মেইন ম্যেনু

বাংলা ধারাভাষ্যের একাল-সেকাল

সব সুন্দর কথা গালভরা কিন্তু সব গালভরা কথা সুন্দর নয়- ক্রীড়া সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গেলে কিংবা লিখতে গেলে এই কথা মাথায় রাখতেই হয়। আধুনিক যুগের কতিপয় সাংবাদিকের লেখায় সাহিত্য নির্ভর ক্রীড়া প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এক সময় খেলার প্রতিবেদন মানেই ছিল কার কত রান, কে ম্যাচসেরা ইত্যাদি ইত্যাদি। খেলার পাতায় সাহিত্য যত দিনে স্থান পেয়েছে তার ঢের আগে সে ঢুকে পড়ে ধারাভাষ্য কক্ষে। কিছু কিংবদন্তির কণ্ঠে ভর দিয়ে। বাংলাদেশ, ভারত (পশ্চিমবঙ্গ) দুই দেশের বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেই এই কথা প্রযোজ্য।

‘নমস্কার। ঘড়িতে সকাল আটটা বত্রিশ। ক্রিকেটের নন্দনকানন ইডেন উদ্যান থেকে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি অজয় বসু। আমার সাথে শ্রী পুষ্পেন সরকার। সুপ্রভাত।’

‘আ-উ-ট! আ-উ-ট! আ-উ-ট! প্রথম বলেই ইন্দ্রপতন। উইকেটরক্ষক জেফ দুঁজোর দস্তানায় প্রাণ জমা দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন ক্রিকেট-সম্রাট সুনীল মনোহর গাওস্কার (গাভাস্কার)। সোনা ঝরা রোদের এই শীতের সকালে কাতারে কাতারে দর্শক এখনও আসন পাওয়ার প্রতীক্ষায়। তার আগেই সিংহাসনচ্যুত তাদের অধীশ্বর। স্তম্ভিত ইডেন উদ্যান। বাকরুদ্ধ ক্রিকেটের নন্দনকানন। লক্ষ লক্ষ হৃদয়ের কল্লোল নিমেষে বদলে যাচ্ছে প্রিয়জন হারা হাহাকারে…।’ অজয় বসুর এমন সব কথা তো লোকগাথা হয়ে আছে। চামড়ায় ভাঁজপড়া যে কোনো ক্রিকেট পাগল বাঙালির কাছে অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার, কমল ভট্টাচার্য বাড়ির ছেলের মতোই। আর বাংলাদেশে খোদাবক্স মৃধা, নুর আহমেদ, মঞ্জুর হাসান মিন্টু, আবদুল হামিদ নামগুলোও একই রকম। তাদের পরে হালের চৌধুরী জাফর উল্লাহ শরাফাত, কুমার কল্যাণসহ আরো কয়েকজন আছেন, যারা চেষ্টা করছেন ওই পর্যায়ে নিজেদের নিয়ে যেতে।

অজয় বসুরা ধারাভাষ্যের নিজস্ব একটা ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। যেটা আজও বজায় আছে। টেস্টের সকালে শুরুটা করতেন অজয় বসু। তার জীবদ্দশায় এই নিয়মটা বজায় ছিল। কলকাতার তৎকালীন ধারাভাষ্যকাররাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন খেলার সময় বাঙালির কানে অজয় বসুর কণ্ঠই আগে যাবে। তিনি সাধারণত মাঠ, আশপাশ ইত্যাদি নিয়ে বলতেন। পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলার দরকার পড়লে পজিশন নিতেন পুষ্পেন সরকার। আর ক্রিকেটের টেকনিক্যাল দিক নিয়ে আলোচনা করতেন কমল ভট্টাচার্য। টেস্টের কোনও বড় টেকনিক্যাল ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার পড়লে কমেন্ট্রি বক্সে অজয় বসুর বাঁধাধরা কথা ছিল, ‘কমলদা, মাইকটা ধরুন’। আবার ম্যাচের বিশেষ আবহের জমকালো বর্ণনা দেওয়ার সময় এলেই কমল ভট্টাচার্য সব সময় বলতেন, ‘অজয়, এ বার তোমার পালা।’ আর কেউ সেঞ্চুরিতে পৌঁছলে বা পাঁচ উইকেট নিলে সেই সময় অবশ্যম্ভাবী মাইকটা চলে যেত পুষ্পেন সরকারের কাছে।

