মেইন ম্যেনু

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে খোলা চিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি ধর্ষণকারীদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকা বাংলাদেশের একজন প্রি-ভিকটিম নাগরিক বলছি। ক্ষমতা ও আন্তরিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত আপনি। আপনি ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’, ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’। ফরচুন ম্যাগাজিনের জরিপে আপনি বিশ্বের ১০ম ক্ষমতাধর নেতা নির্বাচিত হয়েছেন এ বছর। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম নেতা আপনি নারীর ক্ষমতায়নে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন। নারীদের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করেছে আপনার সরকার। বিশ্ব মিডিয়ায় আপনার এই অর্জন বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের গর্বিত করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদানের স্বীকৃতিসহ এমন আরো অনেক বিষয় রয়েছে, যাতে আপনার ক্ষমতা ও সদিচ্ছার এক অনন্য মেলবন্ধন প্রতিফলিত হয়ে ওঠে আমাদের প্রত্যাশার আয়নায়।

প্রিয় নেত্রী, এ সবকিছুই সাফল্যের গল্প। এখন আমি আপনাকে ব্যর্থতার কিছু গল্প শুনাবো। কেবল আমার বা আপনার নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের একান্ত ব্যক্তিগত অন্ধকার সময়ের কিছু গল্প, যেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অর্জন, বহুমুখী সাফল্য আর উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকের আড়ালে।

আলোর ঠিক নিচেই যেমন অন্ধকার, তেমনি উন্নয়ন ও অগ্রগতির উজ্জ্বল স্লোগানের পাশেই কাতরাচ্ছে আমার ধর্ষিতা মা, ধর্ষিতা বোন। একের পর এক খুন আর ধর্ষণে পীড়িত লাঞ্ছিত সমভ্রমলুণ্ঠিত হচ্ছে মূলত আমারই স্বদেশ। এখানে দলবেঁধে জন্মগ্রহণ করে চলছে পৌরাণিক দেবতা জিউস। বিচারহীনতার নীরব সমর্থনে খুন আর ধর্ষণের জন্য এই দেশটাকে ক্রমেই গড়ে তোলা হচ্ছে এক অভয়ারণ্যে।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের কোথাও আজ নারীরা নিরাপদ নয়। না ঘরে, না বাইরে, না গলিতে, না রাজপথে, না সমতলে, না পাহাড়ে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো বোনের ধর্ষণের খবর আসে আমাদের কাছে। গত বছর ৮৫ জন নিরীহ আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু শিকার হয় যৌন নির্যাতন নামক এই মহামারিতে।

দিনাজপুরের ইয়াসমিন থেকে কুমিল্লার তনু- এরা কোনো নাম নয়, এরা নারী, এরা ধর্ষিতা। এদের চিৎকার আর হাহাকারে ভারী হয়ে আছে বাংলাদেশের আকাশ। নারীর প্রতি সহিংসতার এক দুঃসহ বিরামহীন পথ অতিক্রম করছি আমরা। ধর্ষণকারীদের দীর্ঘ ছায়ার নিচে আমাদের বসবাস। প্রি-ভিকটিম হিসেবে সর্বদা ভীত ও আতঙ্কিত প্রত্যেক নারী, বাংলাদেশের অর্ধেক জনগণ।

জানি, এখানে ভোটের রাজনীতি, অনেক কিছুই আপনাকে প্রভাবিত করে থাকে। তাই এখানে মুক্তচিন্তা আপত্তিকর, বিজ্ঞানমনস্কতা আপত্তিকর, ধর্মনিরপেক্ষতা আপত্তিকর। কেবল আপত্তিকর নয় মুক্তিযোদ্ধার নিহত হওয়ার খবর, আপত্তিকর নয় নৃশংসভাবে লেখক-প্রকাশক খুন হওয়ার খবর। এখানে ধর্ষণ আপত্তিকর নয়। আপত্তিকর ধর্ষণের বিচার চাওয়ার খবর! আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? আমরা কি চেয়েছিলাম ঠিক এইভাবে গড়ে উঠুক আমাদের সোনার বাংলা? কেন সমগ্র বাংলাদেশ আজ ধর্ষণের বৃহৎ প্রেক্ষাগৃহ রূপে আবির্ভূত হলো? এ কেমন ধর্ষক জাতিতে পরিণত হয়েছি আমরা?

