মেইন ম্যেনু

বর্ষবরণ উৎসবে মেতে উঠেছে গোটা দেশ

প্রথম প্রহর কেটে দ্বিপ্রহরের আয়োজনে বর্ষবরণ। রমনার বটমূলে বছরের নতুন সূর্যকে গানে গানে স্বাগত জানিয়েছে ছায়ানটের শিল্পীরা। রবীন্দ্র সঙ্গীতে শুরু হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীদের কণ্ঠে ভর করে বাংলার লোকগান।

গানের তালে তালেই চলছে রাজধানীতে বর্ষবরণ উৎসব। সার্বজনীন এই উৎসবে উচ্ছ্বাসিত ও উল্লসিত গোটা দেশ। বৈশাখ বরণে সবাই যেন ঘর ছাড়া। যারা ঘরে আছেন, তারাও বাঙালিয়ানার মধ্য দিয়েই দিনটি পার করছেন।

ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের ঢল নামতে থাকে শাহবাগ-রমনা এলাকায়। রোদের তীব্রতা উপেক্ষা করা জনস্রোতে যেন তিল ধরার ঠাঁই নেই শাহবাগ, ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয় এলাকা, রমনা এলাকায়।

অপশক্তির ভয়কে জয় করে প্রাণের উচ্ছ্বাসে প্রাণ মিলিয়ে বৈশাখ বন্ধনায় মশগুল বাঙালি। বৈশাখের বার্তা বরণে নিজেকে তুলে ধরছেন স্ব মহিমায়। সাদা কালো, লাল সাদায় মিলিয়ে বৈশাখী সাজে সেজেছেন তরুণ-তরুণীরা। মাথায় লাল গামছায় তরুণরা গ্রাম বাংলার কৃষকের বেশ ধরেছে। অন্যদিকে, সাদা আর লাল শাড়িতে তরুণীরা গ্রাম্যবধূর রূপ ধরেছে। তরুণীরা খোপায় গোলাপ, গাঁদা, বেলি আর শেফালী ফুল গেঁথে বৈশাখকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।

সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। চারুকলার আয়োজন থাকলেও মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিশ্বিবিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়। রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা আগুন্তকরা শোভা যাত্রায় অংশ নিয়ে প্রাণ খোলা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে। শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরে বিভিন্ন সড়ক প্রদীক্ষণ করে ফের চারুকলা চত্বরে ফিরে আসে।

নিরাপত্তার তাগিদে শাহবাগ-রমনা এলাকায় যান চলাচলে বন্ধ করতে কারওয়ান বাজার, দোয়েল চত্বর, পলাশী, মৎসভবন, নীলক্ষেত এলাকায় পুলিশের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। যান চলাচল না থাকায় উদযাপনকারীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে।

বৈশাখের সংবাদ সংগ্রহে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় ব্যস্ত রয়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরাও। রাজধানীর ন্যায় গোটা দেশেই বৈশাখ আনন্দের হওয়া বইছে। দেশের বাইরেও বাঙালিরা বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করছেন।

হাজার বছরের ইতিহাসে বর্ষবরণের আবেগ কথা গেঁথে আছে মর্মে মর্মে। একেবারেই বাঙালির উৎসব বর্ষবরণে গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির খাঁটি রূপ রূপায়িত হয়।

এই দিনটিকে ধরেই গ্রামের মানুষেরা এখনও তাদের জীবন পঞ্জিকা সাজায়। এদিন বাঙালি হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে স্বজনের বন্ধনে মিলে যায়। নানা স্বাদের পিঠা-পায়েশ আপ্যায়ন চলে দিন ভর। চলে পান্তা উৎসবের মহাযজ্ঞ। সাম্প্রতিক বছরগুলোত বৈশাখ উৎসবে যোগ হয় জাতীয় মাছ ইলিশও। তবে এ বছর পান্তা-ইলিশ নিয়ে চলছে জোর বিতর্ক।

বৈশাখী উৎসবের দেশের বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয়েছে বৈশাখী মেলা। মেলাতে রয়েছে, নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, রয়েছে নানা রকম পিঠা পুলির আয়োজন। পুরনো সংস্কৃতির খেলাধুলারও আয়োজন করা হয়ে গ্রামেগঞ্জে। অনেক জায়গায় আবার যাত্রাপালা, বাউল গান, কবি গানেরও আয়োজন করা হয়েছে। চলবে রাতেও।

বর্ষবরণ উৎসবে যোগ দিতে কেউ এসেছেন দল বেধে, কেউ এসেছেন একাই। আবার গোটা পরিবার সঙ্গে নিয়েও এসেছেন অনেকে। লাখো প্রাণের মেলায় বৈশাখ যেন উৎসবের পূর্ণতা পেয়েছে। বৈশাখ বন্ধনায় মাতোয়ারা সবাই।

কাজীপাড়া থেকে ছোট বোন মারিয়াকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন রিমা। তিনি বলেন, বৈশাখের আনন্দ তো সকাল থেকেই শুরু। বোনকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখব বলে। সুযোগ পেলে অংশও নেব।

সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব খোলা। গ্রামেগঞ্জের ব্যবসায়ীরা অনেকেই আজ হালখাতার আয়োজন করেছে।

বৈশাখ উৎসবের মধ্য দিয়ে নবউদ্যমে চলার শক্তি সঞ্চয় করে বাঙালি। এবারও তাই ঘটেছে। পুরাতন বছরের গ্লানি মুছে, নতুন বছরের পথ চলা শানিত করতে বৈশাখ উৎসবে মজেছে জাতি।






মন্তব্য চালু নেই