মেইন ম্যেনু

বুয়েটের সেই মেধাবী ছাত্রী সনি হত্যা : বিস্মৃতির এক যুগ

ফেসবুক ও ইন্টারনেটের এই যুগে গোটা পৃথিবীটা এখন হাতের নাগালে। তাই এই প্রবাসে ঘরে বসে প্রাইমারি স্কুলের বান্ধবী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, জুনিয়র-সিনিয়র সবার খবরাখবর রাখি। এই তো সেদিন দেখলাম শম্পা (ছদ্মনাম), বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বছরের ছোট মেয়েটা বিদেশের এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করল। ছবিতে দেখি ডিগ্রি দেওয়ার অনুষ্ঠানে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল মুখ।

ওদেরই সহপাঠী নিলা (ছদ্মনাম) এখন কত বড় প্রকৌশলী। আবার ফুটফুটে দুটি শিশু নিয়ে তাঁর খুব সুন্দর সংসার। আরও দেখি রাহাতকে (ছদ্মনাম)। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছে কত নতুন সব বিষয় নিয়ে। হঠাৎ তখন আমার মনে পড়ে সনির কথা। আজকে বেঁচে থাকলে কেমন হতো সেই মেয়েটি? সে কি দেশে থাকত নাকি বিদেশে পড়াশোনা করত? হয়তো বা শম্পার মতো পিএইচডি শেষ করত কিংবা নিলার মতো একজন বড় প্রকৌশলী হতো। নাকি হতো একজন গবেষক, যাকে নিয়ে আমরা সবাই অনেক গর্ব করতে পারি।

হয়তো তারও একটা সুখের সংসার থাকত, তার সহপাঠী অন্যান্য ছেলেময়েদের মতো। না এগুলো আমি শুধু কল্পনা করতে পারি, কারণ সনি এখন কল্পলোকের বাসিন্দা। ২০০২ সালের ৮ জুন সনি নামের স্বপ্নটার অকাল মৃত্যু হয়। আসলে মৃত্যু বললে অপরাধীদের যথেষ্ট ছাড় দেওয়া হয়। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিকৌশল বিভাগের মেধাবী ছাত্রী সনি হত্যার এক যুগ হয়ে গিয়েছে। আমরা যারা সেই সময়ের সাক্ষী, হয়ত ভুলে গিয়েছি বা যাইনি। কিন্তু তাতে আমাদের সনির ঘুম আর ভাঙবে না। আমরা সবাই আমাদের নিজস্ব জগতে ব্যস্ত। আমাদের সবারই কর্ম পরিধি, জগত ও বয়স বাড়ছে। কিন্তু সনি আটকে আছে সেই ২০০২ সালের সেই দিনটিতে।

প্রায় এক যুগ আগের এই দিনটির কথা, যেদিন আমরা সনিকে হারালাম মনে করার চেষ্টা করলে খুব বেশি নিখুঁত ভাবে মনে করতে পারি না তেমন কিছু। শুধু মনে পড়ে প্রচণ্ড বেদনা, ভয়, ক্ষোভ ও আতঙ্ক, যা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সেদিন গ্রাস করেছিল। সেদিন অন্যান্য দিনের মতো ক্লাস করতে যাই সকালে। কিন্তু খেলার জন্য ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। আমরা সবাই খুশি। হঠাৎ ছুটি পেয়ে কেউ ক্যাফেটেরিয়াতে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কেউ নীলক্ষেতে যাচ্ছে বই কিনতে আবার কেউ যাচ্ছে বিগ বাইট রেস্টুরেন্টে বার্গার খেতে।

আমিও তিন বান্ধবী মিলে গেলাম নিউমার্কেট। এক ঘণ্টা পর ফিরে এলাম কাজ সেরে। ওই সময়টা যদি ক্যাম্পাসে থাকতাম তাহলে কে জানে হয়তো আমাকে নিয়ে আজকে কেউ স্মৃতিচারণ করত, আমিও হতে পারতাম সনির মত কেউ। ক্যাম্পাসে এসে দেখি প্রচণ্ড ভিড় ও পুলিশ। ছাত্রী হলের গেটের সামনে আকুল হয়ে কাঁদছে সনির দুই বান্ধবী।

দারোয়ান ভাইকে প্রশ্ন করে জানলাম, সনি নামের কেমিকৌশল বিভাগের সেই জুনিয়র মেয়েটি ক্রসফায়ারে পড়ে মারা গেছে। নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সবসময় দেখতাম ও শুনতাম ঢাকা, রাজশাহী ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রকম ঘটনা হয়। রাজনৈতিক মারামারি, গোলাগুলিতে পড়ে নিরীহ শিক্ষার্থী নিহত হয়। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরকম ঘটনা কখনো শুনিনি। বেশির ভাগ সময় অনেক বাছাই করা মেধাবী ছেলেময়েরা এখানে পড়তে আসে। পড়াশোনার তীব্র চাপ অন্য কোনো কিছু করার তেমন সময় কাউকে দেয় না।

তাই রাজনৈতিক কোন্দল থেকে কিছুটা মুক্ত শান্তির পরিবেশ আছে বলে অনেক অভিভাবকরাই সন্তানকে এখানে পাঠাতে চান নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশের জন্য। কিন্তু সেই ক্যাম্পাসে একটা নিরীহ ছাত্রীর মৃত্যু, মনে হলো যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। ক্লাস না হওয়াতে সনি উত্তরা বাসায় চলে যাচ্ছিল। এ সময়ই একটা বুলেট এসে তাকে আঘাত করে। পরবর্তীতে জানতে পারি ইউআরপি বিভাগের নতুন বিল্ডিংয়ের টেন্ডার চলছিল সে সময় ক্যাম্পাসে। সরকারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের দুই গ্রুপের মারামারি ও গোলাগুলির ক্রসফায়ারে পড়ে হারিয়ে যায় সনির জীবন।

