মেইন ম্যেনু

‘পে-স্কেল চূড়ান্ত হতে আরো দেরি হবে’

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল সহসা চূড়ান্ত হচ্ছে না। নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত করতে জটিলতার কারণ জানা না গেলেও এটি চূড়ান্ত হতে আরো দুই থেকে তিন মাস লেগে যেতে পারে। আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে পে-স্কেল চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

সম্প্রতি নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত হওয়া নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তবে তিনি বলেন, নতুন পে-স্কেল যখনই চূড়ান্ত হোক তা জুলাই থেকেই কার্যকর হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পে-কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সেটি সচিব কমিটির মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছিল। সচিব কমিটি তাদের সুপারিশসহ ফেরত পাঠিয়েছে। এটি এখন আমার কাছে আছে।’

তিনি বলেন, ‘পে-স্কেলের সুপারিশ এখন পর্যালোচনা হচ্ছে। এটি চূড়ান্ত করতে একটু সময় লাগছে। হয়ত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে। পর্যালোচনা শেষে সুপারিশসহ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। এর আগে তার সঙ্গে আলোচনা করব। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ হয়ে তা জাতীয় সংসদে যাবে। আমি আগেও বলেছি, আবারো বলছি, নতুন পে-স্কেল যখনই চূড়ান্ত হোক তা জুলাই থেকেই কার্যকর হবে।’

সচিব কমিটির সুপারিশের পর পে-স্কেল চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা আছে কি না বা নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে মূল্যস্ফীতির আশংকা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো জটিলতা নেই। পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর আগে যেসব পে-স্কেল হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নেও দেরি হয়েছে। নানা বিষয় থাকে সেগুলো অ্যাডজাস্ট করতে হয়। এ জন্য কিছু সময় লাগছে। এ ছাড়া কোনো জটিলতা নেই। আর নতুন পে-স্কেল মূল্যস্ফীতির কোনো কারণ হবে বলে আমি মনে করি না।’

সচিব কমিটি যে সুপারিশ করেছে, সেগুলোতে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘না, সচিব কমিটি যে সুপারিশ করেছে, তাতে তেমন কোনো পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি না।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে উঠাতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড দেওয়া না হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। আর এ নিয়েই জটিলতা দেখা দিয়েছে। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড থাকবে কি না, সে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত করবেন বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সিলেকশন গ্রেডের মাধ্যমে উন্নীত হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের সম্মানিত বোধ করতেন। এ ব্যবস্থা উঠিয়ে দেওয়া হলে তাদের সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে। বিষয়টি সরকারের জন্য বিব্রতকর সিদ্ধান্ত হবে। যারা এমন সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে প্ররোচিত করছে, তারা সরকারের ভাল চাচ্ছে না। পে-স্কেলে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড থাকছে না, এমন সংবাদ প্রচার হওয়ার পর থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। অর্থমন্ত্রী আশ্বাসও দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত যদি সত্যি সিলেকশন গ্রেড বাদ দেওয়া হয়, তাহলে তা হবে দুঃখজনক।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘টাকার অঙ্ককে ভিত্তি ধরে অর্থ মন্ত্রণালয় সিলেকশন গ্রেডকে বাতিলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সিলেকশন গ্রেড না পেলেও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টে টাকার পরিমাণ বাড়বে, কিন্তু বেতন স্কেলের গ্রেড উন্নতি থেকে বঞ্চিত হতে হবে। কেননা নতুন নিয়মে প্রমোশন ছাড়া ঊর্ধ্বতন গ্রেডে যাওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হচ্ছে না। কিন্তু এই সুযোগটি সিলেকশন গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করত। এতে কর্মকতা-কর্মচারীরা সব দিক থেকে লাভবান হতো।’

সরকারি চাকরিজীবীদের মাসিক বেতন সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন আট হাজার ২৫০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে পে-কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য গঠিত সচিব কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে বেতনের ধাপ বা স্কেল ২০টিই বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

