মেইন ম্যেনু

বিশ্বাস করুন! আজ ভারতের সেই দিন…

আজ ফাইনাল। মাঠে নামবে টি-টোয়েন্টিতে শীর্ষে থাকা ভারত আর এই ফরম্যাটের খেলায় প্রান্তিকে থাকা দল বাংলাদেশ। ৫০ ওভারের খেলা হলে ভিন্ন হিসাব ছিল; কিন্তু টি-টোয়েন্টির পরিসংখ্যান, সামর্থ্য ও গত কয়েকটি ম্যাচে প্রতিপক্ষ ভারতীয় দলের সক্ষমতা—কোনো কিছুই বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। টেবিল এবং মাঠের হিসাবে ধরে নেওয়া সংগত যে, ভারতই জিতবে। এসব টাটকা হিসাব সামনে থাকার পরও হাজার হাজার ক্রিকেটপ্রিয় বাঙালি আজ মিরপুরের গ্যালারিতে হাজির হবে। সব কাজ কিংবা রাজসিক ভোজের নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করে বাসাবাড়ির টিভির সামনে অধীর হয়ে বসে থাকবে। মাঠে থাকার জন্য এরই মধ্যে লঙ্কাকাণ্ড বেঁধেও গেছে পুলিশ ও টিকেটপ্রত্যাশী দর্শকের মধ্যে। নিজের এবং স্বজনের একটি টিকেটের জন্য রাত-দিন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা, পুলিশের বর্বর লাঠিপেটা, গলাধাক্কা সবই হজম করছেন ক্রিকেট-পাগলরা। খেলার আগে এই যে লড়াই, কষ্টক্লেশ, শুধুই কি গ্যালারিতে বসে মাত্র একটি খেলা দেখার জন্য? হাজার পঁচিশেক পাগল দর্শক সবাই কি পরাজয় নিশ্চিত জেনেই মাঠে যাবে, বাংলাদেশ বাংলাদেশ ধ্বনিতে গ্যালারিতে ঢেউ তুলবে! না, না মনে হয়। হিসাবটা অত সরল নয়। পরিসংখ্যান, হিসাব, মাথায় কিংবা মাথার ওপরে ভনভন করে ক্রমাগত চক্কর দেওয়ার পরও প্রতি পলে পলে বাঙালিরা ভারত-বধের মহাকাব্যটি মিরপুরের মাঠে দেখতে চাইছে। টাইগার্সরা জিতছে, শক্ত-পোক্ত কংক্রিটের মতো উইকেটগুলো মাশরাফির গোলন্দাজ বাহিনীর বোলিং-তাণ্ডবে ধুপধাপ ভূপতিত হচ্ছে, ব্যাট হাতে ব্যাট নয় যেন চাবুক হানছে ইন্ডিয়ান বোলিং অ্যাটাকের চোখেমুখে। এমন স্বপ্ন মাঠে এবং মাঠের বাইরে কোটি বাঙালি আজ দেখছেই। তা বলি, এই যে দেখা, জয়ের স্বপ্ন দেখা, এই দেখার ভিত্তি কি শুধু মাশরাফি বাহিনীর সামর্থ্য, ভারত-বধে নিকট অতীতের সক্ষমতা! না। সামর্থ্যের সঙ্গে অন্য কিছু, অন্য হিসাবও তো আছে। আর সে হিসাব ক্রিকেটীয়ও বটে। কোন সে হিসাব? হিসাব আছে।

একটি দল একটি টুর্নামেন্টে ক্রমাগত জেতে না। একদিন অশুভ কোনো লগ্নে তাকে হারতে হয়, হারেই। এমনও তো হতে পারে সেই দিনটি আর কোনো দিন নয়, বাঙালির বিশ্বাস সেই দিনটি আজ, মিরপুরে। ক্রিকেটের ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপের ইতিহাসও বলে প্রথম পর্বে যারা টানা জয়ের পুষ্পমাল্য গলায় নিয়ে বিপুল বিক্রমে নকআউট পর্বে যায়, তারা হয় প্রথম দিন, নয়তো ফাইনালের একটি দিন পা পিছলে ছিটকে পড়ে। টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট অনেক দলের ভাগ্যে এমনটা অনেকবার ঘটেছে। ক্রিকেটকে গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা নামে ডাকাও হয়। এ খেলায় যতটা মেধা-দক্ষতা লাগে, তার চেয়ে কোনো অংশেই কম লাগে না ভাগ্য। ভাগ্য আর নিয়তির দাস হচ্ছে ক্রিকেট। নিয়তি নিয়তই আড়ালে আড়ালে চলে।

