মেইন ম্যেনু

দারিদ্রকে জয় করা ৫ অদম্য মেধাবী’র গল্প

বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে আঁধার ঘরে আলো জ্বালিয়েছে ওরা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : কুড়িগ্রামের অদম্য ৫ মেধাবী জয় করেছে দারিদ্র। আফিয়া ফারজানা (বর্না), রাকিব উজ জামান, শাহীন আলম, নুরনবী সরকার, তৌহিদ আহমেদ সৌরভ চলতি বছর এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে আঁধার ঘরে আলো জ্বালিয়েছে। পরিবারে অভাব অনটন নিত্য দিনের সঙ্গী। এরপরও শত প্রতিকুলতা বাঁধা হয়ে দ্বাড়াতে পারেনি তাদের মেধা বিকাশে। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ৩ জনের আর দু’জন হতে চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু এখন স্বপ্ন পুরোনের মাঝে দেয়াল দারিদ্রতা। আকাশ ছোঁয়া এ সাফল্যেও অভিভাবকদের মনে শঙ্কার পাহাড়। দু’চোখে অন্ধকার, তারপরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার দুর্বার সাহস।

আফিয়া ফারজানা (বর্না)
অভাবের জ্বালা যে কতটা ভয়াবহ তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আফিয়া ফারজানা (বর্না)। শুধু টাকার অভাবে স্কুলে যেতে পারেনি মাসের পর মাস। মাত্র একটি স্কুল ড্রেসে কেটেগেছে ২ বছর। টিউশনি পড়ার সামর্থ হয়নি। উপোস করে স্কুলে আসা ছিল নিত্য ঘটনা। ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করা ছিল খুব কষ্টের। আয় রোজগারের কেউ নেই। নেই আবাদী জমি। বাবা আব্দুল খায়ের কৃষি শ্রমিক। কাজ পেলে জোটে ভাত, না হলে উপোস। এরপরও বড় বোন বাবলি কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে শেষ বর্ষের ছাত্রী আর ছোট বোন ঝর্ণা কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ১০ শ্রেণীর ছাত্রী। তিন বোনকে নিয়ে ৫জনের টানাটানির সংসার।

বাড়িতে বসে মা আফরিমা বেগম (পপি) সেলাইয়ের কাজ করে সামান্য আয় করে। সময় পেলেই মায়ের কাজে সহায়তা করে আফিয়া ফারজানা। কখনও পতিবেশী শিশুদের টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশুনা চালিয়ে নিয়েছে। এতসব প্রতিকুলতার মাঝেও আফিয়া ফারজানা চলতি এসএসসি পরীক্ষায় কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়ে মা-বাবার কষ্ট সার্থক করেছে।

আফিয়া ফারজানা(বর্না) বলেন, আমার বাড়ি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের বড়াইবাড়ী গ্রামে। বাড়ি থেকে প্রায় ৮ কিঃ মিঃ স্কুলে আস্তে ভাড়া লাগে ৩৫/৪০টাকা। টাকা থাকলে স্কুলে আসা হতো। অনেক দিন হেটে এসেছি। কিন্তু পেটে খিদা তার উপর অক্লান্ত পরিশ্রম ক্লাসে আর মন বসত না। এছাড়া মেয়ে হিসাবে পথে-ঘাটে ছিল নানা বিড়ম্বনা। সেসব কষ্ট বলে বুঝানো যাবে না। টাকাই আমার জীবনের প্রধান সমস্যা। তারপরও ইচ্ছা পড়ালেখা করে ডাক্তার হতে চাই।

রাকিব উজ জামানের সামনে ঘোর অন্ধকার
অনাহার-অর্ধাহার-অপুষ্টি ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী রাকিব উজ জামানের। মা উম্মে সালমা প্রতিবন্ধী। বাবা নূরজামাল সরকার অতিদরিদ্রের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির একজন শ্রমিক। প্রতিদিন ৮কিঃ মিঃ পথ পেরিয়ে আসতে হতো স্কুলে। ছিলনা টিউশনি পড়ার সামর্থ্য। এক ড্রেসে কেটেছে ৯ম ও দশম শ্রেণী। একে ছিল না বাড়ন্ত বয়সের পুষ্টিকর খাবার তার উপর শরীরে বাসা বাধে জটিল চর্মরোগ। টাকার অভাবে সে চিকিৎসাও বন্ধ। এমন শতেক বাঁধা রাকিব উজ জামানের সেরা সাফল্য ছিনিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কোন বাঁধা হতে পারেনি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সুভারকুটি গ্রামে রাকিব উজ জামানের নিবাস। দু’ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিভাগে বিবিএ সম্মান শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। ফলে ৪জনের সংসারে অভাব লেগেই আছে।

রাকিব উজ জামান বলেন,বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও গণিত স্যারের কাছে আলাদা ভাবে না পড়লে স্কুলের পড়ায় ভাল ফলাফল করা সম্ভব নয়। অথচ এই টিউশনি পড়ার সামর্থ্য আমার ছিল না। এর উপর কঠিন চর্মরোগ আমার। যার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ রোগের যন্ত্রণায় কখনো কখনো ঠিকমত পড়তে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার আমার স্বপ্ন পুরনে চাই সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগীতা।

তৌহিদ আহমেদ সৌরভ
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পৌর এলাকার কামারপাড়া গ্রামের দরিদ্র বিদ্যুৎ মিস্ত্রী গোলাম মোস্তফার দ্বিতীয় পুত্র তৌহিদ আহমেদ সৌরভ চলতি এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পায়। কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এ ঈর্শ্বণীয় সাফল্য অর্জন করে।