তিন জনেরই একটা অভ্যাস ছিল। সতীর্থ ধারাভাষ্যকার কোনও ভুল করে ফেললে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজে দায়িত্ব নিয়ে সেটা সামলে দেওয়া। কমল ভট্টাচার্য হয়তো অন্যমনস্কতায় এক জন অফস্পিনারকে লেগস্পিনার বলে ফেলেছেন, পাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাইক টেনে নিয়ে অজয় সামলে দিয়েছেন, ‘ও লেগস্পিনটা করলেও খুব খারাপ করত না বোধহয়, কী বলেন কমলবাবু!’ আবার কখনও অজয় তাড়াহুড়া করে স্কোয়ার লেগকে লেগ স্লিপ বলে বসেছেন, কমল ভট্টাচার্য সঙ্গে সঙ্গে হাতের মাইক ‘অন’ করে বলে উঠেছেন, ‘অজয়, ওটা সত্যিই স্কোয়ার লেগ, না লেগ স্লিপ এখান থেকে বোঝা একটু মুশকিল!’ তিনজনের মধ্যে এমনই বোঝাপড়া ছিল যে দর্শকদের কাছে কেউ আগ বাড়িয়ে প্রিয় হতে চাইতেন না। কিংবা কাউকে ছোটো করতে চাইতেন না।

কলকাতায় ধারাভাষ্যের এমন ‘ত্রিকোণ রীতি’ আজও প্রচলিত আছে। যারা ফুটবলের আসর আইএসএল জলসা মুভিজে দেখে থাকেন তারা বিষয়টা বুঝতে পারবেন। ডা.পল্লব বসু মল্লিক, ভারতের সাবেক তারকা গোলকিপার কল্যাণ চৌবে, দেবব্রত মুখোপাধ্যায় এবং দেবায়ন সেন। এই চারজনের মধ্য থেকে প্রতিদিন যে কোনো তিনজন কমেন্ট্রিবক্সে থাকেন। পল্লব সাধারণত পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলেন। দেবব্রত কিংবা দেবায়ন মাঠের পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করেন। আর কল্যাণ শ্রুতিমধুরভাবে টেকনিক্যাল বিষয়ে দর্শকদের পিপাসা মেটানোর চেষ্টা করেন। কখনো কেউ গোল করলে কল্যাণ সংক্ষেপে বুঝিয়ে দেন ফুটবলের ব্যাকরণগত দিক। গোলকিপারের পজিশনে কোথায় ভুল ছিল, তিনি কী করতে পারতেন। কিংবা যে শটে গোল হয়েছে ওই শটের নাম কী, কীভাবে এই ধরনের শট করতে হয় সেটা বলেন। অন্য দুজন ভুলেও এই ধরনের আলোচনা করতে যান না। ঠিক তেমনি কল্যাণকে কখনো মাঠের পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে শোনা যায় না।

বাংলাদেশের ধারাভাষ্য সমন্বয় আবার এমন নয়। সাধারণত দুইজনকে কথা বলতে শোনা যায়। তিনজন যে কথা বলেন না, সেটা নয়। তবে খুব কম। তবে কাউকে এমন নির্দিষ্ট বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায় না। সবাইকে নিজেদের মতো করে কথা বলতে শোনা যায়। প্রয়াত খোদাবক্স মৃধাদের সময়ে আবার ওই সমন্বয়টা ছিল। সবাই তখন সব বিষয়ে কথা বলতেন না। যেমন বাংলাদেশ নিজেদের মাঠে হারলে আর কাউকে বলতে শোনা যেতে না-‘আমারই বঁধুয়া যায়, আমারই আঙিনা দিয়া…।’ খোদাবক্স ছাড়া এমন গালভরা কথা নাকি কেউ বলার সাহসও দেখাতেন না!






মন্তব্য চালু নেই