মেইন ম্যেনু

বিচারপতি অপসারণ আইন উঠছে মন্ত্রিসভায়

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ-সংক্রান্ত আইনের খসড়া নীতিগত বা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠছে। প্রস্তাবিত আইনটির নাম-‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য (তদন্ত ও প্রমাণ) আইন, ২০১৬, এ আইনের খসড়ার ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাওয়া হলেও সর্বোচ্চ আদালত এ ব্যাপারে কোনো মতামত দেয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের পক্ষে মতামত দেয়া সম্ভব নয় উল্লেখ করে সরকারকে জানানো হয়, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬ (৩)-এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে দাখিলকৃত ৯৯৮৯/২০১৪ নং রিট মামলা আগামী ৫ই মে রায় প্রদানের জন্য ধার্য আছে বিধায় বিচারাধীন বিষয় এবং খসড়া বিলের ওপর মতামত প্রদান বিচার বিভাগের স্বাভাবিক কাজে হস্তক্ষেপের শামিল।

২০শে এপ্রিল মন্ত্রিসভার জন্য পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৭ (১) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এ সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে। এ বিধানের প্রতিফলনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারকে তাদের পদ থেকে যথাক্রমে অভিশংসন, পদত্যাগ এবং অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের রয়েছে।

১৯৭২ সালে তৈরি করা মূল সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের তাদের অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের জন্য সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার দুই- তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে দেয়া প্রেসিডেন্টের আদেশে অপসারণের বিধান ছিল। ষড়যন্ত্র ও ক্যু’র মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা গ্রহণকারী সামরিক শাসক সামরিক ফরমান দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের অভিযোগে অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশ সাপেক্ষে প্রেসিডেন্টের উপর ন্যস্ত করে।

প্রধান বিচারপতি এবং অন্য সিনিয়র দুই বিচারপতির সমন্বয়ে এ কাউন্সিল গঠিত ছিল। ২০১৪ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। তবে এতোদিনেও কোনো আইন প্রণীত হয়নি। এখন আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হচ্ছে।

মন্ত্রিসভায় পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়, সংবিধানে বিধৃত গণতান্ত্রিক চেতনা ও মূল্যবোধ এবং জনগণের ক্ষমতায়নের নীতির প্রতিফলনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২০১৪ সালে সংবিধান (ষোড়শ) সংশোধন আইন, ২০১৪ প্রণয়নের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিভিন্ন বিধান পুনঃপ্রবর্তন করে। সংবিধানের সংশোধিত অনুচ্ছেদ ৯৬ (৩) এর বিধান অনুযায়ী কোনো বিচারকের অসদাচরণ ও অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।

আইনের খসড়ায় যা বলা হয়েছে: প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে- সংজ্ঞা, বিষয় বা প্রসঙ্গের পরিপন্থি কোনো কিছু না থাকলে এই আইনে (১) ‘অসদাচারণ’ অর্থ- (ক) কোনো বিচারক কর্তৃক ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে বিচারকার্য পরিচালনা বা রায় প্রদান; বা (খ) বিচারকার্যে প্রভাবিত হওয়া বা অন্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা; বা (গ) কোনো বিচারক কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে বিচারিক পদমর্যাদা বা কার্যালয়ের অপব্যবহার করে আর্থিক, বস্তুগত কিংবা অন্যকোনো রূপ সুবিধা গ্রহণ যা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় অন্তরায়; বা (ঘ) কোনো বিচারক কর্তৃক নৈতিকস্খলন জনিত কোনো অপরাধ সংঘটন; বা (ঙ) কোনো বিচারকের এমন কোনো আচরণ যা বিচার আদালতের অসম্মান বা সুনামহানি ঘটায়; বা (চ) কোনো বিচারকের ইচ্ছাকৃত বা ক্রমাগতভাবে বিচারিক কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা; বা (ছ) কোনো বিচারক কর্তৃক জীবন বৃত্তান্তে ইচ্ছাকৃতভাবে পূর্বাপর এমন কোনো বস্তুগত তথ্য গোপন করা, যা তার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রাসঙ্গিক ছিল। (২) ‘অসামর্থ্য’ অর্থ কোনো বিচারকের স্থায়ী প্রকৃতির শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্য।

