মেইন ম্যেনু

বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখানো মেয়েদের কঠিন জীবন

সিঙ্গাপুরের মেয়েরা বঙ্গমেয়েদের কাছে ৫ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর কী ভাবছিল? হয়তো ভাবছিল এরা অনেক ভালো খেলে, ভালো অনুশীলন করেছে, সারাদিন ফুটবল নিয়ে পড়ে থেকেছে; ইত্যাদি, ইত্যাদি। উন্নত এই দেশ থেকে আসা মেয়েদের কল্পনায় নিশ্চয়ই আসেনি শত-শত দিনের ‘যুদ্ধ’ জয়ের গল্প। পরদিন কী খাওয়া হবে, আদৌ খাওয়া হবে কী না, সেই চিন্তায় অস্থির হওয়ার গল্প! বিস্ময়কর হলেও সত্য বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলের ‘অধিকাংশ মেয়ের’ জীবনে রয়েছে এমনই কষ্টের কাহিনি। এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে ওঠার পর দলটির কোচ গোলাম রাব্বানি ছোটন অমৃত মলঙ্গীকে শুনিয়েছেন মেয়েদের সেই সব কষ্টের কথা।

‘মারিয়া মান্নার কথা তো আমি চিন্তাই করতে পারি না। ওর পরিবার কী খাচ্ছে, আদৌ খেতে পাচ্ছে কী না, সেটা ঢাকায় বসে ও জানত না। এই অবস্থায় এমন ফুটবল খেলা সম্ভব না। ও আমার দলের মূল খেলোয়াড়। মাঝমাঠের কারিগর। আমার মন হয় গড গিফটেড কিছু না থাকলে, এই অবস্থায় এই মানের ফুটবল খেলা সম্ভব নয়।’ ছোটন বলেন আর বিস্ময়ে চোখ বড় করেন।

মারিয়া মান্না উপজাতি মেয়ে। বাবাকে হারিয়েছেন অনেক আগে। সংসার চালাতে মা কৃষিকাজ করেন। ফুটবল খেলার আগে পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি মাকে সাহায্য করতেন। এখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী।

শুধু মারিয়ার গল্প পাষাণে এঁকে রাখার মতো নয়। ছোটন বললেন তার দলের দুইএকজন বাদে সবার পরিবারের একই হাল, ‘মাত্র দুইটা মেয়ে আছে, যাদের পরিবার গৃহস্থ। খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। বাকিরা সবাই একদম হতদরিদ্র পরিবার থেকে এসেছে।’

২০১৭ সালে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হবে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্ব। বাংলাদেশ বাছাইপর্বের ‘সি’ গ্রুপ থেকে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে মূল পর্বে উঠেছে। ইরানকে ৩-০ গোলে, সিঙ্গাপুরকে ৫-০, কিরগিজস্তানকে ১০-০, চীনা তাইপেকে ৪-২ এবং আরব আমিরাতের মতো র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা দেশকে ৪-০ গোলে হারায় কৃষ্ণারা।

ছোটন যখন এই মেয়েদের দায়িত্ব নেন, তখন এরা ঠিকমতো বলে লাথি মারতে পারতেন না। এখন সেই তারা দরিদ্রতা নামক অভিশাপকে ফ্রি-কিক মারছেন, ‘ফুটবল জীবন পাল্টে দিতে পারে, আমার এই দলটা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত হওয়ার পর বাফুফে এদের বৃত্তির ব্যবস্থা করছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা মেয়েদের বৃত্তি দেয়ার পাশাপাশি লেখাপড়ার ব্যবস্থা করবে। ফেডারেশন থেকে পরিবারকে অনুদান দেয়া হবে।’

দেশজ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে সময় পার করছে। এমন সময় ছোটনের মেয়েদের এই সাফল্য কালোর মাঝে আলোর ঝিলিকের মতো। প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত মেয়েদের এমন সাফল্যে উদ্বেলিত হচ্ছেন। ছোটন কিন্তু মাটিতেই পা রাখছেন, ‘আমরা সবেমাত্র মূল পর্বে উঠেছি। এটা সত্য, বাংলাদেশের জন্য কাজটা স্বপ্নের মতো। তবু আমি বলছি না এটা আমার সেরা সাফল্য। আমি উন্নতিতে বিশ্বাসী। দল উন্নতি করেছে এটাই আমার কাছে মূল কথা।’

‘প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের কথা শুনে গর্বে বুকটা ভরে গেছে। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।’

গত ০৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে মেয়েদের ফুটবল আর ছেলেদের ফুটবল নিয়ে রসিকতা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘মেয়েরা এখন ছেলেদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তারা ১০ গোল দেয় আর ছেলেরা ৫ গোল খায়।’

বাছাইপর্বে ঘরের মাঠে এক প্রকার অপ্রতিরোধ্য ফুটবল খেলেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। প্রতিটি ম্যাচে দেখা গেছে মেয়েরা বক্সের বাইরে বল পেলেই হিংস্র হয়ে ওঠেন। যখন-তখন দূরপাল্লার শট নিয়ে প্রতিপক্ষকে ভড়কে দেন। ছোটনও বললেন এটা পরিকল্পনার অংশ ছিল, ‘ঠিক ধরেছেন। প্রাকটিসে আমরা এই দিকটি নিয়ে অনেক কাজ করেছি। আমাদের কৌশলই ছিল বক্সের বাইরে বল পেলে সময় নষ্ট না করে শট নেয়া।’

‘অনুশীলনের সময় প্রতি বৃহস্পতিবার আমরা ভিডিও পর্বের মাধ্যমে মেয়েদের ফর্মেশনে অভ্যস্ত করি। আমি সব সময় ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলতেই ভালোবাসি। মেয়েদেরও এই আক্রমণাত্মক ফর্মেশনে প্রতিটি ম্যাচে মাঠে নামাই। এবার একটু শঙ্কা ছিল, সিঙ্গাপুর, চীনা তাইপের মতো দেশের বিপক্ষে ওরা ফর্মেশন বাস্তবায়ন করতে পারবে কী না, সেটা নিয়ে। কিন্তু ওদের ফুটবল জ্ঞান এখন এতটাই ভালো যে বেশি ভুল করেনি।’

মূল পর্বে বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষ টুর্নামেন্টের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়া। রয়েছে চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলগুলোও। ছোটন এখন থেকেই সেই নকশা আঁকছেন, ‘পর্যাপ্ত অনুশীলনের সুযোগ পেলে মূল পর্বেও আমরা ভালো করবো। যারা কয়েক বছর আগে ফুটবলের মৌলিক জ্ঞানে শূন্য ছিল, তারা এখন আধুনিক ফুটবল খেলছে। এদের দিয়ে সবকিছু সম্ভব।’

ছোটন এরপর উচ্চস্বরে কিছু একটা বলতে যেয়ে, বিড়বিড় করলেন। হাতেখানেক দূরে বসে সেই অস্পষ্ট কথা বুঝতে এতটুকু কষ্ট হল না, ‘যারা নিত্যদিনের অভাবকে পায়ে দলে ফুটবলের স্বপ্ন দেখতে পারে, তাদের কাছে অজেয় বলে কিছু নেই!’ঢাকা টাইমসের সৌজন্যে।






মন্তব্য চালু নেই