মেইন ম্যেনু

বাংলাদেশেও স্যামসাং নোট সেভেনের বিক্রি বন্ধ

স্যামসাং মোবাইল ব্যাটারি দুর্ঘটনার পরে বন্ধ রাখে নোট-৭-এর উৎপাদন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্যামসাং নোট-৭-এর উৎপাদন ‘সাময়িক’ বন্ধ ঘোষণা করেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া তাদের দেশে রিপ্লেস (বদলে দেওয়া) করা নোট-৭ ঢুকতে না দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে। রিপ্লেস হওয়া সেট বিস্ফোরিত হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত বলে জানা গেছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশেও নোট-৭-এর প্রি-বুকিং বন্ধ করে টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে গ্রাহকদের।

স্যামসাংয়ের সঙ্গে মোবাইলফোন অপারেটর গ্রামীণফোন যৌথভাবে সেটটি বাজারে ছাড়ার ঘোষণা (প্রি-বুকিংয়ের) দিয়েছিল। গ্রামীণফোনের জনসংযোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০০ জন ফোনটির জন্য প্রি-বুকিং করেছিলেন। ফোন করে ডেকে সবার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

বাজার ঘুরে বাজারে স্যামসাং মোবাইলের বিক্রি প্রভাব পড়ার তথ্য জানা গেলেও এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমপিআইএ)। সংগঠনটির দাবি, বাংলাদেশের বাজারে স্যামসাং মোবাইলের বিক্রি কমেনি।

এদিকে বাংলাদেশের বিমানে (উড়োজাহাজে) স্যামসাং নোট-৭ ও ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের ওপরে সতর্কতা জারি করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশের এয়ারপোর্ট ব্যবহার করে এমন ২৯টি এয়ারলাইন্সকে গত ২১ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে।

এছাড়া বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থাও বিমানে স্যামসাং নোট-৭ ব্যবহারের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কান্তাস এয়ারওয়েজ, ভার্জিন অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইটে যাত্রীদের গ্যালাক্সি নোট-৭ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ভারতের বিভিন্ন বিমান সংস্থাও তাদের বিমানে গ্যালাক্সি নোট-৭ পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

ব্যাটারি মোবাইলফোনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও স্যামসাং মোবাইলফোনের একটি বিশেষ নোট-৭-এরজন্য তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নোট-৭-এর ব্যাটারিতে আগুন ধরে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুড়েছে স্যামসাং মোবাইলের বাজার। এর ফলে শেয়ার বাজারে স্যামসাং দর হারিয়েছে। বিক্রি কমে গেছে বিভিন্ন দেশে।

প্রসঙ্গত, গত ১৯ আগস্ট থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যালাক্সি নোট ৭ মডেলটির বিক্রি শুরু হয়। এরপরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের সেন্ট পিটার্সবাগে এক দম্পতির গাড়িতে গাড়িতে রাখা গ্যালাক্সি নোট-৭ মোবাইলের বিস্ফোরণের ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। শুধু এই একটিই নয়, এ ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা একের পর এক ঘটতে থাকলে স্যামসাং কর্তৃপক্ষ মোবাইল সেটটিতে ত্রুটি থাকার কথা স্বীকার করে। বাজার থেকে সেটটি তুলে নেওয়ার (২৫ লাখ মোবাইলসেট) ঘোষণা দেয়। একইসঙ্গে বিশ্বব্যাপী এর বিক্রিও বন্ধ রাখা হয়। স্যামসাং কর্তৃপক্ষ আগস্ট মাসেই ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানায়, বিক্রি হওয়া মোবাইল সেটটির মধ্যে মাত্র ০.১ শতাংশ মডেলের ক্ষেত্রে এই অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে স্যামাসাং মোবাইল বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, গ্যালাক্সি নোট-৭ ডিভাইসগুলোর সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করেই এগুলো বাংলাদেশের বাজারে ছাড়া হবে। বাংলাদেশে যেসব গ্যালাক্সি নোট-৭ আসবে তাতে সর্বোচ্চ গুণগতমান নিশ্চিত করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত দেশের বাজারে নোট-৭ সেভেন আসবে কিনা সে বিষয়ে এখনও স্যামসাংয়ের আঞ্চলিক অফিস থেকে ঢাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) সভাপতি ও স্যামসাং মোবাইলফোনের পরিবেশক ফেয়ার ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো.রুহুল আলম আল মাহবুব দাবি করলেন, এটা স্যামসাংয়ের গ্লোবাল ইস্যু। স্যামসাং অচিরেই এই ইস্যুর সমাধান করে ফেলবে। তিনি বলেন, এই ইস্যুর ফলে বাংলাদেশে কোনও প্রভাব পড়েছে বলে আমার জানা নেই। স্যামসাং মোবাইলের বিক্রি আগে মতোই আছে। তিনি মনে করেন, যেহেতু এখনও গ্যালাক্সি নোট-৭ দেশের বাজারে আসেনি ফলে এ নিয়ে কোনও সমস্যা দেখছি না। তিনি বলেন, গ্যালাক্সি নোট-৭ হবে দামি একটি ডিভাইস। আমাদের ক্রেতাদের অ্যাভারেজ চাহিদা ১৭-১৮ হাজার টাকা দামের সেট। এই দামের মোবাইল সেটগুলোর বিক্রি আগের মতোই আছে। আমাদের সেলস রিপোর্ট অন্তত তাই বলে। তিনি জানান, দেশে স্যামসাংয়ের মার্কেট শেয়ার ৫৫ শতাংশ। চলতি বছরের মধ্যে তা ৬০ শতাংশে পৌঁছবে। তাদের লক্ষ্য ৭০ শতাংশ বাজার দখল করা স্যামসাং মোবাইলফোন দিয়ে।

