মেইন ম্যেনু

ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ যেন অসম্ভব

ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ এবং অবৈধ লাইসেন্স জব্দ করতে আবার নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট। এর আগেও একাধিকবার এ ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।মাঝেমধ্যে ঘোষণা দিয়ে দেশজুড়ে অভিযানও চালিয়েছে পুলিশ ও বিআরটিএ। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির কারণে প্রায়ই বিষয়টি সামনে আসে। এরপর এগুলো বন্ধের কথা বলে সরকার। ঢাকঢোল পিটিয়ে নানা সময় চলে অভিযান। কিন্তু কদিন পর আবার আগের জায়গায় ফিরে যায় সব। মাঝে লাভের লাভ হয় পুলিশেন, ঘুষের হার বাড়ে তাদের। তবে জনভোগান্তির কথা ভেবেও মাঝে মাঝে পিছু হটেছে সরকার। অভিযান শুরু হলে নগরীতে যানবাহন কমে যাওয়ায় যাতায়াতে নগরবাসীর কষ্ট বেড়ে যায় আরও। এসব কারণেও কখনও কখনও ছাড় দিয়েছে পুলিশ।

পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিটনেরবিহীন গাড়ি বন্ধ করতে হাইকোর্টের নির্দেশনার দরকার নেই। কারণ, এমনিতেই এসব যানবাহন চলার কথা না। কিন্তু যারা এসব দেখবে সেই সরকারি সংস্থা বিআরটিএ আর পুলিশের দুর্নীতি আর দায়িত্বে অবহেলায় দিনে দিনে বেড়েই চলেছে অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা।

হাইকোর্ট নির্দেশনা দিলেও তা এখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি ও পুলিশ।

এই দুই সংস্থার সদস্যদের ভাষ্য, অবৈধ লাইসেন্স জব্দ এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ করতে হলে সময় লাগবে। এসব বললেই বন্ধ করা যায় না। এগুলো বন্ধ করতে হলে অনেক সমস্যার সমাধান করতে হবে।

সরকারি হিসেবেই দেশে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে এক লাখ অটোরিকশা-অটোটেম্পো। এরপরই ট্রাকের সংখ্যা প্রায় ৪১ হাজার। এমন বাস-মিনিবাস রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। বাকিগুলো অন্যান্য যানবাহন। বিআরটিএ সূত্র জানায়, দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২২ লাখ। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল এবং এগুলোর ফিটনেস সনদ নিতে হয় না। আর কিছু যানবাহন অকেজো হয়ে গেছে। অবশ্য ফিটনেস সনদ থাকা না-থাকা প্রায় সমানই। বাস-ট্রাকের যেগুলোর ফিটনেস সনদ আছে, এগুলোর বেশির ভাগই বিআরটিএ কার্যালয়ে না গিয়েই সনদ নিয়ে থাকে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন একদিকে যেমন সড়ক নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তেমনি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনিস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, একটা যানবাহনের ফিটনেস দিতে ৪২টি পরীক্ষা করার নিয়ম। কিন্তু সেগুলো করা হয় না। তিনি মনে করেন, সরকারি সংস্থাগুলো নিজেরা এই কাজ পারছে না। তাই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।

আগের সব উদ্যোগ ব্যর্থ

ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কখনও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না, এমন নয়। মাস দশেক আগে সারাদেশে ঘটা করে নামা অভিযানে মামলাও হয়েছিল দেদার, কম হয়নি জরিমানাও। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই। এখন সড়কে আবার সেই আগের চিত্র। ভাঙাচোরা গাড়ি চলছে সেই আগের মতোই। ফলে যাত্রীদের চলতে হচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আর কষ্ট স্বীকার করেই।

একই ধরনের উদ্যোগ এর আগেও নিয়েছিল সরকার। কিন্তু পরে আর চালু থাকেনি তা। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের ঘটা করে এসব উদ্যোগ নেওয়ার কোনো মানে হয় না। আইনের প্রয়োগে পুলিশের নিত্যদিনের ব্যর্থতা ঢাকতেই মাঝেমধ্যে ঘটা করে এমন অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে নিজেদের নাম প্রচারের পর আবার সেই আগের চিত্রে ফিরে যায়। এবারও হয়নি তার ব্যতিক্রম।

ভাঙাচোরা গাড়ি আবার সড়কে

গত ১০ নভেম্বর ঢাকার পাশাপাশি জেলা শহরেও শুরু হয় বিআরটিএর অভিযান। এই অভিযানে বেশ কিছু মামলা ও জরিমানা হলেও যাত্রীদের কতটা লাভ হয়েছে তা বলা মুশকিল। অভিযান শুরুর পর থেকে ভাঙাচোরা গাড়িগুলো নতুন করে রঙ করিয়ে নিলেও আসন নোংরা ও ভাঙাই থেকে যায়।

