মেইন ম্যেনু

প্রথম ধাপের নির্বাচন : শত অভিযোগেও নির্বাক ইসি

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম ধাপে ভোটগ্রহণে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, ফলাফল পাল্টানোসহ নানামুখি অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ক্ষুব্ধ প্রার্থী-সমর্থকরা। এছাড়া ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফল কারসাজি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

ইসি সূত্রে জানা যায়, এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংক্ষুদ্ধ প্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট ইউপিগুলোর ফলাফলের গেজেট প্রকাশ না করে নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে। তবে কমিশনের এসব অভিযোগের দিকে কোনো দৃষ্টি নেই। অভিযোগ করতে আসা প্রার্থীদের ট্রাইব্যুনালে মামলা করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কারণ, ইসি ইতোমধ্যে ফলাফলের গেজেট প্রকাশের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচনী অনিয়মের তদন্তের পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে গেল ২২ মার্চ প্রথম ধাপে ৭১২ ইউপিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহে প্রায় চারশ’ অভিযোগ জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। অথচ ওইসব অভিযোগ ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। কোনো কোনো প্রার্থী নিজেই কমিশনারদের সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার চাচ্ছেন। কিন্তু ইসির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কিছুই করার নেই বলে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তা ভোটের ফল ঘোষণার পর নির্বাচনের বিষয়ে কমিশনের আইনগত তেমন কিছু করার থাকে না। সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন। এক্ষেত্রে আদালত যে রায় দেবেন, কমিশন তা মেনে নেবে।’ তবে কমিশন চাইলে যেকোনো অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পারেন। এক্ষেত্রে আইনগত খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালায় কতিপয় ক্ষেত্রে কমিশনকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বিধিমালার ৯০ ধারায় বলা হয়েছে, আইন ও বিধান অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রের নির্বাচন নিরপেক্ষ, ন্যায়সংগত ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাবলি জারি, ক্ষমতা প্রয়োগ এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য আদেশ প্রদান করতে পারবেন।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ইউপি নির্বাচনে অনিয়মের চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার (ইউপি) নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী কমিশন বিশেষ ক্ষমতাবলে এগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারে। এতে কমিশনের স্বচ্ছতা ও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। ইসি এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনে সবাই সতর্ক হবে।’

এদিকে ইসিতে জমা পড়া অভিযোগগুলোর মধ্যে দেখা যায়, অভিযোগকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীও রয়েছেন। বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ১২নং দড়িরচর খাজুরিয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল কাদের কমিশনে করা অভিযোগে বলেন, ‘ভোটের আগের রাতে প্রতিপক্ষ প্রার্থী ও পুলিশ প্রশাসনের সদস্যরা আমার কর্মীদের ভোট দিতে না যাওয়ার হুমকি দেন। গত ২২ মার্চ ভোটগ্রহণ শুরুর পর নৌকা মার্কার ব্যাজ পড়া নেতাকর্মীদের পিটিয়ে কেন্দ্র থেকে সরে যেতে বাধ্য করে। আর এক্ষেত্রে পুলিশ সহায়তা করে।’

অপর আরেক প্রার্থী বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চালুয়া বাড়ি ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী শওকত আলী রেজাল্ট শিট পরিবর্তনের অভিযোগ তুলে বলেন, ‘আমি বিজয়ী হয়েছি। ওইদিন রাত ১০টার দিকে গণমাধ্যমের খবরেও তা প্রচারিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আরেক প্রার্থীর ব্যালেট পেপারের সঙ্গে আমার ব্যালট পেপার ঢুকিয়ে দিয়ে রেজাল্ট শিট পরিবর্তন করা হয়। বিষয়টি তদন্ত করলেই এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে।’ এ অভিযোগে গেজেট প্রকাশ স্থগিত ও অনিয়ম তদন্তের দাবি জানান তিনি।

বরিশালের আগৈলঝারা উপজেলার রত্নাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহীন আলম তার অভিযোগপত্রে বলেছেন, ‘গত ২২ মার্চ ভোটের দিন এই ইউনিয়নের বেশকিছু কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়া হয়। কোথাও কোথাও সকাল ১০টার মধ্যে ভোটও শেষ হয়ে যায়। প্রশাসনও অসহযোগিতামূলক আচরণ করেছে।’ এই অবস্থায় নির্বাচন বাতিল করে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানান তিনি।

একই জেলার মুলাদী উপজেলার সফিপুর ইউনিয়নের ভোট বাতিল ও অনিয়মের তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন চেয়ারম্যান প্রার্থী ফকরুল হাসান।

একইভাবে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নে এক কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোট পড়ার অভিযোগ এনে ওই কেন্দ্রের ফল বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ইউপির চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রণব ঘোষ বাবলু। একই জেলার সদর উপজেলার কুশাখালী ইউনিয়নের ৬নং ওয়াডের্র মেম্বার পদে পুনরায় ভোটের দাবি জানান প্রার্থী মনিরুল ইসলাম।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার টেকনাফ ইউপির চেয়ারম্যান প্রার্থী জিয়াউর রহমান জিহাদ অভিযোগ করে বলেছেন, ‘আইন ও বিধি অনুযায়ী ৩টি কেন্দ্রে ফল ঘোষণা করেননি সংশ্লিষ্ট প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে আমার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা এলোমেলো করে ১৩৪ ভোটের ব্যবধানে আমাকে পরাজিত করা হয়েছে।’ ওই তিন কেন্দ্রে পুনরায় ভোট নেয়ার পর নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে ঝালকাঠীর কাঠালিয়া উপজেলার ৫নং শৌলজালিয়া ইউপির স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. তরিকুল ইসলাম বুলবুল অভিযোগে কয়েকটি কেন্দ্রের নাম ও সময় উল্লেখ করে বলেন, ‘ওইসব কেন্দ্রে জালভোটের মহোৎসব চলেছে। রিটার্নিং ও প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের ফোনে বিষয়টি জানানোর পরও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কয়েকটি কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোট পড়েছে।’ ওইসব কেন্দ্রে পুনঃভোট গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের ২২ মার্চ (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মোট ৬২৯ ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৬৯, বিএনপি ৪৯ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ১০৭ ইউপিতে জয় পেয়েছে। এছাড়া জাতীয় পার্টি- জেপি ৭, ওয়ার্কার্স পার্টি ২, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ৩ এবং ইসলামী আন্দোলন ১টিতে জয় পেয়েছে।বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই