মেইন ম্যেনু

‘ফ্লু’ ভাইরাস দেখতে কেমন?

সুইৎজারল্যান্ডে, ‘নোভার্টিস ইনস্টিটিউট ফর বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ’-এর প্রেসিডেন্সিয়াল ফেলো সায়েন্টিস্ট।গবেষণায়ে বলা হয়েছে ‘ফ্লু’ ভাইরাস কতটা ভয়াবহ, তা বোঝাতে একটা পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। বিশ্বে ফি বছর গড়ে আড়াই থেকে পাঁচ লক্ষ মানুষ মারা যান ‘ফ্লু’ ভাইরাসের হানাদারিতে। ২০০৯ সালে ‘সোয়াইন ফ্লু’র হানাদারির ঘটনা আমরা কেউই ভুলিনি। গত বছরের মার্চ পর্যন্ত ভারতে ‘সোয়াইন ফ্লু’তে আক্রান্ত হয়েছেন ৩১,১৫৬ জন। মৃত্যু হয়েছে ১,৮৪১ জনের।ইন্দ্রনীলের গবেষণাপত্রটি একেবারে হালে প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স’ জার্নালে। তাঁর অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মান ‘ফাইজার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন ইন্দ্রনীল, সদ্য ফেলে আসা জানুয়ারিতে।

flu1463203236

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ‘ফ্লু’ ভাইরাস কতটা ধুরন্ধর, কতটা ধোঁকাবাজ, এ বার সেই গল্পটা একটু বলা যাক। ওই ভাইরাস যখন আমাদের দেহে ঢোকে বা আমাদের কোনও কোষে শুরু হয় তার হানাদারি, তখন সে খুব সজাগ, সতর্ক থাকে। যাতে আমাদের দেহের কোাষের ‘রাডারে’ ধরা না পড়ে তার মতিগতি! তার ফন্দি! ‘রাডার’কে ফাঁকি দেওয়ার ব্যাপারে এতটাই ধুরন্ধর আর ধড়িবাজ ‘ফ্লু’ ভাইরাস যে, যখন সে সবে দেহে ঢুকে কোনও কোষের গায়ে (সারফেস) লেগে থাকে, তখনই সে তার কায়দা-কসরৎ শুরু করে দেয়। বর্জ্য বস্তুর (ওয়েস্ট মেটিরিয়াল) ছদ্মবেশ ধরে লেগে থাকে সেই কোষের গায়ে, যে কোষটিতে সে হানা দেবে বলে ভেবে রেখেছে। আর সেই ছদ্মবেশটি এতটাই নিখুঁত হয় যে, কোষটিও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসটিকে ‘বর্জ্য বস্তু’ বলেই ভেবে নেয়!

কীভাবে আক্রান্ত করে ‘ফ্লু’ ভাইরাস?

কোষের মধ্যে ঢুকে পড়েই ভাইরাসটি তার বাইরের খোল (ক্যাপসিড) আর তার দেহ থেকে বেরনো প্রোটিনগুলো দিয়ে কোষটাকে অল্প অল্প করে খুঁড়তে শুরু করে। কিন্তু, চট করে সেই কোষটির খুব বড় কিছু ক্ষতি করে না ভাইরাসটি। তা হলে তো কোষের ‘চোখে’ সে ধরা পড়ে যেত সঙ্গে সঙ্গে। তাই প্রথমে তার ক্যাপসিড আর প্রোটিনগুলো দিয়ে কোষের খুব সামান্যই ক্ষতি করে ভাইরাসটি। ফলে, বাইরে থেকে যে কোনও ভয়ঙ্কর হানাদার শরীরে ঢুকে পড়েছে, তা আমাদের কোষ বুঝতেই পারে না।