মা নুরনাহার বেগম বলেন, আমার ছেলে খুবই মেধাবী। পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় এবং জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায়। শত প্রতিকুলতার মাঝেও ধারাবাহিক সফলতা এনে দিয়েছে আমাদের। কিন্তু ওদের কষ্ট ছাড়া কিছুই দিতে পারিনি। মাসেও জুটতো না ডিম, দুধ কিংবা মাংস। জুটতো না বেলা ভেট ভরে খাবার। সৌরভের ইচ্ছা পড়ালেখা করে অনেক বড় হওয়ার। কেউকি নেই ওর স্বপ্ন পুরনে এগিয়ে আসবেন।

তৌহিদ আহমেদ সৌরভ বলেন, বাবার আয় দিনে গড়ে ২৫০টাকা। সবদিন কাজও থাকে না। ফলে পরিবারে কষ্টের শেষ নেই। আমার বড় ভাই কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে বিবিএস পড়ছে। আর ছোট বোন নিশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ৫জনের সংসারে টানাপোড়ন নিত্যদিনের। প্রায় প্রতিদিন অনাহারে থেকে স্কুলে যেতাম পায়ে হেটে আড়াই কিঃ মিঃ পথ। ছিলনা বই কিংবা প্রাইভেট। বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার নিতে হতো। তারপরও দমে যাইনি। একটিই স্বপ্ন বড় হতে হবে। ডাক্তার হয়ে পরিবারে ভাগ্য বদলের পাশাপাশি সমাজের দরিদ্র মানুষদের সেবা করতে চাই। আমার এ স্বপ্ন পুরনের প্রধান বাধা অভাব।

শাহীন আলম
অভাব এতটাই প্রকট যে দিনের পর দিন চুলায় আগুন জ্বলে না। উপোস নিত্য সঙ্গি। ৫ জনের সংসারের চাকাই যেখানে সচল নয় তার উপর সন্তানের পড়াশুনা দুঃস্বপ্ন। দ্বিতীয় পুত্র সাজু মিয়া(১৫) মানসিক প্রতিপ্রব›িদ্ধ। ছোট ছেলে রাজুকে(১২) অভাবের তাড়নায় অন্যের দোকানে (স্বর্ণের) কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। এর বিনিময়ে জোটে রাজুর দু’বেলার খাবার। আর বড় ছেলে শাহীন আলম শতেক বাধা অতিক্রম করে চালিয়ে নিয়েছে লেখাপড়া। নিজের লেখাপড়াকে এগিয়ে নিতে টিউশনি পড়ানো এমনকি বন্ধের দিনে দিনমজুরের কাজও করতে হয়েছে তাকে। অদম্য ইচ্ছা শক্তির কারনে দারিদ্রতাকে জয় করেছে শাহীন। তার পরও সে স্বপ্ন দেখে চিকিৎসক হবার।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের ভেরভেরী গ্রামের দরিদ্র রিক্সা চালক মোস্তফা হকের পুত্র শাহীন আলম চলতি এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। হলোখানা দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ঈর্শ্বণীয় সাফল্য অর্জন করে সে। মা সাহের বানু অভাবের সংসারের ঘানি টানতে অন্যের বাড়িতে কাজ করে।

নুরনবী সরকার
স্কুল বন্ধের সময় অন্যেও জমিতে দিনমজুরের কাজ করে এবং ছোট শিশুদের টিউশনি পড়িয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে নিতে হয়েছে নুরনবী সরকারকে। শতেক বাধা আর প্রতিকুল পরিবেশেও নুরনবী চলতি এসএসসি পরীক্ষায় হলোখানা দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সুভার কুটি গ্রামে তাদেও বাড়ী। বাবা আফতাব আলী পেশায় দিনমজুর মা-নুরনাহার বেগম গৃহিনী। দু’বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নুরনবী সবার ছোট। দু’বোন বাড়িতে আইবুড়ো হয়ে বসে আছে। টাকার অভাবে বিয়ে হচ্ছে না। ৫জনের সংসারে তিন বেলা পেটপুরে খাবার জোটে না। অনাহার অর্ধাহারে তাদের দিনকাটে।

নুরনবী সরকার জানায়, তার স্কুল জীবনের দিনগুলো ছিল খুব কষ্টের। প্রায় প্রতিদিন না খেয়ে তিন কিঃ মিঃ দূরের স্কুলে পায়ে হেটে যেতে হতো। দিনে এক বেলার বেশী খাবার জুটতো না। সংসারের এই দুরবস্থার ছাপ আমাদেও সবার উপর। জোটেনি পুষ্টিকর খাবার। ছিল না ভাল পোষাক। এক স্কুল ড্রেসে চালিয়ে দিতে হয়েছে বছের পর বছর। পড়া হয়নি প্রাইভেট কিংবা কোচিং। এসএসসি’র ফরম ফিলাপের টাকা এলাকার বড় ভাইয়েরা চাদা তুলে দিয়েছে। বাড়িতে ছিল না বিদ্যুৎ । কেরোসিন কেনার সামর্থও ছিল না প্রতিদিন। তাই অধিকাংশ সময় দিনের আলোয় পড়াশুনা করতে হতো। এতো কষ্টের মধ্যেও ভাল ফলাফল পেয়ে অনুপ্রানিত হয়েছি। বাবা-মা, প্রতিবেশী, শিক্ষক সবাই খুশি। কিন্তু আমার দুশ্চিন্তা উচ্চ শিক্ষা চলবে কিভাবে। আমার সাহায্যের প্রয়োজন। এ জন্য চাই হৃদয়বান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগীতা।






মন্তব্য চালু নেই