রাতে আকাশের কী যে হলো! বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরে থামতে ভুলে গেল। নিতু সারারাত টিনের চালে বৃষ্টির শব্দের সাথে কেঁপে কেঁপে কাঁদল। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ ছাপিয়ে তার হাহাকার কারও কানে গেল না। পরদিন সকালে শাশুড়ি না ডাকা পর্যন্ত নিতুর ঘুম ভাঙল না। সাদামাটা একটা দিন ছিল কিন্তু সেই দিনটা নিতু কোনোদিন ভুলবে না। সেদিন প্রথম সে তার শরীরের ভেতরে কারও অস্তিত্ব আন্দাজ করতে পেরেছিল। নিতু বুঝতে পারছিল না সে যা ভাবছে তা ঠিক কি না, ঠিক হলে সে কি খুশি হবে? কাউকে বলবে কি বলবে না তা নিয়েও অনেক ভেবেছিল।

বড়বোন ঋতুকে চিঠিতে লিখেছিল কয়েকদিন পরে। তারপর বলেছিল পুতুলকে। তাকে যে এমনিতেই বলতে চেয়েছিল তা নয়। পুতুলের ঘরে সে মাঝে মাঝে যেত গল্পের বই আনতে। নিজের বই থেকে সে বেছে দিত আবার অন্য কারও কাছ থেকে চেয়ে আনা বইও ভালো লাগলে নিতুকে পড়তে বলত। নিতুর পড়া হলে তা নিয়ে দুজনে মিলে গল্প করত। সেদিনও তেমনি বই ফেরত দিতে পুতুলের ঘরে গিয়েছিল নিতু। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে উঠতে হাঁপাচ্ছিল। কোনো পরিশ্রম ছাড়াই শরীর ক্লান্তিতে জমে আসছিল।

দোতলায় উঠে মাথাটা চক্কর দেয়া শুরু করলে ছুটে গিয়ে পুতুলের বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছিল। পুতুল চমকে উঠল, “ভাবী, শরীর খারাপ নাকি?” নিতুকে পানি খাইয়ে পুতুল বলল, “কি হইছে ভাবী, বলো না কেন? তারপর আবার কিছুক্ষণ কী যেন ভাবে, বলে, বাদল ভাইয়ের সাথে তোমার বনে ভাবী? নিতু চুপ করে থাকল, ক্রমাগত মাথা ঘোরাতে অন্যমনষ্ক লাগছিল। এমনিতেও বাদলের কথা বলতে ইচ্ছে হতো না তাই প্রশ্নের কী উত্তর দেবে তা-ও বুঝতে পারল না। পুতুল বলে, “আমার মনে হয় বাদল ভাইয়ের সাথে তুমি- সত্যি কইরা বল তো ভাবী, তার সাথে তুমি ভালো আছ?” নিতু জানালার বাইরে কড়ই গাছের কচি পাতার দিকে তাকিয়ে ছিল।

তার মনে হলো পুতুলকে কিছুই ভেঙে বলার দরকার নেই, সে যেন এমনিতেই সব জানে। নিতুর হাত ধরে বলল, “তুমি বলবা না, আমি জানি। তুমি অনেক ভালোমানুষ তাই বলতে চাও না। কিন্তু আমি তোমাকে বলি, আমি বাদল ভাইরে পছন্দ করি না।” “কেন পুতুল?” “সেইটা আমারে বলতে বইল না ভাবী, আমি তোমারে বলব না।” নিতু পুতুলকে কোনো জোর করেনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “পুতুল, তার স্বভাব আমার কি জানতে বাকি আছে?” নিতুর কথা শুনে পুতুলের যেন হঠাৎ বাঁধ ভেঙে গেল। নিতুর হাত ধরে বলল, “বিশ্বাস কর ভাবী, আমি তোমারে কখনও বলতে চাই নাই, বাদল ভাই খুব হিংস্র মানুষ। সে আমারে একদিন নিচে থেকে হাত ধইরা টাইনা এইখানে আনছে, দরজা লাগাইতে গিয়া বড় চাচা দেইখা ফেলছে, তা না হইলে- তারপর চাচাই বাদল ভাইরে ঢাকায় পাঠাইয়া দিলো।” নিতু অবাক হয়নি, যেন এসব ঘটনা তার জানাই ছিল। মাথার ভেতর কেবল ভয়ঙ্কর ঘূর্ণী শুরু হলে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল, পুতুলকে অস্থির হতে দেখলে বলল, “কিছু হয়নি, এরকম সময়ে এমন হয়।”

“বাদল ভাইরে বলছ?” “না।” “তোমার তো ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিৎ। আমি চাচারে বলব।” বাদলের মধ্যে তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। প্রতি সপ্তাহে এসে শোনাত খাট বা আলমারি কেনা হয়ে গেছে, শুধু বাসা পাওয়া গেলেই সে নিতু আর তার মাকে নিয়ে চলে যাবে। কয়েক মাস পরে একদিন ঘোষণাও দিলো, অফিসের কাছে বাসা পাওয়া গেছে। বর্ষার শেষের দিকে এক দিন বাড়ির পেছনের পাঁচিল হেলে পড়ল। সারারাত শরীরের অস্বস্তি নিয়ে জেগে জেগে ভোরে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল নিতু। সকালে দরজা খুলে বেরিয়েই দেখল রান্নাঘরের পেছনে থইথই পানি। দেখে কেমন দমবন্ধ হয়ে লাগল, যেন বড় একটা ঢেউ মাথার ওপর দিয়ে চলে যাবে তখনই আর নিতু অনেক নিচে ভারী পাথরের মতো অতলে ডুবতে থাকবে। সারাদিন বাড়িতে সবার একটাই আলোচনার বিষয়, এলাকাটা নদীর ভাঙনে চলে যাচ্ছে।

বড় মামা সিদ্ধান্ত নিলেন, আগামী বর্ষার আশায় থাকার দরকার নেই, বাড়ির পেছনের পাঁচিল বানিয়েও আর কাজ নেই। তার চেয়ে বরং আগামী বর্ষার আগেই বাসা গুটিয়ে নদী থেকে দূরে কোনো জমির উপরে সংসার পাতবে তারা। সারাবাড়ি জুড়ে হাহাকার, বাদলের মা শান্ত হয়ে গেলেন, কথাবার্তা কমই শোনা যেত তার। পরীক্ষার পর থেকে নিতুকে তেমন কোনো কাজও দিতেন না। নদীর ভাঙনে কাজের মানুষ সুলভ হয়ে গেল। নিতু সারাদিন হয় পুতুলের আনা বই পড়ত নয়তো শাশুড়ির পাশে বসে থাকত। শাশুড়ির হা-হুতাশের গল্প শুনত।

এই বাড়ি ছেড়ে ঢাকার গ্যাঞ্জামে গিয়ে থাকতে হবে এটাই তার আতঙ্ক। নিতুকে তিনি বাচ্চা হওয়ার জন্য মা-বাবার কাছে চলে যেতে বললেন। কিন্তু নিতু ভেবে পায় না সবাইকে এরকম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে সে যাবে! এরকম সময়ে সে নিজের বাড়িতে গিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকবে ভাবতেই তার নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হতো। শাশুড়ি ঢাকার বাসায় গিয়ে সংসার গোছাতে ব্যস্ত থাকবেন, সবাইকে ছেড়ে একা হয়ে যাবেন কিন্তু সে সময়ে নিতু কাছে থাকবে না, এরকম পরিস্থিতিতে তাকে ফেলে নিতুর পক্ষে চলে যাওয়া সম্ভব নয়। একদিন নিতু সবার সাথে টেলিফোনে কথা বলে এসেছিল একটা ফোনের দোকান থেকে। তারা ধরে নিয়েছিল নিতু কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে যাবে, বাচ্চা সেখানে হবে।

নিতু তাদের কিছুই বলেনি কিন্তু সে জানত সে যেতে পারবে না। বাদলের পাকাপাকি আদেশে একদিন সব গুটিয়ে চলে গেল তারা ঢাকায়। আসার আগে আগে নিতুর শরীরে বাচ্চার উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। বাদল সেই সপ্তাহগুলোতে যখন আসত, একই রকম করে নিতুর উপরে চড়াও হতো। নিতু আপ্রাণ চেষ্টা করত তাকে বোঝাতে, বাদল কিছুই বুঝতে চাইত না। নিতু ভয়ে কাঠ হয়ে থাকত। ঢাকায় যাওয়ার পরে শক্তভাবে বললে বাদলের যেন কী হলো। সে নিতুর সাথে আর ঠিকমতো কথা বলত না, তার কাছে আসতও না, তার দিকে তাকাত না পর্যন্ত। নিতু জানত না শাশুড়ি বাদলকে কিছু বলেছিল কি না। ছোট্ট দুই বেডরুমের বাসা, এক চিলতে বারান্দা এক দিকে, এ ঘরের কথা ওঘরে শোনা যায়, গোপনীয়তা বলে কিছু নেই।

সে যাই হোক, নিতু নিশ্চিন্ত হয়েছিল। বাড়ি থেকে মা, চাচি আর ঋতু এসে তাকে দেখে গেছে। ঋতু বারবার বলেছিল, “আমাদের সাথে চল।” এতদিন পরে দেখা, কেউ ভাবেনি যে নিতু সাথে যাবে না। অথচ নিতু যেতে রাজি হয়নি। চাচি বলেছিল, “আমাদের নিতু সত্যি অনেক বড় হয়ে গেছে!” বাদল অফিস যেত-আসত, নিজের মতো থাকত, মায়ের সাথে কথা বলে তার খোঁজ নিত। বাদল নিতুর উপস্থিতি গ্রাহ্যই করত না। নিতু যেন তার চোখের সামনে ছিল না কিংবা অদৃশ্য হয়ে গেছে। বাদল প্রায়ই রাত করে বাসায় ফিরত। একবার বাদল আসার পরে নিতু জানতে চেয়েছিল, “তুমি কি আমার উপরে রাগ করে আছ?” বাদল কোনো কথা বলেনি। “এত রাত পর্যন্ত কোথায় থাক?” কোনো উত্তর নেই।

শোয়ার পরে নিতু আবার জানতে চেয়েছিল, “বলবে না? আমার উপর রাগ করেছ?” বাদল এক ঝটকায় নিতুর হাত সরিয়ে দিলো। চাপা স্বরে বলল, “ওইদিকে সরো।” “কেন কী হয়েছে? আমার সাথে এরকম করছ কেন?” “কী করছি? তুমি তো চাও তোমার থেকে দূরে থাকি?” “এর মানে কী বাদল? জানো আমাদের বাচ্চা হবে ক’দিন পরে, সেটা নিয়ে কিছু ভাবো?” “সেটা নিয়ে ভাবার জন্য তো তুমি আছ।” “আর তুমি কী নিয়ে আছ?” “সেটা তোমাকে বলতে হবে?” নিতু চুপ করে থাকল। বাদলের এই মুখ সে চিনত। কথাটা বলতে মুখে বাধে। তবু একসময় বলেই ফেলে, “তুমি কি অন্য কোথাও, অন্য কারও সাথে-” “আমার পক্ষে এভাবে থাকা সম্ভব নয়। তুমি জানো না আমি কেমন?” নিতু আর কিছুই জানতে চায়নি। উল্টোদিকে ফিরে গাল ভিজে গেল চেখের পানিতে।

বাদলকে সে ভালোবাসতে পারেনি সত্যি অথচ কষ্ট পাচ্ছিল। নিতু গভীরভাবে ভাবতে থাকল বাদলের কাছ থেকে সে আসলে কী পেয়েছে? মায়ামমতার অভাব আর গায়ের জোরে দখল করতে চাওয়ার মতো শারীরিক সম্পর্ক নিতুকে কিছুই দেয়নি। অথচ তখন, ওই মুহূর্তে কেন যেন মনে হলো তার কিছু একটা হারিয়ে গেছে- সে যেন নিঃস্ব। ১৭ সে বর্ষার শেষের দিকে বাদলদের বাড়ির পেছনের পাঁচিল শেষ পর্যন্ত ভেঙেই পড়েছিল। পেছনের ঝোঁপঝাড় পেরিয়ে নদী এগিয়ে এসেছিল রান্নাঘরের দেয়াল পর্যন্ত। নিতুরা ঢাকায় চলে এলে মামা সবাইকে নিয়ে বিক্রমপুরে চলে যান। পরের বর্ষার শুরুতেই মামা ঢাকায় এসেছিলেন নিতুর বাচ্চা দেখতে।

নাম রেখেছিলেন দীপ। নদীর ধারের সেই বাড়ির বারান্দায় বড় মামা আর খালি গায়ে শুয়ে থাকেন না, রাতবিরাতে মামার রেডিও বেজে ওঠে না, ভাবতেই মামার দিকে তাকিয়ে নিতুর কান্না পাচ্ছিল। অথচ মামাকে দেখে মনে হয়নি কিছু হয়েছে, মহানন্দে বাচ্চাকে কোলে তুলে নিয়ে নিতুর হাতে একটা সোনার চেইন গুজে দিয়েছিলেন। নিতু ভয়ে ভয়ে জানতে চেয়েছিল, “এখনকার বাসাটা কেমন মামা? বারান্দা আছে? নদী দেখা যায়?” হাসতে হাসতে মামা বলেছিলেন, “তাড়াহুড়া কইরা জমি কিইনা বাসা বানাইলে যেমন হয় আর কী! বারান্দা আছে, কিন্তু অত বড় না। আর নদী? আবার নদী কেন মা? দেখলা তো নদীতে কী সর্বনাশ করল! নদী থেকে এবারে দূরে, অনেক দূরে। তবে কে কতদিন থাকতে পারে পানিরে লুকাইয়া। শুধু আমাদের লৌহজং কেন, পুরা পৃথিবীটাই একদিন চইলা যাবে পানির তলায়।