ড. ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে জাতীয় বেতন ও চাকরি কমিশনের প্রতিবেদনে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড তুলে দেওয়ার পক্ষে সুপারিশ করা হয়েছিল। জানা গেছে, ফরাস উদ্দিন নেতৃত্বে পে-কমিশন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের বেতন মাসিক এক লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেছিলেন। সচিব কমিটি তা কমিয়ে ৯০ হাজার করার প্রস্তাব করেছে।

একইভাবে কমিশন সিনিয়র সচিবদের মাসিক বেতন নির্ধারিত ৮৮ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছিল, সচিব কমিটি তা প্রস্তাব করেছে ৮৪ হাজার টাকা। সচিবদের বেতন প্রস্তাব করেছে ৭৮ হাজার টাকা। ফার্স্ট গ্রেডের বেতন হবে ৭৫ হাজার টাকা। এখানে ফার্স্ট গ্রেডের হিসেবে বিভাগীয় প্রধানদের বিবেচনা করা হবে। এটি নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। পঞ্চম গ্রেডের বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৩ হাজার টাকা। ষষ্ঠ গ্রেডের করা হয়েছে ৩৬ হাজার টাকা। ৪-৫ গ্রেডের (এন্ট্রি লেভেল) বেতন হবে ২২ হাজার টাকা। ১৯তম গ্রেডের বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে আট হাজার ৫০০ টাকা। ২০তম গ্রেডের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে আট ২৫০ টাকা। এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবীরা বাংলা নববর্ষে একটি উৎসব ভাতা পাবেন বলে সচিব কমিটি প্রস্তাব করেছে, যা কি না বেসিক বা মূল বেতনের সমতুল্য হবে।

নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের (প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন বাহিনী ও উন্নয়ন প্রকল্পে থাকা জনবল) শুধু বর্ধিত বেতন দিতেই ব্যয় করতে হবে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর পাশাপাশি ভাতা দেওয়া হলে তার জন্য ব্যয় হবে আরো ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসেবে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে অর্থ বিভাগের এক সূত্র জানায়।

সচিব কমিটি দুই ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। আগামী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বর্ধিত মূল বেতন এবং দ্বিতীয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বর্ধিত ভাতা দেওয়ার কথা বলেছে। পে-কমিশন তাদের সুপারিশে সরকারি চাকরিজীবীদের বিদ্যমান ২০ গ্রেডের পরিবর্তে ১৬ গ্রেড করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এর মধ্যে প্রথম গ্রেডে বিদ্যমান বেতন ৪০ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৮০ হাজার টাকা (নির্ধারিত) করার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় গ্রেডে ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৭০ হাজার টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ২৯ হাজার টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ২৫ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে ৫২ হাজার টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ২২ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ৪৫ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩৭ হাজার টাকা, সপ্তম গ্রেডে ১৫ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা, অষ্টম গ্রেডে (বিদ্যমান অষ্টম ও নবম গ্রেড এক করে) ১২ হাজার ও ১১ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা, নবম গ্রেডে ৮ হাজার টাকা থেকে ১৭ হাজার টাকা, দশম গ্রেডে ৬ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১৩ হাজার টাকা, একাদশ গ্রেডে (বিদ্যমান ১২ ও ১৩ গ্রেড এক করে) ৫ হাজার ৯০০ ও ৫ হাজার ৫০০ টাকা বাড়িয়ে ১১ হাজার ৫০০ টাকা। দ্বাদশ গ্রেডে ৫ হাজার ২০০ থেকে ১০ হাজার ৫০০ টাকা, ত্রয়োদশ গ্রেডে ৪ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা, চতুর্দশ গ্রেডে ৪ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ৯ হাজার ৫০০ টাকা, পঞ্চদশ গ্রেডে (বিদ্যমান সপ্তদশ ও অষ্টদশ গ্রেড এক করে) ৪ হাজার ৫০০ ও ৪ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ৯ হাজার টাকা এবং ষষ্ঠদশ গ্রেডে (বিদ্যামন ঊনবিংশ ও বিংশ গ্রেড এক করে) ৪ হাজার ২৫০ ও ৪ হাজার ১০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৮ হাজার ২০০ টাকার করার সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে। পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় যখনই অনুমোদন হোক তা ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন হবে বলে অর্থমন্ত্রী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাধিকবার আশ্বস্ত করেছেন।






মন্তব্য চালু নেই