মেইন ম্যেনু

প্রধান বিচারপতির মেধাবী সহপাঠী আজ ভবঘুরে অপরাধী!

বয়স্ক মানুষটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন বিচারক থমাস মোলে। আমেরিকার ডিসি সুপিরিয়র কোর্টে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আলফ্রেড পোস্টেল। তার চুল মাঝারি ছাঁটে কাটা। পরনের প্যান্ট ছাপিয়ে উপচে পড়েছে ভুঁড়ি। সাদা এলোমেলো দাড়ি মুখে। সিজোফ্রেনিয়ার রোগী আলফ্রেড। তার অপরাধ, ওয়াশিংটনে একটি অফিস ভবনের পাশে ঘুমিয়ে ছিলেন। মূলত ভবঘুরে মানুষ তিনি।

আদালতে ডেপুটি ক্লার্ক বললেন, আপনার চুপ করে থাকার অধিকার আছে। তবে যা বলবেন তা আপনার বিরুদ্ধে যেতে পারে।

অভিযুক্ত পোস্টেল বললেন, আমি একজন আইনজীবী।

এ কথায় পাত্তা দিলেন না বিচারক মোলে। পাগলাটে মানুষটির দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন। ভাবলেন, পাগলে কি না বলে!

বলতে থাকলেন পোস্টেল, আমি ক্যাথোলিক ইউনিভার্সিটি থেকে বার অ্যাট করেছি। ১৯৭৯ সালে কনস্টিটিউশন হলে অ্যাটর্নি হিসাবে শপথ নিয়েছিলাম। ১৯৭৯ সালেই আমি হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন নিয়েছি।

এবার নড়েচড়ে বসলেন বিচারক। তিনি নিজেও হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে ১৯৭৯ সালে গ্র্যাজুয়েশন নিয়েছেন। ঝট করে মনে পড়ে গেলো। বললেন, আমিও সেখান থেকে পাস করেছি এবং আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি।

এই ভরঘুরে মানুষটি পলিথিন ব্যাগে করে তা কয়েকটি কাপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ান। নিউ ইয়র্কের সেভেনটিনথ স্ট্রিটে কথনো পড়ে থাকেন। মাঝে মধ্যে একটি চার্চে ঘুমান। এই ভবঘুরে মানুষটি ১৯৭৯ সালে শুধু থমাসের সঙ্গেই নয়, তিনি আমেরিকার প্রধান বিচারপতি জন জি রবার্টস জুনিয়র এবং উইনকিনসনের সাবেক সিনেটর রাস ফিনগোল্ডের সহপাঠি ছিলেন।

সাংবাদিকদের কোনরকম সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি পোস্টেল। সহপাঠী বিচারক তাকে ডিসি জেলে পাঠানোর রায় দিয়েছেন।

আমেরিকায় অসংখ্য ভবঘুরে মানুষ আছেন। এদের মধ্যে পোস্টেলকে সবচেয়ে শিক্ষিত বলে ধরে নেওয়া যায়। তার মায়ের অ্যাপার্টমেন্টে রয়েছে ডিপ্লোমা, পুরস্কার এবং নানা সার্টিফিকেট। অ্যাকাউন্টিং, ইমোনমিকস এবং আইনের ওপর তার তিনটি ডিগ্রি রয়েছে।

১৯৪৮ সালে জন্ম তার। মা পোশাক সেলাই করতেন। বাবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শামিয়ানা টাঙানোর কাজ করতেন। বাবা-মায়ের স্বপ্নের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে যাচ্ছিলেন পোস্টাল। কোলিজ হাই স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে স্ট্রেয়ার কলেজ থেকে অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি লাভ করেন। সিপিএ পরীক্ষায় পাস করে অডিট অফিসার হিসেবে চাকরি শুরু করেন লুকাস অ্যান্ড টাকার প্রতিষ্ঠানে। তার বছরে বেতন ছিল ৫০ হাজার ডলার। এরপর ইকোনমিকসে ডিগ্রি নেন ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড থেকে। এরপর হার্ভার্ড-এ আইনে ভর্তি হন।

সেথেসডা সফটওয়ার্কের খ্যাতিমান অ্যাকাউনটেন্ট ই বার্নস ম্যাকলিনডন তার মন্তব্যে পোস্টেল সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘আপনি সাফল্যের যে পর্যায়ে উপনীত হয়েছেন তা কয়েক বছর ধরে আমার নজর কেড়েছে’। এই সার্টিফিকেটটি ফ্রেমে বন্দি করেছেন পোস্টেল।

হার্ভার্ড ল স্কুলের শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে বলা হয়, এরা সবাই খ্যাতির আগের অবস্থানে রয়েছেন। সেখানে ছিলেন বর্তমানের প্রধান বিচারপতি রবার্টস, এনএফএল-এর এক সময়ের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট রে অ্যান্ডারসন এবং ওই সময় ব্ল্যাক ল স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য আলফ্রেড পোস্টে। দারুণ মেধাবী ছিলেন তিনি। শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতেই তার ভবিষ্যতটাকে উজ্জ্বল দেখছিলেন সবাই। প্রতিভা ও পরিশ্রম দিয়ে হার্ভার্ডের সেরা ছাত্রদের একজন ছিলেন পোস্টেল।

হার্ভার্ড পাস করার পর বিখ্যাত আইন প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। কেতাদুরস্ত জীবনযাপন করতেন, জানালেন ওই প্রতিষ্ঠানে সাবেব সহকর্মী ফ্রেডরিক ক্লেইন।

আজ এই অবস্থার জন্যে তার অসুস্থতাকে দায়ী বলে মনে করছেন পোস্টেলের বহু সাবেক সহকর্মী এবং সহপাঠী। সিজোফ্রেনিয়ার কারণে তিনি ধীরে ধীরে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকলেন। স্বজন, বন্ধু, পরিচিত মহল থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। তবে তার অসুখটা দ্রুত প্রভাববিস্তার করেছে বলে মনে করেন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান গ্রিন ডোরের পরিচালক রিচার্ড বিবোট। মানসিকভাবে দ্রুত ভেঙে পড়েন পোস্টেল।

মা ফেরাতে পারেননি তিনি। জানালেন, রাতে হঠাৎ করেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেত পোস্টেল। মা পেছনে পেছনে দৌড়াতেন। কিন্তু ফেরাতে পারতেন না। এক সময় পুরোপুরি ভরঘুরে হয়ে গেলেন তিনি। কয়েকবার ছোটখাটো অপরাধে আটক হন তিনি। এর বাইরে তার জীবনটা পুরোপুরি ভুতুড়ে।

আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারক মোলেকে চিনতে পারেনটি পোস্টেল। তবে পরে প্রধান বিচারক রবার্টসকে চিনতে পারেন। স্মৃতিতে উঠে আসে হার্ভার্ড স্কুলের কথা। সূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট






মন্তব্য চালু নেই