এখানে পিতা ধর্ষণ করে কন্যাকে। (কয়েক বছর আগে মধ্যপ্রাচ্য ফেরত এক পিতা ধর্ষণ করে তার তিন কন্যাকে)। শিক্ষক ধর্ষণ করে ছাত্রীকে। (পরিমলের ঘটনায় এখনো আতঙ্কিত প্রতিটি নারীসত্তা)। এখানে মায়ের সামনে গণধর্ষণ করা হয় তার ছোট্ট মেয়েটিকে। (পূর্ণিমা নামের মেয়েটির অসহায় মায়ের হাহাকার এখনো আমাদের কানে বাজে) এখানে বাবাকে জিম্মি করে ধর্ষণ করা হয় ১৩ বছরের শিশুটিকে। (‘চোখের সামনে মেয়েটিকে পশুরা ধর্ষণ করেছে’ বলে আর্তনাদ করে ওঠে কিশোরগঞ্জের এক বাবা) এখানে সহপাঠী কর্তৃক ধর্ষিতা হয় নারী। (স্মৃতিকণা বিশ্বাসকে এখনো ভুলে যায়নি মানুষ, যাকে গণধর্ষণ করে নগ্ন ছবি তুলে রেখেছিল তারই সহপাঠীরা)। এখানে ক্লাস ওয়ানের ছাত্রী (মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলে নির্যাতনের শিকার) থেকে শুরু করে তিন সন্তানের মা, কেউই নিরাপদ নয়। এখানে ছাত্রীরা নিরাপদ নয়, শিক্ষিকা নিরাপদ নয়। গৃহকর্মীদের নিরীহ দেহখানিও রক্ষা পায় না ধর্ষকের নগ্ন হাত থেকে। (কয়েক দিন আগে এক প্রখ্যাত শিল্পীর বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৭ বছরের গৃহকর্মীর ধর্ষিত লাশ) দিনমজুর থেকে উচ্চ শিক্ষিতা কেউ রক্ষা পায় না ধর্ষণকারীর নৃশংসতা থেকে। কী ভয়ানক আর দুঃসহ অন্ধকার সময় কাটাচ্ছি প্রতি মুহূর্তে ভিকটিম হওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত আমরা নারীরা!

ধর্ষণ কোনো তুচ্ছ ঘটনা নয়, কয়েকটা ছেলের দুষ্টুমি নয়, বরং এটি একটি মড়কের নাম, একটি মহামারির নাম। একে সংজ্ঞায়িত করতে হবে সন্ত্রাস ও অপরাধের ভাষায়। এই সন্ত্রাসের আক্রমণে সমগ্র নারী জাতি আজ বিপন্ন। অথচ এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি কোথাও। রাষ্ট্রের নীরব আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে নিরাপদভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে ধর্ষক ও খুনিরা এবং ঘটিয়ে যাচ্ছে একের পর এক লোমহর্ষক সব ঘটনা।
সেদিন জাতীয় খতিব সম্মেলনে আপনি যখন বললেন, ‘ধর্ম নিয়ে কোনো কটাক্ষ সহ্য করা হবে না’ টিভি স্ক্রিনের সামনে বসে আমি আপনার দৃপ্ত উচ্চারণের দিকে তাকিয়ে ছিলাম অপলকভাবে। একজন প্রি-ভিকটিম হৃদয় নিয়ে আমার তখন খুব ইচ্ছে করছিল শুনতে, আপনি বলবেন- ‘যারা ধর্ষণ করে, যারা খুনি, তাদের কাউকেই কোনো ছাড় দেয়া হবে না।’ কিন্তু না, আপনি বললেন না।

যে দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, বিরোধীদলীয় নেতা একজন নারী, স্পিকার একজন নারী, সেই দেশে প্রশাসনের নীরব সম্মতিতে নারীর প্রতি সহিংসতার এই যে মহোৎসব, ধর্ষণ ও খুনের এই যে বিচারহীনতা, এটা নারীর ক্ষমতায়নকেই বারবার প্রকাশ্যে ধর্ষণ করা নয় কি?

ধর্ষণের সব খবর আমরা জানি না। নির্যাতন আর ধর্ষণের অনেক গল্পই রয়ে যায় অন্ধকারে। কলঙ্কের ভয়ে, প্রশাসন ও আত্মীয়স্বজন কর্তৃক আরো কয়েকবার ধর্ষিত হওয়ার ভয়ে চেপে যায় ধর্ষিতা এবং তার পরিবার নিজেই। যেটুকু আলোতে আসে, তাতেই প্রতিনিয়ত শিউরে উঠতে হয় আমাদের। আমরা আতঙ্কে দিশাহীন হয়ে পড়ি এমন বীভৎসতায়। এর কি কোনো প্রতিকার নেই কোথাও? যখন পরিবারের চার দেয়ালের ভেতর কোনো নারীকে ধর্ষণ করা হয়, তখন পরিবারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়ার অজুহাতে তা চেপে যাওয়া হয়। যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারী ধর্ষিতা হয়, তখন প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তা চেপে যাওয়া হয়। যখন রাজপথে, প্রকাশ্যে নারী ধর্ষিতা হয়, তখন প্রশাসনের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তা চেপে যাওয়া হয়।

যখন সেনাবাহিনীর কড়া নজরদারির আওতায় থাকা পাহাড়ে নারী ধর্ষিতা হয়, ক্যান্টনমেন্টের নিরাপদ বলয়ের কাছে নারী ধর্ষিতা হয়, তখন সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তা চেপে যাওয়া আর বিচিত্র কি? এই সমাজে, এই রাষ্ট্রে প্রত্যেকের ভাবমূর্তি আছে। ভাবমূর্তি নেই কেবল নারীর! ভাবমূর্তি নেই কেবল ধর্ষিতার! তাই কোনো কোনো মিডিয়াও ধর্ষিতার নগ্ন ছবি প্রকাশ করে তৃপ্তিবোধ করে। ধর্ষকের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়ার ভয়ে কোথাও প্রকাশ করা হয় না তার ছবি, তার পরিচয় প্রকাশে সর্বত্র নিñিদ্র নিরাপত্তা বজায় রাখা হয় অলৌকিকভাবে!

নষ্ট মানুষ, নষ্ট মগজ এই ধর্ষকরা লুকিয়ে থাকে পরিবারে, সমাজে, শিক্ষাঙ্গনে, কর্মক্ষেত্রে, প্রশাসনে সমাজ-রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অথচ তাদের পরিচয় শনাক্ত ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ নয়, আরো উজ্জ্বল ও আস্থায় নিরাপদ অঙ্গন হয়ে উঠতো আমাদের জন্য। দিনের পর দিন নিরাপত্তাহীনতায় বেড়ে উঠতে হতো না হাজারো স্মৃতিকণা কিংবা কল্পনা চাকমাকে। ধর্ষণ ও খুনের প্রতীক হয়ে উঠতো না হাজারো তনু।

মাতৃময়ী প্রধানমন্ত্রী, আজ তনুদের মায়েদের জায়গায় নিজেকে স্থাপন করে ভেবে দেখুন- আপনি কি পারেন এমন নীরব থাকতে? ২০ হাজার টাকা আর একখণ্ড জমি (মর্যাদা বলে হয়তো বা আরো অধিক)! কি পারে মায়ের বুকের আর্তনাদ থামিয়ে দিতে? ধর্ষকদের (সে যে-ই হোক না কেন) শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না করে আপনি কি পারেন রাতে ঘুমাতে? যদি না পারেন, তবে খুঁজে বের করুন ধর্ষকদের। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন তাদের।

ধর্ষক একদিনে তৈরি হয়নি। তাই এক শেখ হাসিনার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয় রাতারাতি সমগ্র বাংলাদেশকে ধর্ষণমুক্ত ঘোষণা করা। আমরা কেবল চাই ক্ষমতা আর সদিচ্ছা দিয়ে আপনি তার শুরুটা করুন। যেমন করে এই বাংলায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য শুরু করেছিলেন আপনি। সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ধর্ষণমুক্ত হোক আমার স্বদেশ। নারীবান্ধব বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার। হাজারো প্রি-ভিকটিম তনুর মুক্তির ইশতেহার লেখা হোক আপনারই হাতে। ক্ষমতা, উন্নয়ন আর অগ্রগতির সমান্তরালে আজ থেকে লিখিত হোক নারী নিরাপত্তার সূচকও। তনু হত্যার বিচার দিয়েই না হয় শুরুটা হোক।
প্রিয় নেত্রী, আমরা অপেক্ষায় আছি। হাজারো প্রি-ভিকটিম তনু নিরাপত্তার অপেক্ষায় আছে। ভোটের রাজনীতিতে অর্ধেক জনগণ এরা একেবারেই ফেলনা নয় নিশ্চয়ই?ভোরের কাগজ

রুমী আহমেদ : কবি ও লেখক।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই