মেইন ম্যেনু

বাংলা টিভি নাটকে নারী চরিত্রের বিবর্তন

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সকল পেশার নারীর পাশাপাশি নাট্যঙ্গনের নারীরাও এগিয়ে চলছে সমান তালে। দেশ চালানোর মত গুরত্বপূর্ণ ভূমিকায় যেখানে নারীদের আধিপত্য, সেদিকে নাটকের মূখ্য ভূমিকায় ও নাম চরিত্রে এগিয়ে থাকবে এটা আকাশ কুসুম কল্পনা কিছু না।

সেই প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে অভিনয়, তথা নাটক ছিল জনপ্রিয় বিনোদনের মাধ্যম। সেটা হয়েছে কখনো টেলিভিশনের নাটক বা হয়েছে কখনো মঞ্চ নাটকে। কিন্তু যখন টেলিভিশনের নাটক ছিল না, তখন মানুষ যাত্রা, জারি গান, পালা নাটক দেখত। তবে সেই সময়ের নারী চরিত্রগুলোতে অভিনয় করত, নারী পোশাকধারী পুরুষ। তাই নারীর আবেদন পুরুষকে মোহিত করলেও নারীরা ঠিক পুরুষরুপী নারীদের ভেতর নিজেদের খুঁজে পেতেন না।

তবে তা কালের বিবর্তনে অনেক পরিবর্তন চলে এসেছে। এখন অভিনয়ে নারী চরিত্রগুলো নারীরাই করছেন। ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে টেলিভিশন চ্যানেল আসে যা কি না ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৮ ঘন্টা সম্প্রচার করতো। সেই ১৮ ঘন্টার মধ্যেও শিল্পী সংকটের কারণে সপ্তাহে একটি করে নাটক সম্প্রচারিত হত। সেই সংকট প্রায়ই দেখা যেত নারী চরিত্রগুলো তে বেশি হচ্ছে।

ফেরদৌসি মজুমদার, জাহানারা আহমেদ, শর্মিলি আহমেদ, লায়লা হাসান, দিলারা জামানের মত দাপুটে অভিনেত্রীরাই ছিলেন স্বাধীনতা উত্তর টেলিভিশন নাটকের পরিচিত মুখ। তাদের দাপুটে সব চরিত্ররা বাংলার নারীদের এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা হয়ে এসেছে। বিশেষ করে আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘সংশপ্তক’ নাটকে ফেরদৌসি মজুমদারের অভিনয় নারীদের অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সাহস যুগিয়েছে। আরো বেশ কিছু নারী চরিত্রে এইসব অভিনেত্রীরা নারীদের শিক্ষায় এগিয়ে আসার উৎসাহ হয়েছেন। তাদের দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত নানা চরিত্রেও। তারা প্রতিনিধিত্ব করেছেন সেই সময়টাকে।

সেই অনুপ্রেরণায় ৮০’র দশকে আমরা ডলি জহুর, সুবর্ণা মুস্তাফা, তারানা হালিম, লতা, শম্পা রেজার মত জনপ্রিয় অভিনেত্রীদেরকে পেয়েছি। তারা কেউ এসেছেন চিরাচরিত বাঙালি নারী হয়ে। যারা মুখ বুঝে সয়ে যান পারিবারিক ও সাংসারিক সব কাজ ও ঝামেলা। কেউ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে পর্দায় এসেছেন, কেউ আবার চেষ্টা করেছেন আধুনিকতার মোড়কে চির প্রাচীন প্রথা ভেঙ্গে নারীদের একটা ফর্সা আঙ্গিনায় নিয়ে যাবার মন্ত্র হয়ে।

পাশাপাশি এই অভিনেত্রীদের সময় বিভিন্ন শ্রেণির জনগনের মধ্যে ছিল বৈষম্য ও সামাজিক সংকট। ৯০ দশক হচ্ছে বাংলা নাটকের নতুন সূচনা লগ্ন। তাই সেই সময়কার নাটকে উঠে এসেছে, সেই সময়ে নারী চরিত্র থেকে শুরু করে নাটকের সকল চরিত্রের মধ্যে এসেছে বৈচিত্র।

তার ভিড়ে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সেই স্রষ্টা; যিনি নারী চরিত্রগুলোকে উপস্থাপন করেছেন মমতাময়ী, বিপ্লবী ও সংগ্রামী হিসেবে। তার গল্পে নারীরা আসতো বৈচিত্র নিয়ে। এক নারীর ভেতর তিনি অনেক নারীকে হাজির করেছেন রহস্যের জাল বুনে। নব্বই দশকে হুমায়ূন আহমেদের ‘অয়োময়’ নাটকে এলাচি বেগম চরিত্রে সারা জাকের ও তার শাশুড়ির চরিত্রে দিলারা জামানকে তেমনই দেখা গেছে। কোমলে কঠোর ছিলেন তারা। লবঙ্গ বেগম চরিত্রে বিপাশা হায়াত এসেছেন প্রেম আর চঞ্চলতায় ভর করা আধুনিক এক যুবতী হয়ে। সেই নাটকে সুবর্ণা মুস্তাফার চরিত্রটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। ঠান্ডা মাথায় বিপদ মোকাবিলা করে সফল হওয়ার পথে স্বামীকে এগিয়ে যেতে স্ত্রীর যে মন্ত্রণা তা তা মুগ্ধ করেছিলো দর্শকদের।

