মেইন ম্যেনু

বিচারহীনতায় অনিরাপদ বেরোবি ক্যাম্পাস: একের পর এক ঘটছে অপরাধ

এইচ.এম নুর আলম, বেরোবি প্রতিনিধি: একের পর এক ঘটে চলেছে অপরাধ। আর এসব অপরাধমূলক ঘটনার জের ধরে চলছে রাস্তা অবরোধ আর প্রতিবাদে চলছে মানববন্ধন-সমাবেশ। বিচারের জন্য শিক্ষার্থীরা কখনো ধর্না দিচ্ছেন উপাচার্যের কাছে। শাস্তি দাবি করছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। কখনও বা প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সমঝোতা- সমাধান করা হচ্ছে চুপে,কৌশলে। তবে থেমে নেই একের পর এক ঘটনা।

আজ কোনো শিক্ষার্থীকে মারধোর করছে,তো কাল কোনো ছাত্রীকে উত্যক্ত করছে আবার শিক্ষকরাও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে চলমান বেশ কিছু ঘটনায়।এই রাস্তা অবরোধ,মারামারি হচ্ছে কখনো কখনো কোনো শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার জন্য,কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীকর্তৃক শিক্ষার্থীকে পেটানোর জন্য,কখনো ছাত্রী উত্যক্তের প্রতিবাদে বহিরাগতদের সাথে আবার পৃথক দুটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথেও। আর এভাবেই অনিরাপদ হয়ে পড়ছে উত্তরবঙ্গের মানুষের স্বপ্নের ক্যাম্পাস বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

সবশেষ সোমবার বহিরাগতদের হাতে শিক্ষার্থী উত্যক্ত ও মারধোরের ঘটনায় আজ মঙ্গলবার শিক্ষার্থীর ব্যানারে তীব্র প্রতিবাদ ও দোষিদের শাস্তি জানিয়ে মানববন্ধন করেছে বাংলা বিভাগসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা।এ নিয়ে স্থানীয় ১৫ যুবকের বিরুদ্ধে রংপুর কোতয়ালী থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।

বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চলমান কোনো ঘটনা এমনকি পূর্বের কোনো ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় এসব ঘটনা বেড়েই চলছে দিনের পর দিন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রহরিরও অভাব রয়েছে।

জানা যায়, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) চলমান কয়েকদিনের ঘটনাসহ গত তিন বছরে ছোট বড় ৫৭ টিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে যার জন্য প্রায় ৩৫ টি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এসব কমিটির কোন ইতিবাচক ফলাফল আসেনি। বরং অপরাধীকে পার পেয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এসেছে। এমনকি প্রক্টরকেও একাধিকবার লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তারও কোন বিচার হয়নি। যেখানে নিরাপত্তাদাতারাই অনিরাপদ, সেখানে অন্যদের নিরাপত্তা তারা দিবেন কি করে! শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফলে দুর্বল হয়ে পড়েছে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যাবস্থা।

এসব কারণেই ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রশাসনের কাঠামো । আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে। ভেঙ্গে পড়ছে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে থাকলেও সহকারী প্রক্টররা দীর্ঘদিন যাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কোন কাজেই করছেন না।

একজন শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, ঘটনা উদঘাটনের জন্য যেখানে তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেন এবং তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় বেধে দেওয়া হয় না।আবার তথ্যানুসন্ধান কমিটি অনেক্ষেত্রে প্রতিবেদন জমা দিলেও তা জনসম্মুখে আলোর মুখ দেখে না। চেপে রাখা হয় সকল অপরাধ।

শিক্ষক,কর্মচারী ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় মসজিদের পেছনে গাঁজা,মদ সেবনসহ শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।

