মেইন ম্যেনু

বিশ্বখ্যাত রোমান্টিক আইকন ‘দ্য কিস’

কালে কালে ভালোবাসাকে ঘিরে কতই না কাহিনি তৈরি হয়েছে। লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েটদের মত কত চরিত্রই সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ব দরবারে। তেমনি স্থাপত্যকলাতেও রয়েছে নানা উদাহরণ। শিল্পের এ শাখায় বেশ কিছু শিল্পের মাধ্যমে ভালোবাসাকে তুলে ধরা হয়েছে নিপুণ ভাবে। যা বছরের পর বছর ধরে মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তেমনি একটি অতি জনপ্রিয় শিল্পকর্ম ‘দ্য কিস’।

ফ্রান্সের ভাষ্কার আগুস্তো রদ্যাঁর বিখ্যাত মার্বেল পাথরের স্থাপত্য ‘দ্য কিস’। কঠিন পাথর কেটে জাদুকরি হাতের ছোঁয়ায় ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছেন তিনি। মার্বেল পাথরের ‘দ্য কিস’ স্থাপত্যটি বর্তমানে রাখা আছে প্যারিসের মুসে রদ্যাঁ জাদুঘরে। এই চিত্রকর্মটি যেখানে রাখা আছে তার আশেপাশে আরো বেশকিছু মনোমুগ্ধকর স্থাপত্যকর্ম থাকলেও নীচতলায় রাখা এই শিল্পকর্মটি যেন সবসময় আটকে রাখে দর্শকের চোখ।

তবে আপনি কি জানেন, অসম্ভব সুন্দর আর বন্য সৌন্দর্যে মোড়া ‘দ্য কিস’ কিভাবে তৈরি হয়েছিল? এই গল্পটি মোটেও সুখকর নয়। কেউ ভাবেন রদ্যাঁ নিজের ভালোবাসাকে প্রকাশ করতে ভালোবাসার মানুষটিকে মাথায় রেখেই এই স্থাপত্যটি তৈরি করেছিলেন। কেউবা নারীর প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহকেই এগিয়ে রাখেন ‘দ্য কিস’ সৃষ্টির প্রধান অনুপ্রেরণার তালিকায়। তবে বাস্তবে এসব কিছুই নয়। স্থাপত্যটি তৈরির মূলে ছিল তের শতকের দাঁতের দুটি চরিত্র। তিনি আবার এই চরিত্র দুটিকে তুলে এনেছিলেন নরক থেকে!

7

কিন্তু কি করে দান্তের খুঁজে পাওয়া নরকের এই দুই চরিত্রের সঙ্গে জানাশোনা হল আগুস্তো রদ্যাঁর? গল্পের শুরুটা সেই ১৮৮০ সালে। পুলিশ বাবার ছেলে রদ্যাঁ তখন বেশ বড় হয়েছেন। স্থাপত্য নিয়ে কাজ করে বেশ নামও কামিয়ে ফেলেছেন। সেসময় হঠাৎ তার কাছে প্রস্তাব এল ফ্রেন্স সরকারের কাছ থেকে নতুন এক জাদুঘরের প্রধান ফটকে একটি স্থাপত্যকর্ম করে দেওয়ার জন্য। সেসময়ই রদ্যাঁর মাথায় আসে দাঁন্তের দ্বিতীয় নরকে দেখতে পাওয়া দুই চরিত্র পাওলো আর ফ্রান্সেসকাকে। তের শতকের শিল্পজগতে বেশ চেনাজানা এই দুইজনকে নিয়েই কাজ শুরু করেন রোঁদা। কালো পাথরে খোদাই করেন পাওলো আর ফ্রান্সেসকাকে। যারা কিনা একে অন্যকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। আর সেটা জেনে যায় পাওলোর বড়ভাই ফ্রান্সেসকার স্বামী। মুহূর্তেই রেগে গিয়ে দুজনকেই চাকুর মেরে হত্যা করেন তিনি।

এই দুই চরিত্রের বিখ্যাত প্রথম চুম্বনের দৃশ্যটিকে নিজের কাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন রদ্যাঁ। খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে স্থাপত্যকর্মটির পুরুষের হাত থেকে পড়ে যাওয়া একটি বইকে। হঠাৎ হতভম্ব হয়ে গিয়েই ওটা ফেলে দিয়েছলেন পাওলো। প্রথম চুমুর ব্যাপারটাকে এমনভাবেই আকস্মিক আর ভালোলাগার মধ্যে দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন রদ্যাঁ। তবে এখানেই শেষ নয় ‘দ্য কিসে’র গল্প। এটাতো ছিল ছোট্ট ‘দ্য কিস’। তাহলে বড়টা?