বাংলাদেশকে হারানোর মধ্য দিয়ে এশিয়া কাপের টি-টোয়েন্টির যে যাত্রা ভারত শুরু করেছিল, সেই জয়রথ এখন পর্যন্ত থামেনি। তাদের সামনে যে-ই পড়েছে, সে-ই ধরাশায়ী হয়েছে। এই টুর্নামেন্টের একটি ম্যাচেও ভারত এখনো হারেনি। প্রবল পরাক্রমে বধে গেছে প্রতিটি প্রতিপক্ষকে। ট্র্যাজেডি তো এখানেই, একটি দল প্রতিদিন জিতবে, টানা জয়ের সুখ-স্বাদ নিতেই থাকবে, অন্য খেলায় সেটা অনায়াস হলেও ক্রিকেটের পাটিগণিত তেমনটি নয়। একদিন বিধি বাম হয়ই। বিধি বামের দিন ঘাপটি মেরে থাকে। হিসাব কষে দেখুন, আজকের ফাইনাল ছাড়া ভারতীয়দের হাতে সেই দিন নেই। মানে আজকেই সেই ঘাপটি মেরে থাকে বিধি বামের দিন। টানা জয়ের ভরা জোয়ার একটা দিনের জন্য থমকায়, সে দিনটা সাধারণত এমন দিনেই হয়, যে দিনটায় হারলে পেছনের সব জেতা পানসে হয়ে যায়।

বিজ্ঞানসচেতন মানুষ কুসংস্কার মানেন না, মানার জায়গাও নেই। তাই বলে ইঞ্চিখানেক ফাঁকফোকরও কি নেই, যেখানে টুপ করে বাসা বেঁধে ঘরসংসার পাতা যায়! মনে হয় আছে, মনের কোনো কুসংস্কারের সূক্ষ্মতর একটা বাসা বোধকরি কমবেশি সবারই আছে। আর উপলক্ষটা যদি হয় ক্রিকেট খেলা, তা হলে তাকে ঘরের বারান্দায় ফেলে রাখা কষ্টকর্মই বটে। যাঁরা দিনের পর দিন ক্রিকেট খেলেছেন, খেলা দেখেছেন, তাঁরা তুড়ি মেরে ক্রিকেটীয় কুসংস্কারকে উড়িয়ে দিতে পারেন না। আজকের দিনে বাঙালি দর্শকের বুক ধুকধুক করে স্বপ্নের তাতে বিজয় বুনছে, বাংলাদেশের বিজয়। কারণ, ক্রিকেটের নিয়তি তো ‘একদিন’ তত্ত্বে বাঁধা যে। একদিন হারতেই হয়, জয় প্রতিদিন নয়। আজ ভারতীয়দের হারের দিন। একটি দিনের হার মাত্র। সেই দিন আজ। ভারত হারবে, এমন ভাবনা পরিসংখ্যানসম্মত না হলেও আকাঙ্ক্ষার রাজ্যে এমন ভাবনাই দুলকিচালে ছুটছে যে ভারতের জয়রথের চাকা টাইগারদের বোলিং তোপে বিধ্বস্ত হবে, ব্যাট চলবে চাবুকের মতো। বিশ্বাস করুন, বাংলাদেশ আজ জিতবে, আজ সেই দিন। জেতার দিন, ঠিক আছে না জিতলে, বিশ্বাস ভঙ্গ হলে ক্ষতিও তো নেই। নাকি আছে?

লেখক :
সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু
সাংবাদিক






মন্তব্য চালু নেই