মেইন ম্যেনু

বাঁশের কিছু অজানা তথ্য জেনে নিন!

কয়েকবছর আগেও প্রায় প্রতিটি গ্রামে ছিল অনেক বাঁশ বাগান। ধীরেধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সেই বাঁশ বাগানগুলো। শহরে বাঁশ বাগান নেই বললেই চলে, এখন গ্রাম থেকেও ধীরেধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে বাগানগুলো। অথচ এই বাঁশের রয়েছে নানা উপকারিতা, যা হয়ত অনেকেরই অজানা।

বাঁশের নানা উপকারিতার জন্য একে দারিদ্র জনগোষ্ঠীর দারুবৃক্ষ বলা হয়ে থাকে। কাষ্ঠল চিরহরিৎ উদ্ভিদ বাঁশ আসলে ঘাস পরিবারের বৃহত্তমসদস্য। বাঁশ গাছ সাধারণত একত্রে গুচ্ছ হিসেবে জন্মায়। এক একটি গুচ্ছে ১০-৭০/৮০ টি বাঁশ গাছ একত্রে দেখা যায়। এসব গুচ্ছকে একত্রে “বাঁশ ঝাড় ” বলা হয়।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিকট এর গুরুত্ব অপরিসীম। বাঁশ গৃহের অবকাঠামো নির্মাণ, মঞ্চ নির্মাণ, মই, মাদুর, ঝুড়ি, ফাঁদ, হস্তশিল্পসহ নিত্যদিনের ব্যবহার্য বিবিধ জিনিসপত্র তৈরির কাজে ব্যবহূত হয়। দেশের কোন কোন অঞ্চলে বাঁশের পাতা চালা ঘরের ছাউনিতে এবং গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উষ্ণমন্ডলীয় এলাকার দেশসমূহে কাগজ তৈরির প্রধান উপাদান হিসেবে বাঁশ ব্যবহূত হয়ে আসছে। বাঁশঝাড়সমূহ ঝড়ো হাওয়া প্রতিরোধ এবং ভূমি ক্ষয়রোধ করে।

বাঁশ শুধু বিভিন্ন কাজেই নয়,এটা খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। কচি বাঁশের ডগা মুখরোচক সবজি হিসেবে খাওয়ার উপযোগী। এ ধরনের কচি ডগা স্থানীয়ভাবে বাঁশ কোরাল নামে পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বর্ষার মৌসুমে বহুল পরিমাণে এটি খেয়ে থাকে। গৃহস্থালির কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয় বলেই মুলত বাঁশকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর “দারুবৃক্ষ “(timber) বলা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে তৃণ গোত্রের ২৬ প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়। তারমধ্যে মুলিবাঁশ, তল্লাবাঁশ ও বইরা বাঁশ দিয়ে শিল্পকর্ম করা সহজ। বাঁশের তৈরি এই শিল্প দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ছাড়াও আদিবাসীদের জীবনাচরণ ও অনুভূতির প্রতীক। আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বাঁশের তৈরি শিল্পকর্ম দীর্ঘস্থায়ী না হলেও লোকজীবনে ব্যবহারের বহুমাত্রিকতা ও প্রয়োজনের কারণে এই শিল্পকর্ম বংশপরম্পরায় চলে আসছে। এর কিছু কিছু শিল্পকৌশল হাজার বছর ধরে অবিকৃত আছে, যার প্রমাণ পাওয়া যায় বাঁশের মোড়ায়।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরএ দিনাজপুর থেকে সংগৃহীত আনুমানিক দশম শতাব্দীর বুদ্ধমূর্তি সিতাতপত্রা (সংগ্রহ নং ১১১৫) পদ্মের পরিবর্তে বাঁশ ও বেতের তৈরি মোড়া সদৃশ একটি আসনে উপবিষ্ট। কালো পাথর খোদাই করে মোড়াটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই মোড়ায় গ্রামবাংলার কেচকি বেড়ার কৌশল অনুসৃত হয়েছে এবং এ ধরনের মোড়া আজও এদেশে তৈরি হয়।

