মেইন ম্যেনু

প্রাণঘাতী আরেক ভাইরাস লাসসা

পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোয় প্রকোপ বিস্তারকারী এক ভাইরাসের নাম লাসসা।সবচেয়ে বেশি প্রকোপ দেখা যায় বেনিন, গিনি, লাইবেরিয়া, সিয়েরালিয়ন এবং নাইজেরিয়ার কিছু অংশে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় কেন্দ্র (সিডিসি) বলছে, লাসসা জ্বরে পশ্চিম আফ্রিকায় প্রতিবছর ১-৩ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়। গড়ে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এ জ্বরে। নাইজেরিয়ায় চলতি বছরেই তীব্র রক্তপ্রদাহজনিত এ জ্বরে ভুগে মারা গেছে ১০১ জন। ভাইরাসটি সম্পর্কে যা জানা দরকার, তা নিয়েই এ প্রতিবেদন।

উৎপত্তি ও নামকরণ

যদিও ১৯৫০ এর দশকেই লাসসা ভাইরাসের কথা শোনা গিয়েছিল, তবে ১৯৬৯ সালের আগ পর্যন্ত ভাইরাসটির আক্রমণে লাসসা জ্বরের রোগী চিহ্নিত হয়নি। সে বছর নাইজেরিয়ায় লাসসা জ্বরের খবর পাওয়া যায়। দেশটির উত্তর-পূর্ব প্রদেশ বর্নোর একটি শহরে লাসসা রোগীর সন্ধান মেলে। ওই শহরের নাম লাসসা। শহরের নামেই ভাইরাসটির বা জ্বরের নাম রাখা হয় লাসসা। লাসসা হলো এক সূত্রক আরএনএ ভাইরাস যা অ্যারেনাভিরিডি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

দায়ী ইঁদুর

মাস্তোমিস নাতালেন্সিস নামের ইঁদুর থেকে লাসসার উৎপত্তি। আক্রান্ত ইঁদুরের ছোঁয়ায় কেউ আক্রান্ত হবে না। তবে ওই ইঁদুরের মলমূত্র খাবারে মিশে গেলে, সেই খাবার খেয়ে আক্রান্ত হতে পারে যে কেউ। প্রায় ৮০ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি পাঁচ জনে একজন লাসসা জ্বরে ভুগতে পারে। এতে যকৃত (লিভার), প্লিহা ও বৃক্ক (কিডনি) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন থাকলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। সুপরিকল্পিত চলাফেরা করলে এর থেকে দূরে থাকা সম্ভব।

লক্ষণ ও সমস্যা

জীবাণু দেহে প্রবেশের ৬-২১ দিনের মাথায় লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণ হলো: প্রথমে জ্বর হয়। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। অস্বস্তি বোধ হয়। কিছুদিন পর মাথা ব্যাথা শুরু হয়, গলায় ঘা হয়, পেশিতে ব্যাথা করে। বুকে ব্যাথা হয়, অরুচি দেখা দেয় সবকিছুতেই। বমি আসতে পারে। ডায়রিয়া হতে পারে। কাশি ও পেটে ব্যাথা হতে পারে। ফুসফুসে জল জমতে পারে। মুখ, নাক ও যোনিপথ দিয়ে রক্ত পড়তে পারে। নিম্ন রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। ২৫ ভাগ রোগী কানে কম শুনতে পারে। শ্রবণ শক্তি ফিরতে ১-৩ মাস লেগে যেতে পারে। সেরে ওঠার সময় চুল পড়ে যেতে পারে। ১৪ দিনে মাথায় লাসসা জ্বর মৃত্যুর কারণও হতে পারে। বিশেষভাবে ক্ষতি হয় গর্ভবতী মায়েদের। এক্ষেত্রে মাতৃমৃত্যুর হার বাড়ে ও শিশুর জন্ম অস্বাভাবিক হতে পারে।

বিস্তার

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ইঁদুর থেকে লাসসা ভাইরাস ছড়ায়। আক্রান্ত ইঁদুরের মলমূত্রের সংস্পর্শে থাকা খাবার খেলে এ ভাইরাস মানুষে সংক্রামিত হয়। আক্রান্ত ইঁদুরের রক্তের সংস্পর্শেও মানুষে সংক্রামিত হতে পারে লাসসা। এই জীবাণু মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। এমনকি গবেষণাগারে এ ভাইরাস নিয়ে কাজ করার সময় কিংবা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার সময় এটি ছড়াতে পারে যদি যথেষ্ট প্রতিরোধী ব্যবস্থা নেওয়া না হয়। যেমন আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সুচ যদি কোনো সুস্থ ব্যক্তি ব্যবহার করে তবে তার দেহেও লাসসা ঢুকে যাবে। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে অরক্ষিত যৌনমিলনেও এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। লাসসা জ্বর সব বয়সী মানুষের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে যারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে তাদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি।

চিকিৎসা ও টিকা

এখন পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত ইঁদুর নিয়ে গবেষণাগারে কাজ হচ্ছে। ভাইরাসটির কার্যপ্রণালী ও ছড়িয়ে পড়ার গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে। তবে এখনো দরকারি কোনো টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিকার

যেহেতু লাসসার কোনো টিকা নেই। তাই এর থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো সাবধানতা অবলম্বন। আক্রান্ত ইঁদুরকে কোনো ভাবেই বাড়িতে প্রবেশ করতে না দেওয়া। আর যেহেতু বোঝার উপায় নেই কোন ইঁদুরটি আক্রান্ত তাই মাস্তোমিস নাতালেন্সিস জাতের ইঁদুর মাত্রই এড়িয়ে চলতে হবে। কিন্তু পরিবেশ থেকে ইঁদুরকে পুরো নির্মূল করা সম্ভব নয়, ঠিকও নয়। ফলে খাবার-দাবার নিরাপদে রাখতে হবে যেখানে ইঁদুর যেতে পারে না। ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত কিংবা দেহের কোনো তরল পদার্থ কোনো ভাবেই স্পর্শ করা যাবে না, কেননা এসবে লাসসা জীবাণু থাকে যা ছোঁয়ামাত্র সংক্রমণযোগ্য।

আক্রান্ত দেশগুলো থেকে ঘুরে আসা পর্যটকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। পর্যটকের শরীরে লাসসার অস্তিত্ব ধরা পড়লে তাকে আলাদা রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই কেবল ভাইরাসটি পশ্চিম আফ্রিকা থেকে অনত্র ছড়িয়ে পড়তে পারবে না।

তথ্যসূত্র : ডব্লিউএইচও (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা), উইকিপিডিয়া






মন্তব্য চালু নেই