তারপরের কাহিনি হয়তো কমবেশি সবারই জানা, জাতীয় দৈনিকগুলোর সুবাদে। অপরাধীদের একজন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফুঁসে ওঠে প্রতিবাদে। সনিদের ব্যাচ (৯৯) অনশনে বসে বিচারের দাবিতে। আমিও সেদিন জীবনে প্রথম ও শেষ মিছিলে যাই। কিন্তু পুলিশের কাঁদানে গ্যাস খেয়ে দৌড়ে চলে আসি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ভাবে হেনস্তা করা হয়। তাদের বলা হয় বখাটে ও উচ্ছৃঙ্খল। বলা হয় কিছু ছেলেময়ে পড়াশোনা করতে চায় না, পরীক্ষা পেছানোর জন্য আন্দোলন করে।

প্রশাসন থেকে এই সব বখাটে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শাস্তিও দেওয়া হয়। আমি মাঝে মাঝে এই সব অনশনরত বখাটেদের দেখে আসতাম দূর থেকে। না ওদের মতো সাহসী আমি ছিলাম না। ওদের মতো পরীক্ষার নম্বর আর গ্রেডের তোয়াক্কা না করে সহপাঠীর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করার মনের জোর আমার ছিল না। আমি ভিতু ও স্বার্থপর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করি। তবুও আমার বিচ্ছিরি বিবেক আর আবেগপ্রবণ মনটা মাঝে মাঝে বলে এমন বখাটেরা না থাকলে হয়তো পৃথিবীর অনেক ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। হয়তো কালোরা সাদাদের সঙ্গে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারত না, হয়তো আমরা ব্রিটিশদের উপনিবেশ থাকতাম এবং হয়তো বাংলাদেশ বলে কোনো দেশের জন্ম হতো না।

যাই হোক বখাটেরা শাস্তি পেয়েছিল কিন্তু অপরাধীরা নয়। বাংলাদেশে বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ড যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকে সেখানে তেমন কোনো বিচার হয় না। এটা নতুন কিছু না এবং এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর সনি, সে তো মামুলি এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তার পরিবারে না আছে কোনো রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তি না আছে তাদের অঢেল প্রাচুর্য। সনির বাবা-মা ব্যাংকে চাকরি করতেন। সনি তাদের বড় সন্তান। একটা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে একটা মেয়েকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো যোগ্য করে তোলা সহজ কথা নয়। সেটা আর কেউ না জানলেও আমার মতো যারা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে তারা ঠিকই জানে।

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর গড়ে মাত্র ০.০২% মেয়েরা পড়তে আসতে পারে। বেশির ভাগ ক্লাসেই ছাত্রছাত্রীর অনুপাত থাকে ১০: ১। সেখানে একটা মেয়ে শুধু নিজে সেখানে পড়তে আসে না, সে একটা স্বপ্নকেও নিয়ে আসে। হয়তো সনির বাবা-মার এমন অনেক স্বপ্ন ছিল। হয়তো সনদ বেঁচে থাকলে একজন প্রতিষ্ঠিত প্রকৌশলী হতো। না সেগুলো কিছুই হয়নি, হওয়ার নয়। সনি মারা যাওয়ার পর সানির মাকে দেখেছি ছাত্রী হলে সনির রুমে এসে কাঁদতে আর নামাজ পড়তে। তিল তিল করে বড় করে তোলা সন্তানকে একটা বুলেটের আঘাতে এক মুহূর্তে হারিয়ে ফেললে বাবা-মার কেমন কষ্ট হতে পারে সেটা লেখার মতো ক্ষমতা আমার নেই।

শুনেছি অপরাধীরা ভালো আছে। দেশে না হলেও বিদেশের নির্ঝঞ্ঝাট জীবনে। এত বছর পরে এতে আর অবাক হই না। আমাদের সমাজ ও মূল্যবোধের কথা চিন্তা করে এতে অবাক হওয়ারও কিছু নাই। আর কে কোথায় কোন সনি, রনি, বনি মরল না বাঁচলো তাতে এত মায়াকান্না করার কীই বা আছে। তার কীই বা অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক যোগ্যতা ছিল বেঁচে থাকার।

আমরা তো ভালো আছি, বেঁচে আছি। যদিও মাঝে মাঝে যখন মনে হয় এক ঘণ্টার হেরফের হলে আমিও সনির স্থানে থাকতে পারতাম, তখন কেমন একটা শিরশির অনুভূতি হয়। বেঁচে থাকলে হয়তো সনির সঙ্গে আরও বেশি ঘনিষ্ঠতা হতো, যেমন হয়েছিল ওদের ক্লাসের অন্যান্য সহপাঠীদের সঙ্গে। হয়তো কষ্টও অনেক বেশি হতো তখন। সনির বাবা-মাকে কোনো সান্ত্বনা দিতে চাই না, কারণ সন্তান হত্যার কোনো সান্ত্বনা হয় না। শুধু এক যুগ পরে এসব কথা মনে হয়ে নিজেই লজ্জিত হই।

মনে হয় কেন পারি না আমার এই লাগামহীন আবেগ আর বিচ্ছিরি বিবেকটাকে মেরে ফেলে সরীসৃপ হয়ে যেতে। কেন এই সব অদ্ভুত চিন্তা করি, শুধু শুধু সময় নষ্ট করি। আসুন আমরা স্বার্থপর হই, ভালো থাকি, বেঁচে থাকি। শুধু মাঝে মাঝে যদি মনে পড়ে আমাদের সেই ছোট বোন সনির কথা গোপনে বলি, আমাদের ব্যর্থতা ক্ষমা কর সনি।






মন্তব্য চালু নেই