মেইন ম্যেনু

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকেই বলছি…

কোন জায়গা থেকে কথাটা শুরু করবো, তা এখনও নির্দিষ্ট করতে পারিনি, কিন্তু মনের মধ্যে জমে পুঞ্জীভূত হয়েছে হাজারও ক্ষোভ। দিনে দিনে বিষয়গুলো এতদূর গড়িয়েছে যে, আর কিছুই চাওয়ার নেই আপনার কাছে।

বিশেষ করে আমার নামের পিছনে যখন ‘ধর’ নামে পিতৃপ্রদত্ত এইটা টাইটেল থাকে, আমি যখন অন্য দশজনের চেয়ে একটু আলাদা চিন্তাভাবনা করি, যখন বিক্রি হই না কোনো মূল্যেই, তখন আপনার প্রতি আমার এখন অভিমান আর কাজ করে না। বরং প্রচণ্ড ক্ষোভ, বিদ্রোহ জন্মে আপনার প্রতি।

ভাবতে অবাক লাগে এই ভেবে যে, আপনাকেই অনেকে আদর করে ‘শেখের বেটি’ বলে, আপনি বঙ্গবন্ধু তনয়া। এইটুকু যদি আজ অস্বীকার করতে পারতাম, তাহলে হয়তো মনে শান্তি পেতাম। আপনি যদি জাতির জনকের কন্যা না হয়ে রাম-সাম-যদু-মধুর (মধু আবার আমার বাবার নাম) মেয়ে হতেন, তাহলেও শান্তি পেতাম এই ভেবে যে, আপনার কাছে আমাদের কোনো প্রত্যাশা নেই।

আজকেই একটা খবর দিল পাহাড়ের একটি ছেলে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে খাগড়াছড়িতে পাহাড়িদের ওপর যে নির্মম নির্যাতন (অবশ্য এটা ওখানকার নৈমিত্তিক ঘটনা) করা হয়েছিল, তার শিকার একটি ছেলে আজ সকালে হাসপাতালে মারা গেছে। ওরা তো প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন মরছে, তাই না? ওদের নিয়ে শোক করার কিছু নেই। কে না কে ওই ছেলে, পাহাড়ের বাসিন্দা, নাক বোঁচা, কিরকম ভাষায় কথা বলে, কী খায় না খায়, ওদের ওখানে থাকারই কী দরকার! তাছাড়া একুশের চেতনায় সারাদেশ যখন সাদা-কালো হয়ে আছে, সেখানে রক্তের দাগ লাগাতে কেই বা চায়। তাই কারও কোন উচ্চবাচ্য দেখিনি এ নিয়ে। যেমন হয় না পাহাড়ি মেয়েরা প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হলেও। তারা তো আমাদের কেউ না। তাই না?

বরং পাহাড়টাকে নয়নাভিরাম করাই শ্রেয়। লোকজন যাবে পাহাড়ে, নান্দনিক সৌন্দর্যে সবাই প্রলুব্ধ হবে, কেউ কেউ এতোটাই প্রলুব্ধ হবে যে, পাহাড়ি মেয়েকে সান্নিধ্যে পাওয়ার খায়েশও জাগতে পারে। তখন সেখানে প্রশাসনের মদদেই গড়ে উঠবে সেক্স বাণিজ্য। ক্ষতি কী? সেনাবাহিনীকে আপনি অগাধ প্রশ্রয় দিয়ে দিলেন পাহাড়কে সাজানোর। তারাও সাজাচ্ছে মনের মতো করে। তুলে দিচ্ছে সেখানকার আদি বাসিন্দাদের, জায়গা করে নিচ্ছে অন্য জায়গা থেকে যাওয়া ভাড়াটিয়া গুণ্ডা বাঙালীরা। বিশ্বাস করুন প্রধানমন্ত্রী, আমি নিজেও সাংবাদিক। যে দশটা সাংবাদিক ওইসব সেনাবাহিনীর সাথে উঠবস করে, প্রায়ই সেখানে বেড়াতে যায় তাদের অতিথি হয়ে, বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হয় নানাভাবে, আমিও যদি ওদের মতন হতাম, তাহলে আজকের এই চিঠি আমি আপনাকে লিখতাম না। বরং আপনার গুণগান করে আপনার সাথে মিশে থেকে সেলফি তুলতাম। জনগণকে দেখাতাম, দেখো, আমি কত ক্ষমতাশালী।

