মেইন ম্যেনু

প্রথম দেখা

আকিদুল ইসলাম (সাদী) : বৈশাখ মাস৷ প্রচন্ড গরম৷ রোদের তীব্রতা যেন শুধু বেড়েই চলেছে৷ মাটি পুড়ে তামা হওয়ার উপক্রম৷ দীর্ঘ কয়েক মাস যাবৎ কোন বৃষ্টি নেই৷ পশুপাখি পানির জন্য হাহাকার করছে৷ গাছপালা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দরবারে ইলাহীতে পানির জন্য প্রার্থনা করছে৷ একই ভাবে মানুষের মাঝেও পানির হাহাকার৷ পানির অপর নাম যে জীবন‚ তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে৷ টিউওয়েলেও পানি উঠছে না৷ কোথায় যেন তা উধাও হয়ে গেছে৷ রান্না-বান্না‚ গোসল সব কাজেই সমস্যা৷ আল্লাহর একটি মাত্র নেয়ামত পানি৷ তার সংকটেই কী করুণ অবস্থা৷ আর যদি তাঁর দেওয়া হাজার হাজার নেয়ামতের এমন সংকট হয় তাহলে কী অবস্থা হবে তিনিই ভাল জানেন৷ এ যেন কঠিন এক মুসিবত৷ না জানি মানুষ কত গোনাহ করে ফেলেছে৷ তার শাস্তি হিসেবেই হয়তো মুসিবতটা এসেছে৷অনেক জায়গা নামাজ পড়ে মানুষ বৃষ্টির জন্য রোনা জারি করছে৷ আমিও সহ্য করতে পারলাম না৷ তাদের সাথে মিলে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলাম খুব৷ নিজের ও সমাজের মানুষের কৃতকর্মের ক্ষমা প্রার্থনা করলাম৷ তঁার নিকট চাইলাম রহমতের বৃষ্টি৷ পরিত্রাণ চাইলাম এমন দুর্বীক্ষ থেকে৷ আল্লাহ খুবই দয়ালু৷ তিনি আমাদের ডাক শুনবেন‚ অবশ্যই শুনবেন৷ রহমতের বৃষ্টি দিবেন৷ আবার ফিরিয়ে দিবেন টিউবওয়েলের পানি৷ শান্তি ফিরে আসবে সকলের মাঝে৷ মনের মাঝে সবার এমনি আশা৷ এই দুর্বীক্ষের সালটা স্মরণ নেই৷ তবে স্মরণ আছে তখন ঘটে যাওয়া একটি কাহিনী৷ যা মনের মধ্যে আজও গেঁথে রয়েছে৷ হয়তো মুসবে না কোন দিন৷ ঘটে যাওয়া এই দুর্বীক্ষের সময় নাকোল ইউনিয়নের প্রায় জায়গাই টিউবওয়েলে পানি উঠত না৷ তবে আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের মাদরাসার টিউবওয়েলে পানি উঠত৷ তা যেন ছিল আল্লাহর মেহমানদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা৷ যা স্মরণ হলে এমনিই মাথা নুয়ে পড়ে তঁার পায়ে! মাদরাসার আশপাশের লোকজন ওখান থেকেই পানি সংগ্রহ করত৷ আমরাও তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ করে দিতাম৷ হঠাৎ একদিন আসরের নামায শেষ না হতেই আমার খুবই জুররত ধরল৷ কিছুতেই ধরে রাখতে পারলাম না৷ অবশেষে তাড়াতাড়ি করে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলাম৷ এবং নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে জুররত সারলাম৷ ওজু ছাড়া থাকতে আমার ভাল লাগত না৷ তাই ওজু করার খুবই প্রয়োজন অনুভব করলাম৷ কিন্তু কিভাবে করব? টিউবওয়েলে যে অনেক লোকের ভিড়৷ তাও আবার সবাই মেয়ে মানুষ৷ তারা পানি নিতে এসেছে৷ এমতাবস্থায় সেখানে যেতে খুবই লজ্জা করছে৷ কেন জানি ছোট থেকেই আমি খুবই লাজুক প্রকৃতির৷ তবুও ওজু করতেই হবে৷ নইলে ভাল লাগছে না৷ অবশেষে সমস্ত লজ্জা ঝেরে ফেলে টিউবওয়েলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ অপর দিকে তারা একে একে কলসিতে পানি ভরছে আর চলে যাচ্ছে৷এভাবে পর্যায় ক্রমে শেষ হল প্রায় সকলের পানি নেওয়া৷ তবে শেষে রয়ে গেল দু’জন মানুষ৷ তারাও পানি নিবে৷ তাদের মধ্যে একজন একটু বয়স্ক মহিলা৷ অন্যজন ১৬/১৭ বছরের মেয়ে৷ তার গায়ে খুব সুন্দর একটি ফ্রক ছিল৷ তার রঙটা অবশ্য স্মরণ নেই৷ সে টিউবওয়েল চেপে চেপে তার কলসি ভরছে৷ সেদিক মন দিলাম না৷ অন্যদিকে একটু আনমনা হয়ে তাকিয়ে আছি৷

