মেইন ম্যেনু

প্রশংসার ছলে মেধাবীদের হেয় ও মিডিয়ার দায়

প্রতিবছর যখন পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি কিংবা এইচএসসি/সমমানের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয় তখন দেখা যায় অনেক অস্বচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারের তথা খেটে খাওয়া মানুষের ছেলেমেয়েরা ভাল ফলাফল করে থাকে। এবারও এর কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। এটা সত্যিই আমাদের ভালো লাগার বিষয়, গর্ব ও অহংকারের বিষয়।

এই ভালো লাগার মধ্যে মধ্যেও অনেক বেশি খারাপ লাগার বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো এদেরকে নিয়ে নানাভাবে সংবাদ উপস্থাপন করে থাকে। ফলাফল প্রকাশের পরপরই আমরা সংবাদপত্রে দেখি ” রিক্সাওয়ালা, ঝাড়ুদার, ভিক্ষুকের ছেলে, গৃহপরিচারিকার ছেয়ে কিংবা মেয়ে জিপিএ ফাইভ পেয়েছে” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করতে। জানি না, মিডিয়াতে যারা কাজ করেন তারা বিষয়টি নিয়ে কিভাবে চিন্তা করেন। তবে এই সংবাদগুলো আমাকে দারুণভাবে আহত করে । কারণ এখানে শিশুদের মেধার পরিচয় এর চেয়ে তাদের বাবা-মায়ের সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিকভাবে তারা কতটুকু শক্তিশালী কিংবা দুর্বল সেটাই বেশী প্রকাশ পায়। যা আমার দৃষ্টিতে খুবই নিন্দনীয়।

কারণ যখন আমাদের সমাজের কোন ঘুষ খোর, দুর্নীতিবাজ, চোরাকারবারী কিংবা সন্ত্রাসীর ছেলেমেয়ে পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করে কিংবা কোন অপরাধ করে তখন কিন্তু তাদের পরিচয় এইভাবে প্রকাশ করা হয় না। সে ক্ষেত্রে তাদের মানসম্মানের কথা বিবেচনায় নেয়া হয়। তাহলে কেন কেবল “দরিদ্র জনগোষ্ঠির ছেলেমেয়েদেরকে প্রশংসা করার ছলে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়?

এইতো ক’দিন আগে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো। ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন সংবাদপত্রে এদেরকে নিয়ে নানা শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত কয়েকটি শিরোনাম নিম্নে তুলে ধরা হলো- দৈনিক জনতার শিরোনাম ‘সুন্দরগঞ্জে রিকশা চালকের মেয়ের জিপিএ-৫ লাভ’, দৈনিক দিনকালে প্রকাশিত ‘রিক্সা চালক মজিদ জিপিএ-৫ পেয়েছে ’, দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম ‘আঁধার ঘরে চাঁদের আলো’, দৈনিক মানবকণ্ঠের শিরোনাম ‘দারিদ্রতাকে পরাজিত করে গোল্ডেন পেয়েছে জাহিদ’, দৈনিক যুগান্তরের শিরোনাম ‘বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে সাফল্য’। আবার কিছু কিছু মিডিয়ায় এও সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে যে ‘মায়ের ভিক্ষার টাকায় ছেলে কিংবা মেয়ের জিপিএ ৫’। এছাড়া রাজমিস্ত্রির ছেলে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে, দিনমজুরের মেয়ের জিপিএ ৫, সবজি বিক্রেতার ছেলে গোল্ডেন জিপিএ৫ পেয়েছে ইত্যাদি।

এসব শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিটি সংবাদেই কোনো না কোনোভাবে ওইসব মেধাবী সন্তানদের পিতামাতার আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং তাদের দারিদ্রতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। কেন এসব শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে তার জবাবে হয়তো ওই মিডিয়ার কর্তৃপক্ষ কিংবা সাংবাদিকরা বলবেন- এর মাধ্যমে তাদের মেধার প্রশংসা করা হয়েছে অথবা তাদের ভবিষ্যৎ লেখাপড়া যাতে চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য সমাজের বিত্তবান কিংবা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এমনটি করা হয়েছে ইত্যাদি নানা যুক্তি উপস্থাপন করবেন।

কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পর ওইসব সাংবাদিকরা কি কোনো খোঁজ রাখেন ওইসব মেধাবী ছেলেমেয়েদেরকে সমাজের ধনবানদের কয়জন তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন? অথবা সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা কি ওইসব পরিবারের সদস্যদের সম্মতি নেয়ার কথা ভাবেন? কিংবা ওইসব পরিবার ও তাদের মেধাবী সন্তানদের মানসম্মানের বিষয়ে কি একবার চিন্তা করেন? আমরা জানি, খেটে খাওয়া মানুষদের সর্বদা জীবনের সাথে যুদ্ধ করেই চলতে হয়, বর্তমানের কুলষিত নিষ্ঠুর সমাজে এসব সংবাদে তাদের কতটুকু লাভ হয় তা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। ফলে এসব সংবাদে মেধার প্রশংসার আড়ালে সমাজের শত শত মানুষকে কিভাবে হেয় করছি তা কি আমরা একটু ভেবে দেখেছি?

প্রসঙ্গত, গেল বছরের গোড়ার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবে বসে আমার পরিচিত একজন ভদ্র ধনবান নারীর সাথে বসে চা পান করতে করতে খোশগল্প করছিলাম। এর ফাকেঁ তিনি বললেন – তার ভাই আমেরিকা থেকে কিছু টাকা পাঠিয়েছেন দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেয়ার জন্য। তাই তিনি দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের খোঁজছেন। আমার কাছে এমন মেধাবীদের সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন আমি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘ইশ্বরগঞ্জের সবজি বিক্রেতার দুই মেধাবী মেয়ের মেডিকেলে চান্স’ শিরোনামে সংবাদটির প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম।

তিনি আমার কাছে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে ওই পত্রিকার প্রতিবেদকের সাথে কথা বলে তথ্য নিয়ে ওই ভদ্রমহিলাকে দিলাম। অবশেষে দেখা গেল ওই ভদ্রমহিলা যখন তাদের কাছে গিয়ে আর্থিক সহায়তার কথা বললেন তখন তারা অনেকটাই মন খারাপ করলেন। অর্থাৎ তারা কোনো আর্থিক সহায়তা নিতে রাজি হলেন না।এতে ওই ভদ্র মহিলা মন খারাপ করে ফিরে এলেন। এতে বুঝা গেল- দরিদ্র হলেই যে সবাই সাহায্য-সহযোগিতা নিতে চান এমনটি নয়। কেননা তাদের অনেকের কাছে আত্মসম্মানবোধটা অনেক বড়।

আমি মনে করি, সংবাদ কর্মীদের বিষয়টি মাথায় রেখেই সংবাদ করা উচিত । আমি কাউকে এইভাবে প্রশংসা করতে দিতে ইচ্ছুক নই, যার ফলে কেউ ছোট হয়ে যায় । প্রকৃত অর্থে তাদের মেধার প্রশংসার ছলে মিডিয়া তাদেরকে সামাজিকভাবে হেয় করে ফেলে। এরফলে পরবর্তীতে অনেকেই স্কুল কলেজে গিয়ে নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে কষ্ট হয়।

একবিংশ শতাব্দীতে এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে মিডিয়াতেও এসেছে অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন, সংবাদ উপস্থাপনাও এসেছে বৈচিত্র্যতা। ফলে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও মিডিয়াগুলোও ভিন্নতা নিয়ে আসতে পারে, সেক্ষেত্রে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান নয়, তাদের অদম্য স্পৃহা ও মেধার কথাই ফুটে উঠবে। আশা করি মিডিয়া কর্তৃপক্ষ ও সাংবাদিকরা এ ব্যাপারে যত্মবান হবেন।

লেখক : গবেষক ও কলামলেখক। ই-মেইল : [email protected]






মন্তব্য চালু নেই