সবার ভাগ্য একএ আগে আর পরে। খালি নিজেরে নিয়া আর কত দুঃখ করব?” “আপনি তো সবসময় অন্যের দুঃখই দেখতে পান মামা, নিজেরটা দেখেও দেখেন না।” “সেইরকম তো হইতে চাই মা কিন্তু আর পারলাম কই? কিন্তু তোমার শুকনা মুখ দেইখা আমার বুক ফাইটা যাইতেছে! কী হইছে তোমার? এখানে থাকতে ভালো লাগে না?” নিতু হাসল, কথা ঘুরিয়ে বলল, “কতদিন রিনা, মিনা আর পুতুলদের দেখি না! ওদের আনলেন না কেন মামা?” “রিনা আর মিনার তো কলেজ খোলা, বি এ তে ভর্তি হইল দুইজনই। পুতুল পড়তে চইলা গেল রাজশাহী ইউনিভার্সিটি। কেন, তোমারে চিঠি লেখে নাই ওরা?” নিতু আর কিছু বলেনি। বলেনি যে ওরা সবাই অনেক চিঠি লিখেছে।

সে প্রথম প্রথম দায়সারাভাবে একআধটা উত্তরও দিয়েছিল। তারপর আর লেখে নাই। ঋতুকেও আজকাল লেখে না। কারও সাথে যোগাযোগ করতে তার ভালো লাগত না। নিজেই নিজেকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছিল, নিজস্ব সমস্যার আর কারও কাছে তুলে ধরতে ইচ্ছে করত না আবার মিথ্যে করে সুখে থাকার গল্পও সাজাতে রুচি হতো না। এই টানাপোড়েনে আর কাউকে চিঠি লেখা হয়ে উঠত না। দুপুরে বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকলে একাকী নিতু এক চিলতে বারান্দাটায় এসে দাঁড়াত। পাশের বাড়ির ছাদ পাশ কাটিয়ে যেটুকু ধোঁয়াটে আকাশ দেখা যেত তার দিকে তাকিয়ে বিগত জীবনের আনন্দবেদনার কথা ভাবত। কখনও আকাশের গায়ে অথবা ছাদের কার্নিশে বসে থাকা একটা একলা পাখিকে খুব আপন লাগত।

যেন সে পাখিটাই একমাত্র প্রাণী যে তার দুঃখ না বলতেই জেনে গেছে। ভালোর মধ্যে যা হয় তা হলো কলেজের বান্ধবী ফরিদার বিয়ে হলো ঢাকায়। সে আসত, নিতুকেও নিয়ে যেত সাথে। নিতুর বাসা ইন্দিরা রোড থেকে ফরিদার শংকরের বাসা খুব দূর নয়, তাই বাদল অফিসে থাকার সময়ে শাশুড়ির কাছে যাওয়ার অনুমতি পেতে অসুবিধা হতো না। তবু বাবা-মায়ের উপরে নিতান্ত অভিমানে দিনগুলো কাটত নিতুর। একবারও যেতে ইচ্ছে হতো না নিজের বাড়ি। যেন বাড়ির সবার জন্য ঠিক যতটা আকর্ষণ বোধ করত, পেছনে পেছনে ততটাই বিকর্ষণ।

উভয় সংকটে মাঝামাঝি পেন্ডুলামের মতো দুলতে দুলতে দিন পার হয়ে যেত। মনে হতো সেই কবে তারা তাকে পর করে দিয়েছে! আবার তাদের কাছে যাবে কেন? আবার মাঝে মাঝে ভাবত ছুটে যাবে তাদের কাছে, সেখানে গেলেই যেন সব কষ্ট দূর হবে। তখন অভিমান হতো বাদলের উপরে, বাদল বললেও তো পারে, “যাও একবার ঘুরে আস।” কখনও তো বলত না! নিতু বললে হয়তোবা এক কথায় মানা করে দেবে। তাই বলতে চেয়েও আর বলা হয়নি। বছর ঘুরতে থাকল, নিতুর জীবনও যেন একই চাকার উপরে ঘুরছিল, চোখের সামনে দীপ বড় হচ্ছিল, দিন কেটে যেত ব্যস্ততায়। দ্বিতীয়বার বাচ্চা হওয়ার আগে আগে ঋতু বাসায় এসে নাছোড়বান্দার মতো জিদ করল, “আর রাগ করে থাকিস না নিতু, এবারে চল। মা আর চাচি কী অপরাধ করেছে? তারা তো তোকে দেখতে চায়।”

নিতু চলে যায় নিজের বাড়ি বহুদিন বাদে। বাড়িঘর সব একইরকম ছিল। হয়তো আরও একটু নুয়ে পড়েছিল। মায়ের বয়স মনে হয় অনেক বেড়ে গেছে, বাবার সেই হম্বিতম্বি আর নেই, বরং একটু নরম স্বভাবের হয়ে গেছেন। এক সন্ধ্যায় নিতুকে একলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “তুই ভালো আছিস তো মা?” নিতু কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু বাবার দিকে তাকাতে গিয়ে তার চোখ ভরে উঠেছিল। নিতুর মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা আবার বলেছিলেন, “মনে কোনো কষ্ট রাখিস না নিতু- আমি তোকে বুঝতে পারিনি।”

দীর্ঘদিন বাদে সেই উঠোন, সেই ঘরগুলোতে নিতু প্রাণভরে শ্বাস নিত, যখনতখন অকারণে বাড়ির এমাথা-ওমাথা ঘুরে বেড়াত। ছাদে উঠতে গেলে চাচি হৈ হৈ করে দৌঁড়ে আসত, “কর কি কর কি, এই অবস্থায় সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়লে কী হবে জানো?” নিতু তবু থেমে থেমে সিঁড়ি ভাঙত মাঝে মধ্যে। ছাদে গিয়ে পুরোনো সময়গুলো হাতড়াত, অস্পষ্ট হয়ে গেছিল কত কিছু! তবু চারদিকটা যে একই রকম আছে সেটা বুঝতে পারত। মফস্বল শহরের নির্জন একটা পাড়ায় ছয়-সাত বছরের মধ্যে কী আর এমন পরিবর্তন হবে! নিতু ভেবেছিল তার ভাই রিংকুকে বদলে যেতে দেখবে।

কিন্তু তাকেও একই রকম লাগে। রাজনৈতিক দলের নানান প্যাচে দিনরাত ছোটাছুটি, ভীষণ ব্যস্তসমস্ত একটা ভাব নিয়ে থাকা, তার সবকিছু একইরকম ছিল। তখন পার্টিতে তার প্রভাব আরও বেড়েছে। দল বদলে যে দলে ঢুকেছিল সেখানে সে বেশ বড়সড় নেতাও হয়ে গেছে, মানুষজন আসছে বাসায়, তাকে সমীহ করে কথা বলছে। নিতুর বাবা রিংকুর এ সমস্ত কাজকর্ম দেখেও না দেখার ভান করে থাকতেন। তিনি যেন এসব নিয়ে কুরুক্ষেত্র করতে ভুলে গিয়েছেন। বাচ্চা হওয়ার কিছুদিন বাদে নিতু পাড়ার একটি ছেলেকে বলে তপুর খোঁজ করার চেষ্টা করেছিল। ভেবেছিল, যাওয়ার আগে একবার তার সাথে দেখা করে যাবে। কোনো লাভ হয়নি, তপু সেই যে অ্যামেরিকায় চলে গেছে, আর আসেনি। ইনানি হওয়ার কিছুদিন পরে ঢাকায় ফিরে এলো নিতু। বাদলকে দেখা যেত দুই বাচ্চার সাথে কখনও সন্ধ্যাটা কাটাতে।

বাড়ি বদলে একটু বড় বাড়ি ভাড়া করে বাদল। ফরিদা মাঝে মাঝে নিতুকে বেড়াতে নিয়ে যেত। কোথাও কোনো বেকারি বা কফিশপে বসে একটুখানি সময় কাটাত। আশেপাশের রাস্তা আর দোকানপাট নিতুর ভালোই চেনা হয়ে গিয়েছিল ততদিনে। ফরিদার সাথে একদিন ধানমন্ডির সাতাশ নম্বরে ঘুরতে ঘুরতে পাশে থেকে নিজের নাম শুনে চমকে তাকাল নিতু। মানুষটা আবার বলল, “নিতু না?” তাকিয়ে যাকে দেখল, তাকেই যে দেখছে বিশ্বাস করতে কয়েক সেকেন্ড লেগে যায়। আর তাছাড়া সে আগের মতোও নেই।

স্বাস্থ্য ভালো, গাল ভরে গেছে, আগের সেই হ্যাংলা পাতলা গড়ন নেই। বিস্ময় কেটে গেলে নিতু উত্তেজনায় খানিকটা চেঁচিয়ে বলল, “তপু ভাই, তুমি!” ফুটপাথের হেঁটে চলা লোকেরা ফিরে তাকায়। “তুমি ঢাকায় এখন?” “আর তুমি? আমেরিকা থেকে কবে এসেছ?” “এই তো সপ্তাহখানেক। আগেও একবার এসেছিলাম, বাবা-মা এখন এখানে থাকেন তো, তাদের সাথে কিছুদিন থেকে চলে গিয়েছিলাম। দেশের বাড়িতে আর যাওয়া হয়নি।” “আমি খোঁজ নিয়েছিলাম, তুমি সেখানে আর যাওনি।” “তোমার খবর কী বলতো? সংসার কেমন চলছে?” “তুমি কতদিন থাকবে?” “এবারে অনেকদিন থাকব। বাবা-মা গেছেন বোনের কাছে, আমেরিকায়।

আমাদের এখানকার বাসাটা ভেঙে নতুন করে ডেভলপ করা হবে তো, তাই আমাকে বেশ কিছুদিন থাকতে হবে। সে যাই হোক, তোমাকে তো প্রথমে চিনতেই পারছিলাম না। কত বদলে গেছ!” “বড় হয়ে গেছি মনে হচ্ছে?” তপু হাসে, মনে পড়ে প্রায়ই অবাক ভাব দেখাত নিতুর বড় হওয়া নিয়ে। নিতু তাকিয়েই থাকল তার দিকে, পাশে যে ফরিদা আছে মনেই ছিল না। ফরিদা নিতুর মুখ দেখে অবাক, যেন অনেকদিন ধরে যা খুঁজছিল, পেয়ে গেছে। কোনো সঙ্কোচ নেই, গড়গড় করে তাদের কথা চলছে।

অপরিচিত লোকের মতো তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকে ফরিদা বলল, “নিতু, এভাবে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়েই কথা চলবে? চল কোথাও বসি।” নিতুর হঠাৎ খেয়াল হলো, চমকে তাকিয়ে বলল, “তপু ভাই, এ হলো ফরিদা, আমার বন্ধু।” নিতু কথা শেষ করার আগেই ফরিদা বলল, “আর আমি আপনাকে চিনি। আপনি তপু ভাই। আপনার গল্প শুনতে শুনতেই আপনাকে চেনা হয়ে গেছে।” তপু হাসল, “আমার ব্যাপারে কী আর বলার আছে! আচ্ছা আসো বসি কোথাও তারপর শুনি কী বলেছে নিতু।” মার্কেটের নিচের তলায় একটা খাবারের দোকানে বসে চায়ের অর্ডার দেয়ার আগেই ফরিদা বলে, “এই রে, নিতু, একটা কাজের কথা ভুলেই গেছি, আমাকে এক্ষুণই বাড়ি যেতে হবে।

তোরা কথা বল। আমি আসি।” নিতু জানে না ফরিদা ইচ্ছে করেই কেটে পড়ল নাকি। সত্যিই সে তপু ভাইয়ের কথা অনেকবার বলেছে তাকে কিন্তু কখনও তার সামনে তপু ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে যাবে, এমনটা ভেবে তো বলেনি! ফরিদার জানা হয়ে গিয়েছিল, মনে মনে নিতু তপু ভাইয়ের জন্য কী ভীষণ অপেক্ষায় থাকত, একবার, শুধু একবার তপু ভাইকে দেখার জন্য যেন নিতু নিজের সবকিছু বাজী রাখতে পারত। নিতু অবশ্য একসময় ভেবেছিল তার সেই মনটা মরে গেছে। বিশেষ করে বাড়িতে গিয়ে যখন শুনেছিল, তপু আর কখনই আসেনি, তখন মনে হয়েছিল এ জীবনে আর দেখা হবে না তার সাথে। চায়ের অর্ডার দেয়ার পরে তপু ভাইয়ের সামনে কেমন সঙ্কোচ হচ্ছিল।

