মেইন ম্যেনু

রাণীনগরে বেদেনা চাষের উজ্জল সম্ভাবনা

পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে যাওয়ার আশংকা

কাজী আনিছুর রহমান, রাণীনগর (নওগাঁ): দেশের উত্তর জনপদের ধান উৎপাদনের জেলা নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় অন্যান্য কৃষি ফসলের পাশাপাশি মুখরোচক রসালো ফল বেদেনা চাষের উজ্জল সম্ভাবনা থাকা সত্বেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নওগাঁ জেলার একমাত্র কৃষকের বেদেনা চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। এর পরও বেশি লাভের আশায় বানিজ্যিক ভাবে বেদেনা চাষ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন উপজেলার শিয়ালা গ্রামের শিক্ষিত যুবক একেএম শফিকুল ইসলাম রবু (৪৮)।

১৯৮৯ সালে ডিগ্রী পরীক্ষায় উর্ত্তীন্ন হতে না পেরে কিছুটা হতাশায় পরিবারের লোকজনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রথমে তিনি পেঁপে, করলা, ঢেঁড়শের আবাদ শুরু করলেও আবহাওয়া অনুকূলে না থাকা ও স্থানীয় কৃষি বিভাগের প্রত্যক্ষ পরামর্শ ও সহযোগীতার অভাবে বানিজ্যিক ভাবে সে সফল হতে না পেরে ২০১৩ সালে তার বড় ভাই প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের পরামর্শে তাদের পৈত্রিক ২বিঘা জমিতে প্রায় ২লক্ষ ১৫হাজার টাকা ব্যায়ে মাটি ভরাট করে বেদেনা ও আঙ্গুর চাষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

জানা গেছে, উপজেলার একডালা ইউনিয়নের শিয়ালা গ্রামের মৃত-সায়েদার রহমানের তৃতীয় ছেলে একেএম শফিকুল ইসলাম রবু (৪৮)। পড়ালেখা পুরোপুরি শেষ করতে না পারলেও ১৯৯২ সালে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু সংসার জীবনে বেকারত্বের অভিশাপের বেড়াজালে কঠিন এক মহুর্তে নিজ ইচ্ছায় ৯৬ সালে প্রতারক এক আদম ব্যাপারির খপ্পরে পড়ে মালোয়েশিয়ায় পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে।

প্রায় ৬মাস ধরে মানব পাচার দালাল চক্রের প্রভাবশালী সদস্যরা থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আটকে রেখে পুণরায় অতিরিক্ত টাকার দাবি করলে সেটাও পরিষদ করে কোনো ভাবে মালোয়েশিয়ায় পৌঁছলেও অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে আতœগোপনে থাকা অবস্থায় অনেক চেষ্টা করে উপযুক্ত কাজকর্ম হাতে না পেয়ে আর্থিক তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা তার ভাগ্যে জোটেনি।

খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্টের এক পর্যায়ে দেড় বছরের মাথায় দেশে ফিরতে হয়েছে তার। এর পর সংসার জীবনে আবারও অন্ধকার। পারিবারিক পরামর্শে ২০০০সালের দিকে নিজের দু’টি পুকুর ও অন্যের দু’টি পুকুর ১লক্ষ টাকায় লীজ নিয়ে মাছ চাষের মধ্য দিয়ে ভাগ্য বদলের চেষ্টায় মাছ চাষসহ পুকুরের পার্শ্বের জমিতে পেঁপে, ঢেঁড়শ, করলা নানা জাতের শাকসবজি ও বগুড়ায় প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবসা শুরু করে।

প্রায় এক দশক ধরে লাভ-লছের মধ্যে দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ব্যবসা চললেও বিধির বাম সেগুলোতেও সফলতা না পেয়ে উল্টো তার বড় অংকের লোকসান গুনতে হয়। জীবনের সফলতা না পেলেও হতাশায় তাকে দেবে রাখতে পারেনি। শফিকুল ইসলাম জানান, ২০১৩ সালে আমার বড় ভাই প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের পরামর্শে পুণঃরায় জীবনের শেষ ঝুঁকি হিসেবে পৈত্রিক ২ বিঘা জমিতে বেদেনা চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করি। সেই লক্ষ্যে প্রথমে বগুড়া থেকে ভালো মানের বেদেনা নিয়ে চারা করার জন্য একই গ্রামের নার্সারী ব্যবসায়ী বাদশার শ্মরণাপন্ন হয়ে বেদেনা গাছের চারা তৈরি করে জমিতে লাগানো শুরু করি।

গাছের বয়স সাড়ে তিন বছরের মাথায় ফুল আসলেও বাগানে নিজেসহ মাঝে মধ্যে দিন হাজিরায় ৫/৬জন শ্রমিক নিয়ে নিবিড় পরিচর্যা শুরু করেন। বৃষ্টি বাদল এবং নানান রোগ বালায়ের কারণে কিছু গাছ হলুদ বর্ণ হয়ে মরতে শুরু করায় অন্যান্য ভালো গাছে পরিমাণ মতো ফল না আসায় স্থানীয় কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কারিগরি পরামর্শে কীটনাশক প্রয়োগ করার ফলে বাগানের অবস্থা কিছুটা উন্নতি হওয়ায় গাছের ডালে ডালে লাল রংঙ্গের রসালো বেদেনার শোভা পাচ্ছে। তবে কৃষি বিভাগের উন্নত পরামর্শ ও সঠিক রোগ নির্নয়ের অভাবে প্রয়োজনীয় কীটনাশক প্রয়োগ করতে না পারায় ফলন বিপর্যয়ের আশংকা করছেন উদ্দমী কৃষক শফিকুল।

কষ্টের বিষয় এইযে, টাকা শ্রম সব কিছু বিনিয়োগ করে শুরু থেকে এপর্যন্ত মাত্র চার কেজি বেদেনা ২০০টাকা কেজি দরে বিক্রি করে মাত্র ৮০০টাকা পকেটে তুলেছি। তিনি আরো জানান, কৃষি বিভাগের লোকজনের বেদেনা চাষের ভালো অভিজ্ঞতা না থাকায় আমি সঠিক পরামর্শ পাচ্ছিনা। বর্তমানে আমার বাগানের যে অবস্থা এই এলাকায় বেদেনা চাষের উজ্জল সম্ভাবনা থাকলেও উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।

রাণীনগর কৃষি অফিসের একডালা ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিমাই চন্দ্র প্রামানিক জানান, আমি প্রায় দেড় বছর ধরে বানিজ্যিক ভিত্তিতে বেদেনা চাষী শফিকুল ইসলামকে কৃষি বিষয়ক পরামর্শ দিয়ে আসছি। আবহাওয়াগত কারণে বাগানের কিছু গাছ ক্ষতি হলেও সার্বিক ভাবে বেদেনা বাগানের অবস্থা ভালো।

রাণীনগর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ বলেন, আমার এলাকা শিয়ালা গ্রামে বেদেনার চাষ করছে উদ্দোমি কৃষক শফিকুল ইসলাম। তার বাগানে আমি নিজে গিয়েছি। তার প্রচেষ্টা দেখে আমাকে খুব ভালো লেগেছে। তবে তার কারিগরি কোন প্রশিক্ষন না থাকায় বেদেনার বাগান রোগ বালাই মুক্ত হচ্ছেনা বলে তিনি জানালেও আমি কৃষি কর্মকর্তার সাথে কথা বলে তাকে কি ধরণের সহযোগীতা দেওয়া যায় তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।






মন্তব্য চালু নেই