মেইন ম্যেনু

প্রেমের টানে ইতালি থেকে বাংলাদেশে, হলেন মুসলিম

তাহমিনা ইয়াসমিন শশী: এইতো সেদিন পাদোভা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার পথে হঠাৎ পেছন থেকে একটা ডাক শুনতে পেলাম। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলাম একটা মেয়ে আমার দিকেই আসছে। আমাকে প্রশ্ন করল, আপনি কি বাঙালী? উত্তরে বললাম, হ্যাঁ। এবার মেয়েটি বলল, কলকাতার বাঙালি? আমি বললাম না, একদম খাঁটি বাংলাদেশের বাঙালি। মেয়েটি হেসে তার নাম বলল, সনি। এই ভার্সিটিতেই ইকোনোমিক্স প্রথম বর্ষে পড়ছে। জানতে চাইলো আমি কী পড়ছি। বললাম, ফিজিওথেরাপি, ২য় বর্ষ। যদিও আমি সবসময় এখানে আসি না, মানে আসতে হয় না। ভেনিসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা শাখা আছে। সেখানেই ক্লাস করার সুযোগ আছে। শুধুমাত্র পরীক্ষার সময় পাদোভায় আসতে হয়।

সনির সাথে কথার পর্ব শেষ করে বিদায় নিতে যাবো ঠিক তখনি কে যেন ওর নাম ধরে ডাক দিল। আমরা দুজনে একসাথে তাকিয়ে দেখি সাদা চামড়ার একটা লোক সনির দিকে এগিয়ে আসছে। সনি একটু হেসে বলল উনি আমার দুলাভাই, আমাকে নিতে এসেছেন। আমি একটু মজা করে বললাম, আপন দুলাভাই, নাকি পাতিয়েছেন! সনি বলল, আপন বড় বোনের স্বামী। সাদা চামড়ার লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আসসালামুআলাইকুম। আমি সনির দুলাভাই, চলেন এক সাথে কফি খাই। তার বলার আন্তরিকতা দেখে আমি ‘না’ করতে পারলাম না।

একজন ভিনদেশির মুখে নিজের ভাষায় কথা শুনে ভালোলাগায় আমার মনটা ভরে উঠলো। কফি পান করতে করতে জানতে চাইলাম কেমন কাটছে আপনাদের বৈবাহিক জীবন? আর কিভাবে একজন বাংলাদেশি মেয়েকে খুঁজে পেলেন বউ বানাতে? ইতালিয়ান এবং বাংলাদেশের ভাষা, সংষ্কৃতির কোথাও তো মিল নেই। দুটো একদমই আলাদা। কিভাবে ম্যানেজ করছেন সবকিছু? একই ভাষায় কথা বলে, একই দেশে জন্ম নিয়ে, একই সংস্কৃতিতে বড় হয়েই তো মানুষ এখন মানিয়ে নিতে পারছে না। অথচ আপনাদের কোনো কিছুতেই মিল নেই, রঙ, চেহারা, ভাষা, সংস্কৃতি সব কিছুই তো আলাদা, কি করে সংসার করছেন আপনারা?

কথাগুলো বলতে বলতে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমাদের দেশের এক ভয়াল চিত্র। সেখানে হিন্দি সিরিয়ালের মতো অসম প্রেম, প্রতারণা, পরকীয়া, তালাক বেড়ে চলেছে জ্যামিতিক আকারে। প্রতিদিনের পত্রিকা খুললেই দেখা যায় ভালোবাসার নামে নানাভাবে প্রতারিত হয় মেয়েরা। ভণ্ড প্রেমিকদের খপ্পরে পড়ে ধর্ষণের শিকার হয় তারা। ঘরে ঘরে পরোকীয়া এখন একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এক ঢাকা শহরেরই নাকি প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজার তালাকের আবেদন জমা হয়। অথচ এখানে এক ইতালিয় যুবক ভালোবেসে সংসার করছে এক বাংলাদেশি নারীর সাথে।

আমার এতোগুলো প্রশ্নের উত্তরে মাত্র একটা শব্দ খরচ করলেন সানির দুলাভাই। তা হলো- ভালোবাসা। বাংলা এবং ইতালীয়ান ভাষার মিশ্রণে বললেন, ভালোবাসার কোনো রঙ নেই, কোনো গণ্ডি নেই। আমি একটু অবাক হলাম। ইতালির মতো দেহজ সংস্কৃতির দেশের কোনো লোক যে এরকম ভালোবাসার কথা বলতে জানে, তা আমার জানা ছিল না। তাদের ভালোবাসার কথা জানতে আমার কৌতুহল আরো বেড়ে গেল। আমি বললাম কিভাবে আপনাদের ভালোবাসার শুরু হলো? সনির দুলাভাইর নাম আদি। আদির খুব কষ্ট হচ্ছিল বাংলায় কথা বলতে। অনেক শব্দই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আমি বললাম আপনি চাইলে আমার সাথে ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারেন। কিন্তু আদি বাংলাতেই কথা বলতে চাইলেন। কারণ হিসেবে জানালেন তার ভালোবাসার মানুষ বাংলায় কথা বলে। আমি বিস্মিত হলাম। বুঝে গেলাম, সখী ভালোবাসা কারে কয়!

আদি ছিলেন সনির শিক্ষক। একদিন আদি সনিদের বাসায় পড়াতে এলেন। এসে দেখেন সনি এবং তার পরিবার কান্নাকাটি করছে। সনির মন খুব খারাপ, ওইদিন সে পড়বে না বলে আদিকে জানিয়ে দিল। আদি জানতে চাইলেন কেন তাদের মন খারাপ। সনি বলল, বাংলাদেশে তার বড় বোন ছবির স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়েছে। আদি বললেন, ডিভোর্স হয়েছে তাতে মন খারাপের কি আছে? এটাতো একটা অতিসাধারণ বিষয়, যেকারো হতে পারে। সনি তখন আদিকে বুঝিয়ে বলে ডিভোর্সকে আমাদের ধর্ম, সমাজ এবং সংস্কৃতিতে কিভাবে দেখা হয়। আর তাছাড়া একটা মেয়ের জীবনে ডিভোর্স খুবই অপমানজনক বলে আমরা মনে করি। সনির বোনের একটা ছেলে আছে। কিভাবে তার ভরণপোষণ জোগাবে আর কিভাবেই চলবে সনির বোন ছবির জীবন? আদি সব শুনে ছবিকে শান্ত্বনা দেয়ার জন্য সনির কাছ থেকে ফোন নম্বর নেয়। সেখান থেকেই গল্পের শুরু।

টেলিফোনের কথা আস্তে আস্তে প্রেমে রূপান্তরিত হয়। ছবির টানে আদি ছুটে যান বাংলাদেশে। নিজের ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ছবিকে বিয়ে করেন। ছবিকে নিয়ে আসেন ইতালিতে। ছবি আহামরি কোনো সুন্দরি নারী নয়, সাথে একটা বাচ্চাও আছে। তবু কোনো কিছুই অন্তরায় মনে হয়নি আদির কাছে। কারণ আদি ছবিকে ভালোবাসেন। আদি-ছবি খুব সুখী, ওদের ভালোবাসার কাছে ভাষা, ধর্ম, বর্ণ কোনও কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আমার আরো একবার মনে হলো- সখী ভালোবাসা কারে কয়!

লেখক : ইতালির ভেনিসে কর্মরত একজন বাংলাদেশি নাগরিক।






মন্তব্য চালু নেই