পাশাপাশি তুমুল জনপ্রিয় ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে কিংবদন্তি হয়েই আছে সুবর্ণা মুস্তাফার মোনা চরিত্রটি। এখানে মোনা বাকের ভাইয়ের প্রেমিকা হিসেবে অমরত্ব পেলেও চরিত্রটি প্রতিনিধিত্ব করেছিলো সেই সময়ে শিক্ষিতা যুবতীদের দিন যাপনের সংগ্রামের। যে নারী নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলো একটা রুগ্ন, ভঙ্গুর পরিবারের দায়িত্ব।

অন্যদিকে হুমায়ূন আহমেদরই আরেক অমর সৃষ্টি ‘আজ রবিবার’ গল্পের নাটকে মীরা চরিত্রে সুবর্ণা মুস্তাফা হাজির হয়েছেন মমতা-কঠোরের মিশেলে সংসারের মূল চাবিকাঠি হয়ে। এখানে তার হাত ধরেই জামিলের (আবুল হায়াত) পরিবার বদলে যায়, নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। অন্যদিকে একই নাটকের দুই নারী চরিত্র তিতলি(শাওন) ও কঙ্কা(শিলা) থেকে বাবা ও মেয়ের মাঝে যে মধুর সম্পর্ক তারই একটা পরিচয় পাওয়া যায়।

সেই সময় নারী চরিত্রদের পোষাক ও সাজের মধ্যেও ছিল স্বাভাবিক জীবন যাপনের সাথে সামঞ্জস্যতা। আধুনিকতা ছিলো কিন্তু বারাবারি নয়। ঠিক একই আবহে পরের প্রজন্মেই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন শমী কায়সার, আফসানা মিমি, বিপাশা হায়াত, তানিয়া আহমেদ, তারিন, বিজরী বরকতউল্লাহ, তনিমা হামিদ, ত্রপা মজুমদার, অপি করিমরা। তবে এই সময়টাতে এসে দ্রুপদী সাহিত্য নিয়ে নাটক নির্মাণে বিপ্লব হয়েছে বলা চলে। নায়িকারা কখনো কেউ ‘শেষের কবিতার’ লাবন্য হয়েছেন, কেউ ‘হৈমন্তী’র হৈমন্তী হয়েছেন, কেউ আবার শরৎচন্দ্র, সমরেশ, সুনীলের নায়িকা হয়েও দর্শক মাতিয়েছেন। এইসব নাটকে সজীব আর প্রাণবন্ত হয়ে এসেছে নারীর আধুনিকতা, রুচি, মমতা, রুক্ষতা, কূট-কৌশল। এর বাইরে মৌলিক নাটকে শমী-বিপাশারা মুগ্ধ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী হয়ে, শাসন আর ভয়ের বলয় ভেঙ্গে স্বাধীন হবার যুদ্ধে, মুখ বুঝে স্বামীর অন্যায় না সয়ে তাকে ভালো পথে নিয়ে আসার চেষ্টায়, জীবনানন্দ দাশের প্রেমের কবিতায়।

তাদের পরবর্তীতে প্রিয়া ডায়েস, শ্রাবন্তী, ঈশিতা, শারমিন শিলা, রিচি সোলায়মান, সুমাইয়া শিমু, জয়া আহসান, প্রভা, রুনা খানের মতো অভিনেত্রীরাও নাটকের সোনালী দিনের ফ্লেভারটা পেয়েছেন। ততদিন পর্যন্ত নাটকের চরিত্রেরা মানুষের প্রতিনিধি হতে পারত, চরিত্রগুণে তারাকারাও জনপ্রিয় হতে পারতেন। সে সময় নারী চরিত্ররা ছিলো স্বাধীনচেতা ও আত্মনির্ভরশীল।

তবে আজ একবিংশ শতাব্দিতে এসে নাট্যাঙ্গনে নারী চরিত্রগুলোর উপস্থাপনায় অতিরিক্ত ও অতি রঞ্জিত একটা ভাব চলে এসেছে। বছরে হাতে গোনা দুই একটি নাটক পাওয়া যায় যেখানে চরিত্রগুলোকে চেনা যায়, কাছের মনে হয়। আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি রঙিন তাদের উপস্থিতি; পোশাকে ও সাজে।

তবে যতোটা প্রাণবন্ত এই সময়ের নারী চরিত্রের উপস্থাপন ঠিক ততটাই ম্লান, ফ্যাকাশে তাদের আবেদন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিবর্তিত হয়েছি বটে, কিন্তু আবেদন ধরে রাখতে পারিনি। তাল মিলিয়ে নারীর যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে কোনো চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। যেমনটি ছিলেন হুরমতি বুয়া, লবঙ্গ, মোনা কিংবা মীরারা।






মন্তব্য চালু নেই