তবে রাজধানীর একাধিক স্যামসাং ফ্ল্যাগশিপ স্টোরগুলো ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, স্যামসাংয়ের বিক্রি কিছুটা কমেছে। স্যামসাং গ্যালাক্সি নোট-৭ চার্জ দিতে গেলে যে মোবাইলের আগুন ধরে যাচ্ছে বা বিস্ফোরণ ঘটছে, সেই রেশ দেশের বাজারেও কিছুটা পড়েছে। বেশি পড়েছে স্যামসাংয়ের দামি সেটগুলোতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বিক্রেতা জানান, আগের মতো ক্রেতারা আসছে না। অন্যান্য ঈদের আগে যে সংখ্যায় মোবাইল বিক্রি হয় এবার তা হয়নি।

স্যামসাং মোবাইলের ব্যাটারিতে কি ত্রুটি ছিল যার জন্য মোবাইলফোন চার্জে দেওয়ার ফলে অতিরিক্ত গরম হয়ে বিস্ফোরণ হচ্ছে বা আগুন ধরে যাচ্ছে তা এখনও প্রকাশ করেনি। দেশে মোবাইলফোনের মাননিয়ন্ত্রণ কাজের সঙ্গে জড়িত এডিসন গ্রুপের (সিম্ফনি মোবাইলফোন) কোয়ালিটি কন্ট্রোলার মাজহারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক কারণেই ব্যাটারিতে আগুন ধরে যেতে পারে বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। মোবাইল সেট নির্মাণে কোনও ত্রুটি থাকলে, ব্যাটারি ড্যামেজ থাকলে, ব্যাটারি উৎপাদনের সময় কোনও সমস্যা থাকলে, ব্যাটারির সেল ঠিক মতো সংরক্ষণ করা না হলে, ব্যাটারি ঠিক মতো সংরক্ষণ করা না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’ তিনি জানান, ‘মোবাইলফোনের ব্যাটারির যে চার্জারের যে অ্যাম্পিয়ার তার চেয়ে বেশি সক্ষমতার অ্যাম্পিয়ারের চার্জার দিয়ে মোবাইলে চার্জ দিলেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’ স্যামসাংয়ের দুর্ঘটনা কেন ঘটছে সে বিষয়টি তিনি জানাতে না পারলেও এ ধরনের কোনও একটি সমস্যার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে বিশ্বখ্যাত সাময়িকী টাইম বলছে, ব্যাটারি দুর্ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পরে স্যামসাংয়ে শেয়ার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ পড়ে গেছে। যা তাদের ২১১ বিলিয়ন ডলারের এই কোম্পানিটির ব্র্যান্ড ইমেজেও প্রভাব ফেলেছে। সাময়িকীটি আরও বলছে, এই ঘটনার ফলে কোম্পানিটির ‘ডেইলি পারসেন্টজ’ গত ৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন যা প্রতিনিয়ত ‘ড্রপ’ করছে। অন্যদিকে ঘটনা জানাজানি হওয়ার মাত্র দু্ই দিনেই কোম্পানিটি বাজারমূল্য হারিয়েছে ২২ মিলিয়ন ডলার।

গত আগস্টে ইন্টারন্যাশনাল ডাটা করপোরেশন (আইডিসি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৬-এর প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বিশ্বব্যাপী স্যামসাং মোবাইলের মার্কেট শেয়ার ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ছিল ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে ছিল ২০ দশমিক ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৫ সালের প্রথম ৯ মাসে বিশ্বব্যাপী স্যামসাং মোবাইল বিক্রি হয় ২৮৮ মিলিয়ন ৭৯ পিস।






মন্তব্য চালু নেই