6

‘দ্য গেইট অব হেল’

১৮৮০-এর মাঝামাঝি রদ্যাঁর তার মাথায় আসে পাওলো আর ফ্রান্সেসকার আরো বড় আকৃতি দিয়ে তৈরির। ততদিনে অবশ্য তার ‘দ্য গেইট অব হেল’-এ থাকা পাওলো আর ফ্রান্সেসকার ছোট্ট স্থাপত্যটি বেশ পরিচিতি পায়। অবশেষে কিছুদিনের ভেতরেই নিজের কাজ শুরু করেন রদ্যাঁ। মিলে যায় ফ্রান্স সরকারের অনুমতিও।

তবে কাজটি অর্ধেক এগিয়ে নেওয়ার পরই অন্য কজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন রদ্যাঁ। থেমে যায় স্থাপত্যটি নির্মাণের কাজ। অবশেষে ১৮৯৮ সালে বার্ষিক সালোনে নিজের অন্য একটি স্থাপত্যের সঙ্গে ‘দ্য কিস’কেও সবার সামনে প্রদর্শন করার ইচ্ছা জাগে শিল্পীর। এর পর খুব দ্রুতই শুরু শেষ হয় এর কাজ। মোড়ক উন্মোচন করা হয় ‘দ্য কিসে’র। তখন প্রচন্ড সাড়া ফেলে এটি। তারুন্য, উদ্দামতা, আবেগ আর ভালোবাসার মিশ্রণে অনেকটাই মিলেমিশে যাওয়া দ্য কিস মুহূর্তেই তৈরি হয়ে যায় আরো হাজারটা।

১৯০০ সালের কথা। বসতোনিয়ান এক শৌখিন অ্যান্টিক সাংগ্রহিক অ্যাওয়ার্ড পেরি ওয়ারেন রোঁদাকে আমন্ত্রণ জানান নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখার জন্যে আরো উন্নত পাথরের ওপর দ্য কিস খোদাই করার জন্য। এ জন্যে রোঁদাকে বেশ বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তবে শর্ত ছিল স্থাপত্যের পুরুষাঙ্গটি ঠিকঠাক ও স্পষ্টভাবে খোদাই করতে হবে। ইতিবাচক সাড়া মেলে রোডিনের কাছ থেকে। শুরু হয় কাজ। প্রকান্ড এক মূর্তি নির্মাণ করেন রোঁদা। তবে সেটা দুর্ভাগ্যবশত কোনভাবেই ঘরের ভেতরে ঢোকানো যায়নি। ফলে বাইরেই থেকে গিয়েছিল সেটি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ওয়ারেন স্থাপত্যকর্মটিকে লিউয়িস টাউন হলে রাখার ব্যবস্থা করেন। তবে স্থানীয়রা বেশ ঝামেলা বাঁধায় তাতে। স্থাপত্যটির নগ্নতা নিয়ে প্রশ্ন ও নেতিবাচক মনোভাব জানায় তারা। ঢেকে দেওয়া হয় বৃহৎ স্থাপনাটিকে। পরবর্তীতে সেটা আবার নিজের কাছে ফেরত আনেন ওয়ারেন। লুকিয়ে রাখা হয় স্থাপত্যকর্মটিকে। ১৯২৮ সালে মারা যান ওয়ারেন আর এর বেশ কয়েক বছর পর ১৯৫৩ সালে ‘দ্য কিস’কে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে যায় দ্য টাটে।

kiss1449770973

‘দ্য কিস’কে নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার সমাপ্তি কিন্তু তাতেও হয়নি। এই স্থাপনাটিকে নিয়ে নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি হয় প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে। ২০০০ সালের দিকে ‘দ্য কিস’কে তার আগের স্থান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এক শৌচাগারের পাশে হয় এর স্থান। তবে পরবর্তীতে আবার একে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ওঠে। যদিও সেসময় এ প্রস্তাবে অনেকেই বেশ ক্ষেপে যান।

‘দ্য কিস’কে অনেকে রদ্যাঁর স্ত্রীর প্রতিচ্ছবি বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে বাস্তবে এটি নির্মাণের অনেকদিন পর স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় তার। অনেকে রদ্যাঁ উদ্দাম যৌনতার নিদর্শন বলে ভেবে থাকেন ‘দ্য কিস’কে। কেননা এ ভাষ্করের অন্যান্য শিল্পকর্ম যেমন- আইরিস, মেসেঞ্জার অব দ্য গড ইত্যাদির দিকে নজর দিলে খুব সহজেই যে কেউ বুঝতে পারবেন যে বাস্তব জীবনে উগ্র যৌনতায় আকৃষ্ট ছিলেন তিনি। নারীর প্রতি তার অমোঘ টানের বিষয়টি তার স্থাপত্যকর্মে প্রকাশ পেয়েছে স্পষ্টভাবেই। তবে সেসবের তুলনায় ‘দ্য কিস’ একেবারেই ভিন্ন। বন্যতা, উদ্দামতা, যৌনতা- এ শব্দগুলোকে পাশ কাটিয়ে মিষ্টি একটি ভালোবাসার গল্পই হয়তো ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন রদ্যাঁ নিজের এই সৃষ্টিতে। যেখানে দান্তের নরকের চরিত্র আর নগ্নতার ছোঁয়া থাকলেও তার চাইতেও আরেকটু বেশি কিছু, কোন এক স্বর্গীয় আবেগের নিষ্পাপ ছন্দ যেন বিশুদ্ধতার চাদরে ছেঁয়ে দিয়েছে ‘দ্য কিস’কে।






মন্তব্য চালু নেই