ইন্দ্রনীলবাবুর বলেছেন,‘‘আমরা এই প্রথম প্রমাণ করতে পেরেছি, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস আমাদের কোষে হানাদারি শুরুর প্রাক মূহুর্তে তার বাইরের খোলটাকে ভেঙে ফেলে (যাকে বলে, ‘আনকোটিং’)। সেই প্রক্রিয়াটাকে সাহায্য করে আমাদের শরীরেরই কিছু জিন। বর্জ্য পদার্থ সরিয়ে ফেলার জন্য কোষ যে যন্ত্রপাতিগুলো ব্যবহার করে, সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে ওই জিনই। মানে, ‘ঘর শত্রু জিন’ আমাদের শরীরেই রয়েছে। যাদের মধ্যে একেবারে ‘বিভীষণ’টি হল- ‘এইচডিএসি-সিক্স’ বা ‘এইচড্যাক-সিক্স’। আর যে হেতু আমাদের কোষগুলোর সঙ্গে বহু বহু বছরের পরিচিতি রয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের, তাই ওই ভাইরাস ভাল ভাবেই জানে, কোষে হানাদারি চালানোর জন্য সে যেমন কোষেরই বানানো যন্ত্রপাতিগুলো ব্যবহার করতে পারবে, তেমনই তার বাইরের খোলা ভেঙে ফেলার জন্য পাবে ওই ‘এইচডিএসি-সিক্স’ জিনের সাহায্য-সহায়তা। যা কি না বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য কোষের বানানো যন্ত্রপাতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছি, ওই জিনগুলো না থাকলে কোষের ‘ওয়েস্ট ডিজপোজাল’-এর কাজকর্মে তেমন কোনও ব্যাঘাত ঘটে না। কারণ, ‘এইচডিএসি-সিক্স’ জিনের দায়িত্বের ব্যাটনটা তখন আরেকটি জিন নিয়ে নেয় তার কাঁধে। আর সেই জিনটা কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের বাইরের খোলটাকে ভাঙার ব্যাপারে আদৌ মদত দেয় না। ফলে, ‘এইচডিএসি-সিক্স’ জিনটিকে শরীরে কোনও ভাবে নিষ্ক্রিয় (ইনঅ্যাক্টিভ) করে দিতে পারলেই ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ধোঁকা দেওয়ার যাবতীয় ছল-চাতুরিকেই ভোঁতা করে দেওয়া যাবে। আর ওষুধ ব্যবহার করে যে সেটা সাময়িক ভাবে করাও যায়, আমাদের গবেষণায় আমরা সেটাও দেখিয়েছি।’’

পরিবেশ দূষণ কমাতে আমরা যেমন বর্জ্য বস্তুটিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য (রিসাইক্লিং) করে তোলার চেষ্টা করি নানা রকমের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে, তেমনই কোষে ঢুকে পড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসটিকে ‘বর্জ্য বস্তু’ ভেবে সেটিকে নষ্ট করে দেওয়ার (ডিগ্রেডেশান) জন্য তখন কোষও নানা রকমের ছোট ছোট যন্ত্রপাতি বানাতে শুরু করে। যেগুলো নানা রকমের প্রোটিন দিয়ে তৈরি। ওই যন্ত্রপাতিগুলো যাকে বলে, একেবারে ঘাড় ধাক্কা দিয়েই কোষ থেকে বের করে দেয় বর্জ্য বস্তুগুলিকে। ওই বর্জ্য নিষ্কাশনের কাজটা অনেক সময় হয় উৎসেচক নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেও। ধুরন্ধর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস তখনই বুঝে ফেলে, মওকা এসে গিয়েছে। কোষের বানানো সেই সব যন্ত্রপাতি দিয়েই ভাইরাসটি তখন তার বাইরের খোলটাকে (‘শেল’ বা, ‘ক্যাপসিড’) ভেঙে ফেলে। আর তা ভেঙে যেতেই ভাইরাসের শরীরের ভেতরে থাকা জেনেটিক মেটিরিয়াল বেরিয়ে এসে কোষের নিউক্লিয়াসে ঢুকে পড়ে। শুরু হয়ে যায় তার পুরোদস্তুর হানাদারি। কোষ যখন সেটা বুঝতে পারে, তত ক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে।

যেভাবে হানা দেয় ‘ফ্লু’ ভাইরাস, ভিডিও :

সম্পাদনায় : তানভীর আহম্মেদ






মন্তব্য চালু নেই