এই ক্ষমতা কিন্তু আখেরে উপকারে আসে। কতজন নানাকাজে ধর্না দেয়, মোটা অংকসহ প্যাকেট চলে আসে বাসায়, গাড়ি বদল হয়, ফ্ল্যাট হয়, বাগানবাড়ি হয়। আমার জানামতে কম দেশই আছে, যেখানে সাংবাদিকরা এভাবে বিক্রি হয়ে যায় নিজের পেশার আদর্শ ভুলে। আসলে খুব ছোটো পরিবার থেকে উঠে এলেই উপরে উঠার একটা তাগিদ থাকে অনেকের, সেই লোভ সামলানো কঠিন অনেকের জন্য।

যাকগে, অন্য কথায় আসি। একুশে ফেব্রুয়ারির দিন সমস্ত দেশ যখন চেতনায় চেতনায় পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে, তখন কিন্তু একজন পুরোহিতের রক্তে লাল হয়েছে তার বারান্দা। আপনি তো অবশ্যই শুনেছেন, হত্যাকারীরা বলেছিল, ‘আনন্দে আছিস, গান করিস’, বলেই তারা গুলি চালায়। এ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তেমন তোলপাড় নেই। সবার কাছেই আজকাল সবকিছুই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে গেছে।

এবার আপনিই বলুন প্রধানমন্ত্রী, ওই গরীব সংখ্যালঘু পুরোহিত পরিবারের কী আনন্দে থাকার কথা? সে তো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের, তার থাকার কথা মাথা নিচু করে, যেন এইদেশ তাকে দয়া করে থাকতে দিয়েছে, তাতেই তার ধন্য থাকার কথা। সে এমন একটি দেশের মানুষ (?), যে দেশের সংবিধানেই লেখা আছে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’। সংবিধানের শুরু বিসমিল্লাহ দিয়ে। কাজেই যতোই ধর্মনিরপেক্ষতার ভাণ আপনারা করুন না কেন প্রধানমন্ত্রী, আপনি নিজেও ধর্মনিরপেক্ষ নন। হলে আজ এইদেশে এতোবড় অনাচার চলতে পারতো না।

আজকেও পত্রিকায় দেখলাম, নীলফামারীতে দুটি হিন্দু বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে, পুড়ে গেছে সাত-সাতটি ঘর। এই মানুষগুলোর অন্যায় কোথায় ছিল, বলতে পারবেন প্রধানমন্ত্রী? সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এখন প্রতিদিন হামলা হচ্ছে, জায়গাজমি দখল হয়ে যাচ্ছে, কাফেলা বাড়ছে কাঁটাতারের বেড়ার দিকে। আপনার কী সেই ভাবনা আছে প্রধানমন্ত্রী? আপনি তো কোনদিন শরণার্থী হোননি, কি করে বুঝবেন শরণার্থী হওয়ার যন্ত্রণা কী?

আপনি পিতামাতা, স্বজন হারিয়েছেন, এটা ভেবে আমাদেরও বুক ভেঙে যায়। আমিও একাত্তরে বাবাকে হারিয়েছি বাবা জিনিসটা বুঝার আগেই। কিন্তু স্বজন হারানোর কষ্ট আমার বুকে যতটা বাজে, আমি নিশ্চিত, আপনার ততটা বাজে না। রাজনীতি করতে গিয়ে আপনি আজ কঠিন হয়ে গেছেন। আপনার মাতৃত্ব, ভ্রাতৃত্ব সবই নিজেদেরকে ঘিরে, জনমানুষকে ঘিরে নয়।

একবার বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনি আমাদের ছোট্ট বাচ্চা মেঘের মধ্যে রাসেলকে দেখতে পান? আমি বলবো, পান না। আপনি অনেক স্বার্থপর প্রধানমন্ত্রী। নিজেরটা বোঝেন ষোলআনা, অন্যের দু:খকষ্ট আপনাকে ছুঁয়ে যায় না। তাই অন্যের কষ্টে আপনি সহজেই নির্লিপ্ত থাকতে পারেন। একজন দেশনায়ক হিসেবে তো এটা আপনার কাছে কাম্য নয়।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, যারা আমরা শাহবাগ আন্দোলনের সাথে ছিলাম, রাজাকারদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পরে থেকেছি কী একটা হুজুগে মেতে, আজ আমরা দেশান্তরি হচ্ছি কেন একে একে? বলতে পারবেন? একজন জামায়াতে ইসলামি সদস্যও কিন্তু দেশ ছাড়েনি, তাহলে আমার সুহৃদ-বন্ধুরা কেন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কেন চলে যাচ্ছে? অন্যদিকে বহাল তবিয়তে থাকছে আমাদের মানে দেশের বিরোধীরাই। আমি বলবো, আপনিই সেই সুযোগ করে দিচ্ছেন। আপনিই দায়ী সেইজন্য।

