মেইন ম্যেনু

বাচাল মানুষের মুখে লাগাম!

গল্প করতে খুব ভালোবাসেন? আড্ডা না মারতে পারলে মনে হয় দিনটাই বৃথা গেল? অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাটাকে গণতান্ত্রিক অধিকার বলে ভাবেন? কখনো কি স্বপ্নেও চিন্তা করতে পেরেছেন যে এই সাধারণ কাজগুলোর জন্যে প্রচন্ড কোন শাস্তি দেওয়া হতে পারে আপনাকে? হয়তো শুনতে অদ্ভূত লাগছে আপনার, কিন্তু বাস্তবে এমনটাই হয়েছে পুরোটা মধ্যযুগ জুড়ে। গল্প করতে ভালোবাসা নারীদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে অদ্ভূত এক মুখোশের মাধ্যে। আর এই মুখোশটির নাম স্কোলডস ব্রিডেল বা কথার লাগাম!

সেসময় বেশকিছু দেশে চালু ছিল প্রক্রিয়াটি। পরিবারের ভেতরে যে নারী সদস্যটি কথা বলতে বেশি ভালোবাসতেন তাকেই পশুর মতন এই লাগাম পরিয়ে দেওয়া হত। তাও আবার জনসম্মুখে। সবার সামনে অত্যাচার আর অসম্মানের মাধ্যমে প্রচন্ড কষ্টদায়ক এই জিনিসটি নারীদের মাথায় পরিয়ে দেওয়া হত। সেই সাথে তার গলায় পরিচিতি বেঁধে দিয়ে প্রদর্শনও করা হত পুরো শহরে।

২ ইঞ্চি লম্বা ও এক ইঞ্চি প্রস্থের এই কথার লাগামের মূল কষ্টদায়ক অংশটি ছিল এর জিহ্বা আর মাথার সংযোজনকারী ব্যাপারটির ভেতরে ( ভিনটেজ নিউজ )। এই প্রক্রিয়ায় জিহ্বার অংশটি বা এর সম্মুখভাগ একটি তীক্ষ্ণ ধারালো খাঁজের ভেতরে থাকতো। ফলে কথা বলতে গেলেই বা জীভ নাড়াতে গেলেই পুরোটা জিহ্বা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যেত। এতে করে দিনের পর দিন কথা বলার সাথে সাথে খাওয়া-দাওয়া থেকেও বিরত থাকতে বাধ্য হত নারীরা।

১৫৬৭ সালে স্কটল্যান্ডে প্রথম এই যন্ত্রটি ব্যবহারের ধারা শুরু হলেও ইংল্যান্ড ও অন্যান্য বেশকিছু স্থনে অবৈধভাবে ব্যবহৃত হত এই লাগাম ( নিটোরামা )। বিশেষ করে স্কটল্যান্ডের ব্যারোনি কোর্টে সীমালংঘনকারী নারীদের ওপরেই সবসময় নেমে আসত এই নির্যাতন। মাঝে মাঝে এই শাস্তিটি নেমে আসত নিম্ন শ্রেণীর নারী ও প্রতিবাদকারীদের ওপরেও।

তবে সবসময় সবস্থানে কেবল এই লাগাম নারীদের ওপরেই প্রয়োগ করা হয়েছে তা ভাবলে ভুল হবে। কেবল নারীরাই নয়, নিজেদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলা যে কাউকেই একটা সময় এমন লাগাম পরিধানের শাস্তির মধ্য দিয়ে পার হতে বাধ্য করেছেন শাসকেরা। শাস্তিপ্রাপ্তদেরকে এক্ষেত্রে রাস্তার মাঝখানে বা জনগনের মাঝে দাড়িয়ে থাকতে বাধ্য করতেন তারা। যাতে করে সবাই দেখতে পায় নির্দিষ্ট কিছু কাজের পরিণাম।

কেবল শাস্তির সময়েই নয়, মানুষকে শাস্তির কথা মনে করিয়ে দিতে সর্বসম্মুখে টাউন ক্রস, ট্রন বা টলব্রথের সাথে লাগাম লাগিয়ে প্রদর্শন করা হত স্কটল্যান্ডে। ব্যাপারটি শাসকদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে এর জন্যে আলাদাভাবে কোন সময় নষ্ট করা অন্যায়ের ভেতরে ধরা হত না বা আমলে আনা হত না। কোকার নারীদেরকে ধর্মপ্রচারের শাস্তিস্বরূপও এই শাস্তি দিত স্কটল্যান্ডের তত্কালীন শাসকেরা।

পরবর্তীতে ১৬ ও ১৭ শতাব্দীতে একসময় লাগামের পরিবর্তে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে আসে জগস নামের কাঠের তৈরি এক ধরনের স্তম্ভবিশেষ। যেটি শাস্তি দিলেও কথা বলা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করত না শাস্তিপ্রাপ্তদেরকে। তবে ১৫০০ শতাব্দীতে কেবল এই দুটো দেশেই নয়, লাগাম ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে জার্মানিতেও। সেখানে আলাদাভাবে লাগামের মাথায় একটি ছোট ঘন্টাও ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। যার ফলে কথা বলতে গেলেই বেজে উঠত ঘন্টা আর আরো বেশি করে অপদস্ত করা হত শাস্তিপ্রাপ্তদের। ১৮০০ সাল অব্দি জার্মানিতে এই শাস্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।

হয়তো শাস্তি জরুরী। শাস্তি প্রয়োজনীয়। কিন্তু তাই বলে শাস্তিরও একটা সীমা হয়তো থাকা উচিত। কখনোই এমন কোন শাস্তি মানুষকে দেওয়া উচিত নয় যেটা সেই মানুষকে আর শাস্তিদাতাদেরকে মানুষ থেকে পশু, কিংবা তারো বেশি কোন নিন্মস্থানে নামিয়ে দেয়। বিশেষ করে বর্তমান গণতন্ত্রের যুগে তো নয়ই!






মন্তব্য চালু নেই