মেইন ম্যেনু

বাংলার ঐতিহ্য নৌকাবাইচ

দীপংকর গৌতম : আবহমানকাল থেকে বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকাবাইচ। একসময় এ দেশে যোগাযোগ ছিল নদীকেন্দ্রিক আর বাহন ছিল নৌকা। এখানে নৌ-শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্র্র। এসব শিল্পে যুগ যুগ ধরে তৈরি হয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগর। এভাবে একসময় বিভিন্ন নৌযানের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কালের পরিক্রমায় ‘মেসোপটেমিয়ার’ মানুষদের শুরু করা খেলাটি আমাদের দেশেও চলে আসে। শুরু হয় নৌকাবাইচ।

শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ, সবাই আগ্রহ নিয়ে ছুটে চলেন নৌকাবাইচ দেখতে। প্রমত্তা নদীবক্ষে সংগীতের-তাল-লয়ে দাঁড়িদের ছন্দময় দাঁড় নিক্ষেপে নদী-জল আন্দোলিত করে যে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা হয়, তা অতুলনীয়। আবেগ-উত্তেজনার নৌকাবাইচ হয়ে ওঠে আপামর মানুষের নির্মল আনন্দের সপ্রাণ প্রতিভূ। নদীমাতৃক বাংলাদেশ নদীর তরঙ্গভঙ্গের সঙ্গে এ মাটির মানুষের আশৈশব মিতালি। নদী তাই হয়ে উঠেছে এখানে মানুষের প্রাণোচ্ছল ক্রীড়াসঙ্গী। এই প্রেক্ষাপটে নদীবক্ষে নৌকা শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, হয়ে উঠেছে জলক্রীড়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নৌকাবাইচ তারই একটি দৃষ্টিনন্দন রোমাঞ্চময় দৃষ্টান্ত। নৌকাবাইচের দেশীয় প্রেক্ষাপটটাও বিবেচনার বিষয়। সাধারণত ধান কাটার পরে কৃষকরা এ উদ্যোগ নেয়। একজন কৃষকের জমিতে ধান পাকলে ভূমিহীন মজুররা ধান কাটে। বর্ষার জলে ডুবে থাকা ধান কেটে ক্লান্ত জীবনের গতি আনতেই কৃষকদের এই আয়োজন। কৃষকরা তাদের মজুরদের নিয়ে বাইচের আয়োজন করে। গ্রামীণ কৃষকরা মজুরদের ওপর যে পরিমাণ নির্ভরশীল, তার জন্য সে তাকে শুধু শ্রমের মূল্যে মূল্যায়িত করে না। ধান কাটা হলে তাদের একদিন নাচগান ভূরিভোজের আয়োজন করে।

