মেইন ম্যেনু

”বাংলার প্রিন্স”

সাফাত জামিল শুভ : সত্তর দশকের মাঝামাঝি প্রাচ্যের এক অল্প বয়সী যুবকের ধুমকেতুর মতো বাণিজ্যিক উত্থান দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিল বহির্বিশ্ব। সৌদি আরব এবং কাতার প্রবাসী খ্যাতিমান এই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর উত্থান সত্যিই উল্কার মত ঝলসে উঠেছিল। আরব্য রজনীর গল্প-কাহিনীর মতো তার বিস্ময়কর জীবন-কথা নিয়ে রচিত উপাখ্যান ’৮০ দশকের বিশ্ব-গণমাধ্যমে বারবার শিরোনাম হয়। পশ্চিমা বিশ্বে দারুণ সাড়া জাগানো বাংলাদেশি এই খ্যাতিমান অস্ত্র-ব্যবসায়ী যেন রূপকথার রাজপুত্রের মর্যাদাই লাভ করেন।

পশ্চিমাদের কাছে ‘বাংলাদেশের প্রিন্স’ হিসেবে পরিচিত তিনি। বিপুল সম্পদশালী ধনকুবের হিসেবে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি তার।লোকের মুখে মুখে আছে তার বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। তার বিপুল সম্পদরাজি,লাইফস্টাইল সব মিলে রহস্যের যেন শেষ নেই। প্রায় তিন দশক ধরে সেই রহস্যের নাম- মুসা বিন শমসের।

বাংলা উইকিপিডিয়ায় মুসা বিন শমসেরকে ‘বিজনেস মোগল’ এবং ‘প্রিন্স মুসা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ড্যাটকো গ্রুপের চেয়ারম্যান। আর্মস ডিলার হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিত বলেও উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে।ফোর্বস ম্যাগাজিন অনুযায়ী, মুসা বিন শমসেরই বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। তার মূল সম্পত্তি প্রায় ১২ বিলিয়ন ইউএস ডলারের উপরে। তিনি অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিত।

টেলিগ্রাফ ম্যাগাজিনের চোখে ‘ড. মুসা বিন শমসের প্রচন্ডমাত্রায় একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব’। মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিলো বর্ণবাদ বিরোধী কৃষ্ণাঙ্গ নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, লেখক ডেভিট ফ্রস্ট, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিংয়ের। মার্গারেট থেচার, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশও তার বন্ধু। প্রত্যেকেই মুসাকে বিভিন্ন উপাধি দিয়েছেন-মর্মে উল্লেখ করা হয় মুসা সংক্রান্ত জার্নালে।একবার ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে নির্বাচনে ৫০ লাখ পাউন্ড অনুদানের ঘোষণা দিয়ে, একবার আয়ারল্যান্ডের জাতীয় ঐতিহ্য কালকিনি দুর্গ কিনে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর বানানোর প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় আসেন প্রিন্স মুসা।১৯৯৮ সালে বিশ্বখ্যাত লন্ডনের সানডে টেলিগ্রাফের মে সংখ্যায় ‘ম্যান উইথ দি গোল্ডেন গানস’ শিরোনামে প্রথম হাইলাইটস হয়েছিলেন তিনি।

১৯৭৮ সালে ড. মূসা বানিজ্য সংশ্লিষ্ট কাজে সৌদি আরবে থাকাকালীন, নিজ উদ্যোগে ও বিপুল অর্থ ব্যায়ে জেদ্দায় এক জাঁকালো ও অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক অধিবেশনের আয়োজন করেন। অভ্যাগত স্মমানীত স্থানীয় ও বিদেশী অতিথিদের মধ্যে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মহামান্য প্রিন্স সুলতান বিন আব্দুল আজিজও উপস্থিত ছিলেন। প্রিন্স সুলতান প্রধান অতিথীর ভাষণে ড. মূসাকে তাঁর ব্যাক্তিগত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাঁর ভুয়শী প্রশংসা করেন এবং সঙ্গত কারনেই বাংলাদেশকে প্রাধিক্যপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে গণ্য করতে সংশ্লিষ্ট্য সব মহলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

প্রিন্স মুসার বিলাসী শৌখিনতার প্রমান মিলে নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র গুলোতে। তার হাতের ঘড়ির ডায়াল এবং ব্রেসলেট হীরক খচিত। যার মূল্য অর্ধ মিলিয়ন ডলার এবং সবচেয়ে মূল্যবান ঘড়ির বেল্ট, কাফলিঙ্ক-এর সেটের মূল্য ১.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কেবল তার জন্যে প্রস্তুতকৃত এই মূল্যবান ঘড়িটি তৈরি করা হয়েছিল ২৭ মাসেরও বেশী সময় ধরে। বিশ্ব বিখ্যাত রোলেক্স কোম্পানি এই অত্যাশ্চার্য্য ঘড়িটির প্রস্তুতকারক।

