মেইন ম্যেনু

বন্যার পানিতে ভাসছে টাঙ্গাইলের জনপদ

কয়েকদিন ধরে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন টাঙ্গাইলের বিভিন্ন চরাঞ্চলের মানুষ। বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন লক্ষাধিক মানুষ। বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গত ক’দিনে যমুনার পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় যমুনা তীরবর্তী গ্রামগুলোর লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ভূঞাপুরের অর্জুনা, গাবসারা, নিকরাইল, গোবিন্দাসী ইউনিয়ন ও ভূঞাপুর পৌরসভার গ্রাম ফুরুই, রায়ের বাসালিয়া, কুতুপপুর, বামনহাটাসহ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।

একদিকে পানি বৃদ্ধি অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে জনজীবন। গরু ছাগল হাঁস মুরগি নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয়ের স্থান খুঁজছে অনেকে। কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছে বেড়িবাঁধের উপর। কিন্তু বেড়িবাঁধ ভাঙার আশঙ্কায় সেখান থেকে উঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ আসছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে।

বন্যাকবলিত এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যালয় মাঠে এবং ঘরে পানি উঠায় গত ২৬ জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে ৩৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। চরাঞ্চলের বাকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আনুষ্ঠানিক বন্ধ ঘোষণা না করলেও কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসতে পারছে না। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো রকম শিক্ষা কার্যক্রম নেই।

এদিকে, গোবিন্দাসী বাজারের দক্ষিণে গোপালগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতলা ভবনটি হুমকির মুখে রয়েছে। নদী থেকে মাত্র ২০ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে এই ভবন। মাত্র ২-১ ঘণ্টার ভাঙনে বিলীন হয়ে যেতে পারে ৫০ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সরকারি সম্পদটি।

ভূঞাপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দুর্যোগপূর্ণ অবস্থার জন্য চরাঞ্চলের ৩৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

গাবসারা ইউনিয়নের বেলটিয়াপাড়া গ্রামে মোকছেদ আলী বলেন, আমাগো বাড়িঘর ভাইঙ্গা গেছে, জমিজমা বন্যায় ডুইবা গেছে, ওহন পর্যন্ত কোনো কিছুই সরকার দেয় নাই।

একই গ্রামের নুরু শেখ বলেন, আমি এখনো কোনো প্রকার সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। অনেক সময় অর্ধাহারে আবার অনেক সময় অনাহারে দিন কাটছে।

সমিরন নেছা বলেন, কিছুই বলার নাই ভাই।

ভূঞাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হালিম বলেন, বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কিছু এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। কয়েকটি ইউনিয়নের বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এ বরাদ্দ থেকে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার ত্রণন সামগ্রী পাইনি।

ভুঞাপুর উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল বলেন, আমি বন্যা কবলিত মানুষের খোঁজ খবর নিয়েছি। এখনো খোঁজ খবর নিচ্ছি। আমি গতকালও বন্যাকবলিত এলাকায় গিয়েছিলাম। ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

ভুঞাপুরের ইউএনও অফিসের দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনার অফিস সহকারী আব্দুল বারেক বলেন, ৬টি ইউনিয়নে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছেন। এর মধ্যে অজুনা, গাবসারা, নিকরাইল ইউনিয়নের সম্পূর্ণ অংশ এবং ফলদা, গোবিন্দাসি, আলোয়া, নিকরাইলে আঙ্কশিক অংশ প্লাবিত হয়ে সাধারণ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন।

তিনি বলেন, তবে গত অর্থবছরের তালিকা অনুযায়ী এ মাসে ১১৫৬ পরিবারকে ৩৪.৭০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

নাগরপুর উপজেলায় যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তা-ঘাটসহ প্রায় ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পানিবন্দী পরিবারের লোকজন তাদের গৃহপালিত পশু গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি ও তাদের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