কৃষকের নৌকায় যে মজুররা যায় তাদের ‘বাইচা’ বলে। বাইচের দিন বাইচাদের খাবার আয়োজন হয় সকাল থেকেই। তারা খেয়ে কৃষকের দেওয়া একরঙা পোশাক পরে বাইচে যায়। টিকারা ও কাশির তালে চলে নৌকা। বাইচের স্বাভাবিক রীতিটি এমনি ছিল। কিন্তু ইংরেজ শাসনামলে সামন্ত জমিদাররা বাইচের সংস্কৃতিতে ঘূণ ধরায়। তারা বাইচাদের হাতে ঢাল-সড়কি ধরিয়ে যে কোনো উপায়ে জিততে বলে। এমনকি কোনো জমিদারের নৌকায় অন্য কোনো নৌকার জলের ছিটে লাগলেও শুরু হতো কাইজা। সামন্তরা গেলেও এমন অবস্থা কোথাও কোথাও রয়ে গেছে । সামন্তরা বাইচা না পুষে লাঠিয়াল পুষত। তাদের দিয়ে বাইচ দেওয়াত, যাতে গোলমাল করে হলে জেতা যায়। এভাবে সামন্তরা লাঠিয়ালদের সুবিধা দিয়ে পুষত। এমকি গ্রামও বানিয়ে দিত তাদের নামে। ঢাকার অদূরে সাভারের কাছে বিরুলিয়া গ্রামটির নামকরণের কারণ লাঠিয়াল বা বীরদের গ্রাম বলে। বাইচের সংস্কৃতি বদলেছে অনেক, বদলাচ্ছেও। নৌকাবাইচ হলো নদীতে নৌকা চালনার প্রতিযোগিতা। ‘বাইচ’ শব্দটি ফার্সি বাজি শব্দজাত, যার বিবর্তন ঘটেছে। এর অর্থ খেলা। তবে এখানে দাঁড় টানার কসরত ও নৌকা চালনার কৌশল দ্বারা বিজয় লাভের লক্ষ্যে আমোদ-প্রমোদমূলক প্রতিযোগিতা বোঝায়। একদল মাঝি নিয়ে একেকটি দল গঠিত হয়। এমন অনেক দলের মধ্যে নৌকা দৌড় বা নৌকা চালনা প্রতিযোগিতাই হলো নৌকাবাইচ।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ আয়োজন, উৎসব ও খেলাধুলা সবকিছুতেই নদী ও নৌকার সরব আনাগোনা। হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংস্করণ বাংলাদেশের নৌকাবাইচের সময় মাঝিরা একত্রে জয়ধ্বনি সহকারে নৌকা ছেড়ে দিয়েই একই লয়ে গান গাইতে আরম্ভ করে এবং সেই গানের তালের ঝোঁকে ঝোঁকে বৈঠা টানে। যার ফলে কোনো বৈঠা ঠোকাঠুকি না লেগে একসঙ্গে পানিতে অভিঘাত সৃষ্টি করতে থাকে। গায়েন বা পরিচালক কাঁসির শব্দে এই বৈঠার এবং গানের গতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্য সব নৌকাকে পেছনে ফেলে নিজেদের নৌকাকে সবার আগে যাওয়ার চেষ্টায় প্রয়োজনবোধে কাঁসির শব্দে বৈঠার গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সেই সঙ্গে গানের গতিও বেড়ে চলে। এ ছাড়া এই সময় দেহ ও মনের উত্তেজনার বশেই গানের মধ্যে ‘হৈ হৈয়া’ এই ধরনের শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। কালের বিবর্তনে পাশ্চাত্যের ভাবধারায় আধুনিক সুযোগসুবিধার সম্মিলনে কতক শহর গড়ে উঠলেও গ্রামবাংলায় নৌকাবাইচের কদর এখনো ব্যাপক। নৌকাবাইচে আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই তার প্রমাণ।

নৌকাবাইচের সময় মাল্লারা সমবেত কণ্ঠে যে গান গায়, তা সারিগান নামে অভিহিত। নৌকার মধ্যে ঢোল, তবলা, টিকারা নিয়ে গায়েনরা থাকেন। তাঁদের গানগুলো মাঝিদের উৎসাহ আর শক্তি জোগায়। ঢোল ও করতালের, টিকারা, কাঁসির সঙ্গে সঙ্গে নৌকাবাইচে মাঝি-মাল্লারা তালে তালে একসুরে গান গেয়ে ছুটে চলেন। মাল্লাদের কণ্ঠে যখন দরাজ সুর ভেসে আসে, তখন বিশাল নদীবক্ষেই যেন উন্মনা হয়ে ওঠে।

নৌকাবাইচের সময় মাঝি-মাল্লারা সমবেত কণ্ঠে একটি জনপ্রিয় সারিগান :

আল্লায় বলিয়া নাও খোল রে

ভাই সক্কলি।

আল্লাহ বলিয়া খোল।

ওরে আল্লা বল নাও খোল

শয়তান যাবে দূরে।

নৌকাবাইচের নৌকা হয় সরু ও লম্বাটে। কারণ, সরু ও লম্বাটে নৌকা নদীর পানি কেটে দ্রুতগতিতে চলতে সক্ষম। নৌকার সামনে সুন্দর করে সাজানো হয় এবং ময়ুরের মুখ, রাজহাঁসের মুখ বা অন্য পাখির মুখের অবয়ব তৈরি করা হয়। দর্শকদের সামনে দৃষ্টিগোচর করতে নৌকাটিকে উজ্জ্বল রঙের কারুকাজ করা হয়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের নৌকা ব্যবহার করা হয়। সিলেট অঞ্চলে সারেঙ্গী নৌকা ব্যবহার করা হয়। এর আকার কোষা ও ছিপজাতীয় বাইচ নৌকার মতোই সরু, লম্বায় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট। তবে এর প্রস্থ একটু বেশি পাঁচ থেকে ছয় ফুট হয়। নৌকা তৈরিতে শাল, শীল কড়ই, চাম্বুল, গর্জন ইত্যাদি কাঠ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় সাম্পান, গয়না ইত্যাদি নৌকাও ব্যবহৃত হয়। বাইচের নৌকাগুলোকে সোনার তরী, জয়নগর, চিলেকাটা, অগ্রদূত, ঝড়ের পাখি, পঙ্খীরাজ, ময়ুর পঙ্খী, সাইমুন, দ্বীপরাজ ইত্যাদি নামে ডাকা হয়।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে লোকায়ত বাংলার লোকসংস্কৃতির অংশ নৌকাবাইচ কবে এ দেশে গণবিনোদন হিসেবে প্রচলন হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। জনশ্রুতি আছে, জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়। এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এ থেকে কালক্রমে নৌকাবাইচের শুরু।