তার সংগ্রহে আছে ২৪ ক্যারেট সোনা আর ৭৫০০টি হীরকখণ্ডে তৈরি এক কোটি ডলার দামের একটি কলম। বছরের পর বছর এ কলমটি আবার কড়া প্রহরায় রক্ষিত থাকে সুইস ব্যাঙ্কের ভল্টে।আইরিশ ডেইলি মিরর এ নিয়ে কলাম লিখে ‘ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন পেন’।ফ্রান্সে তৈরি ওই রাজকীয় কলম মাত্র একটিই তৈরি করেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি।

১০ লাখ ডলার দামের হীরে-পান্না গলায় এবং লক্ষ লক্ষ ডলারের আংটি পড়েন।বৃটেনের দ্যা উইকলি নিউজ তাকে নিয়ে শিরোনাম করে- ‘গোল্ডফিঙ্গারস্! ম্যান উইথ দ্য মিডাস টাচ ওন্ট জাস্ট রাইট অব ফ্রোজেন অ্যাসেটস’।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডিজাইনার বলে খ্যাত প্রিওনি বেলভেস্ট এবং খ্রিস্টিয়ান ডিয়রের বিশেষ ব্র্যান্ডের পোশাক গায়ে জড়ান।তার সংগ্রহে এরকম অসংখ্য মূল্যবান স্যুট রয়েছে যার মধ্যে বেশ কয়েকটি স্যুট স্বর্ণসুতাখচিত। এক স্যুট পরিহিত অবস্থায় দু`বার দেখা যায় না তাকে। এমনি মূল্যবান প্রতিটি স্যুটের দাম ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার পাউন্ড, যা শুধু তার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এসবের জন্য তাকে বলা হয় The Best Dressed Man of the World.

তার পোশাক, পছন্দ-অপছন্দ বৃটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্যার এন্থনি ইডেনের মত যা ঊনবিংশ শতাব্দির সেরা ফ্যাশনরাজ বিউব্রামেল এর সাথেই কেবল তুলনা চলে।ফিলিপাইনের ফাষ্ট লেডি ইমেল দ্য মারকোসের ওয়্যারড্রব ভরে থাকত শতশত জোড়া সৌখিন জুতোয়। মুসা বিন শমসেরের বিলাসিতা তার চেয়েও বিস্ময়কর।তিনি পায়ে দেন হীরাখচিত জুতো।আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, প্রিন্স মুসা হীরকখচিত যে জুতো পরেন তার মূল্য লক্ষ্য ডলার। তার সংগ্রহে এমনি রত্মখচিত হাজারো জুতো রয়েছে।

কখনো এক পোশাকে দুবার দেখা মেলে না তার। এমনও বলা হয় তিনি এক বিমানেও দুবার চড়েন না। শ্বেতপাথরে মোড়ানো বাড়িতে তিনি থাকেন। তাও আজ কার্ডিফের বাড়িতো কাল লাসভেগাসের লাল-নীল আলোর বর্ণিল ফ্লাটে। কখনো আবার ঢাকার গুলশানের সুরম্য প্রাসাদে। ওই বাড়ির গোলাপ রস আর দুধের স্বর মেশানো বাথ ট্যাবের জলে স্নান করেন। ডলারে মোড়ানো বিছানায় ঘুমান তিনি।সবসময় ফ্রান্সের ইভিয়ান ব্র্যান্ডের পানি পান করেন।

তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আছে ১২ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৯৩ হাজার কোটি টাকা।

১৯৯৯ সালের দিকে হোটেল শেরাটনে নিজের জন্মদিনের অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবার জন্য তিনি বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলা কয়েক ঘণ্টার জন্য ভাড়া নিয়েছিলেন ।

ছয়জন দুর্ধর্ষ দেহরক্ষী ছাড়া তিনি কোথাও যান না, চলাফেরা করেন না।

একবার তিনি তার ব্যাক্তিগত জেট প্লেনটি ধার দিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বব ডোলের যাতায়াতের জন্য। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট তাকে নিয়মিত ফোন করে পরামর্শ নেয়। ক্ষমতায় থাকার সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলতসিন নিয়মিতই খোঁজ নিতেন তার।