বর্ষার পানিতে উপজেলার সদর ইউনিয়ন বটতলা থেকে শাহজানী ভায়া চৌহালী (জার্মান প্রজেক্ট) সড়ক, নাগরপুর-সলিমাবাদ (বেকড়া) সড়ক, নাগরপুর ধুবড়িয়, ভাদ্রা, দপ্তিয়র সড়ক, উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র রাস্তা পানিতে তলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

দপ্তিয়র ইউপি চেয়ারম্যান এম ফিরোজ সিদ্দিকী বলেন, আমার ইউনিয়ন উপজেলার সিমান্তবর্তী যমুনা সংলগ্ন হওয়ায় বর্ষার পানির স্রোতে বিভিন্ন জায়গা ভেঙে উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আমার এ ইউনিয়নে প্রায় ২৫০০ পরিবার পানিবন্দী রয়েছে।

গয়হাটা ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান আসকর বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি রাস্তা-ঘাট পানির নিচে রয়েছে। এ ইউনিয়নে প্রায় ২ হাজার পরিবার বন্যা কবলিত হয়েছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়েছে উপজেলার ভাড়রা ইউনিয়নের চরাঞ্চলের মানুষজন। এ ইউনিয়নে প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়েছে।

এছাড়াও উপজেলার ধুবড়িয়া ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার, সহবতপুরে ৩ হাজার, মোকনায় ২ হাজার, পাকুটিয়া ও নাগরপুর সদর ইউনিয়নসহ ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) পুলক কান্তি চক্রবর্তী বলেন, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ বন্যায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। আমি কয়েকটি ইউনিয়ন পরিদর্শন করে বন্যা কবলিত মানুষের খোঁজ খবর নিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, ত্রাণের জন্য জেলায় যোগাযোগ করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হবে।

বাসাইল উপজেলার ঝিনাই নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের কারণে কাঞ্চনপুর, হাবলা ও কাশিল ইউনিয়নের কাশিল, দাপনাজোর, কামুটিয়া, নথখোলা, থোপিয়া, বালিনা ভৈরপাড়া, আদাজানের মানিকচর, কাঞ্চনপুর কাজিরাপাড়া, সোনারচরসহ বিভিন্ন এলাকার নদী তীরবর্তী প্রায় আড়াই শতাধিক ভিটা-বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে।

কাজিরাপাড়ার কৃষক ওহাব আলী বলেন, আমি ৩টি ঘর সরিয়ে নিয়েছি। আমার ভিটা-বাড়ির সম্পূর্ণ জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন থাকার জাগয়াটুকুও নেই। ঘর-ভিটা হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব।

কাশিল ইউনিয়নের মেম্বার ছানোয়ার খান বলেন, গত কয়েকদিন যাবত কাশিল, কাঞ্চনপুর, হাবিলা ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী অনেক ঘর-বাড়ির ভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় আড়াই শতাধিক পরিবার ঘর-ভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী শহীদুল ইসলাম বলেন, গত শুক্রবার রাত থেকে কেবিএন বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ভবনে ভাঙন শুরু হয়েছে। আমি প্রাথমিকভাবে স্থানীয়দের নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গাছের গুঁড়ি ও বালির বস্তা ফেলে ভাঙন রোধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এতেও ভাঙন থামানো যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলিয়া শারমিন জানান, টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা এ পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে বালির বস্তা ফেলে ভাঙনরোধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মাহবুুব হোসেন বলেন, স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যদি কেউ বন্যায় আক্রান্ত হয় তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া ও প্রয়োজনে সাহায্য সহযোগিতা করার কথা বলা হয়েছে।

টাঙ্গাইলের পানি উন্নয়ন বোডের নিবার্হী প্রকৌশনী শাহজাহান সিরাজ বলেন, এখন বর্তমানে যমুনার নদীর পানি বিপদসীমার ৯১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ধলেশ্বরী নদীর পানির বিপদসীমার ৮১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, নদী ভাঙনরোধে আমি এবং আমার অন্যান্য কর্মকর্তারা প্রতিনিয়তই কাজ করেছেন।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই