মেইন ম্যেনু

পৃথিবীর বিস্ময়কর পাঁচ বিদ্যালয়

বিদ্যালয় কেমন হয়? ভাবছেন এটা আবার জিজ্ঞেস করার কি হলো? বিদ্যালয় তো বিদ্যালয়ের মতনই হয়। যেখানে শিক্ষক থাকেন। থাকে শিক্ষার্থী। ঘর থাকে, চেয়ার আর বেঞ্চ থাকে। থাকে খেলার মাঠ আর শিশুদের কোলাহল। কিন্তু এসব তো আর দশটা সাধারণ বিদ্যালয়ের কথা।

এমন কোনো বিদ্যালয়ের কথা কি শুনেছেন যেখানে মাটিতে নয়, পড়ানো হয় পানির ওপরে আর শিক্ষার্থীরা সেখানে আসে নৌকায় চড়ে? কিংবা এমন কোনো বিদ্যালয়, যেখানে থরে থরে সাজানো রয়েছে বই আর বই? পাহাড়ের ওপরে বছরের পর বছর ধরে নির্মাণাধীন অবস্থায় থাকা কোনো বিদ্যালয়ও নিশ্চয় এখনো পর্যন্ত চোখে পড়েনি আপনার? ভাবছেন, সত্যিই কি এমন বিদ্যালয় রয়েছে পৃথিবীতে? হ্যাঁ! আছে। আর পৃথিবীর বুকে থাকা এমনই কিছু অদ্ভুত আর সুন্দর বিদ্যালয় নিয়েই আজকের এই আয়োজন।

ভাসমান বিদ্যালয়

কেমন হতো ভাবুন তো, যদি বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি-ঘোড়া ব্যবহার না করে নৌকা ব্যবহার করা হতো? কেমন হতো যদি বিদ্যালয় মাটিতে না থেকে থাকত পানির ওপরে, ভাসমান অবস্থায়? অবাক হচ্ছেন? তবে অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্যি যে সাধারণত সব বিদ্যালয় মাটির ওপরে শক্তভাবে গেঁথে থাকলেও পৃথিবীতে এমন বিদ্যালয়ও রয়েছে যেগুলোর অবস্থান পানির ওপরে। মাটির দৃঢ়তা নয়, বরং পানির ঢেউ দুলতে থাকে যেগুলোর ভিত। আর এমনই এক ভাসমান বিদ্যালয় হচ্ছে মাকোকোর ভাসমান বিদ্যালয়। যদিও শখ নয়, প্রয়োজনীয়তা থেকেই তৈরি করা হয়েছে মাকোকোর এই বিদ্যালয়কে, বর্তমানে সবার কাছেই অপূর্ব এক সৌন্দর্যের উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এটি। মাকোকোর বাচ্চাদের জন্য স্কুলটি তৈরি করেছেন এনএলই স্থাপনাকারীরা। যা দিন দিন নাইজেরিয়ার দিকে পৃথিবীর দৃষ্টিকে টেনে নিচ্ছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও পৃথিবীর এ বিদ্যালয়টি দেশটিকে নিয়ে গেছে অন্য রকম এক উচ্চতায়।

তবে মাকোকোর এই বিদ্যালয়টিই শুধু নয়। পৃথিবীতে আরো কিছু ভাসমান বিদ্যালয় রয়েছে। আশ্চর্য আর নতুন হলেও সত্যি যে এমন ভাসমান বিদ্যালয় রয়েছে বাংলাদেশেও। তবে সেটা বছরব্যাপী কোনো বিদ্যালয় নয়। নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় খানিকটা বৃষ্টিপাতেই পানির তলায় ডুবে যায় বাংলাদেশের কিছু স্থান। ঘর-বাড়ির সঙ্গে ডুবে যায় বিদ্যালয়গুলোও। থেমে যায় পড়াশোনা। আর এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতেই এক অসাধারণ ব্যবস্থা করে দিয়েছে শিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা নামের অলাভজনক সংগঠনটি। তারা পানিবন্দি মানুষগুলোকে সাহায্য করতে ভাসমান ঘর, হাসপাতালের পাশাপাশি তৈরি করেছে ভাসমান স্কুলও। অনন্য এই বিদ্যালয়গুলো বছরে দুবার নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। এই কার্যক্রমের আওতায় পরিচালিত হয় প্রায় ১০০টি নৌকা। যার প্রতিটিতেই রয়েছে সূর্যশক্তিকে ব্যবহার করে চলার ক্ষমতাসহ ইন্টারনেট, ল্যাপটপ ও গ্রন্থাগারের সুবিধা। অন্য বিদ্যালয়গুলো বছরের এই দুর্যোগপূর্ণ সময়টাতে বন্ধ হয়ে গেলেই কেবল চালু হয় এই ব্যতিক্রমী বিদ্যালয়গুলোর কাজ। এ ক্ষেত্রে নদীর পাশে থাকা বিভিন্ন স্থান থেকে এরা ছাত্র নির্বাচন করে এবং একটা নির্দিষ্ট স্থানে থেমে ক্লাস পরিচালনা করে। আবার ক্লাস শেষ হলে ঠিক যেখান থেকে ছাত্রদের তুলে নিয়ে আসা হয়েছিল সেখানেই ফিরিয়ে দিয়ে আসে। ২০০২ সালে চালু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষার্থীকে নিজেদের সেবা দিয়েছে স্কুলটি।

