মেইন ম্যেনু

বিদেশের বাজারে নেত্রকোনার শপিং ব্যাগ

ইচ্ছে ও মেধা খাটিয়ে যে কোন অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। তার প্রমাণ করেছেন নেত্রকোনার কামরুন্নাহার লিপি। নিজের চেষ্টায় বাড়ির পাশে ছাপড়া ঘরে কারখানা বসিয়ে চটের ব্যাগ তৈরি করে দেশের গন্ডি পেড়িয়ে বিদেশের বাজারে সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি। তার কারখানার তৈরি ব্যাগ দেশের সীমানা পেরিয়ে ইতালী, সৌদি আরব ও ভারতের বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটী ইউনিয়নের অনন্তপুর গ্রামের কামরুন্নাহার লিপির বয়স মাত্র ২৯ বছর। এই বয়সেই দারুণ সম্ভাবনা দেখিয়ে দিলেন তিনি।

২০০৫ সালে স্থানীয় স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতিতে মাসিক ৬০০ টাকা বেতন কাজ শুরু করেন তিনি। কয়েক বছর কাজ করার পর বেতন ৩০০০ টাকায় তুলতেন। এতে নিজের আত্ম-সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন সফল হবে না বুঝতে পারলেন। তার মনে ইচ্ছে জাগল, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাবেন। ভাবনা শেয়ার করলেন ছোট ভাই সোহেলের সঙ্গে।

ভাবনা আর কাজ শুরু করা এক সঙ্গেই হল। পুঁজি হিসেবে ছিল সেলাই প্রশিক্ষণ। কয়েক বছর একটানা কাজ করে সেলাই কাজে দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। ‘নারীনেত্র উন্নয়ন সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি মাত্র সেলাই মেশিন নিয়ে তার যাত্রা শুরু।

অনন্তপুর গ্রামে নারীনেত্র উন্নয়ন সমিতি ঘুরে দেখা যায়, বাঁশ দিয়ে তৈরি ছাপড়া একটি ঘর। সমিতির ঘরটি পরিপাটি করে সাজানো। ওই ঘরে ২০টি সেলাই মেশিন। সেখানে নারী পুরুষ মিলে প্রায় ৪০ জন লোক কাজ করছেন। এর মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। কেউ সেলাই করছেন, কেউ বাটিকের কাজ করছেন, আবার কেউ সাজিয়ে রাখছেন।

অন্যদিকে সমিতির পরিচালক কামরুন্নাহারের কক্ষটি পাকা ভিটির। ৪টি টেবিল, ৪টি আলমিরা, ১টি কম্পিউটার এবং ঘরের বেড়ায় সমাজ সচেতনতার কয়েকটি ব্যানার সাটানো। শপিং ব্যাগে স্কিন প্রিন্টের কাজ করছিলেন ক’জন।

কামরুন্নাহার জানান,নিজের সেলাই মেশিন না থাকায় পরিচিত একজনের কাছ থেকে একটি মেশিন ধার নেন। আশেপাশের পাঁচজন নারীকে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেন। তা দিয়েই স্থির করলেন কাজ শুরু করার। একদিন জেলা শহরে গিয়ে দেখেন ছোট ছোট দোকানদার ফুটপাতে কম দামে বা””াদের হাফ প্যান্ট বিক্রি করছে। দোকানিকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথা থেকে এবং কত টাকায় প্যান্ট তৈরি করা হয়। সব জেনে অন্যদের চেয়ে কম মূল্যে প্যান্ট সরবরাহের কথা দিয়ে অল্প পারিশ্রমিকে ১০০ পিচ প্যান্ট তৈরির অর্ডার নেন। এভাবে চলতে থাকে তার কর্মজীবন।