একটি বাসের চালক জানালেন, গাড়ির মালিকের সঙ্গে পুলিশের চুক্তি আছে। প্রতিদিনই তাদের নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিয়ে আসে। তাই গাড়ির ফিটনেস দেখে না। অভিযানের কথা বললে বলেন, প্রথম সপ্তাহখানেক চলছিল। তাই মাঝে মধ্যে আটকাইত। কিন্তু এখন সপ্তাহে একবারও আটকায় না’।

টেম্পো হিসেবে পরিচিত হিউম্যান হলারের অবস্থা আরও খারাপ। বনশ্রী রোডে চলা এ ধরনের গাড়িগুলোর বেশিরভাগই রাস্তায় চলতে চলতে থেমে যায়। রামপুরা সেতু থেকে বনশ্রী হয়ে মাদারটেক রোডে চলছে ৭০টির মতো হিউম্যান হলার। সফি আলম নামে একজন সহকারী জানান,অভিযান বলতে আর কি, প্রতিদিন তো এমনিতেই ২৫০ টাকা করে দিতে অয়। অভিযানের নাম দিয়া প্রথম কয়দিন দুই তিনবার ধরতো। ধরলেই দিতে হইত ৫০০ টাকা। আর রেকারে নিলে এক হাজারের কমে আনা যাইত না। তয় এখন আর ধরে না। আর ধরলে সপ্তায় একবার কি দুইবার। টেকা দিলে ছাইড়া দেয়’।

ফার্মগেট, শাহবাগ, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর রোডের গাড়িগুলোতে পুলিশের পরীক্ষা মানে দেখা গেল অন্য এক চিত্র। গাড়ির ফিটনেস কিংবা লাইসেন্সের কাগজ হাতে নিয়ে ভেতরটা খুলেও দেখছেন না অনেক ট্রাফিক পুলিশ। হাতে টাকা গুঁজে দিতেই ফিরিয়ে দিচ্ছেন সেই কাগজ। আর টাকা না দিলে কাগজটা খুলছেন, কিছু তথ্য, নম্বর টুকে মামলা করে দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও দেখা গেল ভাঙাচোরা বাস গাড়ি না থামিয়ে থামানো হচ্ছে অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল।

একজন চালক জানান, একদিন বাস না চললেই কয়েক হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়। তার চেয়ে পুলিশকে কয়েকটি টাকা বেশি দিলে সমস্যা নেই। আর এখন আগের মতো অভিযান হচ্ছে না’।

বিআরটিএ অবশ্য নগরীর এই চিত্র মানতে নারাজ। বিআরটিএর পরিচালক মাসুদ আলম বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অবৈধ লাইসেন্সধারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের মোবাইলে কোর্ট এ লক্ষ্যে প্রতিনিয়তই কাজ করে যাচ্ছে।’

হাই কোর্টের আদেশ এবং আপনাদের অভিযান সত্ত্বেও কেন ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের মোবাইল কোর্ট অভিযান অব্যাহত রাখছে। আশা করছি ক্রমন্বয়ে এসব বন্ধ হয়ে যাবে।’

গত নভেম্বরে ঘটা করে চালানো অভিযানের বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, সরকার যে অভিযান শুরু করেছে সেটি এবার কয়েকদিনের মধ্যে শেষ হবে না। যানচলাচলে ন্যূনতম মান আর যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত চলবে এই অভিযান। অভিযান চালু থাকলে যানবাহন সংকট যেন না হয় সে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন মন্ত্রী। ঢাকায় শিগগির বিআরটিসির আরও ২৫০টি গাড়ি নামানোর ঘোষণা দিলেও তাও নামানো হয়নি এই সময়ে।

বুয়েটের সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, আমাদের দেশে ঘটা করে কোনো কিছু করার রেওয়াজ চালু হয়েছে। এতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আর সুযোগ সন্ধানীদের সুযোগ তৈরি হয়। এবারও তাই হয়েছে। অভিযানের বিষয়টি এনফোর্সমেন্ট বা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে সারা বছর থাকা উচিত। যদি ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সারা বছর ধরে কাজ না করে তাহলে সেটা কোনো কাজে লাগে না’।

জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) খান মোহাম্মদ রেজওয়ান বলেন, ‘দুই কোটি নাগরিকের এই শহরে হাজারো সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না করে অবৈধ লাইন্সেধারী এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ করা সম্ভব না।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই এসব ঘটনায় মামলা করে। কিন্তু তারপরেও কমে না। মামলা হলে ফাইনও দেয়। বন্ধ তো হয় না।’ তবে হাইকোর্টের আদেশের কারণে অভিযান আরও কঠোর হবে বলে তিনি জানান।ঢাকাটাটইমস






মন্তব্য চালু নেই