বইয়ে ঘেরা বিদ্যালয়

বিদ্যালয়ে বই তো থাকবেই। কিন্তু তাই বলে এতটা? যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতন বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যার চিত্রটা কেবল কল্পনাতেই আসা সম্ভব। ভাবুন তো এমন এক স্থানের কথা যেখানে লম্বা একটা হাঁটার জায়গা। আপনি হেঁটে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেন। পথ শেষ হচ্ছে না। সেই সঙ্গে শেষ হচ্ছে না পথের পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বইয়ের তাকও।

এমনটা আপনি পাবেন ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে গেলেই। তবে শুধু ট্রিনিটিতেই নয়, বই আর শিক্ষার অবাধ এক রাজ্য আপনি পাবেন মাগডালান কলেজেও। নির্মাণের সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগারের সংগ্রাহগার নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

দুর্গম পাহাড়েও স্কুল

খুব বেশি দূরের কথা নয়, বিদ্যালয়টি আমাদের পাশেই। ভারতের লাদাখে। ড্রাক হোয়াইট লোটাস স্কুল নামে পরিচিত বিদ্যালয়টি ১৫ বছর ধরে রয়েছে নির্মাণাধীন। অরুপ অ্যাসোসিয়েটের তৈরি ডিজাইন অনুসারে নির্মিত হওয়া এই বিদ্যালয়টির মূল লক্ষ্য পাহাড়ের ওপরে বিদ্যালয়ের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের আরো একটু ভালোভাবে শিক্ষার কাছে নিয়ে যাওয়া। তাদেরক সব ধরনের সমস্যা আর প্রতিকূলতার পাশ কাটিয়ে বাইরের পৃথিবীর কাছে নিয়ে যাওয়া। এর সঙ্গে রয়েছে বিদ্যালয়টিতে সেখানকার টিবেটিয়ান সংস্কৃতিরও একটা গভীর ছাপ। বর্তমানে নির্মাণাধীন থাকা সত্ত্বেও পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সেখানকার স্থানীয়সহ পৃথিবীর সবার কাছেই।

তবে এটাই কিন্তু প্রথম কোনো পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত বিদ্যালয় নয়। এর আগেও চীনে এমন একটি বিদ্যালয় করার চেষ্টা করা হয়। এবং অনেক অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করে সেটা সফলও হয়। চীনের শিনচুন রাজ্যের হানিয়ুন প্রদেশে অবস্থিত খুব ছোট্ট একটি গ্রামের নাম গুলু। যেখানে ঢোকার কেবল একটি রাস্তাই রয়েছে। আর তাও লোওমা ওয়ের ছোটখাটো অনেকগুলো সেতু আর বাঁকে ভর্তি পাথর ভরা সরু রাস্তা। আর এখানকারই এক পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা বিদ্যালয়ের নাম হচ্ছে গুলু প্রাথমিক বিদ্যালয়। আশি শতকের শেষদিকে নির্মিত এই বিদ্যালয়টিতে কেবল একজন মাত্রই শিক্ষক ছিলেন। আর তিনি হলেন শেন ওইজুন। আঠারো বছর বয়সে শেন এই গ্রামে আসেন। সে সময় স্কুলটির খুব করুণ দশা ছিল এবং হঠাৎ করেই তখন একটি ছেলে পাহাড়ের ওপর বিদ্যালয়ের বাথরুম করতে গিয়ে পাহাড় থেকে পড়ে যায়। বেশ শোরগোল পড়ে ব্যাপারটা নিয়ে। বিদ্যালয়ের জন্য একটি বাথরুম তৈরি করার প্রস্তাব ওঠে এবং গ্রামবাসীরা সেটা তৈরি করে দেয়। শুধু তাই নয়, সে সময় বাথরুমের সঙ্গে আরো কিছু উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় বিদ্যালয়টিতে। বাস্কেটবল খেলার জন্যও একটি আলাদা জায়গা করে দেওয়া হয়।