দেখা তো হলো, এরপর কী? আর কী বলার আছে দু’জনের? তপু ভাই শুরু করল, “আশেপাশেই থাক নাকি নিতু?” “ইন্দিরা রোডে” “তোমার সংসার দেখতে হবে একদিন। আমার বাসাও দূরে নয়, ধানমন্ডি ছয় নম্বরে। যে বাসাটা ভাঙা হবে, আপাতত সেখানেই আছি। তোমার বর কী করেন?” “ব্যাংকে চাকরি করে। আমার সংসার দেখার মতো কিছু না তপু ভাই। দুটো বাচ্চা আছে, দীপ আর ইনানি। তোমার কথা বলো, বিয়ে করেছ?” “না, এখনও করিনি। মা খুব পিড়াপিড়ি করছেন, এবারে ফেরত গেলে মনে হয় আর ছাড়বেন না। তোমার দুটো বাচ্চা? দেখতে হবে তো! ভাবতে অবাক লাগছে আমার। এই সেদিন মনে হয় তুমিই বাচ্চা ছিলে!” “ধ্যাত, সেটা তুমি মনে করতে, আমি কখনই তত বাচ্চা ছিলাম না।” “সে তুমি যা-ই ছিলে, নিতু, কিন্তু এত বিষণ্ন ছিলে না। বড় হয়ে খুব ভাবুক হয়ে গেছ নাকি?” “তুমি কিন্তু প্রায় একইরকম আছ।” “কী যে বলো, কত মোটা হয়ে গেছি না?” “ভালোই হয়েছে, ভয়ঙ্কর রোগা ছিলে। এখন ঠিক আছে।”

“তোমার বরকে নিয়ে আসো না একদিন আমার বাসায়। আড্ডা দেয়া যাবে। আমি তো বলতে গেলে একেবারে একা। বাবা আমাকে এখানে এসে বাড়িটার ব্যবস্থা করতে বললেন দেখে আমি খুশিই হলাম। ভালই লাগছে অনেকদিন পরে এখানে থাকতে। আর আমি ছাড়া করবেইবা কে। আসবে তো তোমরা আমার বাসায়?” নিতু উত্তর দেয়নি। বাদলকে তপু ভাইয়ের কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না। কবেকার পরিচিত কে, রাস্তায় দেখা হলো আর তার সাথে বসে গল্প করতে শুরু করে দিলো নিতু! এসব জানলে খুব চেঁচামেচিও করতে পারে। কফিশপে নিতুকে তপুর সাথে বসে থাকতে দেখলে বাদল ফিট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু নিতুর তখন কিছুতেই উঠে যেতে ইচ্ছে করছিল না।

আর বাদলের ভয় নয়, ওই মুহূর্তে বরং ভয় হচ্ছিল যে এই বোধ হয় তপু ভাই বলবে তার কোনো দরকার আছে, বলে চলে যাবে, তারপর আর কোনো দিন হয়তো দেখা হবে না। তবু নিতু কিছুতেই বলতে পারবে না যে কেন সে বাদলকে নিয়ে যেতে পারবে না তপু ভাইয়ের বাসায়। তার চেয়েও লজ্জা লাগছিল ভাবতে যে তপু ভাইকে একবারও নিজের বাসায় আসার জন্য অনুরোধ করতে পারবে না। অনাত্মীয় একটি পূর্বপরিচিত ছেলে নিতুর সংসারে তার খোঁজে আসার আগে নিতুর মরে যাওয়াই ভালো। তপু ভাই তাদের বাসায় আসবে ভাবতেই তার গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে। তপু ভাই নিশ্চয়ই তাকে ভুল বুঝবে, অবাকও হবে যে বাসা এত কাছে হওয়া সত্বেও সে একবারও তাকে নিজের বাসায় যেতে বলছে না। তার বাচ্চাদের দেখতে চেয়েছিল সে, তবু ভদ্রতা করে নিতু বলেনি, আসো একদিন। নিতুর চোখে পানি এসে গেল।

কী বলার আছে! মনে মনে বলে, “তপু ভাই, না বলতেই সব বুঝে যাও না কেন? সবার জীবন কি আর এক রকমের হয়?” নিতুর শব্দহীন ইচ্ছে যেন উড়ে উড়ে ভেসে ভেসে তপুর কানে পৌঁছাল। কিছুই জানতে চায়নি সে আর। নিতুর বিব্রত মুখ সব প্রশ্নের উত্তর একসাথে দিয়ে দিয়েছে। তবু নিতুর ব্যবহারের আগামাথা সে কিছুই ধরতে পারেনি। কেবল ভেতর থেকে একটা প্রশ্ন অনিয়ন্ত্রিত বেরিয়ে এলো, “তুমি ভালো আছ তো নিতু?” তখন নিতু আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। চায়ের তলানিতে গাল বেয়ে এক ফোটা অশ্রু টুপ করে পড়ল শান্ত পুকুরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটার মতো। তপু সেই কাপের দিকে তাকিয়ে থাকল। কেউ কোনো কথা বলল না। অস্বস্তিকর কয়েকটা মুহূর্ত কাটিয়ে তপু প্রসঙ্গ পাল্টায়, “ধানমন্ডির এই দিকটায় কত গ্যাঞ্জাম হয়ে গেছে, না নিতু? কত মার্কেট, রেস্টুরেন্ট, ইউনিভার্সিটি! আমি তো বেশিরভাগ রাস্তাগুলো চিনতেই পারি না ঠিকমতো। যেসব ল্যান্ডমার্ক রেখে গিয়েছিলাম, কিছুই নেই। কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে শহরটা! তোমরা কতদিন হলো এখানে?” “প্রায় ছয় বছর হলো।

আগে কলাবাগানের এই দিকটায় থাকতাম, তারপর ইন্দিরা রোডে। পুরো ঢাকাই বদলে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি। বাদ দাও, তোমার গল্প বলো।” “আমার আর কী গল্প, বাবার দুঃখ তার মতো ল-ইয়ার হতে পারিনি। অ্যাকাউন্টিং ফার্মে চাকরি করি। গত দুবছর টানা কাজ করছিলাম, কোনো ছুটি নেইনি। তারপর নিলাম এবারে একটা লম্বা ছুটি। ভালোই লাগছে। আসো আমার বাসায় একদিন, তোমাকে ওখানকার ছবি দেখাব, দেখবে কেমন থাকি ওখানে।” “আমি তোমার বাসায় যাব?” “কেন যেতে কোনো সমস্যা?” “না মানে তুমি একা, আর আমি ওদিককার রাস্তাঘাটগুলোও ঠিকমতো চিনি না।” তপু নিতুর সঙ্কোচ বুঝতে পারছিল। সেই ছোট নিতুটি তো আর নেই যে না ডাকতেই লাফিয়ে মোটর বাইকের পেছনে বসে তার সাথে রওনা দেবে! কিন্তু কেন যেন মনে হয় নিতুর ওপর দিয়ে একটা কোনো ঝড় বয়ে গেছে।

চেহারার উপরে যেন একটা উটকো বিষাদের ছায়া ঘোরাফেরা করছিল। অথচ সেই ছায়ার নিচে স্পষ্ট বোঝা যায় বয়সের সাথে সাথে ভীষণ সুন্দরী হয়েছে নিতু। দুটো বাচ্চা হয়ে গেছে তার? তারপরও এরকম ছিপছিপে গড়ন থাকে নাকি কারও? আশ্চর্য, দেখলে কেউ বলবে না যে দুই বাচ্চার মা, গর্ভধারণ দুই-দুবারই তার শরীরে কোনো চিহ্ন ফেলে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে সে এত মনমরা কেন, শুধু সেটাই জানতে তীব্র ইচ্ছে হলো তপুর। কিন্তু তা নিয়ে নিতুকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে সাহস হয়নি। তাই নিতুর কথা না বোঝার ভান করে বলল, “এক বুড়ো, করিম ভাই আছে আমার সাথে, বুঝেছ? কেয়ারটেকারও বলতে পার আবার পাহারাদার কি রাঁধুনিও বলতে পার।

আপারা বাসাটা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে দেখেশুনে রাখে আর আমার জন্য একটু-আধটু রান্নাবান্নাও করে। আজ তাকে ছুটি দিয়ে বললাম, আজ আর রান্না চড়িও না করিম ভাই, আজ বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসি।” নিতু নড়েচড়ে বলল, “যাও তাহলে তপু ভাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে তোমার।” “উঠতে হবে, না হলে বেচারা করিম ভাই না খেয়ে থাকবে।” রাস্তায় এসে নিতুর জন্য রিক্সা ডাকতে ডাকতে তপু বলল, “আমার ফোন নম্বরটা অন্তত রাখ নিতু। যদি মনে কর তো ফোন করতে পার।” নিজের আকুলতা লুকিয়ে যন্ত্রের মতো রিক্সায় উঠতে যাচ্ছিল নিতু।

তপুর কথা শুনে ফোন বের করল ব্যাগ থেকে। হেসে বলল, “দেখ, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, ফোন নম্বরটা দাও দেখি-” “তোমারটা আমাকে দিলে না নিতু?” “আমি ফোন করলে পেয়ে যাবে।” তপু আর কোনো কথা বলেনি। নিতু কি তাকে এড়িয়ে যাচ্ছিল? হতে পারে। বিয়েশাদি, বাচ্চাকাচ্চা হলে মেয়েরা হয়তো অনেক বদলে যায়। সে নিজেও তো বদলেছে, নিতুর কান্না সে না দেখার ভান করেছে। এতদিন পরে দেখা, নিজে থেকে আর কতকিছু জানতে চাওয়ার কথা ছিল। নিতু নিজেইবা বলছে না কেন? আগে তো হড়হড় করে বলতে থাকত।

তার সাথে দেখা হয়ে নিতু খুশি হলো নাকি বিরক্ত, কিছুই বোঝা গেল না। রিক্সা ঘুরে যেতে যেতে হাত তুলে বিদায় জানাল তপু। তার দিকে ওঠানো নিতুর হাত ততক্ষণে কোলের উপরে নেমে গেছে। ১৮ বাড়ির সামনে নিচের তলার শিহাব সাহেব দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিতুকে রিক্সা থেকে নামতে দেখে জানতে চাইলেন, “গলির মাথার দিকে তওসিফকে দেখেছেন নাকি? ওর মা তো চিন্তায় অস্থির। এই ভরদুপুরে স্কুল থেকে এসে ছেলেটা গেল কই?” “দেখিনি তো! বলেই নিতুর মনে হয় সে আসলে রাস্তার এদিকে ওদিকে ভালো করে দেখেইনি।

বোধ হয় চুপচাপ শূন্য দৃষ্টিতে কিছু একটা ভাবছিল। তাই আবার সংশোধন করে বলে, না, মানে আমি অত ভালো করে খেয়াল করিনি। টি অ্যান্ড টি মাঠে এই রোদেই কিছু ছেলে মনে হয় ফুটবল খেলছে। তার মধ্যে থাকতে পারে।” “যাই তাহলে এগিয়ে গিয়ে একটু দেখে আসি।” নিতু বাসায় গিয়ে দেখল তওসিফ দীপের সাথে খেলছে। যদিও বয়সে সে দীপের চেয়ে অনেক বড় কিন্তু মাঝে মধ্যে ভালোই জমে তাদের খেলা। তওসিফকে ডেকে বলল, “মাকে বলে আসনি কেন বাবা? মা তো চিন্তা করছেন আর বাবা সামনের মাঠে চলে গেছেন তোমাকে খুঁজতে।

যাওতো দৌঁড়ে গিয়ে মাকে একটু বলে আসো তো দেখি-” কে শোনে কার কথা! দীপের আর তওসিফের কাল্পনিক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা তখন তুঙ্গে। থামার অবকাশ নেই। ‘আরেকটু’, ‘আরেকটু’ করে করে তওসিফ হাতে প্লাস্টিকের বন্দুক নিয়ে ‘ঠিস ঠিস’ শব্দ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল দীপের দিকে। নিতু হাতমুখ ধুতে চলে গেল, ফিরে এসে দেখল তওসিফ তখনও যায়নি। তাই নিজেই নিচতলায় তওসিফের মাকে খবর দিতে চলে গেল সে। দরজায় বেল দিতেই হন্তদন্ত হয়ে তওসিফের মা বেরিয়ে আসলেন। নিতুর কাছে ছেলের কথা শুনে আস্বস্ত হন। তিনি ভেতরে চলে গেলে নিতু উপরের সিঁড়িতে পা দেয়ার আগেই শিহাব সাহেব চলে আসেন। মুখ শুকনো তার, বলেন, “মাঠে তো তওসিফকে পেলাম না।”

নিতু হাসে, বলে, “আরে ভাই, ঠান্ডা হন, ছেলে তো বিল্ডিং-এর ভেতরেই আছে, আপনি খামাখা বাইরে খোঁজাখুঁজি করছেন।” “তাই নাকি? কই?” “আমাদের ওখানে, দীপের সাথে খেলছে।” “কেমন দুষ্টু, উপরে যাবে যখন বলে যাবে না? কী যে হয়েছে আজকালকার বাচ্চারা।” নিতু হেসে বলে, “বাচ্চারা সবকালেই এমন। আমরা যখন বাচ্চা ছিলাম, কী এমন ভালো ছিলাম বলুন! শোনেন, একবার হয়েছে কী, আমার দাদির পুরোনো আলমারির লম্বা তাকের ভেতরে শুয়ে খেলতে খেলতে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপর ঘণ্টা তিনেক পুরো পাড়া খোঁজাখুজির পরে রিক্সায় করে হারানো বিজ্ঞপ্তি দেয়ার আয়োজন করছিলেন আমার বাবা।

বিজ্ঞপ্তি লেখার কাজ শেষ, রিক্সা মাত্র রওনা দেবে। ঘোষকের সাথে যাবে আমার ভাই, হাতে আমার ছবি। দাদি কোনো একটা দরকারে তখন ভেজানো আলমারির ডালা খুলেছিলেন, দেখেন নিচের তাকে খেলনা বুকে নিয়ে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছি। ছোট্টকালের গাঢ় ঘুম, বাসাভরা মানুষের, চেঁচামেচি, ছোটাছুটি, কোনো কিছুতেই ভাঙেনি। এদিকে সবাই চিন্তায় অস্থির। কতজনে কতকিছু ভেবেছে, আমার মা তো ধরেই নিয়েছিলেন ছেলেধরা ধরে নিয়ে গেছে। কেঁদেকেটে একবারে যা-তা অবস্থা। আমাকে পেয়েই দাদি হৈ হৈ করে সবাইকে ডেকে আনলেন তার ঘরে। পাড়া উপচে মানুষ ততক্ষণে আমাদের বাসায়। একটা শোকের মাতম শুরু হয়েছিল আর কী।

আড়মোড়া ভেঙে আমি দেখি আলমারির সামনে অর্ধবৃত্তাকারে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সবার চোখ স্থির আমার দিকে, কারও মুখে কোনো কথা নেই। মুহূর্তের মধ্যে শোক কেটে গিয়ে হাসাহাসির হিড়িক পড়ে গেল। শুধু মানুষের বৃত্ত ঠেলে মা ছুটে এসে আমাকে কোলে নিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বুঝলেন তো, আমাদের সময় আমরাও কি কম জ্বালিয়েছি বাবা-মাকে?” নিতুর গল্প শুনে হেসে উঠলেন শিহাব সাহেব। বললেন, “যা বুঝলাম, আপনি ছোটকালে ভালোই যন্ত্রণা দিয়েছেন।” নিতুও হাসে, “চিন্তা করবেন না, খেলা শেষ হলেই তওসিফ চলে আসবে।

আমি পাঠিয়ে দেব সোজা বাসায়।” যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই সিঁড়িঘরের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বাদল। তখনই এসেছে বলে মনে হয় না, স্থির দাঁড়িয়ে, রাগ আর বিরক্তি মুখে। শিহাব সাহেব বাদলকে দেখে বলেন, “কী খবর ভাই আজ এত তাড়াতাড়ি?” বাদল নির্লিপ্ত চোখে তার দিকে একবার তাকিয়েই চোখ ঘুরিয়ে নিলো। নিতুকে আপাদমস্তক লক্ষ করল একবার, বুকটা ঘনঘন ওঠানামা করছিল তার। শিহাব সাহেবের কথার উত্তর না দিয়ে বাদল নিতুকে পাশ কাটিয়ে ধুপধাপ সিঁড়ি ভাঙল। ঘরে গিয়ে অফিসের ব্যাগটা ছুঁড়ে দিলো বিছানায়।

চিৎকার করে ডাকল নিতুকে। নিতু এমনিতেই জানত সে তাকে ডাকবে তাই আগেই অনুসরণ করছিল। তারপর দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলল, “আমি আগে আগে আসাতে প্রবলেম হয়ে গেল নাকি, নিতু?” “মানে?” “খোশগল্পের আড্ডাটা যে ভেঙে গেল!” “কীসের আড্ডা? তওসিফ আমাদের বাসায় আছে, সেটাই বলতে গিয়েছিলাম। না বলে এসেছে, ওনারা খুঁজছিলেন।” “মিথ্যুক তুমি। তোমাদের হাহা হিহি গেটের বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছিল, জানো? ছিঃ এটা একটা ভদ্রলোকের বাড়ি, সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে তুমি একজনের সাথে রঙ্গতামাশা করবে?” “তুমি ভুল বুঝছ, শোনো-” “আর একটা কথাও বলবে না।

আমি ওখানে দাঁড়িয়ে তোমাদের হাসাহাসি শুনিনি মনে করো? ছিঃ যাও এখান থেকে- ইচ্ছে হলে আবার পাড়া বেড়িয়ে আস, বেশরম মাগী কোথাকার!” বাদলের গলা এত চড়ে যাচ্ছিল যে নিতু আর সহ্য করতে পারল না। ছিটকে বেরিয়ে গেল। ওদিক থেকে শাশুড়ি নরম সুরে জানতে চাইলেন, “কী হইল? কী আবার করলা নিতু? বাদলা ক্ষেপল ক্যান?” বসার ঘরের লাগোয়া বারান্দায় নিতু নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল।

বারান্দার এক কোণে সেঁটে গেল সে। সূর্য ডোবার আগে লালচে আকাশের শেষ মাথায় কয়েকটা কাক উড়ে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে মন ভালো করতে চাইল। মন ভালো না হলেও, কিছুক্ষণ পরে ঘুরে গেল অন্যদিকে, দুপুরবেলা আকস্মিক দেখা তপু ভাইয়ের মুখটার কথা মনে হলো। আজকের মুখটার সামনে আগের দেখা চেহারাটা ঝাপসা হয়ে এলো। সেই কথা ভাবাতে কান্না আসার কথা নয় অথচ কেন যেন চোখ ভরে এলো। ঘর থেকে একটা প্রলয়ঙ্করী আওয়াজ ভেসে এলো, “আমি এতক্ষণ হলো অফিস থেকে আসলাম, আমাকে কি কেউ চা-টা দেবে, নাকি?” ওড়নায় চোখ মুছে নিতু দৌঁড়ে রান্নাঘরে দিকে দৌঁড়ে গেল। নিতুর হাতে চা দেখে বাদল আবার শুরু করল, “তোমাদের এই আলাপ-সালাপ প্রতিদিনই চলে নাকি? ওই ব্যাটা প্রফেসর কলেজ ছুটি হয়ে গেলে দুপুরেই ফিরে আসে, না? বাহ্ তারপর সারা বিকেলটা তো পড়েই রইল, জমেছে ভালোই।”

“তুমি খামাখা সন্দেহ করছ।” “চুপ কর, আমি নিজের চোখে তার সাথে তোমাকে ক্যালাতে দেখলাম তারপরও বলছ সন্দেহ? এখানে সন্দেহের কী হলো? যা দেখলাম তাই বলছি।” নিতুর আর কথা বলতে ইচ্ছে হলো না। যত বলবে ততই বিষয়টা বাদলের মাথায় পাখা গজাতে থাকবে। এরকম সময়ে সবচেয়ে ভালো হয় চুপ করে থাকলে। তর্ক করতে গেলে বাদল কী করবে জানত না সে। ওরকম উন্মাদনা তখন নিতুর আর সহ্য হয় না। বাচ্চারা এসব চেঁচামেচিতে ভয় পেতে পারে ভেবেই সে একবারে মুখে তালা লাগিয়ে ফেলত। না শোনার ভান করে থাকলে বাদল একই কথা বারবার বলতে বলতে একসময় এমনিতেই চুপ হয়ে যেত।

আরেকটা সুবিধা হলো নিতু একেবারে চুপ থাকলে, বাদলের মা বাদলের বকবক শুনতে শুনতে ধৈর্য হারিয়ে নিতুর পক্ষে দু’একটা কথা বলতেন। তখন আকস্মিক বাদল কোনো কোনোদিন থেমেও যেত। সেদিনও বাদল থেমে গেলে নিতু বারান্দায় ফিরে গিয়ে মোড়ায় বসল। অন্ধকারের সাথে মিশে গেল তার শরীর। শুধু হাতে ফোনটা নিয়ে কন্টাক্ট লিস্টে তপু ভাইয়ের নম্বরটার উপরে চোখ যাচ্ছিল। ওই নম্বরটা দিয়ে সে কী করবে? সে কি তাকে ফোন করবে? কী বলবে ফোন করে? আমার সাথে দেখা কর তপু ভাই অথবা তপু ভাই জানো, আমি একদম সুখী হতে পারিনি! নিজের ভাবনায় নিজেরই হাসি পাচ্ছিল। এসব কথা এতদিন পরে কেন বলবে সে তাকে? তবে হ্যাঁ, একসময় খুব বলতে ইচ্ছে হয়েছিল। কোনো কোনোদিন মনে হয়েছিল, শুধু তপু ভাইকে সমস্ত বেদনার কথা একবার বলতে পারলেই সব কষ্ট ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানোর মতো বেদনাবিহীন একটা জীবন হয়ে যাবে তার।

তখন সেই ভাবনা আর ছিল না। এখন হাতের মুঠোয় নম্বর থাকতেও ফোন করতে ইচ্ছে করল না। ভালোই হয়েছিল, মানুষের বিতৃষ্ণা সহ্য করার শক্তিতো তার আগেই হয়ে গিয়েছিল, আর তখন নির্ভর করার মতো জায়গা পাশ কাটানোর ক্ষমতাও হয়ে গেছে। তপু ভাইকে ফোন করার চিন্তা একেবারে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল নিতু। সে সপ্তাহের ছুটিতে কী একটা কাজে মন্টু ঢাকায় এলো বিক্রমপুর থেকে, দুদিন থাকবে। নিতু মন্টুর সাথে তেমন কোনো কথাই বলল না বাদলের সামনে। মন্টু জানেই না যে তার কারণে বাদল তড়িঘড়ি ঢাকায় বাসা ভাড়া করে নিতুকে নিয়ে চলে এসেছিল। যতটুকু আতিথেয়তা করার, নিতু করছিল নিঃশব্দে। কিন্তু সন্ধ্যায় চা খাওয়ার সময়ে বারান্দায় মন্টু উপস্থিত। “ভাবী দেখি ঢাকায় আইসা খুব গম্ভীর হইয়া গেছ!” নিতু মন্টুর কথায় কোনো মন্তব্য করেনি।

হেসে বলল,“নতুন বাড়িটা কেমন বললে না তো?” “একবার আসো না বেড়াইতে। বাড়ি আর নতুন কই, পুরান হইয়া গেল তোমাদের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে।” নিতু না বসতে বললেও মোড়া টেনে বসল মন্টু। বলল, “আসো ভাবী একবার, খুব বেড়াব আমরা। পদ্মায় পিকনিক মনে আছে? এবার যাব তোমার বাচ্চাগুলানরে নিয়া। রিনা-মিনা তোমার কথা খুব বলে। এবারই আসার জন্য জেদ করতেছিল। আমি আবার এমন এক কাজ নিয়া আসলাম, কতদিন লাগে ঠিক নাই। ঢাকার বাইরেও এদিকওদিক যাইতে হইতে পারে। বললাম, পরের বার তোদের নিয়া যাব।” “আমারও ওদের খুব দেখতে ইচ্ছে করে মন্টু, আনো একবার তাদের।

দেখি, দীপ আর ইনানি আরেকটু বড় হলে যাব মাকে নিয়ে।” নিতু অপেক্ষা করছিল কখন মন্টুর কাপের চা শেষ হয়, তাহলেই সে কাপ ধোয়ার ছলে কেটে পড়বে। অন্ধকার হয়ে আসছিল, বাদল সেখানে এসে বেফাঁস কিছু বলে ফেললে লজ্জায় নিতু মরে যেত। চা শেষ হতেই মন্টুর হাত থেকে কাপ-পিরিচ ছিনিয়ে নিতু রান্নাঘরের দিকে দৌড় লাগাল। শোবার ঘরের দিকে যাবার সময় বুঝতে পারল মন্টু তখনও বারান্দায়। হয়তো ভাবছে ভাবী ফেরত আসবে, কিংবা হয়তো সিগারেট খাবে। তবে নিতু জানত মন্টু ডাকার আগে তার নিজের ঘরে চলে যাওয়াই ভালো। ঘরে বাদল বিছানায় আধশোয়া হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল। নিতু আসাতে মনে হয় মুখটা প্রসন্ন হলো।

নিতু এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা দীপ আর ইনানীর খেলনা গোচছাচ্ছিল। বাদল শান্তভাবে বলল, “নিতু, দরজা বন্ধ করে এদিকে আসো তো-” নিতু জানত ওটা ঝড়ের পূর্বাভাস। বাসায় অতিথি তাই ঝামেলা এড়াতেই বাদলের কথামতো আস্তে আস্তে দরজা লাগিয়ে বিছানায় এসে বসল। বাদল নিতুর মসৃণ হাতের উপরে আলতো করে হাত বোলায় আর ঠোঁট বিস্তৃত করে কুৎসিত হাসি ফুটিয়ে বলে, “তোমার মনটা আজ খুব ভালো, না নিতু? বহুদিন পরে দেখা হলো।” “কার সাথে?” “কার সাথে বোঝ না? তোমার পুরোনো প্রেম, মন্টু! আমার চেয়ে অনেক সুন্দর করে কথা বলতে পারে, তাই না? কী কথা বলছিল এতক্ষণ বারান্দায় অন্ধকারের মধ্যে? তোমার এই হাতটা ধরেছিল? যাও ধুয়ে আসো।”

জোরে একটা খামচি দিয়ে হাতটা ছুঁড়ে দিলো বাদল। নিতুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, অস্থির হয়ে বলল, “কেন এসব অদ্ভুত কথা বলছ বাদল? মন্টু কেন আমার হাত ধরবে? তার সাথে আমি বাড়ির কথা বলছিলাম আর কিছুই না, বিশ্বাস কর।” “বাড়ির কথা বলার জন্য সন্ধ্যার পরে চায়ের ছল করে বারান্দায় গিয়ে বসতে হয়, না? আমাকে অত বোকা ভাব? যাও হাত ধুয়ে আসো।” বাদলের শেষ কথাটা এতই উচ্চস্বরে যে নিতু ভয় পেয়ে গেল, মন্টুর কানে না পৌঁছায়! তাড়াতাড়ি উঠে যেই বাথরুমের দিকে যাবে, বাদল হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “শুধু হাত ধোবে না, দশ মিনিটের মধ্যে গোসল শেষ করে এখানে আসো।” নিতু দম দেয়া পুতুলের মতো আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে বাথরুমে চলে গেল।

গোসলের পরে বাথরমের দরজা থেকেই হ্যাচকা টানে বাদল তাকে বিছানায় আনল। ভয়ঙ্কর আক্রোশে নিতুর কাপড় টেনে-ছিঁড়ে খুলে ফেলল। নিতু কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল, “অনেক হয়েছে, দু-দুটো বাচ্চা হয়ে গেছে আমাদের, এবারে তো নিজেকে শুধরাও!” নিতুর মুখের উপরে শক্ত হাত চাপা দিয়ে দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলল, “তোমার কি আজ রাতটা মন্টুর সাথে থাকতে ইচ্ছে করে?…. বলছ না কেন, করে নাকি?” নিতুর মুখে বাদলের হাতের চাপে ঠোঁটের উপরে আঙুলগুলো বসে গেল। বাদলের নখ দিয়ে নিতু দাঁতের মাড়িতে খোঁচা খেতে থাকল।

বাদল মুখ চেপে না ধরলেও এরকম নোংরা কথার সে কোনো জবাব দিত না। রাতের খাবারের পরে নিতু আর মন্টুর দিকে তাকায়নি। বসার ঘরের মেঝেতে মশারি টাঙিয়ে বিছানা করে দেয়ার সময়ে মন্টু শুধু খুব নিচু গলায় জানতে চেয়েছিল, “ভাবী তোমার কী হইছে?” উত্তরে নিতু সামান্য হেসে জবাব দিয়েছিল, “কী আবার হবে? তোমাকে দেখে রিনা-মিনাদের কথা খুব মনে পড়ল মন্টু। আর কিছু না। তুমি ঘুমাও।” চিন্তিত মন্টুর চোখ স্থির ছিল নিতুর মুখের উপরে, বিষণ্ন চোখের নিচের অর্ধবৃত্তকার ছাইরঙ।

সেটা লুকাতেই মন্টুকে বলেছিল, “বাকি দুইটা দড়ি তুমি লাগাও তো ভাই, আমি হাতে পাব না বোধ হয়।” তারপর তাড়াতাড়ি চলে এসেছিল নিজের ঘরে। সারা সপ্তাহ নিতু মোবাইল ফোনের মনিটরে তপুর ফোন নম্বরটার দিকে কতবার যে তাকিয়েছিল! শুধু তাকিয়েই থেকেছে কিন্তু একবারও সবুজ বাটনে আঙুল রাখেনি। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছিল, কেন করবে ফোন তাকে? কী লাভ এতদিন পরে এভাবে নিজেকে সুযোগ দিয়ে? কিন্তু সেদিন রাতে বাদলের নাক ডাকার শব্দ শুনতে শুনতে কেন যেন আবার নম্বরটা দেখতে ইচ্ছে হলো। পাশ ফিরে ফোনের মনিটরে তাকিয়ে থাকল। মনে মনে ভাবল, শুধু কাল সকালের অপেক্ষা। কিন্তু ফোন করে কী বলবে জানত না। একসাথে হাজার কথা উগরে আসবে, কোনটা আগে আর কোনটা পরে বলবে? নাকি কোনোটাই বলবে না। এই মুহূর্তে শুধু একটা বাক্য মাথায় আসে, তপু ভাই আমি আর পারছি না, বাদল আমাকে- কথাটা শেষ হয় না।

চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে বালিশে। বালিশটা এমনিতেই ভেজা ছিল, ভেজা চুলসমেত বাদল তাকে এই বালিশের উপরে ঠেসে ধরেছিল সন্ধ্যার পরপর। তপু ভাইকে ফোন করার ছেলেমানুষীর কথা ভেবে আরও কান্না পায়, এসব নালিশ সে তপু ভাইয়ের কাছে কেন করবে? তার চেয়ে রাতভর ভেজা বালিশকে আরও খানিকটা ভিজিয়ে নালিশ জানানো যাক। সকালে দীপকে স্কুলে দিয়ে পরদিন আর কিছুতেই বাসায় ফিরতে ইচ্ছে হয়নি নিতুর। মনে হয় এমন কোথাও যাক যেখানে প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারে। ফোন নম্বরটার কাছে শেষ পর্যন্ত হার স্বীকার করল।

ওপাশে তপু ‘হ্যালো হ্যালো’ করতে থাকল। এদিকে চুপ বলে আরও জোরে ‘হ্যালো’ বলতে থাকল। তারপর ধীর লয়ে নিতু বলল, “ভালো আছ তপু ভাই?” “ও নিতু? এত্তদিন পরে ফোন করলে? আমি ভালো, তোমার খবর কী?” “তুমি কোথায়?” “এই তো বাইরে থেকে বাসায় ফিরছি। তুমি?” “তুমি কি ব্যস্ত? মানে আমি আসি?” “আসো না! অ্যাড্রেস এসএমএস করে দিচ্ছি, কেমন?” স্কুলের প্যারেন্ট’স রুমে তারপরও অনেকক্ষণ বসে থাকে নিতু। দুটো সত্তা হয়ে গেছে তখন। একটা তাকে ঠেলে পাঠাচ্ছিল এসএমএস আসা ঠিকানায়, আরেকটি বলছে গুমোট সংসারটাতে ঘাড় কুঁজো করে ঢুকে যাও। একসময় ভেতরের দ্বন্দ্বের যন্ত্রণায় ছিটকে রাস্তায় বের হলো। রিক্সায় উঠে বলল, “ধানমন্ডি ছয় নম্বর।” গেটে দারোয়ান করিম ভাইকে আগেই বলা ছিল। অনায়াসে তার দেখিয়ে দেয়া পড়ার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। তপু ভাই টেবিল ল্যাম্পের আলোয় কাগজে মগ্ন দেখে কোনো কথা বলেনি। মানুষ না থাকলেও বাড়িটা গোছানো, কেবল তপু ভাইয়ের কাগজপত্র যত্রতত্র ছড়ানো। চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল নিতু। তপু হঠাৎ চশমার ওপর দিয়ে নিতুকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “এতক্ষণে? আমি তো ভাবলাম আজ আর আসবে না।” নিতু কোনো কথা বলল না, একটু হাসল শুধু।

টেবিলের পাশে একটা সোফায় বসে পড়ল তপু ভাই বসতে বলার আগেই। দিনের পর দিন রাগে-অভিমানে, অনিয়মে তখন মাঝে মাঝেই মাথা ঘুরে উঠত নিতুর। চারদিকে অন্ধকার লাগত কয়েক সেকেন্ড, কোথাও বসে পড়লে তারপর সব ঠিক। তপু বলল, “কিছু হয়েছে নিতু?” “না, ঠিক আছি। তুমি কি ব্যস্ত?” “সামান্য একটু ব্যস্ত নিতু। আর কয়েক মিনিট, অনলাইনে অফিসের একটা কাজ করছিলাম।” তপু কাজ করল আর নিতু তাকিয়ে থাকল তার দিকে। ভাবল নিজের কথা কিছুই বলবে না যা যা বলতে চেয়েছিল। তার নিজস্ব জীবনের নানান অভিজ্ঞতা তপু ভাইয়ের কাছে অবান্তর।

তার চেয়ে ভালো লাগছিল কিছুটা দূর থেকে তাকে দেখা। তাতেই মন ভালো হয়ে যাচ্ছিল। ১৯ বেশিরভাগ দিনেই এমন হতো, তপু কাজ থেকে চোখ উঠিয়ে পাশের সোফায় বসল, “কিছু বলবে নিতু?” নিতু মাথা নিচু করে দুদিকে দোলাত, হাসত। তারপর বাড়িটার নতুন কন্সট্রাকশন কিংবা রাস্তার ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম, এটাসেটা নিয়ে হয়তো তারা কথা বলতে শুরু করল। তপু অ্যামেরিকার কথা বলত। যাওয়ার পর পড়াশোনার সময়টা কতটা কঠিন ছিল, ছোট্ট শহরের সেই বাড়ি আর বন্ধুবান্ধবদের কথা বলত। প্রথম প্রথম নাকি ফিরে আসতে ইচ্ছে করত। প্রথম শীতে মনে হয়েছিল জমেই যাবে বরফের সাথে। তারপর কিছুদিন পরে দেখা গেল, হাত দিয়ে বরফের গোলা বানিয়ে রাস্তায় বরফ ছোঁড়াছুঁড়ি খেলায় ব্যস্ত বাচ্চাদের দিকে ছুঁড়ে মারছে। ওখানকার বাঙালীরা বলল, “কোনো রকমে একটা বছর কাটিয়ে দাও, দেখবে আর যেতে ইচ্ছে করছে না।”

হয়েছিলও তাই। বছর ঘুরতেই মন আর কাঁদেনি। দেশের বাড়ির কথা তখন মনে হতো সুন্দর একটা স্বপ্নের মতো। দূর থেকে প্রিয় জায়গাগুলোর ছবি ভাবতেই ভালো লাগত। যন্ত্রের মতো দিনের পরিশ্রম শেষে বাড়ি ফেরা, লিভিং রুমের কাউচে বসে বন্ধ চোখে ফেলে আসা শহরের চেনা রাস্তায় হাঁটা, সেই হয়ে দাঁড়াল জীবন। নিতু মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে জানতে চেয়েছিল, “আমার কথা কখনও তোমার মনে পড়েনি?” নিতুর প্রশ্ন শুনে গড়গড় করে কথা বলতে থাকা তপু হঠাৎ থমকে গিয়েছিল। নিতু চোখ সরায়নি, আকুল হয়ে তাকিয়ে ছিল মনের মতো একটা উত্তরের আশায়। তপু কথা বলার গতি বদলিয়ে ধীরে ধীরে বলেছিল, “পড়েছিল তো, পড়বে না কেন?” তারপর টেবিলের কাগজপত্র গোছানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। নিজের মনে বলার মতো করে বলেছিল, “মনে তো পড়তই তোমার কথা, কে জানে সংসার কেমন হয়েছে তোমার, বর কেমন হলো, কোথায় থাকো, আমাকে তোমার মনে আছে কি না- এইসব আর কী।”

নিতুর কাছে অবাকই লাগল, যে কথাগুলো সে সেকানে বসে ভেবেছিল, আজ পর্যন্ত একবারও সেসব জানতে চাইল না! কোনো কোনো দিন অভিমান হতো, তপু ভাইয়ের বুঝি তার ব্যাপারে কোনো আগ্রহই নেই, মিছেমিছি বারবার গিয়ে তাকে বিরক্ত করা। আবার কোনোদিন মনে হতো তপু ভাই তাকে দেখলেই সব বুঝে ফেলে. তাই আর কিছুই জানতে চায় না। শুধু কিছুটা সময় মৌন হয়ে তার কাছে গিয়ে বসে থাকা, এটুকুর আশায়ই নিতু প্রায় প্রতিদিন হাজির হতো বাসাটার সামনে।

দারোয়ান করিম ভাইয়ের সাথে ভালো খাতির হয়ে গেল। দেখলেই বলত, “উপরে চইলা যাও গো মা, উপরে আছেন।” নিতুকে দেখে তখনও পাশের কন্সট্রাকশন সাইটের সামনে বসা সিঙাড়াওলার কাছ থেকে নিয়ে আসত গরম গরম সিঙাড়া। গরমের চোটে ঠোঙাটা আনতে গিয়ে হাত বদলাত বারবার। বেশিরভাগ দিনে তপু ভাই চুপচাপ কাজ করত আর নিতু সোফায় বসে ম্যাগাজিন পড়ত। দীপের স্কুল ছুটির সময় হলে নিতু বলত, “তপু ভাই, আসি।” তপু চশমা সরিয়ে জিজ্ঞাসা করত, “ও, যাবে? আচ্ছা যাও।”

কোনোদিন এমনও হতো তপু ভাই বাসায় থাকতও না, পরে আসত, অবাক হয়ে বলত, “ও নিতু, কখন এসেছিলে? আমি তো একটা কাজে আটকে গেলাম আজ” কোনো কোনো দিন তপু ভাই ফেরতও আসত না, নিতু এঘর-ওঘর ঘোরাফেরা করত, নিজের মতো গুনগুনাত, তপুর বোনের ফেলে যাওয়া ম্যাগাজিনের গাট্টি থেকে পুরোনো ম্যাগাজিন ওল্টাত।

