মেইন ম্যেনু

বাবাকে নিয়ে যা বললেন অভিজিৎ-কন্যা

‘সমৃদ্ধ, সাহসী আর অকুতোভয় হও’, প্রিয় মানুষটি চলে গেলেও বন্ধুসুলভ বাবার এই কথাগুলোই পাথেয় হয়ে আছে অভিজিৎ-কন্যা তৃষা আহমেদের মনে। উগ্রবাদীদের হামলায় অভিজিৎ রায় নিহত হন ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। একবছর পরও আজ বাবাকে স্মরণ করলেও সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি কিছুতেই মনে করতে চান না তৃষা।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন’র কাছে যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তৃষা বলেছেন বাবা-মেয়ের সুখের স্মৃতির কথা। না চাইলেও স্মরণ করেছেন গতবছরের এই দিনের কথা।

২৬ ফেব্রুয়ারির সেইদিন ক্লাস করে এসে জানতে পারেন তার বন্ধুর মতো বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তার মা বন্যাকে।

বাবা’র স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তৃষা আহমেদ বলেন, ‘বাবার মধ্যে চমৎকার এক রসিক ব্যক্তিত্ব ছিলো। এজন্য তাকে ‘বাবা’ ডাকতে কিছুটা অদ্ভুত লাগতো’।

এইতো ২০০৮ সালেও বাপ-মেয়ে মেতে উঠতেন কাঠের তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায়। বাবাকে লেখালেখিতেও সাহায্য করতেন তৃষা।

‘বাবা বিজ্ঞান এবং ধর্মভিত্তিক উগ্র মৌলবাদের ‘ভাইরাস’ নিয়ে লিখতেন। তিনি চাইতেন বাংলাদেশের মূলধারায় আরও বেশি অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা হোক। বাবার সঙ্গে একটা চুক্তি করেছিলাম। চুক্তি অনুযায়ী বাবা আমাকে ক্যালকুলাস ও পদার্থবিজ্ঞান শেখাবে আর আমি তার লেখার ইংরেজি অনুবাদে সাহায্য করবো’।

শেষ দেখা

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় বইমেলা হয়। বাবা-মা বই মেলা উপলক্ষ্যে বাংলাদেশে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করতে আমার ক্যাম্পাসে আসেন। আমাকে চমকে দিতে বাক্সভর্তি উপহার নিয়ে হাজির দু’জনে। ওদিকে আমি কী দেবো ভেবে না পেয়ে ব্যাকপ্যাক হাতড়ে একটা স্কার্ফ দিলাম বাবাকে। বাবা রাত পর্যন্ত ওই স্কার্ফ পড়ে ছিলেন’।

সেই ভয়াল দিন

‘২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে দশটায় (যুক্তরাষ্ট্র সময়) আমি ক্লাসের পেছনের একটি সিটে বসে লেকচার শুনছিলাম। ক্লাস শেষ হলো দুপুর নাগাদ চোখ গেলো মোবাইল ফোনের দিকে। দেখি তিনটি ক্ষুদে বার্তা। বাংলাদেশ থেকে আমাদের স্বজনরা আমাকে দুঃসংবাদটি জানায়’।

লাল আর ফুলে ওঠা নিস্পৃহ চোখে আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম,“আমার বাবা একজন প্রখ্যাত বাঙালি লেখক। বিশেষ করে তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক বই এবং নাস্তিক্যবাদ নিয়ে লেখার জন্য পরিচিত। সে এবং আমার মা গত সপ্তাহে বই মেলায় নিজেদের বইয়ের প্রচারণার জন্য বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ১৫ ঘণ্টা আগে মৌলবাদীরা আমার বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। হামলায় গুরুতর আহত আমার মা এখন হাসপাতালে। বাবার মৃত্যু আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে।

jkdt50fxMDpI

আমি এই কথাগুলো বলছি কারণ বাবা সবসময় মুক্তচিন্তা-মুক্তমত তুলে ধরার মাধ্যমে জগতের উন্নতি চেয়েছেন। তাই বলবো না আমি ক্ষুব্ধ কিংবা বেদনাভারাক্রান্ত। এরচেয়ে পৃথিবীকে আরও সমৃদ্ধ করতে লড়াই চালিয়ে যাবো”।

ফেসবুকে লেখা এই শব্দগুলোই সেদিন সবাই দেখেছিলো। তবে কেউ দেখেনি কিভাবে বাবার চলে যাওয়ায় নির্বাক হয়ে যায় সদাহাস্যোজ্জ্বল মেয়েটি। অভিজিতের লুটিয়ে পড়া দেহ এবং রক্তাক্ত বন্যার সাহায্যেও আকুতির ছবিটি প্রকাশিত হয় গণমাধ্যম-সামাজিক মাধ্যমে। অনেকেই আঁতকে উঠেছিলেন সেই ছবি দেখে। আর মেয়ে হয়ে মা-বাবার এই দৃশ্য দেখাটা কতোটা ভয়ঙ্কর ছিলো তা জানিয়েছেন তৃষা।

তিনি বলেন,‘ বাবা রক্তের মধ্যে শুয়ে আছে এই দৃশ্য ভুলে থাকতে আমাকে ঘুমের বড়ি খেতে হয়েছে। মাকেও ততোদিনে ফিরে পাইনি। আর পেলেও তাকে আর আগের অবস্থায় পাবো না এটাতো জানতাম। বাংলাদেশী গণমাধ্যমে বাবা হত্যার প্রতিবাদ সমাবেশ দেখানো হতো সেগুলো দেখতাম’।

এখন যেমন

বাবা হারিয়েছেন আজ এক বছর। এই সময়ের মাঝে বাবা’র আদর্শ আর সাহসিকতার সুর যেনো তৃষা আহমেদের কথাতেও স্পষ্ট। তিনি জানালেন,‘ বাবা তার আদর্শের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। যে দেশ নিজেকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ দাবি করে সেই দেশে বিজ্ঞান ও মুক্তচিন্তার প্রাণ দিয়ে তিনি দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন’।

তিনি বলেন,‘ আমি জানি আল কায়দা, আইএস এবং অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীরা বহাল তবিয়তে আছে। কিন্তু আমি লেখা দিয়েই মোকাবেলা করে যাবো। এই লেখা দিয়েই আমি-আমরা আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হওয়া অপশক্তির আদর্শ ছুড়ে ফেলবো’।

গতবছর ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার সময় টিএসসির কাছে সোহরাওয়ার্দি গেটের কাছে লেখক অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে অভিজিৎ নিহত হন এবং গুরুতর আহত হন বন্যা।






মন্তব্য চালু নেই