ভবিষ্যতের বিদ্যালয়

ভবিষ্যতের বিদ্যালয়! সেটা আবার কি? তবে কি সেটা বর্তমানে নেই, এমন কিছু? না না অন্য সব স্কুলের মতো এই বিদ্যালয়টির অবস্থান বর্তমানেই। তবে এর কাজটা ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করেই। ২০০৬ সালে পশ্চিম ফিলাডেলফিয়াতে ভবিষ্যতের বিদ্যালয় নামক এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে অন্য সব বিদ্যালয়ের মতন বই-খাতা নয়, শিক্ষার্থীদেরকে পড়ানো হয় আর পরিচিত করিয়ে দেওয়া হয় ল্যাপটপ, ইন্টারনেট ও আধুনিক নানা রকম প্রযুক্তির সঙ্গে। বইয়ের বদলে কম্পিউটার, অঙ্কের বদলে ওয়ান নোট, নোট টেকিং অ্যাপ, সাধারণ বোর্ডের বদলে কম্পিউটার পরিচালিত বিশেষ বোর্ড ব্যবহার করা হয়। পরিচয়পত্রের মাধ্যমে খুলতে সক্ষম লকার ব্যবহার করে এখানকার শিক্ষার্থীরা।

এত চমৎকার বিদ্যালয়টি প্রথমেই বেশ ভালোরকম সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। আর প্রধান সমস্যাটি ছিল নেতার অভাব। শিক্ষার্থীরাও খুব একটা ভালো প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল না। তবে খুব দ্রুতই এই সমস্যা কেটে যায়। যদিও প্রথম দিকে খুব একটা যন্ত্রপাতি ছিল না এবং এর অনুদানও কম ছিল। দ্রুত অঙ্কে বেশ ভালো ফলাফল করে সবাইকে চমকে দেয় এখানকার শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া অন্য সব বিষয়ে ভালো ফলাফল করে বের হওয়ার পরপরই বেশ ভালো চাকরি পেয়ে যাওয়া স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে এখানকার শিক্ষার্থীদের কাছে। সাধারণভাবে গ্রেড গণনা না করা এই বিদ্যালয়ের ফলাফল পরিমাপের মাপকাঠি হচ্ছে অ্যাডভান্সড থেকে নট অন দ্য রাডার এর ভেতরে। বিদ্যালয়ের সময়টাও অন্যান্য বিদ্যালয়ের চেয়ে খানিকটা আলাদা। অনেকটা অফিসের মতন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা।

যা-ইচ্ছে-তাই বিদ্যালয়

ব্রুকলিনের এই মুক্ত বিদ্যালয় দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি ৪ থেকে ১১ বছর বয়সিদের জন্যে। অন্যটি ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের। এখানে কোনো নির্দিষ্ট সূচি নেই। শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেখানে খুশি, যেই শ্রেণিতে ইচ্ছে এসে পড়াশোনা করবার অধিকার রাখে। কেবল তাই নয়, কেউ যদি বেরিয়ে যেতে চায় বা পড়তে না চায় তাহলে সেই ব্যবস্থাও রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, শিক্ষকেরা নয়, এখানে শিক্ষার্থীরাই বিদ্যালয়ের নিয়ম তৈরি করে। কারো হয়তো পড়তে ইচ্ছে করছে, কারো ঘুমোতে বা খেলতে। কেউ দল বেঁধে পড়তে চায়, তো কেউ একা একা। কেউ অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে পড়তে চায়, তো কেউ একটা বিষয়ই পড়তে চায়। এর পুরোটাই কেবল এবং কেবলই শিক্ষার্থীর ওপর নির্ভর করবে। এখানে কোনো ক্লাস হয়তো টেলিভিশনের ওপর, কোনটা কোন রেস্টুরেন্টের খাবার ভালো, সেটার ওপর। আর এসব পাঠ্যসূচি আর নিয়ম তৈরি করার জন্য প্রায়ই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। এখানে না আছে কোনো গ্রেড, না ফলাফল, না পরীক্ষা। কোনো শিক্ষার্থী চাইলেই এখানে একটা মিটিং ডাকতে পারে। পাল্টে দিতে পারে বিদ্যালয়ের নিয়ম।

বিদ্যালয়ের ক্লাসগুলো শিক্ষার্থীরাই পরিচালনা করে। শিক্ষকরা কেবল সেটাকে ঠিকঠাক করে নেন। দেখিয়ে দেন। বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের মতে, এখানকার বাচ্চারা তাদের ইচ্ছেমতো পড়ে। তবে কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি না থাকায় প্রায়ই সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় বিদ্যালয়টিকে।






মন্তব্য চালু নেই