বাঁশ শুধু শিল্প, বিভিন্ন কাজে বা খাদ্য হিসেবেই ব্যবহার হয় না। এটি জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং জীববৈচিত্র ধ্বংস হওয়া রোধে সহায়তা করতে পারে। বাঁশ গাছ অন্য যে কোন গাছের তুলনায় দ্রুত গতিতে ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস শুষে নিতে সক্ষম এবং এর শিকড় মাটি ক্ষয়ে যাওয়া রোধ করতে পারে।

চল্লিশটি বাঁশ উৎপাদনকারীদের দেশের সংস্থা , ইন্টারন্যাশনাল নেটওর্য়াক ফর ব্যাম্বু এন্ড র‍্যাট্টান এর মহাপরিচালক, হ্যান্স ফ্রেডরিখ জাতিসংঘ রেডিওর সংবাদাতা ফ্লোরেন্সিয়া সতো নিনোর কাছে বাঁশের উপকারিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছিলেন যে “চীনে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। যেখানে অনেক অঞ্চলে আসলে বহুবছর ধরে বাঁশ উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাওয়া জমির পুনরুজ্জীবনে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে, আমাদের আরও মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে ভারতের এলাহাবাদে। যেখানে একটি এনজিও হিসাবে আমরা গত দশকে ইটের ভাটার কারণে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রায় চার হাজার হেক্টর জমি পুনরুজ্জীবনের কাজ শুরু করি। এখন দশ বছর পর সেখানে প্রায় পঁচাশি হাজার হেক্টর জমি পুনরুজ্জীবন করা হয়েছে যাতে প্রায় সাত লাখেরও বেশি মানুষ উপকৃত হয়েছেন। অর্থাত, মূলত বাঁশের সাহায্যে একটা বিরাট জনগোষ্ঠীর জীবন নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে যাঁরা এখন অন্য ফসল উতপাদন করছেন, যাঁদের আয় রোজগার হচ্ছে এবং সবধরণের সুবিধা তাঁরা ভোগ করছেন।”

বাঁশ সম্পর্কে সবচেয়ে মজার তথ্য হলো এর ফুল নিয়ে। নানা প্রকার বাঁশঝাড়ে নানা সময়ে ফুল ধরে; কোনোটিতে ফি-বছর, কোনোটিতে ৩ বছর, কোনোটিতে ৫০ বছর, কোনোটিতে বা একশো-সোয়াশো বছর পরেও। ভারতের নিজোরাম রাজ্য, বার্মার চিন্‌ আর বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে মেলোকানা বাকিফেরা (Melocanna baccifera) নামে একপ্রকার মুলি বাঁশ জন্মে যাতে ৪৮ বছর পরে ফুল ধরে। এদিকে জাপানী বাঁশ (Phyllostachys bambusoids) ১৩০ বৎসর পর পর্যন্ত ফুলবতী হতে পারে।

এই মুলি বাঁশ গাছের বীজ বা রাইজোম নিয়ে যদি একই সময়ে লাগানো হয় আমেরিকা, ইউরোপ বা আমাজনের অরণ্যে তবু একই সময়ে ফুল ফুটবে তাতে। পরিবেশ, আবহাওয়া কোনো কিছুই তাদের এই ৪৮ বছর পর ফুলফোটার নিয়মকে ভাংতে পারবে না। কেন এমন হয়, এর সঠিক কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো অনুসন্ধান করে চলেছেন।

এত উপকারি এই উদ্ভিদ টি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশ থেকে,যেখানে অনেক দেশেই বাঁশের গুরুত্ব এর কথা চিন্তা করে বেশি করে বাঁশ উৎপাদনের ব্যাবস্থা করছে। জাপান, চীন সহ নানা দেশে এখনো বাঁশের বিশাল বিশাল বন রয়েছে। গুরুত্ব সহকারে তারা চাষাবাদ করছে।

পরিবেশে এর অবদানের কথা মাথায় রেখে তাই বাঁশ বাগান বিলুপ্ত রোধে এগিয়ে আসা উচিত সকলেরই।






মন্তব্য চালু নেই