প্রখ্যাত এই ধনকুবের সপরিবারে থাকেন ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকার একটি সুরম্য প্রাসাদে। অত্যন্ত মনোমুগ্ধকরভাবে সাজানো প্রাসাদটি দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। লিভিং রুমসহ প্রাসাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ছাদে শোভা পাচ্ছে বড় বড় দ্যূতিময় অসংখ্য ঝালর এবং ঘরগুলোর মেঝে মহামূল্যবান ঝকমকে কার্পেটে মোড়া। লিভিং রুমের আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে সুপরিসর ডাইনিং স্পেস। সব মিলিয়ে প্রাসাদটি একটি স্বপ্নপুরীতে পরিণত হয়েছে।

FB_IMG_1470873116967-1

শতাধিক সুশিক্ষিত এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও ইউনিফর্ম পরিহিত একটি দক্ষ কর্মী বাহিনী নিয়োজিত আছে প্রাসাদটি দেখাশোনার জন্য। এই কর্মীরা পাঁচতারা হোটেলের কর্মীদের চেয়েও উন্নত মানের সেবা প্রদানে সক্ষম। প্রিন্স মূসার ঢাকার প্রাসাদকে ঘিরে মিডিয়াতে বিভিন্ন কল্পকাহিনী প্রচারিত হয়েছে এবং দেশি-বিদেশি সব বয়সের পাঠকদের বিমোহিত করেছে। প্রাসাদে মাঝে মাঝে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। অত্যন্ত সৌভাগ্যবান দেশি ও বিদেশি মেহমানরাই শুধু ওই নৈশভোজগুলোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে ধন্য হয়েছেন। ওই সৌভাগ্যবানদের কয়েকজন আলাপকালে জানিয়েছেন, তারা প্রিন্স মূসা ও তাঁর পরিবারের আতিথেয়তায় অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছেন যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এ এক অকল্পনীয় মনোমুগ্ধকর অনুভূতি। তাই প্রিন্স মূসার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দেশের একমাত্র ফাইভ-স্টার ফ্যামিলি হিসাবে সুপরিচিত ও সমাদৃত।

প্রিন্স মূসা তিনটি বুদ্ধিদীপ্ত ও মেধাবী সন্তানের গর্বিত পিতা। ওরা হলেন ন্যান্সী, ববি এবং জুবি। তারা প্রত্যেকেই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

IMG_20160812_043920_300-1

প্রিন্স মূসার প্রথম সন্তান ন্যান্সি জাহারা বিনতে মূসা। তিনি ইউএসএর ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস থেকে গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্ত করেন এবং টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করেন। ন্যান্সি বিয়ে করেছেন সুধী সমাজে পরিচিত স্বনামধন্য ব্যবসায়ী শেখ ফজলে ফাহিমকে। দ্বিতীয় সন্তান ববি হাজ্জাজ বিন মূসা ইউএসএর ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস থেকে গ্র্যাজুয়েশন এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। একজন অক্সফোর্ড স্কলার ববি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার এবং বিখ্যাত কলামিস্ট হিসেবেও সুপরিচিত। ববি ব্যারিস্টার রাশনা ইমামের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন যিনিও একজন অক্সফোর্ড স্কলার এবং নিজস্ব পেশায় একজন উদীয়মান তারকা।প্রিন্স মূসার তৃতীয় সন্তান জুবি হাজ্জাত বিন মূসা বিশ্ববিখ্যাত লিংকন্স ইন থেকে একজন সফল ব্যারিস্টার হিসাবে গ্র্যাজুয়েশন এবং ইউনিভার্সিটি অব ওলভারহ্যাপটন থেকে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ল ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে জুবি আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। তিনি সুমি নাসরিনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন যিনি একটি অভিজাত ক্যানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্ত করেছেন এবং বর্তমানে তার নিজস্ব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।

FB_IMG_1470955307766

ব্যক্তি মুসা আত্মপ্রচারমুখী মানুষ। নিজেকে সব সময় সমাজের উচ্চবর্গীয় হিসেবে ভাবতে পছন্দ করেন তিনি। তাই ক্ষমতা ও অর্থের বিকল্প কোনো মন্ত্র নেই তার কাছে। জীবনযাপনের বিলাসিতাও এরই অংশ। ২০১০ সালে নিজের ১২ বিলিয়ন ডলার সুইস ব্যাংকে আটকে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের মিডিয়ায় ফের আলোচনায় আসেন মুসা। সেময় বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার সম্পদকে ‘অস্বাভাবিক’ মনে করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেন। পরে ২০১১ সালের জুনে মুসা বিন শমসেরের ব্যাংক হিসাব তলব করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে তলব করেন। তখন চার নারী নিরাপত্তাকর্মীসহ ৪০ জনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর বিশাল বহর নিয়ে তিনি দুদক কার্যালয়ে গিয়েছিলেন।






মন্তব্য চালু নেই