মেইন ম্যেনু

প্রকৃতি থেকে যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে তক্ষক

এক হেমন্তের রাতে আমরা ভাই বোনেরা বাড়ীর পুরনো কাঁচারী ঘরের খাটের উপর বসে গল্প করছি। এর মাঝে আমাদের গ্রামের এক বৃদ্ধ মহিলা, যাকে আমরা ঠাকুমা বলে সন্মোধন করি, এসে পুরনো দিনের রহস্যময় সব গল্প জুড়ে দিল। হিম হিম রাত্রে আমরা সবাই প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে গভীর মনযোগ দিয়ে ঠাকুমার গল্প শুনতে লাগলাম। ওদিকে দমকা হাওয়াগুলো দুরন্ত বাচ্চাদের মত ঘরের জানালা দিয়ে ঢুকে এদিক সেদিক অবাধ্য ছোটাছুটি করছে, প্রকৃতিও শ্লথগতিতে পড়ে নিচ্ছে কুয়াশার ধূসর চাদর। নিশুতি রাত ঘনিভূত হয়ে আসছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হীম। চারিদিক নিস্তেজ হওয়ার সাথে সাথে সমানতালে সচ্ছ অতলান্তিক আকাশটায় মাত্র জমে উঠতে শুরু করেছে তারার হাট। পরবাস্তব আবেশময় পরিবেশে আমরা ঠাকুমার রোমাঞ্চকর রহস্যময় গল্পের দেশে তলিয়ে গিয়েছি। কিছুটা ভয়, কিছুটা অজানা কে জানার প্রবল বাসনা আমাদেরকে যেন গল্পের গভীর থেকে গভীরতর অজানা এক সপ্নপূরীতে নিয়ে যাচ্ছে। পরিদের গল্প, মুন্ডুবিহীন এক ইংরেজ সাহেবের রাতবিরাতে ঘোড়ায় চড়ে টগ-বগ-টগ-বগ শব্দ করে দিকবিদিক ছুটে বেড়ানোর গল্প, আরো কত কি(!)। থেকে থেকে তক্ষকের কক্কক্ তক্-ক্কা কক্কক্ তক্-ক্কা তক্-ক্কা ডাক যেন রাতের নির্জনতা, রহস্যের গভীরতা আরো হাজারগুনে বাড়িয়ে দিল। তক্ষকের সেই ডাক ছাড়া নিশুতি রাতের রোমাঞ্চকর রহস্যময় সেই গল্প যেন পূর্ণতা পেত না।

বিশ বছর আগের সেই তক্ষক ডাকা রোমাঞ্চকর নিশুতি রাতের কথা আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল। আজ সেই ঠাকুমা বেঁচে নেই, সেই তক্ষকের ডাকও আর শোনা যায় না। ঠাকুমার সেই রুপকথার মতোই তক্ষকের রোমাঞ্চকর ডাকও আজ রুপকথা হয়ে গেছে। নাকি এই যান্ত্রিক জীবনে হাজারো কলের শব্দে হারিয়ে গেছে সেই রোমাঞ্চকর কক্কক্ তক্-ক্কা কক্কক্ তক্-ক্কা তক্-ক্কা ডাক। এই অদ্ভুত প্রাণীটির কথায় আসা যাক।