এত সহজে বাসাজুড়ে সে বিচরণ করত যেন তার আপন জায়গা। শুধু আপন নয়, যেন একটা লুকানো ঝরনা, প্রতিদিন সেই ঝরনায় আপাদমস্তক ভিজিয়ে শীতল হয়ে, মন জুড়িয়ে তারপর আবার জলন্ত চুল্লীর মতো সংসারে ঝাঁপ দিত। পরদিন আবার আসত গোপন ঝরনার পাশে জিরিয়ে নিতে। একবার রাতে বাদলের তিক্ত ব্যবহারে নাজেহাল হয়ে পড়েছিল নিতু। সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়ে ধুলোয় শুয়ে থাকা বিড়ালের মতো ঝেড়ে ঝেড়ে শরীর থেকে সব বেদনা ঝেড়ে ফেলেছিল।

তারপর আড়মোড়া ভেঙে এক ঝলকে আনকোরা করে ফেলেছিল আত্মা। মানুষের শরীর যতই ঠুনকো হোক, কত বেদনাই না সহ্য করতে পারে! ভেতরে ভেতরে ধ্বসে যায়, ক্ষয়ে যায়, তারপরও একইভাবে চলতে থাকে। বাইরে থেকে কেউ বুঝত না, বুঝবে কী করে? নিজের ভাবনায় হাসে নিতু। তার চকচকে চোখ সবাইকে ধোঁকা দিত। শুধু নিজের কাছে খাবলে খাওয়া শরীরটা নোংরা লাগত। আর আত্মা? আত্মা কি কখনও নোংরা হয় শরীরের মতো? হয় না। নিতু প্রতিদিন তার আত্মার ক্ষয় পূরণ করত, দিনশেষে তাতে আঘাতের কোনো চিহ্ন থাকত না। সেদিনও থাকবে না ভেবেই তপু ভাইয়ের বাসার দিকে রওনা দিয়েছিল। আত্মার আরামের কাছে কিছুই অশোভন লাগত না।

গোপন সেই গন্তব্য তাকে একটুও ভোগাত না, মাঝে মাঝে মনে হতো নিজের সংসার থেকে যতই ধাক্কা খায় ততই যেন তপুর দিকে হেলে পড়ে। সেদিন শখ করে শাড়ি পরেছিল, আকাশের সব রঙে মাখামাখি জর্জেটের শাড়ি। নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল। চোখ আর ঠোঁট সাজানো হলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, তপু ভাই দেখলে কী বলতে পারে, দু’একবার সেটা নিয়েও ভেবেছিল। তপু ভাই তো তাকে শাড়ি পরতেই দেখেনি কখনও, নিশ্চয়ই অবাক হবে, নতুন একটা কোনো মন্তব্য অবশ্যই পাওনা। কিন্তু গিয়ে দেখে সে বাসায়ই নেই।

অন্যদিন সে না থাকলে তত মন খারাপ হতো না, সেদিন হলো। মন খুব খারাপ হলো। এত অভিমান হলো যে মনে হলো, ফোন করে কী লাভ? নিতু কে, যে সে ডাকলেই কোনো কাজ ফেলে ছুটে আসবে তপু? আর তাছাড়া ফোন সে করবেইবা কেন! তপু ভাই কি জানত না, এই সময়ে প্রতিদিনের মতো আসবে নিতু? তবু কেন বাইরে চলে গেল? রাগে-দুঃখে নিতুর হু হু করে কান্না এলো। মনে হলো কী যেন সব বৃথা হয়ে গেছে। করিম ভাই নিতুর মন খারাপ দেখে বলে, “কী গো মা, মনে ব্যথা পাইলেন? চইলা আসবে, উপরে গিয়া বসেন।” নিতু ছুটে চলে গেল তপুর ঘরে, সোফায় আছড়ে পড়ল, কাঁদতে কাঁদতে ফুলে উঠছিল শরীর। নিজেকে বোঝাল তারপর, তপু ভাই তো কোনো কথা দেয়নি, তার কাছে তো এ খবরও নেই যে নিতু আজ পাগলের মতো তাকে দেখতে চাচ্ছিল অথবা নিজেকে দেখাতে চাচ্ছিল! কাঁদতে কাঁদতে একসময় অবসন্ন লাগল, ক্লান্তিতে চোখ বুজে এলো।

তপু এসে দেখল মেঝেতে লুটাচ্ছে নীল আর টরকয়েজ আাঁচল, উল্টো দিকে ফিরে শুয়ে আছে নিতু, ঝরঝরে চুলগুলো মেঝে স্পর্শ করেছে প্রায়। ফ্যানের বাতাসে চুল আর আঁচল থরথর কাঁপছে। ঢালু ব্লাউজের গলায় উন্মুক্ত পিঠ আর কোমর মোমের মতো জমাট, যেন একটু তাপ লাগলেই উবে যাবে। ফ্যানের বাতাসে কোমরের নিচেও ফিনফিনে জর্জেটের শাড়ি এলোমেলো। শাড়ি পরেছিল নিতু! এদিকে মুখটা ফেরালে দেখা যেত কেমন লাগছে। নিতু যেমন মাঝে মাঝে দরজার চৌকাঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, তপু না বলা পর্যন্ত ভেতরে আসত না, শব্দ করত না, তেমনি সেদিন তপু দাঁড়িয়ে ছিল দরজায়, নিতু ফিরে তাকায় না কেন? সে কি ঘুমিয়ে পড়েছে? তপু বুঝতে পারছিল না ডাকবে কি ডাকবে না নিতুকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, নাহ্ বাচ্চার স্কুল ছুটি হতে তখনও ঘন্টা দুয়েক দেরি, ঘুমালে ঘুমাক, হয়তো খুব ক্লান্ত ছিল, হয়তো রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। তপু টু-শব্দ না করে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকল।

নিতুর পায়ের দিকে চোখ আটকে গেল, এমন মসৃণ পা হয় নাকি কারও? শিল্পীরা একাকী রমনীর ছবি আঁকলে হয়তোবা নিতুর পায়ের মতোই পা আঁকবেন। তপু আঁকিয়ে হলে হয়তো ওই দরজায়ই ইজেল নিয়ে শুরু করে দিত। সে নিতুর বিষণ্ন মুখটার দিকেই তাকাত, নিতুর নিশ্চয়ই অনেক দুঃখ, সংসারে হয়তো তার তেমন সুখ হয়নি। ভাবত নিতু নিজে থেকে না বললে সে কি শোনার জন্য জোর করতে পারে? জানতে চাইলে যদি রেগে যায়? যদি আর না আসে? তার চেয়ে সেটাই ভালো ছিল, না জানা।

কিন্তু তখন কেন যেন বিষাদের কারণ জানতে ইচ্ছে করছিল, ইচ্ছে করছিল উন্মুক্ত পিঠে আলতো করে হাত রেখে জানতে চায়, নিতু তোমার কীসের দুঃখ? তোমার মতো মেয়ের তো পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ প্রাপ্য ছিল, তুমি পাওনি? ভাবনার ঘোরে সময় কাটছিল। পাশ ফিরতে গিয়ে নিতু চোখ খুলল, বুঝতে পারল ঘুমিয়ে পড়েছিল, মনে পড়ল সোফায় শুয়ে কাঁদছিল, মাথা ফেরাতেই তপু ভাই দরজায়। লাফিয়ে উঠে অবিন্যস্ত শাড়ি গোছাল, আঁচল ঠিক করল। ফ্যানের বাতাসে বারবার বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছিল দেখে অসহায়ের মতো তপুর দিকে তাকাল বারকয়েক।

তপুর চোখে তখন অন্য কিছু, মায়া-মমতা আর আরও কিছু একটা খেলছে সেই চোখে, যেটা সহ্য করা কঠিন। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হলো দৃষ্টির উত্তাপে নিতু সত্যি মোমের মতো গলে পড়বে। কোনো কথা বলা হয়নি, মনে হলো কোনো কথা নেই এর মধ্যে। তপু বলতে তো পারত, কখন এসেছিলে নিতু? অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলে? কিছুই তো বলল না! নিতু শাড়ি ঠিক করতে করতে তপুকে ঘেঁষে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু একটা হাত আটকে গেল আরেকজনের হাতের মধ্যে। তপু নিতুর হাতটা চট করে ধরে ফেলেছিল, আঙুলগুলো ততক্ষণে ঢুকে গেছে নিতুর আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে, হাতুর তালুগুলো কথা বলছে মুখে মুখ ঘষে। যখন একজন এরকজনের দিকে মুখ ঘোরাল তখন কপালে কপাল ঠেকল, যেন কোনো এক অচেনা আবেগের কাছে নতজানু দুজনে। তারপর এমনভাবে মুখগুলো তুলে ধরল যে এই খেলায় হার মানলে কোনো লজ্জা নেই, কারও কোনো ক্ষতি নেই। নিতুর পাতলা ঠোঁটে যখন তপু তার ঠোঁট ছোঁয়ায় তখন এক মুহূর্ত স্থবির, যেন অনুমতি চায় ঠোঁটজোড়া। নিতু বিস্মিত, এমনও হয় মানুষের ছোঁয়া! স্পর্শ এত শব্দময়! বাদল কবে তার ঠোঁট ছুঁয়েছিল নিতুর মনে নেই। ওভাবে যে ছোঁয়ওনি কখনও তা নিতু হলফ করে বলতে পারত। বছরের পর বছর দুটো শরীরের দুটো অঙ্গই শুধু ব্যবহৃত হয়েছে। শরীরের যে ভাষা প্রকাশিত হয়েছে তা রূঢ়, আবেগহীন।

নিতু নিজেও জানত না যে নিজেরই শরীরে এত আকুলতা জমা হয়ে ছিল, আর ছিল সুযোগের অপেক্ষায়। কোনো এক স্রোতের তোড়ে বেদনারা ভেসে গেল, গ্লানিও জমতে পারল না। মন না জাগলে বুঝি শরীর কখনও জাগতে পারে না, ভেতর থেকে প্রতিধ্বনির মতো কেউ যেন ক্রমাগত বলে যাচ্ছে, ‘সমর্পণ কর…সমর্পণ কর’, আর নিতু সমর্পিত হচ্ছিল অসহ্য সুখের কাছে। তারপর মাসদুয়েক কেটেছিল একটা ঘোরের মধ্যে। নিতুর সামনে কখন কী হচ্ছে, কে কী বলছে, সব সে শুনতে পেত, কেবল তার চিন্তাশক্তি নিজের দখলে ছিল না। চাবি দেয়া পুতুলের মতো ঘরের কাজ করত, বাদলের সব খায়েশ মেটাত আবার সময় হলে ঠিক তপুর সামনে গিয়ে দাঁড়াত।

সেখানে যেন জীবনীশক্তির একটা খনি পেয়েছিল নিতু। মনের মধ্যে কোনো ভয়ও আসেনি যে এই খনি অশেষ নয়, কোনোদিন যাবে ফুরিয়ে। একদিন বাচ্চা খরগোশের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে তপুর বাসায় ঢুকতে গিয়ে দেখল নিচের তলার বসার ঘরে রিয়েল এস্টেট কোম্পানির লোকজনের সাথে মিটিং চলছে তপুর, কাগজপত্র সই করানো হচ্ছে।

তারা চলে গেলে ভেতরে এসে তপু বলল, “হয়ে গেল, নিতু!” “কী?” “অ্যাগ্রিমেন্ট। দুই মাস পরে বাসা ভাঙা শুরু হবে। আড়াই বছর পরে অ্যাপার্টমেন্টগুলো হ্যান্ডওভার করবে। ছয়টা আমাদের, বাকিগুলো তাদের।” তপুকে নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছিল, চুক্তিতে লাভের দিকেই আছে হয়তো। “তাহলে, তুমি কবে চলে যাচ্ছ?” নিতুর প্রশ্নে যেন তপুর খেয়াল হলো, “হ্যাঁ যাব, দেখি- সাত-আট মাস পরে হয়তো একবার আসব কাজ দেখতে। ভাবছি যাওয়ার আগে একবার দেশের বাড়ি ঘুরে যাই।

কেউ নেই, তবু একটু যাই, আর কখনও যাওয়া হয় কি না! তুমিও যাবে নিতু? চলো না, সেই দীঘিটা এখনও তেমন আছে নাকি দেখে আসি?” “এতদিনে ইচ্ছে হলো সেখানে যেতে?” নিতুর চোখ লুকাতে মুখ নামিয়ে নিলো। তপু পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আর যদি বলি, চিরকালের জন্য আমার সাথে চলো, যাবে?” আকস্মিক পুরো পৃথিবীটা অন্যরকম লাগল নিতুর কাছে। কোথাও কেউ নেই, যেন একা সে দাঁড়িয়ে আছে জনমানবহীন কোনো বিস্তীর্ণ চরাচরে, সামনের মাঠ জুড়ে ন্যাপিয়ার ঘাসে কী ভীষণ বাতাসের আলোড়ন! সেই সবুজ ঢেউয়ের মতো মনের ভেতরে ভাবনাটা আলোড়িত হলো, তপু ভাই শুধু তার কাছে নয়, একেবারে পাশে ডাকছে নিতুকে! দিগন্তের রেখার কাছে দাঁড়িয়ে অস্পষ্ট তপু হাতছানি দিয়ে ডাকছিল, বলছিল, যাবে নিতু আমার সাথে? বাতাসের তোড়ে তপুর মুখ থেকে ‘যাবে…’ শব্দটা বেরিয়েই ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল। তবু নিতু শোনার জন্য আকুল, উর্ধ্বশ্বাসে প্রবাহের উল্টোদিকে হাওয়া চিরে চিরে তপুর দিকে ছুটে যাচ্ছিল- দূর, আরও দূর কোথাও থেকে শব্দ ভেঙে ভেঙে ভেসে আসছিল, ‘যাবে-এ-এ-এ?’ “কী হলো নিতু? বলো, আমি যদি সব ব্যবস্থা করি, যাবে আমার সাথে?” তাকে ঘোর থেকে বের করে আনল তপুর প্রশ্ন।

কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে নিতু বলল, “যাবো।” বহু দিনের প্রত্যাশিত প্রশ্নের সযত্নে লালিত উত্তরটা মুক্তি পেল নিতুর ঠোঁটে- এ যেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামান্য দূরে সেই পদ্ম দীঘি যাওয়া, তপু ভাই জানতে চাইল যাবে কি না আর নিতু রাজি হয়ে গেল! সেই আনন্দেই একসময় নিতু বাসায় চলে এলো। এতই আনন্দ যে পড়–ক না কেন কোনো জলন্ত চুলায়, দেখে চারদিকে কোনো কষ্ট নেই! যে যতই চেষ্টা করুক না কেন, কোনোভাবে নিতুকে কষ্ট দিতে পারবে না। নিতু তখন থেকে চিরসুখী। সব ভালো লাগল তার, যা দেখছিল সব। অফিসফেরত বাদলের টুকটাক চেঁচামেচিও কানে যায়নি, অদ্ভুত এক টানে নিতু চারপাশের সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় একটা ফোনে কান পাততেই হলো।

আপার ফোন। তার কথা এমন জড়িয়ে যাচ্ছিল যে কিছুই ঠিকমতো বোঝা গেল না। হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে আপা কী একটা যেন বলতে চাচ্ছিল। বহুবার জিজ্ঞাসা করেও উদ্ধার করতে পারল না নিতু, কেবল একটি কথা শেষে স্পষ্ট হলো, “নিতু রে, ভাইয়া আর নেই।” ২০ মফস্বল শহরে এক দলের বড় নেতাকে আরেক দলের ছেলেরা গুলি করে বা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে, এর মধ্যে নতুনত্বের কিছু ছিল না।

এসব খবরে শহরে তেমন কোনো গ-গোলও হয়নি। যে শুনেছে সে-ই ‘আহা রে আহা রে’ করেছে কিন্তু অবাক হয়নি। এমনকী নিতুর বাবা পর্যন্ত নাকি খবরটা শোনার পর শান্ত স্বরে বলেছিলেন, “আমি জানতাম এমন হবে। বলেছিলাম না, এদের হাতেই এদের মৃত্যু লেখা থাকে!” তারপর অবশ্য বহুক্ষণ তিনি অন্যমনস্ক হয়ে ছিলেন, কোনো কথাও বলতে দেখা যায়নি তাকে। পরে ভেঙে পড়েছেন ভেতরে ভেতরে, যদিও নিজের অসহায় ভাব লুকাতে নিতু আসার আগপর্যন্ত তিনি সফল হয়েছেন। নিতু খবর পেয়েই বাচ্চাদের নিয়ে নাইট কোচে চড়ে বসল। বাস ছাড়ার পরে মনে পড়ল তপু বলেছিল সে যাবে ছোট্ট শহরটায় ঘুরে আসতে, নিতুকেও বলেছিল যেতে।

নিতু ভেবেছিল তার যাওয়া হবে না, বাদলকে বোঝানোর জন্য কোনো উপলক্ষ্য তৈরি করা কঠিন হবে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে উপলক্ষ্য তৈরিও হয়ে গেল। নিজেকে ধাতস্ত করার পরে তপুকে ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ জানাল সে। ভোরবেলা বাড়িতে পৌঁছে দেখল কান্নার রোল, মা আর চাচির দিকে তাকানো যায় না। তাদের দেখে নিতু নিজের মধ্যে ফিরে এলো, যেন অনেকদিনের গন্তব্যবিহীন নৌকা বাতাসের ঠেলায় ভাসতে ভাসতে তীরে এসে ভিড়ল। প্রজাপতির মতো উড়ছিল। ভাইয়ের মৃত্যুতে বাসার সবাইকে বিপন্ন দেখে হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ল। সবাই যখন থেকে থেকে রিংকুর কথা বলে ডুকরে কাঁদে , তখন নিতুও পারল না নিজেকে ধরে রাখতে। একই ঘটনা বারবার শুনছিল, আগের দিন রাতে রিংকু বাসায় ফেরেনি, তারপর সারাদিনও কোনো খোঁজ ছিল না। রিংকুর দু’চারদিন বাসায় না ফেরাটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, তাই কেউ গা করেনি।

বিকেলের দিকে ঈদগাহ মাঠের শেষ মাথায় পুকুর পাড়ের তালগাছের নিচে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। চাচা জেনে এসেছিলেন প্রথমে। দলের কয়েকজন ছেলে গল্পটা শুনিয়েছিল তাকে। তালগাছের গুঁড়িকে বালিশ বানিয়ে মাথা রাখা ছিল সেখানে। প্রথমে তাকে শুইয়ে তারপর গুলি করা হয়েছে, তাই নিশ্চয়ই একের বেশি মানুষ ছিল আততায়ী, বলতে বলতে কেঁদেও ফেলেছিল দু’একজন পাতিনেতা।

বড় নেতার মৃত্যুর খবর শুনে দৌঁড়ে গিয়েছিল তারা। লাশের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা মদের গন্ধই বলে দিচ্ছিল যে মৃত্যুকে ঠেকানোর মতো যথেষ্ট সবল হয়তো ছিল না সে। শিষ্যরা রাগে-দুঃখে গরগর করছিল, বলছিল, “সারা গায়ে কাটাছেঁড়া, রক্ত চারদিকে, মাথায় গুলি- মারবেই যখন একবারে গুলি করতে পারত, কিন্তু করে নাই। অনেক ভোগাইছে মারার আগে।” আরেকজন নতুন কিছু আবিষ্কারের মতো করে বলল, “এতকিছুর পরেও ভাইয়ের চোখ কিন্তু খোলা ছিল, সে দেখছে কে তারে মারছে, সে নিশ্চয়ই তারে চিনত!” কেউ বলল প্রতিদ্বন্দ্বী পার্টির লোকেরাই তাকে মেরেছে, কেউ আবার বলল নিজেদের পার্টির লোকেরাও মারতে পারে, একজনকে সরিয়েই আরেকজন ওপরে উঠবে, এটাই নিয়ম। ছোটখাট খেকে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র চলতে থাকে এসব পলিটিকাল পার্টির ভেতরে, অতীতে রিংকুও কি নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে নিজেরই পার্টির লোককে খুন করায়নি? সেরকম প্রকাশ্য গোপন ব্যবস্থার কথা কে না জানে! একটা মৃত্যুতে কারও না কারও তো লাভ হয়ই। পুলিশ কিছুই বলতে পারল না।

পুলিশের কী? একটা রাজনৈতিক নেতার লাশ, ‘রাজনৈতিক হত্যাকা-’ লেবেল লাগিয়ে পেপারে রিপোর্ট লিখতে সাহায্য করা পুলিশের জন্য সহজ। সবাই তো জানতই রিংকুর অনেক শত্রু ছিল, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পার্টির মধ্যে রিংকুকে মারার মোটিভ ছিল- এরকম অন্তত পঞ্চাশ জনকে পুলিশ এখনই লাইনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু কথা হলো, পুলিশ কি তখন ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় করবে? এভাবে মশা-মাছির মতো কোনোদিন যে মরতে হবে, তা শুধু সবাই কেন, রিংকু নিজেও জানত। সবাই এ-ও জানত যে হয় মরবে না হয় অনেক বড় নেতা হয়ে যাবে, এর মাঝামাঝি কিছু হওয়ার কথা ছিল না। এরকম মানুষ হলে হয় ক্ষমতাধর না-হয় ক্ষমতা কেড়ে নেয়া অসহায়, যাকে যে পায় সে-ই ল্যাং মারে।

এতকিছুর পরেও সবাই জানত না কেবল একটি ব্যাপার। রিংকু মারা যাওয়ার পরের দিন একটি মেয়ে এসে উপস্থিত হলো বাসায়। নিতু আর ঋতুকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করল। দেখতে-শুনতে চমৎকার, ছোট শহরের নামকরা পরিবারের বাচ্চা মেয়েটিকে রিংকু কী করে পটিয়ে ফেলেছিল তা ভেবে সবাই অবাক, কয়েকদিনের মধ্যে নাকি তারা বিয়েও করত। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটি ফিট হয়ে যেতে লাগল বারবার। তার অবস্থা দেখে ঋতু আর নিতু নিজেদের সামলে নিলো। নিজেদের মধ্যে তারা বলাবলি করছিল, “ভালোই হয়েছে, এই মেয়েটিকে বিয়ে করার আগেই ভাইয়া মরে গেছে। এর জীবনটা তো বাঁচল!” নিতুর বাবা টিভিতে খবর দেখার সময়ে যে চেয়ারে বসেন, সেখানে দিনরাত বসে ঝিমাচ্ছিলেন। কারও সাথে কোনো কথা বলেননি। রিটায়ারমেন্টের পরে এমনিতেও তিনি চুপচাপ হয়ে গেছেন, রিংকুর টাকাকে আর পাপের টাকা বলতেন না। সংসার দেখতে একইরকম থাকলেও, চলত যে রিংকুরই টাকায় সেটা তখন তার কাছে ছিল স্বাভাবিক। রিংকুর মৃত্যুর পরে শুভাকাক্সক্ষী মানুষজন এলেন, সান্ত¦না দিলেন তারা। যাবার সময়ে সবাই বলে গেলেন, “কী আর করবেন, আল্লাহ্ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।”

যাদের রিংকুর উপরে বেশি রাগ ছিল তারা আক্ষেপ করে বললেন, “কোথায় এখন তার বয়স্ক বাবা-মাকে দেখাশোনা করার সময় এসেছিলো, তা না তরতাজা একটা ছেলে কীভাবে জীবনটা নষ্ট করল!” রিংকুর বাবা সবার কথায়ই মাথা নাড়লেন। শুনতে শুনতে একসময় হাত ওপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙতেন যেন সামনের মানুষটি বুঝতে পারেন যে তিনি তখন ক্লান্ত। বুদ্ধিমান হলে উঠে চলে যেতেন, কেউ আবার আরও দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কথা চালিয়েই যেতে থাকেন। রিংকু খুন হয়েছিল ঠিকই, তবে সবার বক্তব্যের সারকথা ছিল এটাই যে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী যদি কেউ হয়ে থাকে তবে একমাত্র সে নিজে। সেই শোকের বাড়ির মাতমের মধ্যে খুনের তিন দিন পরে তপু এসে প্রথমেই পড়ল নিতুর বাবার সামনে।

হঠাৎ পাথরে প্রাণ পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটল। তপুকে দেখে নিতুর বাবা অস্থির হয়ে উঠলেন, “আরে তুমি! আসো আসো,” নিজেই উঠে চেয়ার টেনে দিলেন সামনে, “তুমি এতদিন পরে কোত্থেকে এলে, বাবা?” তপুর সাথে চলল তার লম্বা আলাপ, “রিংকুর জন্য যত বন্ধুবান্ধব আসছে বাড়িতে, সব ওই তার রাজনৈতিক দলের চ্যালাচামু-, বুঝলে? তাদের দেখলেও আমার মনে হয় এক-একটা রিংকু। বেয়াড়া আর বেয়াদব। তোমাদের মতো যারা তার আগের বন্ধু ছিল সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কেউ তাকে পছন্দ করত না, তো আজ আমাদের কাছে আসবে কেন? একমাত্র তুমিই এলে!” নিতু তপুর গলা শুনে বেরিয়ে এলো।

এমন করে তাকাল তার দিকে যেন দেখছে বহুকাল পরে- তাই তো! ওই সময়ের মধ্যে কত কী হয়ে গেল, কত মানুষের আনাগোনা বাসায়, কত কথা, নিতুর মন থেকে তপু রোদেলা আকাশের তারার মতো হাওয়া হয়ে গিয়েছিল, হয়তো ছিল কিন্তু ঠিক ঠাহর করতে পারেনি। এ ক’দিনে তেমনও মনে হয়নি একবারও যেমন গত কিছুদিন ধরে মনে হতো, মনে হতো চারদিকে প্রজাপতি নাচছে, ভ্রমর গুনগুনাচ্ছে, অপূর্ব বেহালা বাজছে ক্ষীণ স্বরে। তপু নিতুকে দেখার আগেই বাবা বললেন, “আয় মা, বস। দেখ তপু এসেছে, এতদিন পরে আমেরিকা থেকে এলো। যা চা নিয়ে আয় ওর জন্য।” চা বানিয়ে এনে দেখল বাবা তার দুঃখের কাহিনী শোনাচ্ছেন তপুকে- “ছেলে তো রইল না, তপু।

