মেইন ম্যেনু

বারবার সিমকার্ড নিবন্ধন জটিলতা, দায়ী কে?

বিটিআরসি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না বলেই দীর্ঘ সময় ধরে ভুয়া নিবন্ধন কিংবা নিবন্ধন ছাড়াই মোবাইল ফোনের সিমকার্ড বিক্রি ও ব্যবহার চলেছে অবাধে। এমনকি ফুটপাতে, চায়ের দোকানে যত্রতত্র বিক্রি হয়েছে সিমকার্ড। একই জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ৮৮টি সিমকার্ড নিবন্ধনের তথ্যও মিলেছে। ভুয়া নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরকে জরিমানা করার ক্ষমতা থাকলেও এর কোনো উদাহরণ সৃষ্টি করেনি বিটিআরসি।

ফলে ভুয়া নিবন্ধনের সিমকার্ড ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, হুমকি, প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে টাকা চুরি, অবৈধ আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদান, পরিচয় গোপন রেখে তথ্য আদান-প্রদান বেড়ে চলছে। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, মোবাইল ফোন সংযোগ ব্যবহার করে যত ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তার মূলে ভুয়া কিংবা অবৈধভাবে নিবন্ধিত সিমকার্ড। এ কারণেই সিমকার্ডের সঠিক নিবন্ধন এবং ডাটাবেজ তৈরি জরুরি হয়ে পড়েছে। সে কারণেই নতুন করে নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে যারা আগে থেকেই যথাযথ নিয়মে নিবন্ধন করেছেন তাদের যেন ভোগান্তি না হয় সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত গ্রাহকদের ছবিসহ সঠিক নিয়মে ফরম পূরণ করে শুধু বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের গ্রাহক সেবাকেন্দ্র এবং অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকেই সিমকার্ড কেনা যেত।
২০০৩ সাল থেকে সিমকার্ড খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে চলে আসে এবং এ সময় থেকে সঠিক নিয়মে ফরম পূরণ ছাড়াই যত্রতত্র সিমকার্ড বিক্রি হতে থাকে। ফলে ফরমে গ্রাহকের প্রকৃত তথ্য না দিয়ে এমনকি কোনো ফরম পূরণ ছাড়াই বিক্রি হতে থাকে সিমকার্ড। এ সময় থেকে মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি, হুমকির মতো অপরাধও বাড়তে থাকে।

২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিটিআরসি নতুন করে বিটিআরসির নির্ধারিত ফরমে সব সিমকার্ড নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে। ওই সময় প্রায় সাড়ে চার কোটি গ্রাহকের সিমকার্ড বিটিআরসির ফরমে নতুন করে নিবন্ধন করা হয়। কাছাকাছি সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ কার্যক্রম শেষ হলে জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা পাসপোর্ট নম্বর কিংবা অন্য কোনো অনুমোদিত পরিচয়পত্র সিমকার্ড নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করে নির্দেশনা জারি করে বিটিআরসি। পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা পাসপোর্ট নম্বর ছাড়া নতুন সংযোগ চালু না করারও নির্দেশনা দেয় বিটিআরসি।

সূত্র জানায়, কিছুদিন বিটিআরসি সিমকার্ড বিক্রির ক্ষেত্রে নির্দেশনা বাস্তবায়নে তৎপর থাকলেও ২০১০ সাল থেকে আবারও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ওই বছরই ২০০১ সালের টেলিযোগাযোগ আইন সংশোধন করে বিটিআরসির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রায় সব ক্ষমতা খর্ব করে মন্ত্রণালয়কেই চূড়ান্ত অনুমোদনের কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। একই সময়ে আইজিডবি্লউ, আইসিএক্স, আইআইজি এবং ভিএসপি লাইসেন্সিং কার্যক্রম নিয়ে বিটিআরসি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে ২০১২ সালের অক্টোবরের পর থেকে গ্রাহক স্বার্থ রক্ষায় দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে বিভিন্ন খাতে নতুন লাইসেন্সিং কার্যক্রমই প্রধান হয়ে ওঠে বিটিআরসির। এ সময়ে আবারও ভুয়া নিবন্ধনে সিমকার্ড বিক্রি হতে থাকে অবাধে। রাস্তায় রাস্তায় ফেরিওয়ালাকেও সিমকার্ড বিক্রি করতে দেখা যায় নিবন্ধন ছাড়াই। পরে দেখা যায়, অধিকাংশ সিমকার্ডের ক্ষেত্রেই নিবন্ধন ফরমে নাম থাকা গ্রাহক আর প্রকৃত ব্যবহারকারী পৃথক ব্যক্তি।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের একটি সূত্র জানায়, অনেকের সিমকার্ড হারিয়ে গেলে কিংবা নষ্ট হলে প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এই জটিলতা প্রকট আকার ধারণ করে। দেখা যায় সিমকার্ড ব্যবহারকারী প্রতিস্থাপন করতে আসার সময় ডাটাবেজে অন্য কারও নাম ও ছবি দেখা যায়।

গত ৯ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক, টিআরএনবির সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এ ধরনের তথ্য দিয়ে ডাক ও টেলিযোযোগ প্রতিমন্ত্রীর সামনেই খোদ বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস বলেন, সাবেক একজন মন্ত্রীর ব্যবহৃত সিমকার্ডও মুন্সীগঞ্জের এক অখ্যাত ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত।

সূত্র জানায়, একই জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ৮৮টি নম্বর নিবন্ধিত সিম পাওয়া যায়। পরে দেখা যায়, ফটোকপি করা হয় এমন দোকানে একজনের জাতীয় পরিচয়পত্র ফটোকপি করে রাখা হয়, পরে ওই দোকান থেকেই ওই জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে একের পর এক সিমকার্ড বিক্রি করা হয়।

ভুয়া নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোন অপারেটরকে জরিমানা করার ক্ষমতা থাকলেও সেই ক্ষমতা প্রয়োগের নজির দেখা যায়নি। গত প্রায় পাঁচ বছরে বিভিন্ন অভিযানে অবৈধ আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানে ব্যবহৃত প্রায় ৭১ লাখ সিমকার্ড বাতিল করে বিটিআরসি। তবে বাতিল করা সিমকার্ড কিছুদিনের মধ্যে আবার সচল হয়েছে কি-না তার কোনো খোঁজ রাখা হয়নি বিটিআরসি থেকে।

প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, বিটিআরসি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে সিমকার্ড নিবন্ধন নিয়ে সাধারণ মানুষকে বারবার জটিলতায় পড়তে হতো না। তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও বিটিআরসি কঠোর নজরদারি না রাখলে সিমকার্ড নিবন্ধন নিয়ে জটিলতা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।






মন্তব্য চালু নেই