তক্ষক (এবপশড়) খধপবৎঃরষরধ বর্গের এবশশড়হরফধব গোত্রের একটি গিরগিটি প্রজাতি। পিঠের দিক ধূসর, ধুসর-সবুজ, নীলচে-ধূসর বা নীলচে বেগুনি-ধূসর। সারা শরীরে থাকে লাল ও সাদাটে ধূসর ফোঁটা। পিঠের সাদাটে ফোঁটাগুলি পাশাপাশি ৭-৮ টি সরু সারিতে বিন্যাস্ত। কমবয়সী তক্ষকের লেজে পরপর গাঢ-নীল ও প্রায় সাদা রংয়ের বলয় রয়েছে। তক্ষক তার গায়ের রঙ মুহূর্তে পরিবর্তন করে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে পারে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। এদের মাথা অপেক্ষাকৃত বড়, নাকের ডগা চোখা ও ভোঁতা। চোখ বড় বড়, মণি ফালি গড়নের। লেজ সামান্য নোয়ানো। দৈর্ঘ্য নাকের ডগা থেকে পা পর্যন্ত ১৭ সেঃমিঃ এবং লেজও প্রায় ততটা। তক্ষকের ডাক চড়া, স্পষ্ট ও অনেক দূর থেকে শোনা যায়। এদের ‘তক্কে তক্কে’ ডাকের জন্যই হয়তো নাম হয়েছে তক্ষক। কক্কক্ আওয়াজ দিয়ে ডাক শুরু হয়, অতঃপর ‘তক্-ক্কা’ ডাকে কয়েক বার ও স্পষ্টস্বরে। প্রধানত পুরুষ তক্ষকই ডাকে ‘তক্কে-তক্কে’ কওে, স্ত্রী তক্ষককে আকর্ষণ করার জন্য। তবে অন্য পুরুষদের তার উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করা বা তাকে ভয় দেখানোর জন্যও ডেকে থাকে এরা, যাতে তার এলাকায় কোনো পুরুষ না ঢুকে পড়ে। প্রয়োজনে এক এলাকার পুরুষটি অন্য এলাকার পুরুষের সঙ্গে যুদ্ধ করে এবং কখনও সে কিংবা দুজনই আহত হয়। এরা তিন বছর বয়সেই প্রজননক্ষম হয় এবং প্রকৃতিতে প্রায় দশ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তক্ষক নিশাচর প্রাণী হলেও দিনের বেলায়ও এদের ডাক শুনে খুব সহজেই অবস্থান নির্ণয় করা যায়। এ কারণেও এরা সহজেই ধরা পড়ে। প্রজননকাল ছাড়া এরা একাকী বসবাস করে। এদের প্রজনন মৌসুম হল গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল। স্ত্রী তক্ষক মাত্র ১ থেকে ২টা ডিম পাড়ে। ডিমের খোলস বেশ শক্ত এবং বাচ্চা না ফোঁটা পর্যন্ত স্ত্রী তক্ষকটি পাহারা দেয়। জন্মের সময় বাচ্চা ৮ থেকে ৯ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। যেহেতু বছরে মাত্র ১ থেকে ২ টা ডিম দেয় সেহেতু প্রায় বিলুপ্ত হলে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তা ছাড়া বেজি, সাপ, ঈগল, চিল, খাটাশ, শিয়াল দেখলেই এদের শিকার করে থাকে। এরা কীটপতঙ্গ, ঘরের টিকটিকি ছোট পাখি ও ছোট সাপ খেয়ে থাকে। ছাদের পাশের ভাঙা ফাঁক-ফোঁকড় বা গর্তে অথবা গাছে বাস করে। ব্যাপক নিধনই বিপন্ন হওয়ার কারণ। অনেকে ভুলক্রমে তক্ষককে বিষাক্ত সরীসৃপ হিসেবে চিহ্নিত করে। দেশী চিকিৎসায় এদের তেল ব্যবহূত হয়। ভারত ও বাংলাদেশসহ মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কাম্পুচিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির তক্ষকের বাস।

অনেক সময় তক্ষক পোষা প্রাণী হিসেবেও রাখা হয়। তবে এদের কামড় প্রচন্ড যন্ত্রণাদায়ক হয়ে থাকে। এরা সাধারণত বৃষ্টিবহুল বনের বাসিন্দা। তবে মানববসতির আশপাশে যেকোনো ঝোপ-ঝাড়ে, এমনকি স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের ফাঁক-ফোকরে (২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা দিনে এবং ১৮ থেকে ২৩ ডিগ্রি রাতে) অনায়াসেই বসবাস করতে পারে।

তক্ষক পোকামাকড় ও ইঁদুরের বাচ্চা দমনে এতটাই পারঙ্গম যে ৮০ থেকে ৯০-এর দশকে হাওয়াই, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, বেলিজসহ ক্যারিবিয়ান দ্বীপসমূহে এদের এনে ছেড়ে দেয়া হয় পোকা নিধনের জন্য। সে জন্য কৃষিক্ষেত্রে এদের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবেশের বাস্তুসংস্থান রক্ষায়ও এদের জুড়ি নেই।