ভেবেছিলাম তোমাদের মতো পড়াশোনা শিখে ভালোমানুষ হবে। তারপর দেখলে তো কী হলো। তোমাদের চোখের সামনেই তো হলো যা হবার, কাকে দোষ দেব? সব আমার কপাল, পারলাম না ছেলেকে মানুষ করতে। বড় মেয়েটা ভোগালেও এখন সে তার সংসারে সুখে আছে। তাকে দেখলে খুব ভালো লাগে, শান্তি পাই, শেষটা তো তার ভালো হয়েছে! আর এই যে দেখছ নিতুকে, এর মতো একটা মেয়ে থাকলে সব ব্যথা ভুলে যাওয়া যায়, বুঝলে? এ হচ্ছে আমার রত্ন, সারাজীবন কখনও আমার কথার অবাধ্য হয়নি।

কোনোদিন হবেও না, আমি জানি, হলফ করে বলতে পারি, নিতু কোনোদিনই এমন কিছু করবে না যা আমাকে লজ্জায় ফেলে। এখন এই একটা সান্ত¦না নিয়েই আমি আর নিতুর মা বেঁচে থাকব। মানুষ অন্তত নিতুকে দেখে বলতে পারবে যে আমরা নেহায়েত খারাপ অভিভাবক ছিলাম না।” নিতু হাতের চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাবার কথাগুলো কানে সুচের মতো বিঁধছিল, অসংখ্য সুচ, সারা শরীরে যেন তীব্রবেগে রক্ত চলাচল শুরু করল, ঝিঝি ধরে গেল হাতে-পায়ে। নিতু চায়ের কাপ হাতে তুলতে পারবে না আবার ওখান থেকে উঠে চলেও যেতে পারবে না, ঠায় বসে বাবার কথায় সুচের গুঁতো খাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তখন তার। কোনোরকমে তপুর দিকে তাকায়, তপুও চোরা চোখে তার দিকে, বিব্রত সে দৃষ্টি, দেখা যায় না বেশিক্ষণ, যেন আকস্মিক কোনো চোরাগোপ্তা পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেল।

তার মধ্যে সিঁড়িতে ধুপধাপ শব্দে নেমে এলো ইনানি, নিতুর গা ঘেঁষে দাঁড়াল, তপুর চোখ আটকে গেল ইনানির দিকে। মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “এ কী, এ তো দেখি একেবারে ছোট্ট নিতু!” ইনানি অচেনা মানুষকে তার সম্পর্কে বলতে শুনে মায়ের পেছনে লুকাল, পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরল মায়ের। মুখের সামনে তার ছোট্ট ছোট্ট হাতে চুমু খেতে লাগল নিতু। তপু স্বর্গীয় দৃশ্য দেখার মতো তাকিয়ে থাকল সেদিকে। নিতুর কনুইয়ে মুখ ঘষছিল ইনানি। নিতু কনুইটা সামান্য সরিয়ে নিয়ে আদরের সুরে বলল, “ইনানি, আবার?” তারপর তপুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার কনুইয়ের মধ্যে মুখ না ঘষে এই বাচ্চাটা থাকতে পারে না, বুঝলে? রাতে এরকম না করলে ওর ঘুমই আসে না!” ইনানি লজ্জা পেয়ে আবার মায়ের পেছনে লুকাল। তপু আত্মভোলা হয়ে জানতে চাইল, “তোমার বর আসেনি নিতু?” “না, আসতে পারল না।” বাসায়ও সবাইকে নিতু বলেছিল বাদল ছুটি পাচ্ছে না। বাদলকে আসার কথা বলাতেই সে ক্ষেপে গিয়ে বলেছিল, “একটা রাজনৈতিক গুন্ডা খুন হয়েছে, তার জন্য শোক করতে আমাকে যেতে হবে নাকি? আমার এ ধরনের আত্মীয়-স্বজন আছে সেটা তো মানুষকে বলাও যায় না। যাও গিয়ে বলো আমার ছুটি নেই।” নিতু তাকে আর অনুরোধ করেনি।

যাবার সময়ে নিতু সেই আগের মতো গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল তপুকে। কিন্তু কিছুই যেন আর আগের মতো নেই। দুজনের চিন্তায়ই অন্য কিছু ঘুরছিল, কোথাও যেন একটা তার ছিঁড়ে গেছে, সুরটা আর তেমন মধুর লাগছিল না। কল্পনার মেঘের ওপর থেকে একটা কিছু যেন তাদের দুজনকে আকস্মিক ছুঁড়ে ফেলেছে শক্ত মাটিতে, দুমড়ে মুচড়ে পড়ে, আঘাতের ব্যথার জ্বালায় মুখে তাদের কোনো কথা নেই। শুধু অন্তরে কথাগুলো এসে এসে ফিরে গেল। চোখে চোখে কথা হলো, কানে বাজল না, শুধু অনুভূতিতে শোনা গেল সে কথা- “সেই তো এলে এখানে,” মনে মনে বলল নিতু। আর জানল তপু বলছে, “পদ্মদীঘিতে যাবে, নিতু? বাড়িতে বলে এসেছ?” “এখন কী করে যাই তপু ভাই? এ জনমে আমার তোমার সাথে পদ্মদীঘিতে আর যাওয়া হলো না।” “জীবন এমন কেন, নিতু?” “জীবন তো এমনই, এটাই তো বাস্তবতা।

তুমি তো বরাবরই জানতে, তাই যেদিন শুনেছ আমি বিয়ে হয়ে চলে যাচ্ছি সেদিন আমাকে পদ্মদীঘিতে নেয়ার জন্য জেদ করনি। পরেও আমার দিকে আর কই হাত বাড়িয়েছ? আমিই তো ছিলাম অবুঝ, আমিই ফিরে ফিরে গেছি তোমার কাছে- পরিবার আছে, সমাজ আছে, বুঝতে পারিনি। এসবকিছুর কাছে নিজস্ব আনন্দ কত তুচ্ছ্ব!” “কিন্তু নিজস্ব আনন্দ চাওয়া কি অন্যায়?” “খুব স্বার্থরের মতো চাওয়া এটা, খুব স্বার্থপরের মতো।” গেটে দাঁড়িয়ে তপু যেই ঘুরে তাকাল, নিতুর মাথার ভেতরে কথোপকথন বন্ধ হয়ে গেল।

শুধু একবার চোখাচোখি, তারপরই মুখ ফিরিয়ে নিলো তপু। গলার কাছে কান্নার ঠেলায় মাথা নুয়ে আসছিল। কান্নাটাকে আটকে রাখল, বেরিয়ে আসতে দেয়নি। অবশ্য কাঁদলেও কোনো অসুবিধা ছিল না, কেউ দেখলে ভাবত ভাইয়ের জন্য কাঁদছে, ভাইয়ের পুরোনো বন্ধুকে দেখে হয়তো তার কথা বেশি করে মনে পড়েছে। কিন্তু তবু কেন যেন নিতুর মনে ভয় ত্রাসের মতো ঘোরে ফেরে, সবাই যেন তার ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে, সে যেন স্বচ্ছ, এই বুঝি ধরা পড়ে গেল! তাই ক্লান্ত হাতের ধাক্কায় গেট এগিয়ে গেল অমীমাংসিত অধ্যায় সমাপ্ত করতে। সে রাতে মাথা ধরা নিয়ে ঘুমাতে গেল নিতু। কিছু পরে ঘরে তখন উথালপাতাল বাতাস, শনশন আওয়াজের মধ্যে যেন কিছুই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না।

কিন্তু বোঝা গেল ইনানি ‘মা, মা’ বলে ডাকছে। নিতু হাজার চেষ্টা করেও কেন যেন জবাব দিতে পারছিল না। বাচ্চাটা পাগলের মতো ডেকেই যাচ্ছিল। তার মাঝখানে আবার নষ্ট হয়ে যাওয়া ছেলের জন্য দুঃশ্চিন্তা করতে করতে চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া চেহারা নিয়ে বাবা আকস্মিক প্রশান্তির হাসি হেসে বললেন, “নিতু, মা রে, তুই আমার আদর্শ মেয়ে!” আরও জোরে হেসে হেসে বললেন, “এই দেখ তপু, এই নিতুই আমার একমাত্র ভরসা।” বাবার মুখের কথা হাসি বিকট শব্দে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে ফিরে আসছিল। নিতুর কান ফেটে যাচ্ছিল, কানে হাত চাপা দিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল, সবার কাছ থেকে দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করছিল।

এতজনের হয়ে তাকেই কেন শুধু ভালো থাকতে হবে? এটা কেমন কথা হলো! কিন্তু কেন যেন হাতটা কান পর্যন্ত উঠতে পারল না। অসহায়ের মতো সেই প্রশান্তির হাসি আর নিজেকে দেয়া বাবার সান্ত¦নার কথাগুলো শুনে যেতে হলো অবিরাম। বাতাসের শনশন শব্দের সাথে আরেকটা তা-বের মতো আওয়াজ এলো, “যাবে নিতু? যাবে?” আওয়াজটা ধীরে ধীরে কী ভীষণ মধুর হয়ে যায়, মনে হয় হ্যামিলনের বাঁশিওলা! নিতুর ইচ্ছে করল ইঁদুরের মতো তার পেছনে পেছনে গর্তে গিয়ে ঝাঁপ দেয়, মরলেও ক্ষতি নেই। সম্মেহিত নিতু যেন বাঁশির সুরের মতো ‘যাবে-’ ‘যাবে-’ শব্দের পেছনে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। হঠাৎ চমকে উঠল ক্রূর একটা হাসির শব্দে, নাহ্, এটা কিছুতেই ওই বাঁশিওলার হতে পারে না! তাহলে কার? পেছনে ফিরে বাদলের ক্রুদ্ধ চোখদুটো দেখতে পেল, দেখল, রাগে চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, আর তার এক হাতে নিষ্ঠুরভাবে ঝুলছে ইনানি, ক্রমাগত ‘মা মা’ করে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। বাঁশির মায়া ছেড়ে হুড়মুড় করে উল্টোদিকে ছুটতে গিয়ে নিতু নিজেকে পেল বিছানায়, সারা শরীর ঘামে ভেজা, লাফিয়ে উঠে বসল বিছানায়।

কালবৈশাখী ঝড়ের এলোমেলো বাতাস ঘরজুড়ে। বিদ্যুৎ চমকানোতে পাশে ইনানি আর দীপের ঘুমন্ত মুখগুলো এক ঝলক দেখতে পেল। অতিরিক্ত গরম দেখে জানালা খুলে ঘুমিয়ে পড়েছিল রাতে, তখন বাতাসের ঠেলায় কপাট খুলছে আর ফিরে এসে সশব্দে চৌকাঠে আঘাত করছে। বাতাসের সাথে দু’চার ফোটা বৃষ্টি এসে পায়ে পড়তেই নিতু কপাট লাগাল। তারপর মধ্যরাতে জানালার শিক ধরে বসে থাকল বৃষ্টির ছাটে ভিজে যাওয়া বিছানার ধারটাতে। আর একটুও কান্না পায়নি, শুধু পিপাসায় গলা শুকিয়ে এলো।

সেখানে যে ক’দিন নিতু ছিল, তপু আর আসেনি, কথাও হয়নি আর। ঢাকায় ফিরে এসে কিছুদিন পরে ফোন করেছিল তপু। বলেছিল, “চলে যাচ্ছি নিতু। তোমার সাথে কি একবার দেখাও হবে না? একটাবার আসো না!” তাই আজ নিতুকে যেতে হয়েছিল, সে কিছুতেই মানা করতে পারেনি, হয়তো ব্যথা ভাগাভাগি করে নিতে চেয়েছিল।

নিতু তার নিজের কথা বলছিল, “আমি অত সাহসী নই, আমি কখনও বিদ্রোহ করতে শিখিনি।” সে জানত তপু দুর্বল নয় কিন্তু ছিনিয়ে নেয়ার রুচি সবার থাকে না। কথা যা বলার বলেছিল নিতুই, তারপর ‘কথা শেষ’ ঘোষণাও সে-ই দিয়েছিল। তবে ‘শেষ’ বললেই কি আর শেষ হয় সবকিছু? নিঝুম রাতের একাকিত্বে নিতুর কি তপুর কথা মনে পড়বে না? সে তো জানবেই যে পৃথিবীর উল্টোপিঠে কেউ একজন তার কথা ভেবে কোনো এক মুহূর্তে অন্যমনস্ক হয়, হয়তো না চাইতেও কিছুক্ষণ অতীতে হাঁটে।

ফেরার সময় তপু বলেছিল, “সারাজীবন তোমার ভাগে কেবল কষ্টই পড়ল, নিতু!” নিতুর তখন কিছু বলতে ইচ্ছে হয়নি। মধ্যরাতে বিছানায় এখন বাদল উল্টো দিকে ফিরে ঘুমাচ্ছে- এখন তপুর কথার পিঠে ইচ্ছে মতো কথা বলা যায়। ছাদের দিকে চোখ মেলে মনে মনে বলে, “কে বলল কেবল কষ্ট, সুখ ছিল না? হোক না সে ক্ষণস্থায়ী, এই যে ক’দিন তুমি কানায় কানায় ভরিয়ে রেখেছিলে, সে তো আমারই ভাগে পড়ল।

একটা জীবন পার করতে এর চেয়ে বেশি কী লাগে?” নিঃশব্দ নিঃশ্বাস ফেলে তপুর কণ্ঠস্বরে উত্তরটা সাজাতে থাকে নিতু।



(পরের সংবাদ) »



মন্তব্য চালু নেই