অন্য একটি জনশ্রুতি হলো, পীরগাজীকে কেন্দ্র করে। আঠার শতকের শুরুর দিকে কোনো এক গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ে থাকা তা ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোনো নৌকা ছিল না। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙিনৌকা খুঁজে বের করেন। যখন নৌকাটি মাঝনদীতে এলো, তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হলো। নদী ফুলে ফেঁপে উঠল। তখন চারপাশের যত নৌকা ছিল, তারা খবর পেয়ে ছুটে আসে। সারি সারি অজস্র নৌকা একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। এ থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়।

অন্যদিক কেউ কেউ মনে করেন, মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌকাবাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল। নবাব বাদশাহদের নৌবাহিনী থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়।

পৃথিবীতে সর্ব প্রথম ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরাই এই খেলাটির প্রচলন করেছিল বলে ইতিহাস বলে। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে একধরনের নৌকাবাইচের আয়োজন করত। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীল নদের জলে নৌকা চালনা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর ছড়িয়ে পড়তে থাকে এর প্রসার। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতাটি এখনো ব্যাপক জনি প্রয়। ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় নৌকাবাইচ অন্তর্ভুক্ত আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ সংস্কৃতি এখন চালু রয়েছে।

তামিলনাড়ুর ওনামই বাইচের সমরূপ-বাংলায় যে সময় আড়ং, আড়ম বা বাইচ অনুষ্ঠিত হয় ঠিক একই সময় তামিলনাড়ুর সমুদ্রতটবর্তী অঞ্চল বিশেষত কেরালায় অনুষ্ঠিত হয় ওনাম উৎসব। ওনাম সম্ভবত প্রাচীন অসুর শব্দ আড়মের সংস্কৃতিকরণ। এই ওনাম উৎসবে বাইচের মতোই অনুষ্ঠিত হয় বাল্লাম কেলি মালাবার উপকূলের নৌপ্রতিযোগিতার সর্বাধিক প্রচলিত আনন্দদায়ক খেলা। এই প্রতিযোগিতা ওনাম উৎসবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ওনাম একটি কৃষি উৎসব। ফসল ঘরে তোলার পর উপকূলের মানুষ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে। চারদিন ধরে চলে নাচ, গান ও ভোজনের উৎসব। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ হলো বাল্লাম কেলি। রংবেরঙের শতাধিক নৌকা নিয়ে আন্নামালাই, কোট্টিয়াম ও কোবালাম অঞ্চলের সাধারণ মানুষ মেতে ওঠে নৌপ্রতিযোগিতায়। কাড়া, নাকাড়া ও করতালের দ্রুত ছন্দে চলে বৈঠার টান। নৌকাবাইচের গানের মতোই বাল্লাম কেলির গানে থাকে একই ছন্দ, একই আবেগ ও একই দ্যোতনা। ফলে আড়ম-ওনাম, বাল্লাম কেলি ও বাইচ যে সম সংস্কৃতিসম্পন্ন জনপুঞ্জের লোকায়ত বিদ্যা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

কিছুদিন ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌকাবাইচের আয়োজন চলছে। এই আয়োজন অব্যাহত থাকলে নৌপথের খেলা দীর্ঘদিনের হারানো ঐতিহ্য নৌকাবাইচ পুরোপুরি স্বরূপে ফিরে না এলেও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। এই খেলাকে সারা দেশে আগের অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার পথ আমরাই নষ্ট করে ফেলেছি। বিভিন্নভাবে নদী দখল ও কল-কারখানার বর্জ্যের মাধ্যমে নদীকে মেরে ফেলেছি। নষ্ট করে ফেলেছি নদীর পানি। নদী তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলেছে। ফলে পানি শুকিয়ে নদী মরে যাচ্ছে। ফলে এমনিতেই হারিয়ে যাচ্ছে নৌপথের খেলা নৌকাবাইচ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও ইছামতি নদীতে তাই এখন আর নৌকাবাইচের আয়োজন দেখা যায় না। অনেক স্থানের নদী মরে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের বাইচের দুটি বড় এলাকা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার বাঘিয়া ও কালিঞ্জিরি (কালীগঞ্জ) এলাকার বাইচ। দুটি বাইচই ছিল বিলবাসী মানুষের বিনোদন। বিলের পাড় দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণ করে বিলে জলের বহতা কমে যায়। ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসে বিল। ফলে বাইচ দেওয়া এখানে অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরপর বাইচ চলে আসে খালে। এই খালে জলের বহতার মূল উৎস ছিল আড়িয়াল খাঁ নদ ও মধুমতি নদী। দুটোর অবস্থাই শোচনীয়। খালের মতো হয়ে গেছে নদী। জলের বহতা নেই। তবু বাইচের দিন যেন শেষ হয় না। বাইচকেন্দ্রিক মেলা বাইচের অন্যতম আকর্ষণ, অন্তত শিশু-কিশোরদের কাছে। প্রতিবছর বাইচের কাছাকাছি সময় এলে ছেলেমেয়েরা এখনো টাকা জমা করে। বাইচের দিন খরচ করার অপেক্ষার প্রহর গোনে সবাই। ক্রমশ সেই সব দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

এ ছাড়া বাইচে ব্যবহৃত সব গানে প্রাণবন্ত ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সুর থাকে। থাকে লোকজ শব্দের অসাধারণ ব্যবহার। হাওর-নদী, বিল-বাঁওড়ে বাইচের প্রচলন কমে আসায় সেসব প্রাণবন্ত শব্দ, সুরের ব্যবহার এখন আর তেমন একটা শোনা যায় না। আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য নৌকাবাইচ নানা প্রতিকূলতার পথ পাড়ি দিয়ে আজ ক্লান্ত। হারিয়ে যেতে বসেছে মেহনতী মানুষের বিনোদনের অন্যতম নিয়ামক নৌকাবাইচ। মেহনতী মানুষের শ্রম, ঘাম, উৎসাহ-উদ্দীপনা, আনন্দ আর উত্তেজনার খেলা বলতেই নৌকাবাইচ। ‘বারো মাসে তেরো বাইচ’-এর একটি প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ভাটি অঞ্চলের সারিগান গেয়ে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন শৌখিন মাল্লারা। নৌকার দাঁড় টানার কসরত ও নৌকা চালানোর উদ্দীপনা জোগাত এই সারিগান। জয়-পরাজয় নির্ভর করত নৌকার মাল্লাদের ওপর। কিন্তু আজ নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা দিন দিন কমে যাওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে, যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে থেমে যাচ্ছে ভাটি বঙ্গের সারিগান। উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন নৌকার মালিকরা। এখনো দেশের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাঝেমধ্যে নৌকাবাইচ হয়। কিন্তু আগের মতো সেই আনন্দ-উদ্দীপনা আর আবেদন নেই। তাতে অনেকটা ভাটা পড়ে গেছে। পড়ারই কথা। সংস্কৃতি এমন একটা বিষয়, যেটা শুধু একা নয়। এর সঙ্গে আরো বহু যুক্ত। পুঁজির অস্থির উত্থান-পতন, শ্রমজীবী মানুষের পেশাবদল, নদী, খাল, বিল শুকিয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের এপাশ বাঁচে তো ওপাশ বাঁচে না। এমন অবস্থায় ঐতিহ্য-সংস্কৃতির টিকে থাকা কষ্ট। এ অচলায়তনের পরিবর্তন জরুরি। যেসব মানুষ এগিয়ে এলে এসব সমস্যা কাটিয়ে, বাইচের নৌকা জল কেটে চলে যাবে সবার আগে। তারা কি এগিয়ে আসবেন না? আমরা কি শুনব না—

‘ভগমানের আশীর্বাদে, হেইয়া হো

তোমার আমার মধ্যে যত কালিমারই পোচ

মুচতে বলে মাগো কালি মোচ মোচ মোচ।

হেইয়া গেল- হরিব্বোলো, হেইয়া গেলো রে হে।’

তথ্যসূত্র : মাঠকর্ম ও ইন্টারনেট






মন্তব্য চালু নেই