কিন্তু এখন তক্ষকের আর ‘তক্ষক’ নাম নেই, নাম হয়েছে ‘মিলিয়ন ডলার তক্ষক’। ২০১২-১৩ আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী প্রজাতিটির এখন ঈওঞঊঝ-এ ঝপযবফঁষব-১ এ অন্তর্ভূক্তির প্রস্তাবনায় আছে। কোনো কোনো মহল তক্ষকের চাহিদা মেটানোর স্বার্থে চাষের সুপারিশ করেছেন। এই যদি হয় তক্ষকের বর্তমান অবস্থা তাহলে ধরেই নিতে হয় বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে বন্যপ্রাণীর ওপরে কোনো জরিপ নেই বা অন্যান্য দেশের মতো ডরষফষরভব ঝঁৎাবু ওহংঃরঃঁঃব নেই সেখানে তক্ষক কী অবস্থায় আছে!

আমাদের চারিপাশে তক্ষকের এই অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করার এক প্রবল ইচ্ছে অনুভব করলাম। জানলাম এই তক্ষক নামের প্রাণীটিকে বাংলাদেশে এখনো বিলুপ্ত ঘোষণা করা না হলেও, সংস্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তারা বলছেন বিদেশে, বিশেষ করে চীন ও ভিয়েতনামসহ আন্তর্জাতিক বাজারে এদের ব্যাপক চাহিদা থাকায় যে হারে এটির নিধন চলছে, তাতে অচিরেই একে বিলুপ্ত প্রাণীর কাতারে ফেলতে হবে।

ওদের বিষে মানুষ মরে না, বেঁচে উঠে। তাই মানুষ ওদের নির্বিচারে মারে

টোকে গেকো তক্ষকের পোষাকী নাম। চলার পথে জিভ দিয়ে কক্কক্ তক্-ক্কা শব্দ করে বলেই ওদের নাম তক্ষক। পুরানো গাছ কিংবা লোকালয় সংলগ্ন জঙ্গলে ওদের বসবাস। প্রয়োজনমত রং বদলাতে পারে ওরা। পোকামাকড় খায় তাই মানুষের সাথে কোন দিনই শত্রুতা ছিলনা ওদের। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল ২০০৯ সালে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক ঘোষনায় জীবন দূর্বিষহ হয়ে উঠল তক্ষকদের। হু জানালো কান্সার ও এইডস এর মত ভয়ংকর রোগের ঔষধ রয়েছে তক্ষকের বিষে। ব্যাস। বক্তব্যের সত্যতার জন্য অপেক্ষা করল না কেউ। আন্তর্জাতিক বাজারে তর তর করে বাড়তে লাগল বাংলার এই নিরীহ প্রাণী তক্ষকের দাম। আমাদের দেশের সীমানায় তক্ষক পাচারের চক্র রমরমা ব্যাবসা ফেদে বসল।

দেশে বিদেশে রাতারাতি গজিয়ে উঠল একদল তক্ষক চোরাচালানকারী। নিরীহ গ্রামবাসীদের কে রাতারাতি কোটি টাকার মালিক বনে যাবার সপ্নে বিভোর করে তুলল তারা। গ্রামে গঞ্জে শুরু হয়েছে তুলকালাম সব কান্ড। রীতিমত ফেলুদা কিংবা শার্লোক হোমসের রহস্যময় গোয়েন্দা কাহিনীগুলোকে হার মানানো কান্ডকাজ শুরু হয়ে গেল। তাদের সকল কার্যক্রম ছিল অতি গোপনীয়তা রক্ষা করে। দেখা গেল একই গ্রামের একাধিক লোক সারা দিনরাত তক্ষক সন্ধানে ছুটে বেড়াচ্ছেন পরিত্যাক্ত বাড়ি অথবা বড় বড় গাছে। কিন্তু কিসের সন্ধানে তাদের এই ছোটাছুটি তা কেউ কারো কাছে স্বীকার করছে না। গোপনে বড়লোক হওয়ার এক প্রবল নেশা চেপে বসল একদল মানুষের বুকে। তক্ষক নিয়ে রীতিমত শুরু হয়ে গেল এক রহস্যের ধুম্রজাল। তক্ষক সাধারনত সন্ধ্যার পর ডাক ছাড়ে। ওই ডাকের সুর ধরেই অনেকেই তক্ষক ধরতে রাতের অন্ধকারে সুউচ্চ বৃক্ষ বেয়ে উঠে গেছে মগডালে। অনেকে ধরেছেনও। কিন্তু কোটি টাকার সপ্নই রয়ে গেছে তাদের।

