মেইন ম্যেনু

ফেরত যাচ্ছে বিশ্বব্যাংকের অর্থ

শেষ পর্যন্ত ফেরত যাচ্ছে আটটি প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের টাকা। এসব প্রকল্পের প্রায় ৩০ লাখ ডলার প্রত্যাহার করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৪ কোটি টাকা (১ ডলার ৮০ টাকা হিসাবে)।

অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আটটি প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার করে নিতে গত মে মাসে সংস্থাটির ঢাকা মিশনের প্রধান ইউহানেস জাট অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠি দিয়েছিলেন।

৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পগুলোতে উল্লিখিত দুর্নীতির অংশের টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক। কিন্তু এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছিল ইআরডি। কিন্তু সে যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়নি সংস্থাটি। ফলে সরকারকে উক্ত অর্থ সহায়তা টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে সবার আগে ফেরত যাচ্ছে ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড চিলড্রেন অ্যাট রিস্ক প্রকল্পের টাকা।

ইআরডির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে সংস্থাটি অসন্তোষ জানিয়ে আসছিল বেশ আগে থেকে। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের ঋণ থেকে ৪৪ কোটি টাকা বাতিল করে। গত দুই বছরে প্রকল্পটি থেকে আরো ৭০ কোটি টাকা বাতিল করা হয়।

সূত্রটি বলে, ‘দাতাদের সহযোগিতার অংশ হিসেবে উন্নয়নকাজে অনিয়ম হলে এমন সমস্যা হতেই পারে।’ এজন্য প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বেশি দায়ী বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আরাস্তু খান (বিশ্বব্যাংকের প্রাক্তন দায়িত্বপ্রাপ্ত) বলেন, ‘এটি নতুন ঘটনা নয়। এর আগেও এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। তখন প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার মতো ফেরত যায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটি কখনোই আমাদের কাম্য নয়। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের অসন্তোষ থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটে।’ তাই সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে আরো বেশি আন্তরিক হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গত মে মাসে আটটি প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক। তখন বিষয়টি নিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে ইআরডি। এর আগে এপ্রিলে অনুষ্ঠিত দাতাদের সভায়ও বিষয়টি নিয়ে তাগিদ দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক।

এরপর ওই আট প্রকল্প সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পাল্টা জবাব দেয় ইআরডি। সংশ্লিষ্টরা বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক যে অভিযোগ তুলে অর্থ ফেরত চেয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়।’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস ও ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, আট প্রকল্পের প্রায় ২৪ কোটি টাকা প্রত্যাহার করার কথা বলা হয়েছে। এসব প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছিল, তার মধ্যে শুধু অনিয়ম ও দুর্নীতির অংশের অর্থ ফেরত চাওয়া হয়েছে। এর আগে গত ৩০ মার্চ ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড চিলড্রেন অ্যাট রিস্ক প্রকল্প থেকে ৪৪ কোটি টাকা প্রত্যাহার করে বিশ্বব্যাংক।’

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোথাও কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে সরকারকে এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করে বিশ্বব্যাংক। তবে কোনো প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘এটি বিশ্বব্যাংকের নীতিগত অবস্থা থেকে করা হচ্ছে।’ চলমান উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার এটি প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, উচ্চশিক্ষায় গুণগত মান বৃদ্ধি প্রকল্প, বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রজেক্ট (এনএটিপি), ঝরে পড়া শিশুদের পুনর্বাসন প্রকল্প-২ (রস্ক), সেকেন্ড রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প (আরটিআইপি-২), স্ট্রেনদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন ইন এশিয়া প্রকল্প, এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন প্রোগ্রাম ফর পুওরেস্ট প্রকল্প, স্কিলস অ্যান্ড ট্রেনিং এনহেন্সমেন্ট প্রকল্প ও ক্লিন এয়ার সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট প্রকল্প।

এ প্রসঙ্গে ইআরডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সংস্থাটির অভিযোগ কয়েকটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ঠিক। এজন্য এ পর্যন্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দুই প্রকল্পের অর্থ ফেরত পাঠানো হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলোর মধ্যে শুধু ছাড়কৃত ঋণের টাকাটা ফেরত দিতে হবে সরকারকে।’

তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) কাজি সফিকুল আজম বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ইআরডি থেকে জবাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রকল্পের অবস্থা ভালো থাকলেও সংস্থাটির মূল্যায়নে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়েছে। এসব বিষয় সমন্বয় করে অর্থসহায়তা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।’

তবে তিনি জানান, এরই মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বর্তমানে ৩৩টি প্রকল্প চলমান। এসব উন্নয়ন প্রকল্পে তাদের ৭৫০ কোটি ডলারের অর্থায়ন রয়েছে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪টি প্রকল্পের ঋণের আংশিক অর্থ প্রত্যাহার করেছে বিশ্বব্যাংক। আরো কয়েকটি প্রকল্পের অর্থ বাতিল হওয়ার পথে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে ২০১১ সালের ২৯ জুন দুর্নীতির অভিযোগে বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। এর পর থেকে সংস্থাটির অর্থ সহায়তা ফেরত যাওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয় বেশি।রাইজিংবিডি






মন্তব্য চালু নেই