মেইন ম্যেনু

বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা নয়, ইস্যু এখন ‘বাঁচাও সুন্দরবন’!

রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে এখন আর খুব একটা ভাবছেন না আন্দোলনকারীরা। এখন তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য সুন্দরবন বাঁচানো নিয়ে। তবে আন্দোলনের দিক ‘পরিবর্তন’ করায় সমালোচনাও শুনতে হচ্ছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিকে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে অসম চুক্তির কথা বলে আন্দোলন চালিয়ে আসছে তারা। যদিও আন্দোলনকারীরা বলছেন, সুন্দরবনে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে আপত্তি নিয়েই তাদের আন্দোলন চলছিল।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইআইএ (এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদীপথে পরিবহন করা হবে। সেক্ষেত্রে পরিবেশ-আইন অনুসারে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সুন্দরবনের ইকো-সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে সরকারি ইআইএ প্রতিবেদনেই আশংকা করা হয়েছে।

এতদিন আন্দোলনে চুক্তির অসমতার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেলেও ১২ জুলাইয়ের চুক্তির পর ইস্যুটি পরিবেশবাদী হিসেবে রূপ নিচ্ছে। আপনাদের আন্দোলন কি চুক্তির অসমতা ও পরিবেশ ধ্বংস রুখতে, নাকি কেবল পরিবেশগত, এমন প্রশ্নের জবাবে গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রিয় সদস্য ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘সন্দেহাতীতভাবেই আমার কাছে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎটাই প্রধান আপত্তি, বাকি সবকিছু এখানে গৌণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘মারাঠা বর্গীরা কত স্বর্ণমুদ্রা চৌথ নিয়েছিল, তা নিয়ে আমরা আজ সামান্যই ভাবি। পর্তুগিজ হার্মাদরা মগ জলদস্যুদের সাথে মিলে যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, সুন্দরবনকে নিয়ে সরকার-এনটিপিসির তৎপরতা রুখতে না পারলে সেটার চেয়েও অনেক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হবে।’ তিনি মনে করেন, ‘এখানে আজ হার্মাদের ভূমিকায় স্বয়ং রাষ্ট্রশক্তি; এনটিপিসি উসিলা মাত্র।’

অ্যাক্টিভিস্ট ও প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা শুরু থেকেই এ আন্দোলনে সক্রিয়। তিনি বলেন, মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণকারী বলে সাধারণত কোনও সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতির ১৫-২০ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয় না। যে ভারতীয় এনটিপিসি কোম্পানি বাংলাদেশে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চাচ্ছে, সেই ভারতেও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ইআইএ গাইড লাইন ২০১০-এ স্পষ্ট বলা আছে, নগর, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণির অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা ইত্যাদির ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এড়িয়ে চলতে হবে। তার মানে, যে এনটিপিসিকে সুন্দরবনের এত কাছে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে, সে তার নিজ দেশে চাইলেও এ কাজ করতে পারতো না।

প্রকল্প বিষয়ে তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুইটি বিদ্যুৎ-উৎপাদন ইউনিট থাকবে। প্রথম ইউনিট নির্মাণের জন্য চার বছর এবং দ্বিতীয় ইউনিট শেষ হতে আরো ৬ মাস বাড়তি, অর্থাৎ মোট সাড়ে ৪ বছর সময় লাগবে। এই সময় জুড়ে গোটা এলাকার পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদের উপর যে প্রভাব পড়বে, তা এড়ানোর কোনও সুযোগ নেই।

সুন্দরবন ঘেঁষে রামপাল হবে কিনা, সে বিষয়ে গণভোটের দাবিও উঠেছে সম্প্রতি। তবে আন্দোলনকারীদের অনেকেই এ দাবিকে সমর্থন করেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, এ আন্দোলন এখন একটা রূপ পেয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়িয়ে এটা কলকাতা, মুম্বাই পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এ সময় গণভোট হলে এবং সেই ভোটের রায় কোনওভাবে রামপালের পক্ষে গেলে আমাদের সুন্দরবন আমরা বাঁচাবো কী করে?

তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনের কোনও বিকল্প নেই। এটা বিপন্ন হলে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, এটা বোঝানোর কাজটা জোরেশোরে শুরু করতে আমরা খানিকটা দেরি করে ফেলেছি। তবে এখন এটা খুব ভালো জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।’






মন্তব্য চালু নেই