একপর্যায় শেষ হল তার কলস ভরা৷ এখন কাঁখে তোলার পালা৷ কিন্তু সে কলসিটি একা উঁচু করতে সক্ষম নয়৷ তাই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাকে বলল‚ চাচি আমার কলসটি একটু তুলে দিন না! মহিলাটি কি জানি ভেবে বলল‚ ওই সানজিদ ছেলেটাকে বল তুলে দিতে৷ আমি আবার ঐ এলাকায় ভালই পরিচিত ছিলাম৷ তাই হয়তো আমার নামটা সে জেনেছে৷ কিন্তু তার কথা শুনে তো আমি অবাক! কী বলে মহিলাটি? নিজেকে বলেছে কাজের জন্য আর সে কিনা তা অন্যের উপর গড়িয়ে দিচ্ছে। মেয়েটি অনেক লাজুক।আমাকে বলতে চেয়েও যেন কিছু বলতে পারছে না।কিন্তু সে তো একেবারেই নিরুপায়। তাই লজ্জা ছেড়ে বলেই বসলো- ভাইয়া কলসটা একটু তুলে দিন না। তার কথাটি শুনে রীতিমত আমি চমকে উঠলাম।কিন্তু মেয়েটির কথায় আমিও যে অনেকটা নিরুপায় হয়ে গেলাম।তাই বাধ্য হয়ে তার নিকট গেলাম কলসিটা তুলে দিতে। কলসটি ধরে দেখি খুবই ভারি৷ তাকে বললাম‚ এটা তো তোমার চেয়েও বড় এবং ভারি৷ তুমি কি নিতে পারবে? সে কথাটি শুনে আমার দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে মিষ্টি একটি হাসি দিল৷ হাসিটি সত্যি ভুলার মত নয়৷ আজও চোখের উপর ঝাপসা আকারে ভাসে তার সেই মিষ্টি হাসি আর কাজল চোখের চাহুনী৷ সে হাসি দিয়ে বলেছিল‚ হ্যাঁ পারব৷ আপনি তুলে দিন না….। তারপর কলসি আমি মেয়েটির কাখে তুলে দিয়ে একটি দীর্ঘাশ্বাস নিলাম। আমার দীর্ঘাশ্বাস নেওয়া দেখে মেয়েটি বলে উঠল, ভাইয়া এতটুকুতেই………….। এরপর সে কলস নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হল৷

এই ছিল তার সাথে আমার “প্রথম দেখা”৷ তবে এক দেখাতেই তার চেহারা মনের খাতায় অঙ্কন করতে পারিনি৷ কিন্তু সেদিনের পর থেকে সে এসেছিল কল্পনার জগতে৷ আজও আছে‚ ভবিষ্যতেও থাকবে। আমার কেন জানি শুধু মনে হচ্ছিল, মেয়েটি অনেক লাজুক। তার লাজুকতার সেই মুহূর্তর্টি যেন আমার আজও ভাবিয়ে তোলে।

দিন যায়, মাস যায় এভাবেই চলতে থাকে জীবন ঘড়ির কাটা গুলো। কত পড়ন্ত বিকেল কেটেছে আমার সেই কলপাড়ে। কিন্তু আর কখনই দেখা হয়নি সেই মেয়েটির সাথে। মাঝে মধ্যে মনে হয়, যেন স্বপ্নের মাঝে এসেছিল সে। আবার স্বপ্ন শেষে চলেও গেছে।

দেখতে দেখতে দুটি বছর পেরিয়ে গেল। একদিন সেই কলপাড় সংলগ্ন এলাকায় একটি দুধষ এ্যাকসিডেন্ট হলো। আর সেই এ্যাকসিডেন্টের কবলে পড়ে আমি মারাত্মক আহত হলাম। হুশ ফেরার পর দেখলাম আমি হাসপাতালে বেড়ে শুয়ে আছি। আমার মাথা আর হাতে ব্যান্ডেজ। হঠাৎ নার্স এসে বলল, আপনার প্রচন্ড রক্ত খনন হয়েছে। সময় মতো হাসপাতালে না আনলে আর সময় মতো ঠিকঠাক রক্ত না পাওয়া গেলে আপনার অবস্থা কি হতো আল্লাহ-ই ভাল জানেন। তবে আপনি খুব ভাগ্যবান। কেন জানেন? আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন??? তারপর নার্স বলল- পল্লীর এসব ক্লিনিকে তাৎক্ষণিত কোনো রক্ত পাওয়া যায় না। কিন্তু যে মেয়েটি আপনাকে হাসপাতালে এনেছে সেই মেয়েটিই আপনাকে রক্ত দিয়েছে। নার্সের কথাগুলো শুনে আমি একেবারেই ‘থ’ মেরে গেলাম। তারপর বললাম কে সেই মেয়ে??? নাস বলল, মেয়েটি নাম বলেনি। তবে শুধু এতটুকু বলেছে- অনেক আগে নাকি একটা কলপাড়ে তার সাথে আপনার দেখা হয়েছিল। সে সময় তাকে নাকি আপনি এটা উপকারও করেছিলেন। কথাগুলো অকপটে বলে নার্স রুম থেকে চলে গেল।

দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস নিয়ে আমি শুধু ভাবতে লাগলাম- ছোট্ট একটি পড়ন্ত বিকেলের সেই ‘প্রথম দেখা’। আর এই দেখাতেই মেয়েটি আমার জন্য এতকিছু করলো!!!

যাকে আমি কল্পনার চাদরে ঢেকে রেখেছি এতটা দিন সে আজ যা করলো তা আমার জীবনে চির অমর হয়ে থাকবে। তবে এভাবে তার জন্য আমার হৃদয়ের শূন্যতা কি শুধু বাড়তেই থাকবে? আর কি কখনই পাব না তার দেখা…………….?






মন্তব্য চালু নেই