মেইন ম্যেনু

বাংলাদেশ নাকি বাঙলাদেশ? কোন বানানটি সঠিক?

মুহম্মদ মাজ্‌হারুল ইসলাম : “বাংলা কেন বাঙলা নয়,হয়?”; এটি কি মনের ভাব প্রকাশ করছে? কী মনের ভাব প্রকাশ করছে? এরকম মনে হচ্ছে কি যে- বাংলা এবং বাঙলা দু’টি আলাদা ভাষা? তাই আমি লিখেছি বাংলা; বাঙলা হতে পারে না? অথবা হতে পারে?

আসলে আমি কি মনের ভাব প্রকাশে ব্যর্থ হলাম? হয়তবা!তাহলে এটিকে কি ভাষা বলা যাবে না? কারণ যা মনের ভাব প্রকাশে ব্যর্থ,তাকে ভাষা বলব কিভাবে?

আরও প্রশ্ন করা যেত। তাতে পাঠক বিরক্ত হবেন। হয়ত না পড়েই চলে যাবেন।তাই প্রশ্ন করা আপাতত বন্ধ। এখন উত্তর দিতে থাকি।

“বাংলা কেন বাঙলা নয়,হয়?”; এটা মনের ভাব প্রকাশ করেছে খুব অস্পষ্টভাবে। কেননা কোন নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ পাচ্ছে না এ থেকে। এটা একটা দ্বিধাকে প্রকাশ করে। ফলে এটি ভাষা। সুতরাং যা আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করে বা করতে চায় তাইই ভাষা।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর “বাঙ্গালা ব্যাকরণ” বইটিতে (২৭ পৃঃ) বলেছেন-

“মনুষ্য জাতি যে ধ্বনি বা ধ্বনি-সকল দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করে,তাহার নাম ভাষা(language)।”

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এখানে ‘মনুষ্য জাতি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাহলে ভাষা কি শুধুমাত্র মনুষ্য জাতির জন্যই? গাছের কি ভাষা নেই? মাছের কি ভাষা নেই? যে পাখিগুলো আমাদের ঘুম ভাঙাই ভোরে অথবা ওই মোরোগটির কি কোন ভাষা নেই? এরা কি শুধুমাত্র আওয়াজ দিতে পারে? আমাদের মত কথা বলতে পারে না? হয়ত পারে আমরা বুঝি না।

তাহলে প্রশ্নটি কী দাঁড়াচ্ছে? মানুষ বাদে অন্য যে-কোন কিছুর আওয়াজ বা ধ্বনি কি ভাষা হ’তে পারে?

না,পারে না। কারণ-

১। ভাষা হল আওয়াজের সমষ্টি।আর এই আওয়াজই ধ্বনি। ধ্বনি উচ্চারিত হতে হবে মানুষের বাগ্‌যন্ত্রের সাহায্যে। এবং তার অর্থ থাকতে হবে। ‘ররুউইবভহদব’কোন ভাষা নয়। কেননা এটির কোন অর্থ নেই;সে-যতোই কন্ঠ দিয়ে উচ্চারিত হোক না কেন।

২। ভাষার অর্থদ্যোতকতা থাকতে হবে। অর্থাৎ আমি যদি বলি-“আমি বনের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাই।”তাহলে তা ভাষা হবে। কিন্তু “বন আমার ভিতর দিয়ে হেঁটে যায়।” তাহলে তা সঠিক হবে না। ধ্বনি ও শব্দ বিন্যাস সঠিক না হ’লে তাকে ভাষা বলা যায় না।

৩। ভাষার মাধ্যমে অবশ্যই মনের ভাব পূর্ণরূপে ব্যবহার করতে হবে।

আসলে অনেকেই বলতে পারেন- এসব যদি পশু পাখির মধ্যে হয়; তাহলে তাকে ভাষা বলা যাবে না কেন ?

আচ্ছা আপনিই বলুন কেন যাবে না।

দুটি কুকুর কথা বলছে-“দোস্ত ! বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা !”

দুটি ইঁদুর কথা বলছে-“জানিস ! আমার বাবা গরিব হলেও সৎ ছিলেন !”

আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন ভাষা কেন শুধুমাত্র মানুষের জন্য।

সাধারণতঃ কোনও দেশের বা দেশবাসী জাতির নাম অনুসারে ভাষার নাম হয়ে থাকে। বাঙালিরা যে ভাষা ব্যবহার করে তার নাম বাংলা ভাষা (bengali language)।

আমি বোধহয় আমার মূল বিষয়টি থেকে সরে এসেছি। অর্থাৎ “বাংলা কেন বাঙলা নয়,হয়?”। এটি লেখার প্রধান উদ্দেশ্য হল- বাঙলা/বাংলা শব্দ দু’টির বিশ্লেষণ করা।

তবে যেহেতু বাঙলা নিয়ে কিছু লিখছি; তাই ব্যাকরণটি প্রথাগতভাবে উঠে এল।পরে আরও আসবে।

# বাঙলা শব্দটির হেতুঃ

সাধারণতঃ বাঙলা শব্দটি ব্যবহার করা হয় বাঙালি লেখার জন্য। কিন্তু অনেকেই ‘বাঙলা’ শব্দটি স্বভাবত লিখে থাকেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানতাম না যে -বাংলাদেশ বানানটি লিখতে হয়-‘বাঙলাদেশ’এ। ডক্টর হুমায়ুন আজাদের বইয়ে আমি প্রথম দেখি, তিনি কোথাও বাংলা লেখেন নি। চারদিকে শুধু বাঙলা বাঙলা বাঙলা আর বাঙলা ! আমি বুঝলাম; বুঝলাম না। বুঝলাম- যেহেতু হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন,তাই এটি ভুল হতে পারে না। আর বুঝলাম না, তিনি কেন এটি লিখেছেন। আমি তার ঐ ‘বাঙলা’লেখার প্রথা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারি নি। শুধু আমার ক্ষেত্রেই যে এমনটি ঘটেছে তা নয়; বোধহয় আমার অনেক বন্ধুও দেখেছি বাংলাকে বাঙলা লেখে। এবং তারাও জানে না এটির কারণ। তারাও প্রথা থেকে মুক্ত হতে পারে নি।

আসলে বাঙলা সঠিক না বাংলা সঠিক সেটি পরে বলা যাবে। আমার কথাগল্প থেকেই তা ফুঁটে উঠতে বাধ্য।

বাঙলা শব্দটিতে ‘ব’ এবং ‘ল’-এই দুটি বর্ণের কোন পরিবর্তন নেই। কিন্তু ‘ঙ’ বা ‘ং’নিয়ে বিপত্তি ঘটেছে।

# ‘ঙ’ এর ব্যাখ্যা ও ব্যবহারিক নিয়মঃ

ব্যাখ্যাঃ-

১। অবস্থান-‘ঙ’ বর্ণটি বাঙলা বর্ণমালার ‘ক’ বর্গের ৫ম বর্ণ।

২। উচ্চারণ স্থান- কণ্ঠ বা জিহ্বা-মূল।

৩। নাম- কণ্ঠ বর্ণ/জিহ্ববামূলীয় ধ্বনি/ঘোষ ধ্বনি/নাসিক্য ধ্বনি।

৪। ধ্বনি বৈশিষ্ট্য- ‘ঙ’ নাসিক্য বর্ণ; উচ্চারণ ইংরেজি ng-এর মতো।

৫। শব্দে অবস্থান- ‘ঙ’ বাক্যের প্রথমে বসতে পারে না।

৬। ইংরেজিতে এর ধ্বনিগত নাম- voiced velar nasal consonant sound.

এখন আমরা দেখব এটি কিভাবে উচ্চারিত হয়।

আমরা সাধারণতঃ বলি ‘ঙ’-কে ‘উঁয়ো’। যদি তা বলা হয় তাহলে এটি স্পর্শহীনতার জন্য ব্যঞ্জন ধ্বনি হতে পারবে না। হলে ‘ঙ’-এর উচ্চারণ করা উচিৎ ছিল-‘অঙ্‌’।কিন্তু এটি উচ্চারণ করা হলে সহজে ধরা পড়বে না আমি কি বলছি তা।তাই এই বর্ণটি উচ্চারণ করা বেশ জটিল। ফলে আমাদেরকে এটি শব্দের মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। যেমন- রঙ্‌,সঙ্‌,বাঙলা,ভাঙন,রাঙ্‌ ইত্যাদি।

ব্যবহারিক নিয়মঃ-

‘ন’ এবং ‘ম’ যেখানে শব্দের আদি,মধ্য ও অন্তে অবাধে বিচরণ করে; ‘ঙ’ সেখানে শুধুমাত্র শব্দের মধ্যে (বাঙলা,বাঙাল) এবং অন্তেই (রঙ্‌,ঢঙ্‌) ব্যবহৃত হয়। প্রত্যয় ও বিভক্তিযুক্ত হলে এবং পদের মধ্যে ও শেষে স্বরচিহ্ন থাকলে ‘ঙ’ব্যবহৃত হবে। যেমন- বাঙালি, ভাঙা, রঙিন, রঙের ইত্যাদি।

# ং’ এর ব্যাখ্যা ও ব্যবহারিক নিয়মঃ

১। অবস্থান-‘ং’বর্ণটি বাঙলা বর্ণমালার ‘অনুস্বর’নামে পরিচিত।

২। উচ্চারণ স্থান- জিহ্বা-মূল।

৩। নাম- জিহ্ববামূলীয় ধ্বনি।

৪। ধ্বনি বৈশিষ্ট্য- উচ্চারণ বাঙলা ‘ঙ’-এর মতো।

৫। শব্দে অবস্থান- ‘ং’বাক্যের প্রথমে বসতে পারে না।

ব্যবহারিক নিয়মঃ- শব্দের মধ্য ও অন্তে অবাধে বিচরণ করে। এ ধ্বনির প্রতীক বর্ণও শব্দের আদিতে ব্যবহৃত হয় না।কিন্তু প্রত্যয় ও বিভক্তিহীন শব্দের শেষে সাধারণভাবে ‘ং’ব্যবহৃত হবে। যেমনঃ সংঘ,ব্যাং ইত্যদি।

এতক্ষণে আমরা চিনতে পারলাম ‘ঙ’ এবং ‘ং’-এর লিখিত পার্থক্য কী। কিন্তু উচ্চারণে কি পার্থক্য হতে পারে? কী পার্থক্য হতে পারে?

# ‘ঙ’ এবং ‘ং’-এর উচ্চারণ পার্থক্য-

ধ্বনিগত দিক থেকে ‘ঙ’ এবং ‘ং’-এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কেননা কেউ বুঝতে পারবে না; যদি আমি বলি-“আমি বাঙলায় গান গাই”; এখানে ‘ঙ’ নাকি ‘ং’ ব্যবহৃত হয়েছে ! ফলে ধ্বনিগত দিক থেকে ‘ঙ’-এর পরিবর্তে ‘ং’-এর জন্য আমরা অতিরিক্ত কোনো ব্যঞ্জনা শুনতে পাই না। ফলে উচ্চারণের দিক থেকে এদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

# ঐতিহাসিক ‘ং’ও ‘ঙ’- (!)

এখন আমরা দেখব- ইতিহাসে কখন কিভাবে এই ‘ঙ’ এবং ‘ং’ব্যবহৃত হয়েছে।

দেবনাগরী অক্ষরে গুজরাটি ও মারাঠিতে এবং আধুনা হিন্দীতে অনুস্বারের (ং) স্বতন্ত্র কোনো ধ্বনি নেই। তা পরবর্তী বর্গীয় ধ্বনির নাসিক্য ধ্বনিজ্ঞাপক একটি চিহ্ন বা prosodic mark মাত্র। এসব ভাষায় সংকল্প,সঙ্গীত,সংবাদ,সংজয় প্রভৃতি শব্দে ব্যবহৃত অনুস্বার বাঙলার মত সর্বত্র ‘ঙ’ এর প্রতীক নয়। ফলে এর উচ্চারণে ভিন্নতা দেখা যায়। সেগুলো হল-

১। ‘ক’- বর্গীয় ধ্বনির পূর্বে ‘ঙ’-এর মত।

২। ‘চ’- বর্গীয় ধ্বনির পূর্বে ‘ঞ’-এর মত।

৩। ‘ট’- বর্গীয় ধ্বনির পূর্বে ‘ণ’-এর মত।

৪। ‘ত’- বর্গীর ধ্বনির পূর্বে ‘ন’-এর মত।

৫। ‘প’- বর্গীয় ধ্বনির পূর্বে ‘ম’-এর মত।

উদাহরণঃ

১। সংকল্প> সঙকল্প

২। সংজয়> সঞজয় বা সঞ্জয়

৩। পংডিত> পণ্ডিত

৪। কিংনর> কিন্নর / চংদ্র> চন্দ্র

৫। সংবাদ> সম্বাদ

সুতরাং দেখাই যাচ্ছে- ‘ং’ এবং ‘ঙ’ ধ্বনিগত দিক থেকে অভিন্ন। তাই ড. মুহম্মদ আবদুল হাই, তাঁর “ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব” বইটিতে বলেছেন-

“বাঙলায় অনুস্বার ‘ঙ’ এবং ‘ং’ ধ্বনিগত দিক থেকে অভিন্ন বলে বাংলার হরফ সংস্কারের সময় অনুস্বারকে বাদ দিয়ে পশ্চাত্তালুজাত ক-বর্গীয় স্পৃষ্টধ্বনির সহগামী নাসিক্য ধ্বনির প্রতীক ‘ঙ’ রাখলেই উভয়ের কাজ চলতে পারে।” (পৃঃ-৭৮)

এ থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে- ‘বাঙলা’ এবং ‘বাংলা’র মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।কিন্তু একটি দিয়ে যেহেতু আরেকটির কাজ চালানো যাচ্ছে, তাই শুধু শুধু দলভারী করে লাভ কি ! আমরা ‘বাঙলা’ই লিখতে পারি। যেহেতু এটি সর্বজন স্বীকৃত।

# সংবিধানে কোন্‌ বাঙলা ?-(!)

‘বাঙলা’লেখা যাবে। কিন্তু ভাল হয় যদি কেউ ‘বাংলা’লেখে। কেননা আমাদের সংবিধানে ‘বাংলা’ ও ‘বাংলাদেশ’ লেখা আছে।

আমি বোধ হয় মহাবিরক্তিকর কিছু একটা লিখেছি আপনাদের জন্য। যারা এটি পড়ে সময় নষ্ট করা ভাবলেন তাদের জন্য কিছু বলার নেই। আর যারা পড়ে উপকৃত হলেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

# যে কারণে এটি লেখা হল-

আমি ফেসবুকে অন্যের স্ট্যাটাস কিংবা অন্য কোনো কিছুতে কমেন্ট দেই না সাধারণত। কিন্তু আমার স্ট্যাটাসে কিছু মানুষ নিয়মিত কমেন্ট করে। আমি দেখি তারা বাঙলায় বেশ ভুল করে। আমি চিনতে পারি কোনগুলো টাইপ করতে গিয়ে ভুল হয়েছে আর কোনগুলো তার অজানার জন্য ভুল হয়েছে। ব্যাকরণে আমি যতটুকু জানি তাতে কোন ভুল চোখে পড়লেই আমি ঠিক করার জন্য বলি। এতে অনেকে বিব্রতবোধ করেন। তবে একটা ব্যাপার মাথায় রাখা উচিৎ- বাঙলা ভাষাটা আমাদের অনেক কষ্টের ভাষা। কাব্যে বলতে গেলে-‘রক্ত দিয়ে কেনা।’ তাই এ ভাষা নিয়ে একটু ভাবুন;একটু পড়ুন;একটু বিচরণ করুন। আশা করি ভাল লাগবে।

আমার লেখায় কোন বানান ভুল চোখে পড়লে দয়া করে লিখে দেবেন। আমি পরে সেটি ঠিক করে দেব।

ধন্যবাদ সকলকে।

# এটি লিখতে আমাকে যে বইগুলোর সাহায্য নিতে হয়েছে-

১। বাঙ্গালা ব্যাকরণ- ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

২। ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব- মুহম্মদ আবদুল হাই

৩। কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী- ডক্টর হুমায়ুন আজাদ

৪। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (নবম-দশম শ্রেনি )- মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী

৫। ভাষা-শিক্ষা(সম্পাদিত) – ডক্টর হায়াৎ মামুদ

৬। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান- ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক/শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী/স্বরোচিত সরকার।






মন্তব্য চালু নেই