এমনকী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবনের(ডরমেটরি) সামনেও অশ্লীল কাজ চলছে দিনের পর দিন। ডরমেটরিতে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকাশ্যেই এসব অশ্লীল কাজ চলছে দিনের পর দিন। প্রশাসন এসব অপরাধিদের কিছুদিন শাসালেও থেমে থাকছেনা অপরাধ। আর এসব অপরাধের সাথে অধিকাংশই জড়িত বহিরাগতরা।এমনকি তাদের জন্য নিজস্ব মাঠেও খেলা খেলতে পারেনা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউন্ডারি দেয়াল থাকলেও বহিরাগতদের প্রবেশ আর তাদের বিভিন্ন অপরাধ ঠেকানো যাচ্ছে না।এমনকি গেইট থাকলেও নিরাপত্তা প্রহরায় নেই কেউই।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নতজানু আচরনের জন্য ক্যাম্পাসে ঠেকানো যাচ্ছেনা একের পর এক সংঘর্ষ, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। ক্যাম্পাস পরিণত হয়ে পড়ছে বহিরাগত সন্ত্রাসী আর অপরাধীচক্রের অভয়াশ্রমে। দিন দিন বেড়েই চলেছে একের পর এক সহিংসতার ঘটনাও।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রক্টরিয়াল বডির দায়িত্বে তিন সহকারী প্রক্টর সিরাজ-উদ-দৌলা, সুবরণ চন্দ্র সরকার ও মীর তামান্না ছিদ্দিকা দীর্ঘদিন যাবৎ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কোন কাজেই করছেন না। এমনকি গত ৫ মাস ধরে একটি দিনও যোগাযোগ কিংবা প্রক্টর অফিসে আসেননি সহকারী প্রক্টররা।

প্রক্টরের যাবতীয় কাজ একাই সামলাতে হচ্ছে বর্তমান প্রক্টরের চলতি দায়িত্বে থাকা একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মোঃ শাহীনুর রহমান । প্রক্টরিয়াল বডির অন্যান্য সদস্যদের অসযোগিতা ও উদাসীনতায় একক ভাবে কোন রকমে প্রক্টরের যাবতীয় কাজ সামলাচ্ছেন তিনি। প্রক্টর পদে থাকলেও তিনি নিজেও কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের হাতে একাধিকবার লাঞ্ছিত হয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যেই কয়েকটি সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৪ মার্চ এক শিক্ষকের সাথে অসৌজন্য আচরণকে কেন্দ্র করে উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা,২৬ মার্চ সিনিয়রিটি না মানার জেরে স্বাধীনতা দিবসের দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সমাজবিজ্ঞান ও লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ২৭ মার্চ কর্মচারীর হাতে শিক্ষার্থী লাঞ্ছিতের ঘটনা এবং ৪ এপ্রিল বহিরাগতদের হাতে ছাত্রী উত্যক্ত ও শিক্ষার্থীদের মারধোরের ঘটনা ঘটেছে। আর এসব ঘটনার জের ধরে উত্তপ্ত রয়েছে বেরোবি ক্যাম্পাস।

এ অবস্থায় শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ বিঘিœত হচ্ছে বলে অভিযোগ করে কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্বদ্যিালয় প্রশাসন ও বর্তমান প্রক্টরিয়াল বডির দুর্বলতা ও ঘটনার পরবর্তী সময়ে বিচারহীনতা সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার কারণে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান প্রধান বলেন,‘ বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা আর বিশ্ববিদ্যালযের প্রশাসনের দুর্বল কাঠামোই ক্যাম্পাসটাকে অনিরাপদ করে দিচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন,‘ ইতোপূর্বে একাধিক এ ধরণের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তার কোন উপযুক্ত বিচার হয়নি। আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই ক্যাম্পাসটাকে এ দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’

যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (চলতি দায়িত্ব) শাহীনু রহমান ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিজেও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ক্যাম্পাসের যে কোন সমস্যায় সবাই আমাকে ফোন করেন। আর আমি নিজে তা সামাল দেওয়ারও চেষ্টা করি। কিন্তু সহকারী প্রক্টররা মাঠে নাই।’

তবে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারি প্রক্টর সুবরণ চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন,‘আমি বাইরে থাকি। যখন ঘটনা ঘটে তখন হয়তো উপস্থিত হতে পারি না তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন অবস্থান করি তখন উপস্থিত হই। এছাড়াও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আমার কাজের চাপ থাকে।’

তবে এভাবে অপরাধ আর এর সুষ্ঠু সমাধান না করলে বিশ্ববিদ্যালয় আরো অস্থিতিশীল হতে থাকবে বলে জানান বিশিষ্ট শিক্ষকেরা। বিশিষ্ট জনেরা বলেন,বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আট বছর পেরিয়ে গেলেও ঠেকানো যায়নি বহিরাগত টোকাইদের ছিনতাই,অনুপ্রবেশ। নেই যথেষ্ট পরিমানে নিরাপত্তা প্রহরী। থাকলেও তাদেও দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না।তাই অতিদ্রুত বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রক্টরিয়াল বডিকে একটিভ করার মাধ্যমে ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের প্রতি জোড় দাবি করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।






মন্তব্য চালু নেই