আমি একজন শহীদ পরিবারের সন্তান। মুক্তিযুদ্ধ মানে আমার মায়ের সারাজীবনের লড়াই, আমার বেড়ে উঠা, আমার জীবন, আমার যাপন, আমার ধ্যান, আমার জ্ঞান। এর বাইরে কিছুই বুঝি না আমি। আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে শুধুই একটি দেশের স্বাধীনতা না, এইদেশের প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা, প্রতিটি ধর্মের স্বাধীনতা, সবরকমের স্বাধীনতা।

কিন্তু প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, একবার আপনি ক্ষমতার বলয় ছেড়ে আমাদের কাতারে এসে দাঁড়িয়ে দেখুন আমরা কেমন আছি সাধারণেরা, আপনাদের ভাষায় সংখ্যালঘুরা, পাহাড়িরা, ভিন্ন মতাবলম্বীরা।

একটা কথা বলুন তো প্রধানমন্ত্রী, এইদেশ তো একটা গণতান্ত্রিক দেশ, তাই না? আপনিই তো বলেন। আমরা সবাই তাই দাবিও করি। তাহলে এখানে ভিন্নমত কেন সহ্য হয় না? কেন করেন না আপনারা? কারাগারে বিনা বিচারে বছরের পর বছর ধরে কত-শত নির্দোষ মানুষ দিন কাটাচ্ছেন, আপনি জানেন? জানেন না। এই খবর আপনার চাটুকাররা আপনাকে দেয় না। ডেইলি স্টার সম্পাদককে নিয়ে দেশজুড়ে যা শুরু হয়েছে, আপনি বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনার নিজেরই কী ভাল লাগছে? মনে হচ্ছে, যা হচ্ছে তা ঠিকই হচ্ছে? বলুন প্রধানমন্ত্রী। একটা দেশ আর কত নিচে নামবে? মান-ইজ্জতের আর কিছুই রইলো না প্রধানমন্ত্রী।

অনেক আশা-ভরসা নিয়েই কিন্তু ২০০৮ সালের (২০০৮ সালটা জোর দিয়েই বললাম) নির্বাচনে তরুণরা আপনাকে, আপনার দলকে নির্বাচিত করেছে, আপনার ব্যক্তিগত দৃঢ়তার কারণেই আজ এই দেশে রাজাকারদের বিচার হচ্ছে, এ পর্যন্ত সব ঠিক আছে। তারপর?

শুধুমাত্র রাজাকারদের বিচার দিলেই তো আজকের ৪৪ বছর বয়সী দেশের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হলেও যে সংখ্যক হিন্দু এইদেশটাকে নিজের ‘বাংলাদেশ’ মনে করে থেকে গিয়েছিল, পরবর্তী ২৪ বছর, এবং তারও পরের এই ৪৪ বছরে সেই সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, আপনি খবর রাখেন?

আমরা সাধারণের সাথে মিশি। সবাই সুযোগ খুঁজছে চলে যাওয়ার। থাকছে তারাই যাদের আপনি এবং আপনারা ক্রিম খাওয়াচ্ছেন। তারা অপার আনন্দে আছে চোখ-কান-মুখ-বিবেক বন্ধ রেখে। তাদের কাছে আমার মতন সাধারণ মানুষের আর্তি কোনদিন পৌঁছাবে না। আপনি তাদের বধির করে রেখেছেন আপনারই স্বার্থে।

বাহ, প্রধানমন্ত্রী, বাহ্। আজ এইদেশটাকে আমার আর নিজের দেশ, আমার বাবার দেশ, মায়ের দেশ বলে মনে হয় না। আমি এক আগন্তুক এখানে আজ।

সুপ্রীতি ধর, সম্পাদক, উইমেন চ্যাপ্টার






মন্তব্য চালু নেই