অনুসন্ধানে দেখা যায় বাংলাদেশ থেকে তক্ষক ভারতে যায় বনগাঁ-বসিরহাট সীমান্ত দিয়ে। চোরাচালানকারীদের এক একটি তক্ষকের বাজারদর প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা। পাচার হওয়া সেই তক্ষকের দাম নিয়ে বাড়ছে চোরাচালানকারীদের অন্তর্দ্বন্ধ। ফলে সীমান্তে অপরাধ বাড়ার নেপথ্যে এক বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তক্ষক পাচার। কিন্তু আমাদের দেশের পুলিশ প্রশাসনের কাছে এ অপরাধের গুরুত্ব আর অন্য পাঁচটা অপরাধের মত নয়। কঠোর হস্তে এর পাচার দমনের পরিবর্তে অনেক সময় প্রসাশনের সহায়তাতেই পাচার হচ্ছে এই নিরীহ প্রাণীটি। কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান অপরাধ কপালে ভাঁজ ফেলেছে পরিবেশ ও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের। কারণ বিরল এ প্রাণীটি এভাবে চোরাশিকারীদের কবলে পড়তে থাকলে এদের সংরক্ষন করা দায় হয়ে উঠবে। পরিবেশবিদ ও কৃষিবিদদের মতে এই নিরীহ প্রাণীটি পরিবেশের বাস্তুসংস্থানে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। ফসলের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমনে তক্ষকের জুড়ি নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান অনুষদের একজন অধ্যাপক জানান, ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে তক্ষকের হাড় বা মাংস খেলে যৌন ক্ষমতা বাড়ে, কিংবা হাঁপানি, বাঁত, ব্যথার জন্যে এটি মহৌষধ। তাছাড়া ২০০৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক ঘোষনায় তক্ষকদের এই দুরবস্থা হয়েছে। এ কারণে সারাদেশ জুড়ে একসময় তক্ষকের দেখা মিললেও এখন আর এদের তেমন দেখা মেলে না। এছাড়া পূর্ব এশিয়ায় প্রাণীটির বড় বাজার থাকায় সেখানেই এগুলো পাচার হয়ে যায়। তারা বলছেন বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকায় যে হারে এটির নিধন চলছে তাতে করে অচিরেই একে বিলুপ্ত প্রাণীর কাতারে ফেলতে হবে। তাছাড়া আধুনিকায়নের ফলে বন কমে যাওয়া ও লোকালয়ে মানুষ বেড়ে যাওয়াই এদের বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ।

তক্ষক বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, জাপান, দক্ষিণ চীন, উত্তর অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশে পাওয়া গেলেও সব দেশেই এরা হুমকির মুখে। এ জন্য দায়ী তক্ষকের অনিয়ন্ত্রিত অসাধু রমরমা ব্যবসা। শোনা যায় চীন ও ভিয়েতনামি ক্রেতারা অতি উচ্চমূল্যে তক্ষক ক্রয় করছে।

বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তক্ষকের ওপর এখনই একটি জরিপ হওয়া প্রয়োজন এবং জরিপের ফলাফল অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্ববাজারে তক্ষকের মূল্য যতই হোক না কেন পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে তক্ষকের মূল্য অপরিসীম। পরিবেশের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে না। তাই আসুন, দেশ বাঁচানোর পাশাপাশি আমরা তক্ষক তথা পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় উদ্যোগী হই।

পরিবেশের কাগজ






মন্তব্য চালু নেই