আইনের ৪ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও অসামর্থ্য সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ আনয়ন করতে চাইলে তা জাতীয় সংসদের স্পিকারের নিকট লিখিতভাবে দাখিল করতে হবে। ৪ (৪) ধারায় বলা হয়েছে, স্পিকার কোনো ব্যক্তির নিকট হতে কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কিত কোনো অভিযোগপ্রাপ্তির পর ইহার প্রাথমিক সত্যতা নিরূপণের জন্য জাতীয় সংসদের সদস্যগণের মধ্য হতে অনধিক ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে উক্ত কমিটির নিকট অভিযোগটি প্রেরণ করবেন। স্পিকার কর্তৃক গঠিত কমিটি অভিযোগের সত্যতা না পেলে স্পিকারের কাছে প্রতিবেদন দেবেন। স্পিকার বিষয়টি সমাপ্ত বলে গণ্য করবেন।

অন্যদিকে, কমিটি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেলে স্পিকারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। স্পিকার জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রমত, চলতি বা পরবর্তী অধিবেশনের বৈঠকে উহার উপর আলোচনার জন্য দিন ধার্যকরতঃ উপস্থাপন করবেন এবং উক্তরূপ আলোচনা স্পিকার যুক্তিসঙ্গত মনে করলে জাতীয় সংসদের গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদের উক্ত বৈঠকে উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগটি সম্পর্কে তদন্ত করা প্রয়োজন মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন তবে স্পিকার উক্ত তদন্ত কার্য পরিচালনার নিমিত্ত ধারা-৫ এর অধীন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন।

৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ তদন্তের জন্য স্পিকার নিম্নরূপ ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করবেন, যথা:- (ক) বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি অথবা আপিল বিভাগের একজন সাবেক বিচারপতি যিনি উক্ত তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান হবেন, (খ) বাংলাদেশের একজন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল, (গ) বাংলাদেশের একজন সম্ভ্রান্ত নাগরিক /জুরিস্ট।

আইনের ৭(৬) ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিচারকের লিখিত বক্তব্য বিবেচনার পর যদি তদন্ত কমিটির নিকট তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে প্রতিবেদন আকারে দাখিলের মাধ্যমে স্পিকারকে জানাবে এবং স্পিকার উক্ত প্রতিবেদনটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন। জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য উক্ত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করলে বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে।

ক্ষেত্রমত, সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত অনুসারে বিষয়টি পুনঃতদন্তের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। ৭ (৭) ধারায় বলা হয়েছে- স্পিকার, জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত অনুসারে পুনরায় তদন্তের জন্য পূর্বোক্ত তদন্ত কমিটি বা নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করে উক্ত কমিটির নিকট আনা অভিযোগটি পুনঃপ্রেরণ করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, দ্বিতীয়বার তদন্ত কমিটির নিকট হতে একই সিদ্ধান্ত আসলে স্পিকার বিষয়টি জাতীয় সংসদের গোচরে এনে নিষ্পত্তি করবেন।

৭ (৮) যদি তদন্ত কমিটি এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, সেক্ষেত্রে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন ও সিদ্ধান্ত স্পিকারের নিকট প্রেরণ করবে এবং স্পিকার উক্তরূপ প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর তা জাতীয় সংসদের বৈঠকে বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করবেন।

১১ ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ কর্তৃক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বিবেচনার পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিচারককে জাতীয় সংসদে তার আত্মপক্ষ সমর্থনে লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য পেশ করার সুযোগ প্রদান করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিচারকের লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য যদি থাকে, তা বিবেচনা করে প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কিত একটি প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উত্থাপন করতে হবে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৬ (২) অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারে যদি প্রস্তাবটি জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত না হয়, তবে সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে উক্ত বিধান অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। যদি প্রস্তাবটি জাতীয় সংসদ কর্তৃক অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গৃহীত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য প্রমাণিত হয়েছে মর্মে গণ্য হবে এবং তার অপসারণ প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির নিকট উপস্থাপিত হবে। জাতীয় সংসদের প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট সংশ্লিষ্ট বিচারককে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৬ (২) অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারে স্বীয় পদ থেকে অপসারণ করবেন।

মন্ত্রিসভা উত্থাপিত সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, এ বিলটি আইনে পরিণত হলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬ (৩) এর বিধান অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কিত অভিযোগ স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত ও প্রমাণের প্রয়োজনীয় বিধানাবলী প্রবর্তিত হবে।

ফলে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে গঠিত সংসদে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের মতো উচ্চ আদালতের বিচারকদের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতার যে নীতি বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কার্যকর রয়েছে বাংলাদেশেও তার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আইন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারককে অপসারণের সুযোগ থাকবে না। এর ফলে বিচারকরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব অবাধ ও সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রতিপালনের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সমুন্নত রাখতে পারবেন। (মানবজমিন)






মন্তব্য চালু নেই