মাঝে মাঝে ভূর্তকীও দিতে হতো। তিনি চিন্তা করেন ‘ঝুঁকি না নিলে উন্নতি করা যাবে না’। এক সময় জানতে পারেন ঢাকার কালীগঞ্জ হতে কেজি হিসেবে কাপড় কিনে আনা যায়। একদিন নিজেই কিছু টাকা নিয়ে চলে যান ঢাকার কালিগঞ্জে। মাত্র ৮০০ টাকার কাপড় কিনে বিক্রি করে দেখেন অর্ধেক লাভ।

এমন অবস্থার মধ্যেই চোখ পড়ল শপিং ব্যাগে। চিন্তা করলেন প্যান্টের চেয়ে সহজে তা বানানো যায়। একটি ব্যাগ কিনে তার সেলাই পদ্ধতি দেখেন। শুরু করেন ব্যাগ তৈরির কাজ। ওই ব্যাগের বাজারে চাহিদাও রয়েছে প্রচুর। কিছু দিন নিজে কাজ করার পর শুরুতে যে ৫ জন মহিলাকে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে প্যান্ট তৈরি করছিলেন, তারাই ব্যাগ তৈরির কাজ শুরু করল। এখন ওই প্রতিষ্ঠানে বাজারের ব্যাগ ছাড়াও স্কুল ব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগও তৈরি করা হয়।

নারী নেত্র উন্নয়ন সমিতির ব্যাগ জেলা শহরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হত। ওই ব্যাগের গায়ে পরিচালক কামরুন্নহারের বিদেশ যাত্রী কেউ এসব দোকান থেকে পণ্য কিনলে তা দিয়ে তৈরি ব্যাগে করে পণ্য নিয়ে বিদেশে যান। ব্যাগের গায়ে তার মোবাইল নম্বর থাকায় সেখান থেকে ফোনে ব্যাগের অর্ডার দেওয়া হয়। অর্ডার আসে বিদেশ থেকে। দেশের বাইরে থাইল্যান্ড থেকে তিনি ব্যাগ সাপ্লাই দেওয়ার অর্ডার পান। পরিচিত একজনের মাধ্যমে ব্যাগ পাঠাতে শুরু করেন তিনি। এভাবে বাজার বাড়তে থাকে তার।

এখন সৌদি আরব এবং ভারতে কিছুদিন পর পর ২০-২৫ হাজার ব্যাগ পাঠান। বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চল হতেও ব্যাগ বানিয়ে দেওয়ার অর্ডার পান। তার তৈরি শপিং ব্যাগ এখন ইতালি, সৌদি আরব ও ভারতে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আমেরিকার বাজারে ওই ব্যাগ নেওয়ার জন্য ওখানকার লোকজনের সাথে আলোচনা চলছে। তবে এক্্রপোর্ট লাইসেন্স না থাকার কারণে তিনি বিদেশের বাজার ঠিকমত ধরতে পারছেন না। তাকে স্থানীয় প্রশাসন বা বড় কোন প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করেনি। যদি করত তবে তিনি আরও এগিয়ে যেতে পারতেন।

কাজের সফলতা স্বীকৃতি যখন পেতে থাকেন তখন উপজেলা সমবায় কার্যালয় থেকে নিবন্ধন করিয়ে নেন। সফল সমবায়ী উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কৃত হন। স্বীকৃতি পেয়েছেন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বিভিন্ন এনজিও হতেও। সামাজিক অধিকার আইনের মাস্টার ট্রেইনার হিসেবেও কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে তেমন সামাজিক সহযোগিতা পাননি। স্থানীয় ইসলামী ব্যাংক ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ৯০ হাজার টাকার ঋণ নেন। বর্তমানে সেলাই কার্যক্রমে ৭ লক্ষ এবং স্যানিটেশন ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে ৫ লক্ষ টাকার প্রকল্প চলছে। অন্যদিকে পুষ্টি ও কৃষি, জন সচেতনতা বৃদ্ধি, উন্নত চুলা বিক্রি, স্ক্রিন প্রিন্ট কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে প্রায় ২০০জন লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠানে।






মন্তব্য চালু নেই